Altruistic
Uploader
Salafi User
- Joined
- Nov 17, 2023
- Threads
- 421
- Comments
- 542
- Solutions
- 1
- Reactions
- 13,721
- Thread Author
- #1
আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান একই শহরে বসবাস করে। একদা আব্দুল্লাহ দেখলো যে, আব্দুর রহমান কিছু মানুষ কে বলছে পৃথিবী আকৃতি ও ভৌগলিক ভাবে সম্পূর্ণ সমতল; এবং কুরআন এটাই বলে। এই কথা শুনতে পেয়ে আব্দুল্লাহ বললো....
আব্দুল্লাহ:- কুরআন ও হাদীস পৃথিবীকে সমতল বলে এটি সম্পূর্ণ সঠিক; কিন্তু কুরআন আকৃতি ও ভৌগলিক ভাবে সম্পূর্ণ সমতল বলে; এটা ভুল কারণ, কুরআন মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে এসব বলেছে যা কুরআন দিয়েই সুপ্রমাণিত।
আব্দুর রহমান:- কুরআন তো সমতল,বিছানা ইত্যাদি বলেছে। তুমি কিভাবে বলছো যে, এগুলো সব মানুষের পর্যাবেক্ষনের বা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে? তোমার কাছে কি কোন দলিল আছে?
আব্দুল্লাহ:- এটি আমি এই জন্য বলছি কারণ, কুরআন ও হাদীস বুঝতে হয় সামগ্রীকভাবে। সমস্ত আয়াত কে একসাথে করে তারপর তার বুঝ কে বাহির করতে হয়। আর আমরা যখন পৃথিবীকে সমতল বা বিছানোর সকল আয়াত কে একসাথে করি তখন আমরা দেখি যে, তা পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে বলছে। এর প্রমাণ সূরা গাশিয়ার ২০ নং আয়াত:-
وَإِلَى ٱلۡأَرۡضِ كَيۡفَ سُطِحَتۡ
অনুবাদ:- এবং (দেখ) ভূতলের দিকে যে, কিভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে?
এখান থেকে বুঝা যায় যে, অন্য আয়াত বলছে পৃথিবী সমতল বাহ্যিক বা পর্যাবেক্ষনের দৃষ্টিতে এবং কুরআন মানুষের উপকার হাসিলের জন্য এই আলোকেই বর্ণনা করেছে।
আব্দুর রহমান:- এখানে তো দেখার কথা বলা হয়েছে কিন্তু অন্য স্হানে দেখার কথা বলা হয়নি বরং সাধারণ ভাবে বলা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে আমাকে বলো.., কুরআন ও হাদীস বলছে যে সূর্য উদয় ও অস্ত যায়।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:-
فَلَآ أُقۡسِمُ بِرَبِّ ٱلۡمَشَٰرِقِ وَٱلۡمَغَٰرِبِ
অনুবাদ:- আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচল-সমূহের..। সূরা মা'আরিজ ৪০
অর্থাৎ সূর্য কখনো এক স্থান আবার কখনো অন্য স্হান থেকে উদয় হয়; আবার কখনো এক স্থান আবার কখনো অন্য স্হানে অস্ত যায়। অর্থাৎ সূর্য উদয় ও অস্ত যায় এটা কুরআন বলে এবং তা বিভিন্ন স্থানে। এখানে দেখার কথা বলা হয়নি বরং সাধারণ ভাবে বলা হয়েছে।
হাদীসে এসেছে:-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ
অনুবাদ:- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমুআর দিন সর্বোত্তম। সহীহ মুসলিম ৮৫৪।
এখানেও দেখার কথা বলা হয়নি বরং শুধু বলা হয়েছে সূর্য উদয় হয়। তাহলে কি সূর্য বাস্তবিক ভাবে ভৌগলিক আকৃতির আলোকে অস্ত যায়! অথচ এটা এটা স্পষ্ট সত্য যে, সূর্য ভৌগলিক ভাবে কখনও অস্ত যায় না। এই বিষয়ে কি বলবেন?
আব্দুর রহমান:- কুরআনের বিভিন্ন আয়ত বলে যে সূর্য উদয় ও অস্ত দেখার বা পর্যাবেক্ষনের আলোকে। যেমন:-
وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ وَهُمۡ فِي فَجۡوَةٖ مِّنۡهُۚ
অনুবাদ:- আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। সূরা কাহাফ ১৭
এখানে দেখার কথা বলা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে বিষয়টি তো একই দাঁড়ালো। তুমি নিজেই বলছো যে, কুরআন কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক থিসিস হিসেবে নয়, বরং মানুষের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। ভাষা সবসময় মানুষের পর্যবেক্ষণ বা পারসেপশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং এটা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। তুমি সূর্য উদয় ও অস্ত কে অন্য আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে; তাহলে সমতল পৃথিবীকে কেন অন্য আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা নাও না? যদি সূর্য উদয় ও অস্তের ক্ষেত্রে অন্য আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা নাও তাহলে এখানে কেন মুনাফিকি করো? যেকোনো এক নীতি গ্রহণ কর।
আব্দুর রহমান:- দুটো একই বিষয় নয় কারণ, হাদীসে এসেছে:-
যিমাম বিন ছা'লাবা (রা.) বললেন: أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاءَ، وَبَسَطَ الأَرْضَ، وَنَصَبَ هَذِهِ الجِبَالَ، آللَّهُ أَرْسَلَكَ؟ (আমি আপনাকে সেই আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, যিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন, জমিনকে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং পাহাড়সমূহকে স্থাপন করেছেন—আল্লাহ কি আপনাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন?)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: نَعَمْ (হ্যাঁ)। (সহীহ বুখারী ৬৩)
এইবিষয় থেকে প্রমাণিত হয় যে, জমিন বাস্তবেই ভৌগলিক আলোকে সমতল।
আব্দুল্লাহ:- এখানে যেকেউ বলবে যে, এই অমুসলিম ব্যক্তিটি তার বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে বলেছেন কারণ মানুষ তার পর্যাবেক্ষনে তাই দেখে। এই ব্যক্তিকে আল্লাহ ওহী পাঠিয়ে বলে দেয়নি বরং সে তার পর্যাবেক্ষনের আলোকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এসব কথা বলেছেন।
আব্দুর রহমান:- কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো চুপ ছিলেন। যার অর্থ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ব্যক্তির কথাকে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবী সমতল।
আব্দুল্লাহ:- তুমি এখানে আংশিক বলছো কারণ, এখানে বলতে হবে:-" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ব্যক্তির পর্যাবেক্ষনের আলোকের কথাকে মেনে নিয়েছে"। কারণ সেই ব্যক্তি নিজের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই বলেছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিয়েছে।
এছাড়াও কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের আয়াত মেনে নেননি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন এই ব্যক্তির কথাকে মেনে নিয়েছে তেমনি কুরআনের কথাকেও; বরং কুরআনের কথাকে তো অমুসলিম গোষ্ঠীকাদিয়ানী, হাদীস অশ্বিকার কারী সহ সকলেই মেনে নিয়েছে। তাহলে কি এখন ভৌগলিক ভাবে সূর্য উদয় ও অস্ত যায়?
আব্দুর রহমান:- আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সূরা গশিয়ার ২০ নম্বর আয়াত উপস্থাপন করা ভুল হয়েছে কারণ, আল্লাহ শুধু সেখানে জমিনের কথায় বলেনি বরং তার পূর্বে উট, আকাশ ও পাহাড়ের কথাও বলা হয়েছে। যদি আপনার কথা ধরে নেয় যে, জমিন সমতল বলা হয়েছে কিন্তু আসলে তা ভিন্ন রকম; তাহলে উট, আকাশ, পাহাড় সম্পর্কে যা বলা হয়েছে আসলে তা ভিন্ন রকম। আপনি কি বলবেন এই বিষয়ে?
আব্দুল্লাহ:- এখানে কথা হচ্ছে পর্যাবেক্ষন না কি পর্যাবেক্ষন নয়; এখানে ভিন্ন-অভিন্ন আসবে না কারণ, উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন এগুলোকে বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে দেখে চিন্তা-গবেষণা করে উপকার হাসিলের কথা বলা হয়েছে যা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই। এখানে ভিন্ন অভিন্নের কথা কথা আসবে না। কুরআন এখানে উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন যেমন দেখা যায় আসলে তা ভিন্ন বা অভিন্ন নিয়ে কিছুই বলেনি বরং এগুলোকে পর্যাবেক্ষনের মাধ্যমে উপকার হাসিলের কথা বলেছে।
এটা জরুরী নয় যে, মানুষ পর্যাবেক্ষনের আলোকে যা কিছু দেখে আসলে তার ভিন্ন কিছু হতে পারে না। কারণ, মানুষ পাহাড়কে কেবল একটি বিশাল পাথরের স্তূপ হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি হলো: এটি কেবল পাহাড়ের চূড়া বা উপরের অংশ। এটি ভূ-ত্বকের গভীরে এমনভাবে গেঁথে আছে যা পৃথিবীর নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নাবায় (৭৮:৭) বলেছেন:- وَٱلۡجِبَالَ أَوۡتَادٗا
অনুবাদ:- আর (বানাইনি) পর্বতসমূহকে পেরেক ?
এখানে 'আওতাদ' (أَوْتَادًا) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ তাঁবুর খুঁটি। একটি খুঁটির যেমন সামান্য অংশ উপরে থাকে এবং অধিকাংশ অংশ মাটির নিচে গেঁথে রাখা হয় যাতে তাঁবুটি স্থির থাকে, পাহাড়ের গঠনও ঠিক তেমনি।
অর্থাৎ আবশ্যক নয় যে, মানুষ পাহাড়কে যেভাবে একটি বিশাল পাথরের স্তূপ হিসেবে দেখে আসলে তাই হবে। মানুষ মাটির নিচে দেখতে পারে না। আর কুরআনের উদ্দেশ্যেও এটা নয় বরং উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন পর্যাবেক্ষন করে আল্লাহ মানুষকে অনুধাবন করতে বলেছে। এখানে ভিন্ন অভিন্নের কিছুই বলা হয়নি।
আবার আমরা দেখি যে সুবহে সাদিক, সূর্যের রশ্মি ও মেঘমালা যুক্ত বায়ুমণ্ডল কে কুরআন ও হাদীসে আকাশ বলা হয়েছে। মানুষ যা দেখে তা হলো মানুষের পর্যাবেক্ষনের বায়ুমণ্ডলিও আকাশ। আসল আকাশ হলো গায়বি বিষয় এবং মানুষ তা দেখতে পারে না কারণ, অন্ধকার ঘড়ের মধ্যে কি কেউ তার শেষ দেয়াল দেখতে পারে? অবশ্যই না। তেমনি মহাবিশ্বের বিশার অন্ধকার জগৎ পেরিয়ে কিভাবে আসল আকাশ দেখবে? যা কিনা আমাদের মহাবিশ্বের দেয়াল। মানুষ আসল আকাশ দেখতে পারে না বরং বায়ুমণ্ডলিও আকাশ দেখে। অর্থাৎ মানুষ যেই আকাশ দেখে এটা হলো পর্যাবেক্ষনের আলোকে বায়ুমণ্ডলীও আকাশ। এটাকেই মানুষ দেখতে পারে এবং আল্লাহ এটাকেই দেখতে বলেছেন। বাস্তবিক আকাশ কেউ দেখতে পারে না।
এর প্রমাণ ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে যা নাসার সাজানো নাটক নয় বরং সাধারণ মানুষের নিজস্ব গবেষণা। ইউটিউবে গিয়ে বিভিন্ন রকেট ও বেলুন দিয়ে মহাকাশ পর্যাবেক্ষনের ভিডিও দেখতে পারো।
অর্থাৎ প্রমাণিত হলো যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এখানে উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন কে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে বলেছেন যেন মানুষ অনুধাবন করতে পারে। কুরআন এখানে ভিন্ন অভিন্নের কিছুই বলে নাই বরং সাধারণ মানুষের পর্যাবেক্ষন বলা হয়েছে।
কুরআন কোন সাইন্সের থিসিস নয় বরং মানুষের জন্য হেদায়েত। তাই কুরআন মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই আলোচনা করে।
আব্দুর রহমান:- কুরআন বলছে সূর্য ঘুড়ে। এই বিষয়ে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- উত্তর একই। অর্থাৎ কুরআন বুঝতে হয় সামগ্রীক ভাবে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বলে সূর্য চলমান; তা হলো মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে কারণ অন্য আয়াতে এসেছে এবং আপনিও তা পূর্বে উল্লেখ করেছেন। যেমন:-
وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ وَهُمۡ فِي فَجۡوَةٖ مِّنۡهُۚ
অনুবাদ:- আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। সূরা কাহাফ ১৭
এখানে দেখার কথা বলা হয়েছে।
কুরআন হলো মানুষের হেদায়েত গ্রন্থ তাই সর্বদা সে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই এসব বিষয় আলোচনা করে। তোমায় নিকট কি আর কোন সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীস আছে যা সরাসরি ভাবে পৃথিবীর সমতল,সূর্যের ঘুর্ণন,সূর্য উদয় ও অস্তের শব্দ সরাসরি ব্যবহার করে? যা দিয়ে প্রমাণ করবে যে, কুরআনের এগুলো অর্থাৎ সূর্য উদয় ও অস্ত, পৃথিবীর সমতল, সূর্যের ঘুর্ণন ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যাবেক্ষনের আলোকে নয় বরং অন্য কিছু?
আব্দুর রহমান:- সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীস আর নেই কিন্তু কিছু লজিক রয়েছে যা বিভিন্ন কুরআনের আয়াত ও হাদীসের উপর কিয়াস করে বের করা হয়েছে। যা প্রমাণ করবে যে পৃথিবী সমতল।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে তোমরা পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতিকে আকিদার বিষয় কেমনে বানাও যার কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই? সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীস ছাড়া কুরআন ও হাদীসের কিছু বিষয়ের উপর কিয়াস করে কি তোমরা আকিদা প্রমাণ করো এবং অন্যকে কাফের বলো?
আব্দুর রহমান:- অনেক পূর্ববর্তী আলেম বলেছেন।
আব্দুল্লাহ:- পূর্ববর্তী কোন আলেম যদি বলেও থাকেন তাহলে তা ছিল কুরআন ও হাদীসের শব্দের বাহ্যিক শব্দ ও নিজেদের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। এই বিষয়ে তো সকল আলেম একমত যে, পৃথিবী সমতল; কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। তুমি আমাকে ইজমা প্রমাণ করে দেখাও যে, কোন আলেম পৃথিবী আকৃতির আলোকে সমতল বলে ইজমা দাবি করেছেন? যখন ইজমা নেই তখন গোঁড়ামি বন্ধ করে কুরআন ও হাদীসের দিকে ফিরে এসো এবং প্রমাণ কর। বিপরীতে আমি উপরে কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণ করেছি যে, কুরআন এসব বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করেছেন। কুরআনের কোন মাথাব্যথা নেই যে, পৃথিবী গোল নাকি সমতল এবং এটা কোন আকিদার বিষয়ও নয়। সাইন্স যেই দৃষ্টিতে আলোচনা করে কুরআন সেই দৃষ্টিতে আলোচনা করে না; তাই উভয়ের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আর যদি ইজমা হিসেবে বলতে হয় তাহলে আলেমরা ইজমা করেছেন যে, পৃথিবী গোলাকার যা,ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম ইবনে তাইমিয়া সহ আরও অনেকেই উল্লেখ করেছেন। ইজমা বাদ দিলেও কিছু যায় আসে না কারণ কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে স্পষ্ট।
তোমার আর কি কোন সংশয় আছে যে, পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি কেমন তা কোন আকিদার কোন বিষয়ে নয়? এবং আর কি এই বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে ও কাফের বলবে?
আব্দুর রহমান:- না। তবে কিছু কুরআনের আয়াত ও হাদীস আছে যার উপর কিয়াস করলে প্রতিয়মান হয় যে পৃথিবী সমতল বা অন্য কিছু। যেমন:- এক হাদীসে এসেছে যে, এক দাসিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে আল্লাহ কোথায়? সেই দাসি উপরের দিকে আঙুল তুলে বলেছিল উপরে। যদি পৃথিবী সমতল না হয়ে গোল হয় তাহলে তো এক একটি স্থান থেকে এক এক দিকে আঙুল যাবে। আল্লাহ তাআলা তাহলে কোন দিকে?
আব্দুল্লাহ:- তুমি এখানে ভুলের শিকার হয়েছো। সব সময় মনে রাখবে যে, গায়েবি বিষয় দিয়ে এগুলো প্রমাণ করতে যাবে না। যেমন:-আল্লাহ প্রথম আকাশে নেমে আসেন। বুদ্ধি ও যুক্তি তো এটাই বলে যে, তাহলে আল্লাহ সৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আল্লাহ তাআলা সকল সৃষ্টির উর্ধ্বে। তাই গায়েবি বিষয়ের উপর বাস্তবিক বিষয় কে কিয়াস করবে না। অনেক দল গোমরাহ হয়েছে গায়েবি বিষয় কে বাস্তবিকতার সাথে মিশিয়ে।
এখন আসো তোমার পেশকৃত হাদীসের দিকে। এই হাদীসের কাহিনীতে আঙুলের ইশারা করা হয়েছে শুধু বোঝানোর জন্য ও মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য। মানুষ যেন এটা বুঝতে পারে যে, আল্লাহ সকল কিছুর উর্ধ্বে। এটা দিয়ে সমতল পৃথিবীর উপর কিয়াস করা যায় না কারণ এখানে বাস্তবিক ও আসল উর্ধ্বে বোঝানো উদ্দেশ্য যা আরশেরও উপরে। কারণ হলো হাদীসের মধ্যে এরূপ আরও বিষয় পাওয়া যায়। যেমন:-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُولُ " يَأْخُذُ الْجَبَّارُ سَمَوَاتِهِ وَأَرْضَهُ بِيَدِهِ - وَقَبَضَ بِيَدِهِ فَجَعَلَ يَقْبِضُهَا-
অনুবাদ:- আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) আসমান ও যমীনসমূহকে ধরে তাঁর হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে নিবেন। (এই কথা বলতে বলতেই) তিনি নিজের হাত মুঠো করলেন এবং তা খোলেন ও বন্ধ করেন বারবার। ইবনে মাজাহ ১৯৮।
এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরূপ করা দেখে কি আপনি বলবেন যে, আল্লাহ এরূপ করবেন? এটা যে রূপ আল্লাহ তাআলার সিফাত; অনুরূপ আরশেরও উপরে উঠা আল্লাহ তাআলার সিফাত। এরূপ আরও হাদীস রয়েছে। এগুলো দিয়ে মূলত উদ্যেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে ভালো ভাবে বোঝানো যে, আল্লাহ সত্যিই আরশেরও উর্ধ্বে, আল্লাহ সত্যিই আসমান জমিন কে মুষ্টিবদ্ধ করবেন। কিন্তু এগুলোর ধরন আমরা জানি না কারণ, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ অর্থাৎ তাঁর সদৃশ বা সমান কিছুই নেই। তাই আপনার এই যুক্তি উপস্থাপন ঠিক হয়নি।
আব্দুর রহমান:- তাহলে ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল সম্পর্কে কি বলবেন? আমরা তো ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল কে দেখতে পারি না।
আব্দুল্লাহ:- তোমাকে তাই পূর্বেই বলা হয়েছে যে, গায়েবি বিষয় দিয়ে বাস্তব বিষয়ে লজিক দিলে তুমি স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল হলো আল্লাহর অলৌকিক ও গায়েবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। তিনি মানুষের থেকেও বেশী জিন শয়তান আবাদ করিয়েছেন এবং অগণিত ফেরশতাকে বিভিন্ন কার্যে নিযুক্ত করেছেন কিন্তু এগুলো মানুষ দেখতে পায়না। ঠিক তেমন ভাবেই আল্লাহ ইয়াজুজ মাজুয ও দাজ্জাল কে লুকিয়ে রেখেছেন কার তিনি কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। আর ইয়াজুজ মাজুয ও দাজ্জাল হলো অলৌকিক পূর্ণ ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত করণ, বাদশাহ জুলকারনাইন যে দেয়াল বানিয়েছিল তা একবার চিকন হয় আবার আল্লাহর ক্ষমতায় পূর্বের মত হয়ে যায়। অর্থাৎ এটি আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতার অংশ। আর অলৌকিক বিষয় কে অলৌকিক ভাবে না নিয়ে বাস্তবিক ভাবে বিশ্লেষণ করা হলো মূর্খদের কাজ। আল্লাহ ইয়াজুজ ও মাজুয কে অলৌকিক ভাবে কোথায় ও কিভাবে লুকিয়ে রেখেছেন আল্লাহ ভালো জানেন।
আবার দাজ্জালের সাথে পশম ওয়ালা প্রাণী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস যে, এখন যারা বেঁচে আছে ১০০ বছরের মধ্যে তারা কেউ বেঁচে থাকবে না পৃথিবীর বুকে । তাও যদি দাজ্জাল বেঁচে থাকে তাহলে তা হলো আল্লাহর অলৌকিক বিষয়। আর অলৌকিক বিষয় কে অলৌকিক ভাবে না নিয়ে বাস্তবিক ভাবে বিশ্লেষণ করা হলো মূর্খদের কাজ। আল্লাহ দাজ্জাল কে অলৌকিক ভাবে কোথায় ও কিভাবে রেখেছেন আল্লাহ ভালো জানেন।
আব্দুর রহমান:- কুরআনের মধ্যে আয়াত আছে যে, গ্রহ,নক্ষত্র, আকাশ-মহাকাশ ইত্যাদি সব ধ্বংস হয়ে পৃথিবীতে খশে পড়বে। তাহলে কুরআন বলছে পৃথিবী সবচেয়ে বড়।আরা মিথ্যুক বিজ্ঞান বলছে সূর্য বড়।
আব্দুল্লাহ:- বিজ্ঞান যা খুশি তাই বলুক তাতে কিছু যায় আসে না কিন্তু তুমি বলছো কুরআন বলেছে বাস্তবিক পৃথিবী বড় সূর্যের চেয়ে এটা কুরআনের উপর অপবাদ। পূর্বে প্রমাণ করা হয়েছে যে, কুরআন সবসময় মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে অর্থাৎ কুরআনের কোন আয়াত দ্বারা যদি এটা মনে হয় যে, কুরআন বলছে পৃথিবী বড় তাহলে, এটা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। আর যদি বাস্তবিক ধরেও নি তাহলে এগুলো বিষয় সংগঠিত হবে কিয়ামতের সময় যখন পৃথিবীকেও পরিবর্তন করা হবে অন্য পৃথিবীতে। তাই কিয়ামতের সময়কার পৃথিবীর সাথে এখনকার পৃথিবীর তুলনা করা মূর্খতার পরিচয়।
যদি ধরেও নি যে পৃথিবীর এখনকার আকৃতিতেই থাকবে, তাও প্রমাণ হয় না যে, কুরআন বলে, পৃথিবী বড় এবং সূর্য ছোট্ট কারণ আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। তিনি চাইলে বড় বস্তুকেও ছোট বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করাতে সক্ষম। তাই কুরআন কোথাও পৃথিবীকে সূর্যের চেয়ে বড় বলেনি বাস্তবিক ভাবে এবং আল্লাহ সবকিছুই করতে ক্ষমতাবান।
আব্দুর রহমান:- এরূপ ফাও পেচাল কৈ পেয়েছেন?
আব্দুল্লাহ:- আমার কথা অযৌক্তিক নয় কারণ আমি দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছি এবং করবো; কিন্তু তোমার এইসব যুক্তি হলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করার মূর্খতা। কিয়ামতের সময় পৃথিবী কেমন হবে, পাহাড় কেমন হবে, যেই আসমান দেখিনায় তা কিভাবে ভেঙে পড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি হলো গায়েবি বিষয়। তুমি গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করে পথভ্রষ্ট হয়েছো ও হইতেছো।
আল্লাহ নিজেই কুরআনে বলে দিয়েছেন যে, তিনি কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। তুমি কি আল্লাহর ক্ষমতাকে অশ্বিকার করবে? এবং আল্লাহর "কুন-ফায়াকুন" ক্ষমতাকে ভুলে যাবে? আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মধ্যে বলে দিয়েছেন যে, তিনি যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন বললে " কুন" সাথে সাথে তা" ফায়াকুন" হয়ে যায়। আর আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্র সব কিছুই আল্লাহর সিদ্ধান্ত সমূহের একটি সিদ্ধান্ত। আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্র যে পৃথিবীতে খশে পড়বে এটাও আল্লাহর সিদ্ধান্ত সমূহের একটি সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন যে, তিনি যে কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক না কেন তার জন্য কুন-ফায়াকুনই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বদা কুন-ফায়াকুন ক্ষমতাকে প্রয়োগ করতে সক্ষম। তার কুন-ফায়াকুন ক্ষমতা থেকে সেই বিষয়ে বাদ যাবে যে সিদ্ধান্তগুলোকে আল্লাহ নিজেই নির্দিষ্ট করার ওয়াদা করেছেন। যেমন:- আল্লাহ চাইলে সকল অমুসলিম কাফেরকেউ তার সাথে শিরকে আকবার করার পরও ক্ষমা করে দিতে সক্ষম কিন্তু তিনি তাদের ক্ষমা করবে না কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূর্বেই তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আল্লাহ শিরক কারীকে কখনোও ক্ষমা করবে না। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তায়ালা অমুসলিম কাফের সকলকেই জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম ও ক্ষমতা বান কিন্তু আল্লাহ তা করবেন না কারণ, আল্লাহ নিজেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, অমুসলিম কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম।
এমন কোন কাজ নেই যা মানুষ কল্পনা করতে পারে এবং আল্লাহ তা করতে সক্ষম নন। তবে আল্লাহ সে সকল কার্জ করতে ক্ষমতা বান হওয়া শর্তেও করবেন না যেই বিষয় কে তিনি পূর্বেই কুরআন ও হাদীসের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীসের কোথাও বলা হয়নি যে, আল্লাহ পৃথিবীকে বড় করবেন না বা আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্রকে ছোট করবেন না বা তিনি বড় বস্তুকে ছোট বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করাবেন না। বরং কুরআনে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের সময় এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করা হবে।যখন এই বিষয়ে কোনো কিছু নির্দিষ্ট করা হয় নি তাহলে এই বিষয়গুলো আল্লাহর কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। কেননা সমস্ত সিদ্ধান্তই আল্লাহর কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত যদি না আল্লাহ কিছু নির্দিষ্ট করে দেন। তাই আল্লাহ তায়ালা আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্রকে পৃথিবীর মধ্যে কেন বরং একটি পিঁপড়ার মধ্যেও প্রবেশ করাতে সক্ষম এবং তিনি তাকে কোন কিছু দিয়ে নির্দিষ্ট করে নি।
আব্দুর রহমান:- আল্লাহ তাআলা বলেছেন "আল্লাহ তিনিই, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবীও তার অনুরূপ" এটা সম্পর্কে কি বলবেন? এটা দিয়ে কি পৃথিবী আসমানের মত বড় প্রমাণ হয়না?
আব্দুল্লাহ:- তোমাদের প্রত্যেক বিষয় কেন গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত থাকে? তুমি কি প্রথম আসমান দেখেছো? গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা বন্ধ কর। এই আয়াত দ্বারা সংখ্যা বোঝানো হয়েছে। আকাশ আর পৃথিবী কিভাবে অনুরূপ হয়? আকাশ কি দিয়ে তৈরি আর পৃথিবী কি দিয়ে? আকাশের দরজা আছে আর পৃথিবীর দরজা কোথায়? আকাশ তো গম্বুজ এর মত; পৃথিবী কি গম্বুজের মত?ইত্যাদি ইত্যাদি।
আব্দুর রহমান:- এই বিষটির প্রমাণে শক্তিশালী আরেকটি কিয়াস রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা থেকে হাসান সনদে প্রমাণিত যে, জমিন থেকে জমিন থেকে প্রথম আসমানের দুরত্ব ৫০০ বছরের এবং এক আসমান থেকে অন্য আসমানের দুরত্ব ৫০০ বছরের এবং পুরুত্বও ৫০০ বছরের। আবার জমিনের পুরুত্বও ৫০০ বছরের এবং এক জমিন হতে অন্য জমিনের দূরত্বও ৫০০ বছরের। এই হাদীস প্রমাণ করে যে পৃথিবী সমতল। কারণ, আকাশের পুরুত্ব ৫০০ বছর আবার জমিনেরও। এটা প্রমাণ করে পৃথিবী অনেক প্রসস্থ ও সমতল এবং পুরুত্ব আছে। গোলাকার জিনিসের কোন পুরত্ব হয় না।
আব্দুল্লাহ:- পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী এক নয় বরং ভিন্নতা আছে যেমন:- আকাশ গম্বুজের মত আর পৃথিবী গম্বুজের মত না ইত্যাদি। আর গোলাকার জিনিসের পুরুত্ব হয় না কে বলেছে? একটি আসল ক্রিকেট বল নিয়ে দেখো যে, তার উপর মোটা চামড়া, তার ভিতরে একটি বল এবং তার ভিতরেও হয়তো আরোও স্তর আছে। একটি গোলাকার ছোট ক্রিকেট বলে যদি স্তর এবং পুরুত্ব থাকে তাহলে অন্য বিষয়ের কথা বাদই দেন।
আর এখানে ৫০০ বছর কে রূপক অর্থে নেওয়া হয়েছে। এর দ্বারা ৫০০ বছর উদ্যেশ্য নয় বরং বিশাল প্রসস্ততা বোঝানো হয়েছে। এরূপ আরবি বালাগাতের ব্যবহার অনেক রয়েছে। অনেক যায়গায় এরূপ রূপক ভাবে প্রসস্ততা ও সংকির্ণতা বোঝানোর জন্য বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হয়। এটা যে রূপক এর দলিল হলো:- একটি সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে,
رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " فِي الْجَنَّةِ مِائَةُ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ
অর্থ:- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে একশতটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বর্তমান। (সুনান তিরমিজী ২৫৩১).
অর্থাৎ জান্নাতের স্তর সমূহের মধ্যে আসমান ও জমিনের পার্থক্য। আবার অন্য সহীহ মারফু হাদীসে এই পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " فِي الْجَنَّةِ مِائَةُ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ مِائَةُ عَامٍ "
অর্থ:- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের একশত স্তর (ধাপ) রয়েছে। প্রত্যেক দু স্তরের মাঝখানে রয়েছে একশত বছরের ব্যবধান। (সুনান তিরমিজী ২৫২৯).
তাহলে টনটনে সহীহ মারফু হাদীস দিয়ে প্রমাণিত যে, আসমান ও জমিনের দূরত্ব ১০০ বছর; অথচ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস অনুযায়ী ৫০০ বছর। তাহলে কোনটা ঠিক? আসলে দুটোই ঠিক কারণ এখানে সময় উদ্যেশ্য নয় বরং অনেক দূরত্ব তা বোঝানো উদ্দেশ্য।
আবার অপর একটি সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে যে, বান্দার মাঝে ও জান্নাত-জাহান্নামের মাঝে ১ হাত পার্থক্য থাকে। কিন্তু পরিশেষে তাকদির এসে পড়ে এবং সে জান্নাতে বা জাহান্নামে চলে যায়।
আসলেই কি জান্নত ও জাহান্নাম ও ব্যক্তির মাঝে ১ হাত পার্থক্য থাকে? সেই ব্যক্তি কি একটি লাফ দিয়েই সোজা জান্নাতে ও জাহান্নামে চলে যাবে?
এখানে এক হাত হিসাব দ্বারা এক হাত দূরে জান্নাত জাহান্নাম বোঝানো হয়নি বরং সময়ের স্বল্পতা বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ হলো, একজন মানুষ তার জীবনের একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং তার মৃত্যু অতি সন্নিকটে। আমাদের যাপিত জীবনের সাপেক্ষে মৃত্যু এবং পরকাল এতটাই কাছে, যা রূপক অর্থে 'এক হাত' বলা হয়েছে।
এরূপ রূপক শব্দের ব্যবহার অনেক স্থানেই করা হয়েছে। আর সর্বপরী, এগুলো গায়েবি বিষয়। এগুলোর উপর কিয়াস করা বোকামি ছাড়া কিছুই না। এগুলো দিয়ে অকাট্য কিছু তৈরি হয় না বরং শুধু ধারণা। আর ধারণা দিয়ে আকিদা তৈরি হয় না।
আব্দুর রহমান:- তাহলে জমিন কে যে আকাশের অনুরূপ বলা হয়েছে এটাতে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- কোন কিছুকে কারো অনুরূপ বলা হলেই তা হয়ে যায় না বরং এরূপ রূপক কথার উদ্যেশ্য দেখতে হয়। সহীহ ইবনে হিব্বানের হাদীসে আকাশ কে আংটি বলা হয়েছে; তাহলে কি আকাশ আংটির মতো? আংটির যেমন চারদিকে রিং মাঝখানে ফাঁকা; আকাশও কি এমন? আকাশ কি ক্রিকেট ফুটবলের মাঠ নাকি যে, চারদিকে রিংয়ের মত আর ফাঁকা?
এসব রূপক কথামূলক হাদীস। এখানে আকাশের যেমন পুরুত্ব ও দূরত্ব রয়েছে এক আসমান থেকে অন্য আসমানের; ঠিক আকাশের মত জমিনেরও পুরুত্ব ও দূরত্ব রয়েছে তাই বোঝানো উদ্দেশ্য। ৫০০ বছর কিংবা ১০০ বছর কিংবা এতো ইঞ্চি এতো হাত বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। আসমানের পুরুত্ব রয়েছে, জমিনেরও রয়েছে, আসমানের দুরত্ব রয়েছে, জমিনের ও রয়েছে, আসমান সাতটি, জমিনও। এখানে জমিন আসমানের অনুরূপ। সর্বপরী এসব গায়েবি ও রূপক কথামূলক হাদীসের পিছনে পড়ে থাকলে এমনিতেই গোমড়াহ হয়ে যাবে।
আব্দুর রহমান:- আকাশ কে যে, ছাদ বলা হয়েছে তাতে কি বলবেন? আসমান ও জমিন পূর্বে একত্রিত ছিল; আল্লাহ তাআলা অতঃপর আলাদা করে সুবিনাস্ত করেছেন তাতে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- প্রিয় ভাই! যেখানে আসমানই গায়েবি বিষয় সেখানে বারবার এটা নিয়ে প্রশ্ন করা মুর্খতার পরিচয় বহন করে। আকাশ কে যে ছাদ বলা হয়েছে তাতে কি হয়েছে? ছাদ কি বড় হয়না? আমিতো সকল বাড়িই দেখি যে, বাড়ির ভূমির তুলনায় ছাদ কিছু বড় হয়; আবার অনেক কিছুর ছাদ বেশিই বড় হয়। আবার আসমান ও জমিন পূর্বে একত্রিত ছিল তাতে কি হয়েছে? এখানে কি পূর্বের কথা ধরা হবে? পূর্বে আকাশ ও পৃথিবী অন্যরকম ছিল। আল্লাহ তাকে পরিবর্তন করে বর্তমান করেছেন। ভবিষ্যতে কিয়ামতের সময় আল্লাহ তাআলা আবার পরিবর্তন করবেন। তাহলে পূর্বে ও পরে পৃথিবী কেমন তা দিয়ে কি হবে? লাগবে তো বর্তমান। আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন কারণ তিনি কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। পূর্বেই কুন ফায়াকুন নিয়ে বলা হয়েছে;তা ভালোকরে স্বরণ করুন। আমিতো বাস্তবিক জীবনেও দেখেছি যে, কত বিশাল ছাদের সাথে লাগানো ছোট এক টুকরো গোলাকার লাইট। আবার এক প্রকারের বিশেষ গোলাকার কাগজের ফানুসের মধ্যে ছোট লাইটা লাগানো; যার জন্য সেই ফানুস টি জ্বলছে এবং দেখতে সুন্দর লাগছে। একসাথে থাকলে কি সমান সমান হতে হবে? আবার আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। তার জন্য কোনো কিছু অসম্ভব নয়। সর্বপরি এইসব গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা বন্ধ কর। যেইদিন আসমান,সপ্ত জমিন, আকাশের দরজা ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখবে তখন কিয়াস করিও। এসব গায়েবি বিষয়ের উপর অযৌক্তিক কিয়াস ব্যবহার করার কোন মূল্য নেই।
আব্দুর রহমান:- পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতলের অন্য একটি লজিক হলো:- পশ্চিম দিকে হয়ে সালাত আদায় করা। পশ্চিম দিকে হয়ে সালাত আদায় করতে হলে পৃথিবীকে সমতল হতেই হবে এটা কিয়াসের দাবি। গোলাকার পৃথিবীতে তুমি দিক নির্ণয় কিভাবে করবে?
আব্দুল্লাহ:- তোমার লজিকে না ধরলেও আলেমরা ঠিকই এই বিষয়ে সুন্দর ও সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন।এটাও গোলাকার পৃথিবীতে সম্ভব। পবিত্র কাবার দিকে মুখ করার ক্ষেত্রে যা চাওয়া হয়েছে তা হলো তার দিকের (অভিমুখের) দিকে ফেরা, যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “সুতরাং আপনি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরান এবং তোমরা যেখানেই থাক না কেন, সেদিকেই মুখ ফেরাও।” [সুরা আল-বাকারা, ১৪৪]
সুতরাং উদ্দেশ্য হলো দিক এবং অভিমুখ। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে এটি জানা বিষয় এবং প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতার জ্ঞানে ও সুস্থ বিবেকের বিচারে এটি স্বীকৃত যে, পৃথিবীর এবং সকল নভোমণ্ডলের চারটি দিক রয়েছে যা তা থেকে অবিচ্ছেদ্য। সেগুলো হলো উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম। এটি পৃথিবীর সেই অক্ষের ওপর ভিত্তি করে যা ডান থেকে বামে ঘোরে এবং আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যে নিজস্ব মেরুশক্তি দিয়েছেন তার ওপর ভিত্তি করে, যার ফলে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কম্পাস উত্তর ও দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করে।
এগুলো হলো নিজস্ব (প্রাকৃতিক) দিক, যা পৃথিবীর নিজের সাপেক্ষে কখনোই পরিবর্তিত হয় না, যদিও আপেক্ষিক অবস্থানের কারণে তা ভিন্ন মনে হতে পারে। এজন্য পৃথিবীর গোলাকার হওয়া এই চারটি দিককে বাতিল করে দেয় না, এমন দাবি করে যে— পশ্চিম দিকে ঘুরতে থাকলে তা পূর্বে গিয়ে পৌঁছাবে, অথবা উত্তর দিকে গেলে দক্ষিণে গিয়ে পৌঁছাবে। এখান থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে, যে ব্যক্তি পৃথিবীর নিজস্ব উত্তরে অবস্থান করছে, তার জন্য কিবলার দিক হলো দক্ষিণ। যে পৃথিবীর নিজস্ব দক্ষিণে আছে, তার জন্য কিবলার দিক উত্তর। যে পৃথিবীর নিজস্ব পূর্বে আছে, সে কিবলার জন্য পশ্চিমে মুখ করবে এবং যে পৃথিবীর নিজস্ব পশ্চিমে আছে, সে কিবলার জন্য পূর্বে মুখ করবে। এটিই হলো সেই কিবলার দিক, শরীয়তে যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি কেবল কিবলা সম্পর্কিত নয়, বরং পৃথিবীর সমস্ত শহর এবং দিকগুলোর আনুপাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই আপনি কাউকে এমন কথা বলতে শুনবেন না যে, ইউরোপ মহাদেশ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত, কারণ কেউ যদি আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে, তবে পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার কারণে ঘুরতে ঘুরতে সে ইউরোপে পৌঁছে যাবে!
আপনি ভারতের কোনো আলেমকেও এমন কথা বলতে শুনবেন না যে, যদি তাকে আমেরিকা মহাদেশের দিক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে তিনি পূর্ব দিকে ইশারা করবেন। বরং তিনি পশ্চিম দিকেই ইশারা করবেন, যদিও পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার কারণে একেবারে পূর্ব দিকে চলতে থাকলে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু দিকের প্রশ্ন এক জিনিস, আর পৌঁছানো বা গন্তব্যে যাওয়ার পথ আরেক জিনিস।
সাধারণ মানুষের প্রথা অনুযায়ী এবং শরীয়তের পরিভাষাতেও উদ্দেশ্যকৃত দিক হলো: সমগ্র পৃথিবীর জন্য স্থির দিকগুলো—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম। আর এটি সেই দিক যা স্থির ম্যাগনেটিক কম্পাস সব জায়গায় নির্দেশ করে। এটি পৃথিবীর নিজস্ব ও স্থায়ী দিক যা কখনো পরিবর্তিত হয় না
আমাদের শরীয়তে এই স্থির প্রথার ভিত্তিতেই কিবলার দিকে মুখ করা কাম্য, যে কোনো পথ দিয়ে সেখানে পৌঁছানো উদ্দেশ্য নয়। দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট।
[সোর্স: IslamQA; প্রশ্ন নং ২২৬৭৯১]
إذا كانت الأرض كروية فلماذا ليس ثمة إلا اتجاه واحد للقبلة ؟ - الإسلام سؤال وجواب
তুমি পৃথিবীর যেখানেই দাঁড়াও না কেন, তোমার সামনের দিকটি সবসময় পৃথিবীর পৃষ্ঠের সমান্তরালে থাকে। পৃথিবী গোল হওয়ার কারণে তুমি যখন কিবলার দিকে মুখ করো; তখন মূলত পৃথিবীর বক্রতা বরাবর একটি বক্ররেখাকে অনুসরণ করছো। তোমার দৃষ্টি সরাসরি মহাকাশের দিকে চলে যায় না, কারণ বায়ুমণ্ডল এবং আলোর প্রতিসরণ তোমাকে দিগন্তের দিকেই তাকাতে বাধ্য করে। আমরা সবসময় পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবরই কিবলা খুঁজি এবং এর অনুসরণ করি। এটা হলো পৃথিবীর স্থির দিক যা কখনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ দিক খোঁজার জন্য সমতল পৃথিবী হওয়া আবশ্যক নয় বরং গোলাকার পৃথিবীতেও সম্ভব এবং সবচেয়ে সঠিক। গোলাকার জিনিসের ওপর দিক মানে হলো সেই গোলকের কেন্দ্রকে ঠিক রেখে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুর ক্ষুদ্রতম কৌণিক দূরত্ব।
আব্দুর রহমান:- তাহলে তুমি বলছো যে, দিক এভাবে আঁকা-বাঁকা হয়ে যায়? এটা একদম বাজে কথা।
আব্দুল্লাহ:- গিয়ে পূর্বে নিজের সমতল পৃথিবীর সূর্য দেখ। কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত যে, সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাত্রা করে। দিক যদি এরূপ আঁকা-বাঁকা না হয় তাহলে সূর্য কিভাবে সমতল ম্যপে ১৮০ ডিগ্রি ঘুর্ণন করছে? সমতল ম্যপ অনুযায়ী যদি তুমি সোজা পশ্চিম দিকে যাত্রা কর তাহলে যাত্রা করতে করতে পৃথিবী থেকে নিচে পড়ে যাবে বা শেষ সীমানায় পৌছে যাবে। তোমাদের সমতল ম্যপেও সূর্য ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন মেরে এঁকে বেঁকে চলে। আর তোমাদের সমতল ম্যাপে দক্ষিণ দিক কয়েকটি বা নাই নাকি? উত্তর কে যদি কেন্দ্র করি তাহলে তো জাপানো দক্ষিণে আবার আমেরিকা দক্ষিণে। যেদিকে যাও সব দক্ষিণ । আগেও দক্ষিণ পরেও দক্ষিণ কারণ কেন্দ্র হলো উত্তর। এটা আবার কি ম্যাপ। মজা করা বাদ দিয়ে বললে, মুসলিম- অমুসলিম, গোলাবাদী-সমতলবাদী সবার ঐক্য আছে যে দিক এঁকে বেঁকে যাত্রা করে। তাই দিক নির্ণয় করার ক্ষেত্রে গোলাকারের যুক্তি তোমাদের সমতলের যুক্তি থেকে ভালো। গিয়ে পূর্বে নিজেদের ম্যাপে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সূর্যের যাত্রা দেখ; তাহলে বুঝতে পারবে দিক এঁকে বেঁকেও চলতে পারে।
পৃথিবীর নিজস্ব (প্রাকৃতিক) স্থির দিক রয়েছে, যা পৃথিবীর নিজের সাপেক্ষে কখনোই পরিবর্তিত হয় না, যদিও আপেক্ষিক অবস্থানের কারণে তা ভিন্ন মনে হতে পারে। এই স্থির দিকগুলোর ভিত্তিতে কিবলার দিকে মুখ করা কাম্য। এবং এরই ভিত্তিতে সবচেয়ে নিকটস্থ বিন্দুকে অনুসরণ করতে হবে। তাই গোলাকার হলেও কাবার দিকে মুখ করতে কোন অসুবিধা নেই ।
আব্দুর রহমান:- বায়তুল মামূর সম্পর্কে কি বলবে? বায়তুল মামুর কাবা বরাবর অবস্থিত। যদি পৃথিবী সমতল না হয় তাহলে বায়তুল মামুর ও কাবা কিভাবে বরাবর হবে?
আব্দুল্লাহ:- এর উত্তর পূর্বেই চলে গিয়েছে। কিন্তু তোমার বুদ্ধি মোটা তাই বুঝতে পারোনা। জীবনে বায়তুল মামুর দেখেছো? বায়তুল মামুর হলো গায়েবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। গায়েবি বিষয় দিয়ে বাস্তব বিষয়ের প্রতি কিয়াস করলে তুমি প্রথভ্রষ্ট হবে। আল্লাহ প্রতিদিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন। আমরা জানি যে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময় রাতের শেষ তৃতীয়াংশ থাকে। তাহলে কি আল্লাহ পৃথিবীর আকাশেই সর্বদা থাকে? এবং আরশ কি ফাঁকা হয়ে যায়? যুক্তি কি বলে?
এরূপ আবার তোমার মতো অনেকেই সাত তবক জমিনের উদাহরণ দেয় যে, কিয়ামতের মাঠে সাত তবক জমিন ঘাড়ে তুলে দেওয়া হবে। অথচ এটাও গায়েবি বিষয়; কারণ, কিয়ামত হলো গায়েবি বিষয়। আবার কিয়ামতের সময় এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করা হবে তা কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত।
তাই গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা মূর্খতা ছাড়া কিছুই না। যার বাস্তবিক অবস্থা আমরা জানিনা তার উপর কিয়াস কখনও করবে না।
আব্দুর রহমান:- আল্লাহ তাআলা সূরা রহমানে বলেছেন যে, "হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পার, তাহলে বের হও।" তাহলে মানুষ কিভাবে মহাকাশে যেতে পারে?
আব্দুল্লাহ:- এখানেও একই উত্তর। এগুলো গায়েবের বিষয়। তুমি কি কখনো আসল আসমান দেখেছো? তাহলে তুমি তার উপর কিয়াস করছো কেন? তোমার কাছে আকাশ কোনটি? আমরা যা দেখি এবং যেইখানে মেঘ থাকে, সুবহে সাদিক, সুবহে কাযিব, দিন রাত দেখি এটা আসল আসমান? এটা আসল আসমান নয় বরং বায়ুমণ্ডলিও আকাশ; যার প্রমাণ হাজার হাজার আছে। মানুষ পৃথিবী থেকে এক বিশেষ বেলুন উড়িয়ে এই মেঘ, সুবহে সাদিক,রাত দিন যুক্ত বায়ুমণ্ডল খুবই সহজে অতিক্রম করতে পারে। কুরআন ও হাদীসে এটাকেও আসমান বলা হয়েছে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে কারণ কুরআন ও হাদীস মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের মধ্যে যে সপ্ত আসল আকাশের কথা বলা হয়েছে এটা গায়েবি বিষয় কারণ মানুষ তা দেখতে পারে না। মানুষের দৃষ্টি আসল আকাশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না বরং মানুষ আকাশের নিচের কোটি কোটি তারকা নক্ষত্র ইত্যাদির মধ্যে অল্প কিছু দেখতে পারে। আসল আকাশ হলো গায়বি বিষয়। আর সপ্ত জমিনও গায়েবি বিষয় কারণ কেউ তা দেখেনি।
তুমি যেই আয়াতের কথা বলছো সেখানে أقطار শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবিতে ‘قطر’ (কুতর বা ব্যাস) বলতে কোনো জিনিসের দুই বিপরীত প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বোঝায়। কুতর বা ব্যাস ওই জিনিসের সীমানার ভেতরেই থাকে, তার বাইরে নয়। ইমাম বায়হাকি একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যেখানে
নবীজি (সা.) বলেছেন:
“যদি কোনো ব্যক্তি জনমানবহীন প্রান্তরে আজান ও ইকামত দিয়ে নামাজ পড়ে, তবে তার পেছনে ফেরেশতাদের এমন কাতার হয় যার দুই প্রান্ত (قطراه) দেখা যায় না...”
এখানে ‘قطراه’ অর্থ হলো চারদিকে এর বিস্তৃতি। একইভাবে পৃথিবীর ‘কুতর’ বা ব্যাস হলো এর ঘনত্ব বা গভীরতা—অর্থাৎ এক প্রান্ত থেকে শুরু করে কেন্দ্র ভেদ করে অপর প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব। পৃথিবীর ব্যাস ভেদ করতে হলে এর পৃষ্ঠ থেকে ভেতরের দিকে খুঁড়ে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হতে হবে, যা মানুষের সামর্থ্যে অসম্ভব। মানুষ রাশিয়ার কোলা সুপারডিপ বোরহোল বা জার্মানির মতো জায়গায় মাত্র ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন করতে পেরেছে, এরপর প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যদি মানুষ পৃথিবীর ব্যাস বা গভীরতাই ভেদ করতে না পারে, তবে আসমানের ব্যাস কীভাবে ভেদ করবে?
এই আকাশ এবং যমিন সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিন এই জমিনকে অন্যরূপ প্রদান করবেন। আসলে এগুলো গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা অজ্ঞতার শামীল। আসমানের সিমানা চাঁদ, মঙ্গল ইত্যাদি গ্রহ থেকেও এতদূর বিস্তৃত যে, মানুষ আসল আসমান দেখতে পারে না। যখন আসল আসমানিই দেখতে পারে না তখন তার সীমানা পার করবে কিভাবে? মানুষ আল্লাহর মৃত্যু দূতের পাকড়াও বা কিয়ামতের শাস্তি থেকে পালায়ন করতে সক্ষম নয়।
আব্দুর রহমান:- পৃথিবী সমতল এই বিষয়ে পূর্ববর্তী সকলের ইজমা রয়েছে। তাই ইজমা মেনে নিন এবং গোলাকার মতবাদ কে উপেক্ষা করুন।
আব্দুল্লাহ:- পূর্ববর্তী কেন? বরং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের ইজমা রয়েছে যে পৃথিবী সমতল কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। আলেমরা একমত হয়েছেন যে, মানুষের পর্যাবেক্ষনে একটি বড় গোলকের পৃষ্ঠকে মানুষ সমতল দেখে থাকে। অর্থাৎ কুরআন-হাদীস ও ইজমার আলোকে পৃথিবী সমতল; কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। ভৌগলিক বা আকৃতির আলোকে নয়।
ইজমা কিভাবে প্রমাণিত হয় জানেন? ইজমা প্রমাণিত হওয়ায় জন্য প্রথম শর্তই হলো ইজমার বিষয়টি আলেমদের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ থাকবে অথবা গভির জ্ঞানের অধিকারী কোন নির্ভরযোগ্য বিদ্বান ইজমার বিষয়টি বর্ণনা করবেন।
কোন ইমাম ইজমার কথা বলেছেন? কোন ইমাম বলেছেন যে, পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতল এই ব্যাপারে ইজমা আছে? বরং আমরা এর উল্টো দেখতে পায়।
ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কায়্যুম, ইবনে জাওযি সহ অনেকেই ইজমার উল্লেখ করেছেন। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ সকল ফকিহ তাহকিক করেছেন এবং তারাও ইজমা মেনে নিয়েছে। কিন্তু তোমার মত অভার স্মার্ট অল্লামারা মেনে নেইনি। এই সব হাজার হাজার ইমাম ফকিহ তোমার থেকে ভালো বুঝতেন কুরআন-হাদীস এবং সালাফদের বক্তব্য। সালাফরা কুরআন ও হাদীসের বাহ্যিক আয়াত এবং মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে বুঝতেন। কিন্তু ইজমা মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে পৃথিবী দেখতে কেমন এই বিষয়ে নকল করা হয়নি বরং ভৌগলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবী কেমন এই বিষয়ে ইজমা রয়েছে। দুই বিষয় ভিন্ন। তাই ইমাম ইবনে হাযম এর মতো কট্টর যাহেরি মাযহাবের অনুসারীও ব্যাক্তিও ইজমা নকল করেছেন।
তাই পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতলের উপর ইজমা আছে এটা বলা হাস্যকর। হ্যাঁ। মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে পৃথিবী সমতল এই বিষয়ে সবাই একমত। কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে এসব আলোচনা করেছেন যেন, মানুষ অনুধাবন করে উপকৃত হতে পারে এবং আল্লাহ ক্ষমতা ও অনুগ্রহ বুঝতে পারে।
ইজমা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। তাই দেখ আমি ইজমাকে দূরে সরে দিয়ে তোমার সাথে কুরআন- হাদীস এবং বাস্তববিক দৃশ্যমান বিষয় দিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু তুমি বারবার ইজমা-ইজমা করছো। তুমি ইজমার কথা না বললে আমি ইজমার নিয়ে বলতামই না। কারণ কুরআন ও হাদীসই যথেষ্ট।
অতএব এতো দীর্ঘ আলোচনা করার পর প্রমাণিত হলো যে, এটি কোন আকিদার বিষয় নয় কারণ, আকিদার বিষয় হতে হলে কুরআন- হাদীসের সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। কিন্তু প্রথমেই প্রমাণ করা হয়েছে যে, কুরআনের ও হাদীসের কোথাও পৃথিবীর আকৃতি কে সমতল বলা হয়নি বরং কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করেছে এবং মানুষ তা অনুধাবন করেছে। তারপর সুস্পষ্ট নয় এমন আয়াত ও হাদীসের উপর কিয়াস নিয়ে আলোচনা করলাম তোমার সাথে কিন্তু তাতেও কিছু প্রমাণ করতে পারলে না বরং তোমার কিয়াসের উত্তম জবাব দেওয়া হয়েছে। যদি তোমার কিয়াস সহীহ হতো তাও কিছু যায় আসতো না কারণ এভাবে কিয়াস করে আকিদার বিষয় প্রমাণ হয় না বরং দলিল লাগে। যদিও তোমার কিয়াস সব বোকামো এবং তাই তোমার সব কিছু বিফলে গেছে এবং উত্তম জবাব দেওয়া হয়েছে।
যদি আরও কোন যুক্তি থাকে যা গায়েবি বিষয়ের বাহিরে বলতে পারো কিন্তু গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করে বাস্তব বিষয়ে ফিট করবে না। আর কোন প্রশ্ন আছে?
আব্দুর রহমান:- ..... নাই তবে আমি গোলাকার পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক ভুল ধরে প্রমাণিত করতে পারি যে, বিজ্ঞান বলে পৃথিবী গোলাকার এটা ভুল।
আব্দুল্লাহ:- এখন থাকুক ভাই। পরে এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা হবে। রাত অনেক হয়েছে পড়ে কথা হবে। আসলে ভাই, আমার উদ্যেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে যেন তা মানুষের উপকার করে। কুরআন কোন বৈজ্ঞানিক সুত্র, থিসিস শিখানোর গ্রন্থ নয়। কুরআনের বিষয় বস্তু আর বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা। বিজ্ঞান যেরূপ মহাকাশের আলোকে বলে যে, পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার বা চাঁদে গিয়েছিলাম; এইসব বিষয়ে কুরআনের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই কারণ উভয়ের উদ্যেশ্য ভিন্ন। যদিও আমি গোলাকার বিশ্বাস করি কিন্তু আমার কোন পড়োয়া নেই যে মানুষ বিজ্ঞানের আলোকে পৃথিবীকে কি প্রমাণ করলো। এটা না আকিদার বিষয়, আর না কুরআনে এই বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা আছে। ভাই জাঝাকাল্লাহু খয়রন।
আব্দুর রহমান:- দেখে শুনে যাইয়েন ভাই। জাঝাকাল্লাহু খয়রন।
আব্দুল্লাহ:- কুরআন ও হাদীস পৃথিবীকে সমতল বলে এটি সম্পূর্ণ সঠিক; কিন্তু কুরআন আকৃতি ও ভৌগলিক ভাবে সম্পূর্ণ সমতল বলে; এটা ভুল কারণ, কুরআন মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে এসব বলেছে যা কুরআন দিয়েই সুপ্রমাণিত।
আব্দুর রহমান:- কুরআন তো সমতল,বিছানা ইত্যাদি বলেছে। তুমি কিভাবে বলছো যে, এগুলো সব মানুষের পর্যাবেক্ষনের বা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে? তোমার কাছে কি কোন দলিল আছে?
আব্দুল্লাহ:- এটি আমি এই জন্য বলছি কারণ, কুরআন ও হাদীস বুঝতে হয় সামগ্রীকভাবে। সমস্ত আয়াত কে একসাথে করে তারপর তার বুঝ কে বাহির করতে হয়। আর আমরা যখন পৃথিবীকে সমতল বা বিছানোর সকল আয়াত কে একসাথে করি তখন আমরা দেখি যে, তা পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে বলছে। এর প্রমাণ সূরা গাশিয়ার ২০ নং আয়াত:-
وَإِلَى ٱلۡأَرۡضِ كَيۡفَ سُطِحَتۡ
অনুবাদ:- এবং (দেখ) ভূতলের দিকে যে, কিভাবে ওটাকে সমতল করা হয়েছে?
এখান থেকে বুঝা যায় যে, অন্য আয়াত বলছে পৃথিবী সমতল বাহ্যিক বা পর্যাবেক্ষনের দৃষ্টিতে এবং কুরআন মানুষের উপকার হাসিলের জন্য এই আলোকেই বর্ণনা করেছে।
আব্দুর রহমান:- এখানে তো দেখার কথা বলা হয়েছে কিন্তু অন্য স্হানে দেখার কথা বলা হয়নি বরং সাধারণ ভাবে বলা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে আমাকে বলো.., কুরআন ও হাদীস বলছে যে সূর্য উদয় ও অস্ত যায়।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:-
فَلَآ أُقۡسِمُ بِرَبِّ ٱلۡمَشَٰرِقِ وَٱلۡمَغَٰرِبِ
অনুবাদ:- আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচল-সমূহের..। সূরা মা'আরিজ ৪০
অর্থাৎ সূর্য কখনো এক স্থান আবার কখনো অন্য স্হান থেকে উদয় হয়; আবার কখনো এক স্থান আবার কখনো অন্য স্হানে অস্ত যায়। অর্থাৎ সূর্য উদয় ও অস্ত যায় এটা কুরআন বলে এবং তা বিভিন্ন স্থানে। এখানে দেখার কথা বলা হয়নি বরং সাধারণ ভাবে বলা হয়েছে।
হাদীসে এসেছে:-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ
অনুবাদ:- রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমুআর দিন সর্বোত্তম। সহীহ মুসলিম ৮৫৪।
এখানেও দেখার কথা বলা হয়নি বরং শুধু বলা হয়েছে সূর্য উদয় হয়। তাহলে কি সূর্য বাস্তবিক ভাবে ভৌগলিক আকৃতির আলোকে অস্ত যায়! অথচ এটা এটা স্পষ্ট সত্য যে, সূর্য ভৌগলিক ভাবে কখনও অস্ত যায় না। এই বিষয়ে কি বলবেন?
আব্দুর রহমান:- কুরআনের বিভিন্ন আয়ত বলে যে সূর্য উদয় ও অস্ত দেখার বা পর্যাবেক্ষনের আলোকে। যেমন:-
وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ وَهُمۡ فِي فَجۡوَةٖ مِّنۡهُۚ
অনুবাদ:- আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। সূরা কাহাফ ১৭
এখানে দেখার কথা বলা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে বিষয়টি তো একই দাঁড়ালো। তুমি নিজেই বলছো যে, কুরআন কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক থিসিস হিসেবে নয়, বরং মানুষের হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। ভাষা সবসময় মানুষের পর্যবেক্ষণ বা পারসেপশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং এটা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। তুমি সূর্য উদয় ও অস্ত কে অন্য আয়াত দিয়ে ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে; তাহলে সমতল পৃথিবীকে কেন অন্য আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা নাও না? যদি সূর্য উদয় ও অস্তের ক্ষেত্রে অন্য আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা নাও তাহলে এখানে কেন মুনাফিকি করো? যেকোনো এক নীতি গ্রহণ কর।
আব্দুর রহমান:- দুটো একই বিষয় নয় কারণ, হাদীসে এসেছে:-
যিমাম বিন ছা'লাবা (রা.) বললেন: أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاءَ، وَبَسَطَ الأَرْضَ، وَنَصَبَ هَذِهِ الجِبَالَ، آللَّهُ أَرْسَلَكَ؟ (আমি আপনাকে সেই আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, যিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন, জমিনকে বিছিয়ে দিয়েছেন এবং পাহাড়সমূহকে স্থাপন করেছেন—আল্লাহ কি আপনাকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন?)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: نَعَمْ (হ্যাঁ)। (সহীহ বুখারী ৬৩)
এইবিষয় থেকে প্রমাণিত হয় যে, জমিন বাস্তবেই ভৌগলিক আলোকে সমতল।
আব্দুল্লাহ:- এখানে যেকেউ বলবে যে, এই অমুসলিম ব্যক্তিটি তার বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে বলেছেন কারণ মানুষ তার পর্যাবেক্ষনে তাই দেখে। এই ব্যক্তিকে আল্লাহ ওহী পাঠিয়ে বলে দেয়নি বরং সে তার পর্যাবেক্ষনের আলোকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এসব কথা বলেছেন।
আব্দুর রহমান:- কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো চুপ ছিলেন। যার অর্থ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ব্যক্তির কথাকে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবী সমতল।
আব্দুল্লাহ:- তুমি এখানে আংশিক বলছো কারণ, এখানে বলতে হবে:-" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ব্যক্তির পর্যাবেক্ষনের আলোকের কথাকে মেনে নিয়েছে"। কারণ সেই ব্যক্তি নিজের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই বলেছিল এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিয়েছে।
এছাড়াও কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের আয়াত মেনে নেননি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন এই ব্যক্তির কথাকে মেনে নিয়েছে তেমনি কুরআনের কথাকেও; বরং কুরআনের কথাকে তো অমুসলিম গোষ্ঠীকাদিয়ানী, হাদীস অশ্বিকার কারী সহ সকলেই মেনে নিয়েছে। তাহলে কি এখন ভৌগলিক ভাবে সূর্য উদয় ও অস্ত যায়?
আব্দুর রহমান:- আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সূরা গশিয়ার ২০ নম্বর আয়াত উপস্থাপন করা ভুল হয়েছে কারণ, আল্লাহ শুধু সেখানে জমিনের কথায় বলেনি বরং তার পূর্বে উট, আকাশ ও পাহাড়ের কথাও বলা হয়েছে। যদি আপনার কথা ধরে নেয় যে, জমিন সমতল বলা হয়েছে কিন্তু আসলে তা ভিন্ন রকম; তাহলে উট, আকাশ, পাহাড় সম্পর্কে যা বলা হয়েছে আসলে তা ভিন্ন রকম। আপনি কি বলবেন এই বিষয়ে?
আব্দুল্লাহ:- এখানে কথা হচ্ছে পর্যাবেক্ষন না কি পর্যাবেক্ষন নয়; এখানে ভিন্ন-অভিন্ন আসবে না কারণ, উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন এগুলোকে বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে দেখে চিন্তা-গবেষণা করে উপকার হাসিলের কথা বলা হয়েছে যা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই। এখানে ভিন্ন অভিন্নের কথা কথা আসবে না। কুরআন এখানে উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন যেমন দেখা যায় আসলে তা ভিন্ন বা অভিন্ন নিয়ে কিছুই বলেনি বরং এগুলোকে পর্যাবেক্ষনের মাধ্যমে উপকার হাসিলের কথা বলেছে।
এটা জরুরী নয় যে, মানুষ পর্যাবেক্ষনের আলোকে যা কিছু দেখে আসলে তার ভিন্ন কিছু হতে পারে না। কারণ, মানুষ পাহাড়কে কেবল একটি বিশাল পাথরের স্তূপ হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি হলো: এটি কেবল পাহাড়ের চূড়া বা উপরের অংশ। এটি ভূ-ত্বকের গভীরে এমনভাবে গেঁথে আছে যা পৃথিবীর নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নাবায় (৭৮:৭) বলেছেন:- وَٱلۡجِبَالَ أَوۡتَادٗا
অনুবাদ:- আর (বানাইনি) পর্বতসমূহকে পেরেক ?
এখানে 'আওতাদ' (أَوْتَادًا) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ তাঁবুর খুঁটি। একটি খুঁটির যেমন সামান্য অংশ উপরে থাকে এবং অধিকাংশ অংশ মাটির নিচে গেঁথে রাখা হয় যাতে তাঁবুটি স্থির থাকে, পাহাড়ের গঠনও ঠিক তেমনি।
অর্থাৎ আবশ্যক নয় যে, মানুষ পাহাড়কে যেভাবে একটি বিশাল পাথরের স্তূপ হিসেবে দেখে আসলে তাই হবে। মানুষ মাটির নিচে দেখতে পারে না। আর কুরআনের উদ্দেশ্যেও এটা নয় বরং উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন পর্যাবেক্ষন করে আল্লাহ মানুষকে অনুধাবন করতে বলেছে। এখানে ভিন্ন অভিন্নের কিছুই বলা হয়নি।
আবার আমরা দেখি যে সুবহে সাদিক, সূর্যের রশ্মি ও মেঘমালা যুক্ত বায়ুমণ্ডল কে কুরআন ও হাদীসে আকাশ বলা হয়েছে। মানুষ যা দেখে তা হলো মানুষের পর্যাবেক্ষনের বায়ুমণ্ডলিও আকাশ। আসল আকাশ হলো গায়বি বিষয় এবং মানুষ তা দেখতে পারে না কারণ, অন্ধকার ঘড়ের মধ্যে কি কেউ তার শেষ দেয়াল দেখতে পারে? অবশ্যই না। তেমনি মহাবিশ্বের বিশার অন্ধকার জগৎ পেরিয়ে কিভাবে আসল আকাশ দেখবে? যা কিনা আমাদের মহাবিশ্বের দেয়াল। মানুষ আসল আকাশ দেখতে পারে না বরং বায়ুমণ্ডলিও আকাশ দেখে। অর্থাৎ মানুষ যেই আকাশ দেখে এটা হলো পর্যাবেক্ষনের আলোকে বায়ুমণ্ডলীও আকাশ। এটাকেই মানুষ দেখতে পারে এবং আল্লাহ এটাকেই দেখতে বলেছেন। বাস্তবিক আকাশ কেউ দেখতে পারে না।
এর প্রমাণ ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে যা নাসার সাজানো নাটক নয় বরং সাধারণ মানুষের নিজস্ব গবেষণা। ইউটিউবে গিয়ে বিভিন্ন রকেট ও বেলুন দিয়ে মহাকাশ পর্যাবেক্ষনের ভিডিও দেখতে পারো।
অর্থাৎ প্রমাণিত হলো যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এখানে উট, আকাশ, পাহাড়, জমিন কে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে বলেছেন যেন মানুষ অনুধাবন করতে পারে। কুরআন এখানে ভিন্ন অভিন্নের কিছুই বলে নাই বরং সাধারণ মানুষের পর্যাবেক্ষন বলা হয়েছে।
কুরআন কোন সাইন্সের থিসিস নয় বরং মানুষের জন্য হেদায়েত। তাই কুরআন মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই আলোচনা করে।
আব্দুর রহমান:- কুরআন বলছে সূর্য ঘুড়ে। এই বিষয়ে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- উত্তর একই। অর্থাৎ কুরআন বুঝতে হয় সামগ্রীক ভাবে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত বলে সূর্য চলমান; তা হলো মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে কারণ অন্য আয়াতে এসেছে এবং আপনিও তা পূর্বে উল্লেখ করেছেন। যেমন:-
وَتَرَى ٱلشَّمۡسَ إِذَا طَلَعَت تَّزَٰوَرُ عَن كَهۡفِهِمۡ ذَاتَ ٱلۡيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَت تَّقۡرِضُهُمۡ ذَاتَ ٱلشِّمَالِ وَهُمۡ فِي فَجۡوَةٖ مِّنۡهُۚ
অনুবাদ:- আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। সূরা কাহাফ ১৭
এখানে দেখার কথা বলা হয়েছে।
কুরআন হলো মানুষের হেদায়েত গ্রন্থ তাই সর্বদা সে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকেই এসব বিষয় আলোচনা করে। তোমায় নিকট কি আর কোন সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীস আছে যা সরাসরি ভাবে পৃথিবীর সমতল,সূর্যের ঘুর্ণন,সূর্য উদয় ও অস্তের শব্দ সরাসরি ব্যবহার করে? যা দিয়ে প্রমাণ করবে যে, কুরআনের এগুলো অর্থাৎ সূর্য উদয় ও অস্ত, পৃথিবীর সমতল, সূর্যের ঘুর্ণন ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যাবেক্ষনের আলোকে নয় বরং অন্য কিছু?
আব্দুর রহমান:- সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীস আর নেই কিন্তু কিছু লজিক রয়েছে যা বিভিন্ন কুরআনের আয়াত ও হাদীসের উপর কিয়াস করে বের করা হয়েছে। যা প্রমাণ করবে যে পৃথিবী সমতল।
আব্দুল্লাহ:- তাহলে তোমরা পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতিকে আকিদার বিষয় কেমনে বানাও যার কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই? সুস্পষ্ট আয়াত ও হাদীস ছাড়া কুরআন ও হাদীসের কিছু বিষয়ের উপর কিয়াস করে কি তোমরা আকিদা প্রমাণ করো এবং অন্যকে কাফের বলো?
আব্দুর রহমান:- অনেক পূর্ববর্তী আলেম বলেছেন।
আব্দুল্লাহ:- পূর্ববর্তী কোন আলেম যদি বলেও থাকেন তাহলে তা ছিল কুরআন ও হাদীসের শব্দের বাহ্যিক শব্দ ও নিজেদের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। এই বিষয়ে তো সকল আলেম একমত যে, পৃথিবী সমতল; কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। তুমি আমাকে ইজমা প্রমাণ করে দেখাও যে, কোন আলেম পৃথিবী আকৃতির আলোকে সমতল বলে ইজমা দাবি করেছেন? যখন ইজমা নেই তখন গোঁড়ামি বন্ধ করে কুরআন ও হাদীসের দিকে ফিরে এসো এবং প্রমাণ কর। বিপরীতে আমি উপরে কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণ করেছি যে, কুরআন এসব বাস্তবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করেছেন। কুরআনের কোন মাথাব্যথা নেই যে, পৃথিবী গোল নাকি সমতল এবং এটা কোন আকিদার বিষয়ও নয়। সাইন্স যেই দৃষ্টিতে আলোচনা করে কুরআন সেই দৃষ্টিতে আলোচনা করে না; তাই উভয়ের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আর যদি ইজমা হিসেবে বলতে হয় তাহলে আলেমরা ইজমা করেছেন যে, পৃথিবী গোলাকার যা,ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম ইবনে তাইমিয়া সহ আরও অনেকেই উল্লেখ করেছেন। ইজমা বাদ দিলেও কিছু যায় আসে না কারণ কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে স্পষ্ট।
তোমার আর কি কোন সংশয় আছে যে, পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি কেমন তা কোন আকিদার কোন বিষয়ে নয়? এবং আর কি এই বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে ও কাফের বলবে?
আব্দুর রহমান:- না। তবে কিছু কুরআনের আয়াত ও হাদীস আছে যার উপর কিয়াস করলে প্রতিয়মান হয় যে পৃথিবী সমতল বা অন্য কিছু। যেমন:- এক হাদীসে এসেছে যে, এক দাসিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে আল্লাহ কোথায়? সেই দাসি উপরের দিকে আঙুল তুলে বলেছিল উপরে। যদি পৃথিবী সমতল না হয়ে গোল হয় তাহলে তো এক একটি স্থান থেকে এক এক দিকে আঙুল যাবে। আল্লাহ তাআলা তাহলে কোন দিকে?
আব্দুল্লাহ:- তুমি এখানে ভুলের শিকার হয়েছো। সব সময় মনে রাখবে যে, গায়েবি বিষয় দিয়ে এগুলো প্রমাণ করতে যাবে না। যেমন:-আল্লাহ প্রথম আকাশে নেমে আসেন। বুদ্ধি ও যুক্তি তো এটাই বলে যে, তাহলে আল্লাহ সৃষ্টির মধ্যে প্রবেশ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আল্লাহ তাআলা সকল সৃষ্টির উর্ধ্বে। তাই গায়েবি বিষয়ের উপর বাস্তবিক বিষয় কে কিয়াস করবে না। অনেক দল গোমরাহ হয়েছে গায়েবি বিষয় কে বাস্তবিকতার সাথে মিশিয়ে।
এখন আসো তোমার পেশকৃত হাদীসের দিকে। এই হাদীসের কাহিনীতে আঙুলের ইশারা করা হয়েছে শুধু বোঝানোর জন্য ও মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য। মানুষ যেন এটা বুঝতে পারে যে, আল্লাহ সকল কিছুর উর্ধ্বে। এটা দিয়ে সমতল পৃথিবীর উপর কিয়াস করা যায় না কারণ এখানে বাস্তবিক ও আসল উর্ধ্বে বোঝানো উদ্দেশ্য যা আরশেরও উপরে। কারণ হলো হাদীসের মধ্যে এরূপ আরও বিষয় পাওয়া যায়। যেমন:-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَقُولُ " يَأْخُذُ الْجَبَّارُ سَمَوَاتِهِ وَأَرْضَهُ بِيَدِهِ - وَقَبَضَ بِيَدِهِ فَجَعَلَ يَقْبِضُهَا-
অনুবাদ:- আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) আসমান ও যমীনসমূহকে ধরে তাঁর হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে নিবেন। (এই কথা বলতে বলতেই) তিনি নিজের হাত মুঠো করলেন এবং তা খোলেন ও বন্ধ করেন বারবার। ইবনে মাজাহ ১৯৮।
এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরূপ করা দেখে কি আপনি বলবেন যে, আল্লাহ এরূপ করবেন? এটা যে রূপ আল্লাহ তাআলার সিফাত; অনুরূপ আরশেরও উপরে উঠা আল্লাহ তাআলার সিফাত। এরূপ আরও হাদীস রয়েছে। এগুলো দিয়ে মূলত উদ্যেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে ভালো ভাবে বোঝানো যে, আল্লাহ সত্যিই আরশেরও উর্ধ্বে, আল্লাহ সত্যিই আসমান জমিন কে মুষ্টিবদ্ধ করবেন। কিন্তু এগুলোর ধরন আমরা জানি না কারণ, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ অর্থাৎ তাঁর সদৃশ বা সমান কিছুই নেই। তাই আপনার এই যুক্তি উপস্থাপন ঠিক হয়নি।
আব্দুর রহমান:- তাহলে ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল সম্পর্কে কি বলবেন? আমরা তো ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল কে দেখতে পারি না।
আব্দুল্লাহ:- তোমাকে তাই পূর্বেই বলা হয়েছে যে, গায়েবি বিষয় দিয়ে বাস্তব বিষয়ে লজিক দিলে তুমি স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। ইয়াজুজ মাজুজ ও দাজ্জাল হলো আল্লাহর অলৌকিক ও গায়েবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। তিনি মানুষের থেকেও বেশী জিন শয়তান আবাদ করিয়েছেন এবং অগণিত ফেরশতাকে বিভিন্ন কার্যে নিযুক্ত করেছেন কিন্তু এগুলো মানুষ দেখতে পায়না। ঠিক তেমন ভাবেই আল্লাহ ইয়াজুজ মাজুয ও দাজ্জাল কে লুকিয়ে রেখেছেন কার তিনি কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। আর ইয়াজুজ মাজুয ও দাজ্জাল হলো অলৌকিক পূর্ণ ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত করণ, বাদশাহ জুলকারনাইন যে দেয়াল বানিয়েছিল তা একবার চিকন হয় আবার আল্লাহর ক্ষমতায় পূর্বের মত হয়ে যায়। অর্থাৎ এটি আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতার অংশ। আর অলৌকিক বিষয় কে অলৌকিক ভাবে না নিয়ে বাস্তবিক ভাবে বিশ্লেষণ করা হলো মূর্খদের কাজ। আল্লাহ ইয়াজুজ ও মাজুয কে অলৌকিক ভাবে কোথায় ও কিভাবে লুকিয়ে রেখেছেন আল্লাহ ভালো জানেন।
আবার দাজ্জালের সাথে পশম ওয়ালা প্রাণী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস যে, এখন যারা বেঁচে আছে ১০০ বছরের মধ্যে তারা কেউ বেঁচে থাকবে না পৃথিবীর বুকে । তাও যদি দাজ্জাল বেঁচে থাকে তাহলে তা হলো আল্লাহর অলৌকিক বিষয়। আর অলৌকিক বিষয় কে অলৌকিক ভাবে না নিয়ে বাস্তবিক ভাবে বিশ্লেষণ করা হলো মূর্খদের কাজ। আল্লাহ দাজ্জাল কে অলৌকিক ভাবে কোথায় ও কিভাবে রেখেছেন আল্লাহ ভালো জানেন।
আব্দুর রহমান:- কুরআনের মধ্যে আয়াত আছে যে, গ্রহ,নক্ষত্র, আকাশ-মহাকাশ ইত্যাদি সব ধ্বংস হয়ে পৃথিবীতে খশে পড়বে। তাহলে কুরআন বলছে পৃথিবী সবচেয়ে বড়।আরা মিথ্যুক বিজ্ঞান বলছে সূর্য বড়।
আব্দুল্লাহ:- বিজ্ঞান যা খুশি তাই বলুক তাতে কিছু যায় আসে না কিন্তু তুমি বলছো কুরআন বলেছে বাস্তবিক পৃথিবী বড় সূর্যের চেয়ে এটা কুরআনের উপর অপবাদ। পূর্বে প্রমাণ করা হয়েছে যে, কুরআন সবসময় মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে অর্থাৎ কুরআনের কোন আয়াত দ্বারা যদি এটা মনে হয় যে, কুরআন বলছে পৃথিবী বড় তাহলে, এটা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। আর যদি বাস্তবিক ধরেও নি তাহলে এগুলো বিষয় সংগঠিত হবে কিয়ামতের সময় যখন পৃথিবীকেও পরিবর্তন করা হবে অন্য পৃথিবীতে। তাই কিয়ামতের সময়কার পৃথিবীর সাথে এখনকার পৃথিবীর তুলনা করা মূর্খতার পরিচয়।
যদি ধরেও নি যে পৃথিবীর এখনকার আকৃতিতেই থাকবে, তাও প্রমাণ হয় না যে, কুরআন বলে, পৃথিবী বড় এবং সূর্য ছোট্ট কারণ আল্লাহ সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। তিনি চাইলে বড় বস্তুকেও ছোট বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করাতে সক্ষম। তাই কুরআন কোথাও পৃথিবীকে সূর্যের চেয়ে বড় বলেনি বাস্তবিক ভাবে এবং আল্লাহ সবকিছুই করতে ক্ষমতাবান।
আব্দুর রহমান:- এরূপ ফাও পেচাল কৈ পেয়েছেন?
আব্দুল্লাহ:- আমার কথা অযৌক্তিক নয় কারণ আমি দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছি এবং করবো; কিন্তু তোমার এইসব যুক্তি হলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করার মূর্খতা। কিয়ামতের সময় পৃথিবী কেমন হবে, পাহাড় কেমন হবে, যেই আসমান দেখিনায় তা কিভাবে ভেঙে পড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি হলো গায়েবি বিষয়। তুমি গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করে পথভ্রষ্ট হয়েছো ও হইতেছো।
আল্লাহ নিজেই কুরআনে বলে দিয়েছেন যে, তিনি কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। তুমি কি আল্লাহর ক্ষমতাকে অশ্বিকার করবে? এবং আল্লাহর "কুন-ফায়াকুন" ক্ষমতাকে ভুলে যাবে? আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মধ্যে বলে দিয়েছেন যে, তিনি যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন বললে " কুন" সাথে সাথে তা" ফায়াকুন" হয়ে যায়। আর আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্র সব কিছুই আল্লাহর সিদ্ধান্ত সমূহের একটি সিদ্ধান্ত। আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্র যে পৃথিবীতে খশে পড়বে এটাও আল্লাহর সিদ্ধান্ত সমূহের একটি সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন যে, তিনি যে কোন সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক না কেন তার জন্য কুন-ফায়াকুনই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বদা কুন-ফায়াকুন ক্ষমতাকে প্রয়োগ করতে সক্ষম। তার কুন-ফায়াকুন ক্ষমতা থেকে সেই বিষয়ে বাদ যাবে যে সিদ্ধান্তগুলোকে আল্লাহ নিজেই নির্দিষ্ট করার ওয়াদা করেছেন। যেমন:- আল্লাহ চাইলে সকল অমুসলিম কাফেরকেউ তার সাথে শিরকে আকবার করার পরও ক্ষমা করে দিতে সক্ষম কিন্তু তিনি তাদের ক্ষমা করবে না কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পূর্বেই তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, আল্লাহ শিরক কারীকে কখনোও ক্ষমা করবে না। অনুরূপভাবে, আল্লাহ তায়ালা অমুসলিম কাফের সকলকেই জান্নাতে প্রবেশ করাতে সক্ষম ও ক্ষমতা বান কিন্তু আল্লাহ তা করবেন না কারণ, আল্লাহ নিজেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, অমুসলিম কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম।
এমন কোন কাজ নেই যা মানুষ কল্পনা করতে পারে এবং আল্লাহ তা করতে সক্ষম নন। তবে আল্লাহ সে সকল কার্জ করতে ক্ষমতা বান হওয়া শর্তেও করবেন না যেই বিষয় কে তিনি পূর্বেই কুরআন ও হাদীসের মধ্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীসের কোথাও বলা হয়নি যে, আল্লাহ পৃথিবীকে বড় করবেন না বা আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্রকে ছোট করবেন না বা তিনি বড় বস্তুকে ছোট বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করাবেন না। বরং কুরআনে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের সময় এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করা হবে।যখন এই বিষয়ে কোনো কিছু নির্দিষ্ট করা হয় নি তাহলে এই বিষয়গুলো আল্লাহর কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। কেননা সমস্ত সিদ্ধান্তই আল্লাহর কুন-ফায়াকুন ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত যদি না আল্লাহ কিছু নির্দিষ্ট করে দেন। তাই আল্লাহ তায়ালা আকাশ মহাকাশ, গ্রহ নক্ষত্রকে পৃথিবীর মধ্যে কেন বরং একটি পিঁপড়ার মধ্যেও প্রবেশ করাতে সক্ষম এবং তিনি তাকে কোন কিছু দিয়ে নির্দিষ্ট করে নি।
আব্দুর রহমান:- আল্লাহ তাআলা বলেছেন "আল্লাহ তিনিই, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবীও তার অনুরূপ" এটা সম্পর্কে কি বলবেন? এটা দিয়ে কি পৃথিবী আসমানের মত বড় প্রমাণ হয়না?
আব্দুল্লাহ:- তোমাদের প্রত্যেক বিষয় কেন গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত থাকে? তুমি কি প্রথম আসমান দেখেছো? গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা বন্ধ কর। এই আয়াত দ্বারা সংখ্যা বোঝানো হয়েছে। আকাশ আর পৃথিবী কিভাবে অনুরূপ হয়? আকাশ কি দিয়ে তৈরি আর পৃথিবী কি দিয়ে? আকাশের দরজা আছে আর পৃথিবীর দরজা কোথায়? আকাশ তো গম্বুজ এর মত; পৃথিবী কি গম্বুজের মত?ইত্যাদি ইত্যাদি।
আব্দুর রহমান:- এই বিষটির প্রমাণে শক্তিশালী আরেকটি কিয়াস রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা থেকে হাসান সনদে প্রমাণিত যে, জমিন থেকে জমিন থেকে প্রথম আসমানের দুরত্ব ৫০০ বছরের এবং এক আসমান থেকে অন্য আসমানের দুরত্ব ৫০০ বছরের এবং পুরুত্বও ৫০০ বছরের। আবার জমিনের পুরুত্বও ৫০০ বছরের এবং এক জমিন হতে অন্য জমিনের দূরত্বও ৫০০ বছরের। এই হাদীস প্রমাণ করে যে পৃথিবী সমতল। কারণ, আকাশের পুরুত্ব ৫০০ বছর আবার জমিনেরও। এটা প্রমাণ করে পৃথিবী অনেক প্রসস্থ ও সমতল এবং পুরুত্ব আছে। গোলাকার জিনিসের কোন পুরত্ব হয় না।
আব্দুল্লাহ:- পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী এক নয় বরং ভিন্নতা আছে যেমন:- আকাশ গম্বুজের মত আর পৃথিবী গম্বুজের মত না ইত্যাদি। আর গোলাকার জিনিসের পুরুত্ব হয় না কে বলেছে? একটি আসল ক্রিকেট বল নিয়ে দেখো যে, তার উপর মোটা চামড়া, তার ভিতরে একটি বল এবং তার ভিতরেও হয়তো আরোও স্তর আছে। একটি গোলাকার ছোট ক্রিকেট বলে যদি স্তর এবং পুরুত্ব থাকে তাহলে অন্য বিষয়ের কথা বাদই দেন।
আর এখানে ৫০০ বছর কে রূপক অর্থে নেওয়া হয়েছে। এর দ্বারা ৫০০ বছর উদ্যেশ্য নয় বরং বিশাল প্রসস্ততা বোঝানো হয়েছে। এরূপ আরবি বালাগাতের ব্যবহার অনেক রয়েছে। অনেক যায়গায় এরূপ রূপক ভাবে প্রসস্ততা ও সংকির্ণতা বোঝানোর জন্য বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হয়। এটা যে রূপক এর দলিল হলো:- একটি সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে,
رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " فِي الْجَنَّةِ مِائَةُ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ
অর্থ:- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতে একশতটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বর্তমান। (সুনান তিরমিজী ২৫৩১).
অর্থাৎ জান্নাতের স্তর সমূহের মধ্যে আসমান ও জমিনের পার্থক্য। আবার অন্য সহীহ মারফু হাদীসে এই পার্থক্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:-
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " فِي الْجَنَّةِ مِائَةُ دَرَجَةٍ مَا بَيْنَ كُلِّ دَرَجَتَيْنِ مِائَةُ عَامٍ "
অর্থ:- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাতের একশত স্তর (ধাপ) রয়েছে। প্রত্যেক দু স্তরের মাঝখানে রয়েছে একশত বছরের ব্যবধান। (সুনান তিরমিজী ২৫২৯).
তাহলে টনটনে সহীহ মারফু হাদীস দিয়ে প্রমাণিত যে, আসমান ও জমিনের দূরত্ব ১০০ বছর; অথচ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস অনুযায়ী ৫০০ বছর। তাহলে কোনটা ঠিক? আসলে দুটোই ঠিক কারণ এখানে সময় উদ্যেশ্য নয় বরং অনেক দূরত্ব তা বোঝানো উদ্দেশ্য।
আবার অপর একটি সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে যে, বান্দার মাঝে ও জান্নাত-জাহান্নামের মাঝে ১ হাত পার্থক্য থাকে। কিন্তু পরিশেষে তাকদির এসে পড়ে এবং সে জান্নাতে বা জাহান্নামে চলে যায়।
আসলেই কি জান্নত ও জাহান্নাম ও ব্যক্তির মাঝে ১ হাত পার্থক্য থাকে? সেই ব্যক্তি কি একটি লাফ দিয়েই সোজা জান্নাতে ও জাহান্নামে চলে যাবে?
এখানে এক হাত হিসাব দ্বারা এক হাত দূরে জান্নাত জাহান্নাম বোঝানো হয়নি বরং সময়ের স্বল্পতা বোঝানো হয়েছে। এর অর্থ হলো, একজন মানুষ তার জীবনের একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং তার মৃত্যু অতি সন্নিকটে। আমাদের যাপিত জীবনের সাপেক্ষে মৃত্যু এবং পরকাল এতটাই কাছে, যা রূপক অর্থে 'এক হাত' বলা হয়েছে।
এরূপ রূপক শব্দের ব্যবহার অনেক স্থানেই করা হয়েছে। আর সর্বপরী, এগুলো গায়েবি বিষয়। এগুলোর উপর কিয়াস করা বোকামি ছাড়া কিছুই না। এগুলো দিয়ে অকাট্য কিছু তৈরি হয় না বরং শুধু ধারণা। আর ধারণা দিয়ে আকিদা তৈরি হয় না।
আব্দুর রহমান:- তাহলে জমিন কে যে আকাশের অনুরূপ বলা হয়েছে এটাতে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- কোন কিছুকে কারো অনুরূপ বলা হলেই তা হয়ে যায় না বরং এরূপ রূপক কথার উদ্যেশ্য দেখতে হয়। সহীহ ইবনে হিব্বানের হাদীসে আকাশ কে আংটি বলা হয়েছে; তাহলে কি আকাশ আংটির মতো? আংটির যেমন চারদিকে রিং মাঝখানে ফাঁকা; আকাশও কি এমন? আকাশ কি ক্রিকেট ফুটবলের মাঠ নাকি যে, চারদিকে রিংয়ের মত আর ফাঁকা?
এসব রূপক কথামূলক হাদীস। এখানে আকাশের যেমন পুরুত্ব ও দূরত্ব রয়েছে এক আসমান থেকে অন্য আসমানের; ঠিক আকাশের মত জমিনেরও পুরুত্ব ও দূরত্ব রয়েছে তাই বোঝানো উদ্দেশ্য। ৫০০ বছর কিংবা ১০০ বছর কিংবা এতো ইঞ্চি এতো হাত বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। আসমানের পুরুত্ব রয়েছে, জমিনেরও রয়েছে, আসমানের দুরত্ব রয়েছে, জমিনের ও রয়েছে, আসমান সাতটি, জমিনও। এখানে জমিন আসমানের অনুরূপ। সর্বপরী এসব গায়েবি ও রূপক কথামূলক হাদীসের পিছনে পড়ে থাকলে এমনিতেই গোমড়াহ হয়ে যাবে।
আব্দুর রহমান:- আকাশ কে যে, ছাদ বলা হয়েছে তাতে কি বলবেন? আসমান ও জমিন পূর্বে একত্রিত ছিল; আল্লাহ তাআলা অতঃপর আলাদা করে সুবিনাস্ত করেছেন তাতে কি বলবেন?
আব্দুল্লাহ:- প্রিয় ভাই! যেখানে আসমানই গায়েবি বিষয় সেখানে বারবার এটা নিয়ে প্রশ্ন করা মুর্খতার পরিচয় বহন করে। আকাশ কে যে ছাদ বলা হয়েছে তাতে কি হয়েছে? ছাদ কি বড় হয়না? আমিতো সকল বাড়িই দেখি যে, বাড়ির ভূমির তুলনায় ছাদ কিছু বড় হয়; আবার অনেক কিছুর ছাদ বেশিই বড় হয়। আবার আসমান ও জমিন পূর্বে একত্রিত ছিল তাতে কি হয়েছে? এখানে কি পূর্বের কথা ধরা হবে? পূর্বে আকাশ ও পৃথিবী অন্যরকম ছিল। আল্লাহ তাকে পরিবর্তন করে বর্তমান করেছেন। ভবিষ্যতে কিয়ামতের সময় আল্লাহ তাআলা আবার পরিবর্তন করবেন। তাহলে পূর্বে ও পরে পৃথিবী কেমন তা দিয়ে কি হবে? লাগবে তো বর্তমান। আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন কারণ তিনি কুন ফায়াকুন ক্ষমতার অধিকারী। পূর্বেই কুন ফায়াকুন নিয়ে বলা হয়েছে;তা ভালোকরে স্বরণ করুন। আমিতো বাস্তবিক জীবনেও দেখেছি যে, কত বিশাল ছাদের সাথে লাগানো ছোট এক টুকরো গোলাকার লাইট। আবার এক প্রকারের বিশেষ গোলাকার কাগজের ফানুসের মধ্যে ছোট লাইটা লাগানো; যার জন্য সেই ফানুস টি জ্বলছে এবং দেখতে সুন্দর লাগছে। একসাথে থাকলে কি সমান সমান হতে হবে? আবার আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। তার জন্য কোনো কিছু অসম্ভব নয়। সর্বপরি এইসব গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা বন্ধ কর। যেইদিন আসমান,সপ্ত জমিন, আকাশের দরজা ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখবে তখন কিয়াস করিও। এসব গায়েবি বিষয়ের উপর অযৌক্তিক কিয়াস ব্যবহার করার কোন মূল্য নেই।
আব্দুর রহমান:- পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতলের অন্য একটি লজিক হলো:- পশ্চিম দিকে হয়ে সালাত আদায় করা। পশ্চিম দিকে হয়ে সালাত আদায় করতে হলে পৃথিবীকে সমতল হতেই হবে এটা কিয়াসের দাবি। গোলাকার পৃথিবীতে তুমি দিক নির্ণয় কিভাবে করবে?
আব্দুল্লাহ:- তোমার লজিকে না ধরলেও আলেমরা ঠিকই এই বিষয়ে সুন্দর ও সুস্পষ্ট ভাবে বলেছেন।এটাও গোলাকার পৃথিবীতে সম্ভব। পবিত্র কাবার দিকে মুখ করার ক্ষেত্রে যা চাওয়া হয়েছে তা হলো তার দিকের (অভিমুখের) দিকে ফেরা, যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “সুতরাং আপনি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফেরান এবং তোমরা যেখানেই থাক না কেন, সেদিকেই মুখ ফেরাও।” [সুরা আল-বাকারা, ১৪৪]
সুতরাং উদ্দেশ্য হলো দিক এবং অভিমুখ। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে এটি জানা বিষয় এবং প্রাচীন ও আধুনিক সভ্যতার জ্ঞানে ও সুস্থ বিবেকের বিচারে এটি স্বীকৃত যে, পৃথিবীর এবং সকল নভোমণ্ডলের চারটি দিক রয়েছে যা তা থেকে অবিচ্ছেদ্য। সেগুলো হলো উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম। এটি পৃথিবীর সেই অক্ষের ওপর ভিত্তি করে যা ডান থেকে বামে ঘোরে এবং আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে যে নিজস্ব মেরুশক্তি দিয়েছেন তার ওপর ভিত্তি করে, যার ফলে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কম্পাস উত্তর ও দক্ষিণ দিকে নির্দেশ করে।
এগুলো হলো নিজস্ব (প্রাকৃতিক) দিক, যা পৃথিবীর নিজের সাপেক্ষে কখনোই পরিবর্তিত হয় না, যদিও আপেক্ষিক অবস্থানের কারণে তা ভিন্ন মনে হতে পারে। এজন্য পৃথিবীর গোলাকার হওয়া এই চারটি দিককে বাতিল করে দেয় না, এমন দাবি করে যে— পশ্চিম দিকে ঘুরতে থাকলে তা পূর্বে গিয়ে পৌঁছাবে, অথবা উত্তর দিকে গেলে দক্ষিণে গিয়ে পৌঁছাবে। এখান থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে, যে ব্যক্তি পৃথিবীর নিজস্ব উত্তরে অবস্থান করছে, তার জন্য কিবলার দিক হলো দক্ষিণ। যে পৃথিবীর নিজস্ব দক্ষিণে আছে, তার জন্য কিবলার দিক উত্তর। যে পৃথিবীর নিজস্ব পূর্বে আছে, সে কিবলার জন্য পশ্চিমে মুখ করবে এবং যে পৃথিবীর নিজস্ব পশ্চিমে আছে, সে কিবলার জন্য পূর্বে মুখ করবে। এটিই হলো সেই কিবলার দিক, শরীয়তে যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি কেবল কিবলা সম্পর্কিত নয়, বরং পৃথিবীর সমস্ত শহর এবং দিকগুলোর আনুপাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাই আপনি কাউকে এমন কথা বলতে শুনবেন না যে, ইউরোপ মহাদেশ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত, কারণ কেউ যদি আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে, তবে পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার কারণে ঘুরতে ঘুরতে সে ইউরোপে পৌঁছে যাবে!
আপনি ভারতের কোনো আলেমকেও এমন কথা বলতে শুনবেন না যে, যদি তাকে আমেরিকা মহাদেশের দিক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে তিনি পূর্ব দিকে ইশারা করবেন। বরং তিনি পশ্চিম দিকেই ইশারা করবেন, যদিও পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার কারণে একেবারে পূর্ব দিকে চলতে থাকলে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু দিকের প্রশ্ন এক জিনিস, আর পৌঁছানো বা গন্তব্যে যাওয়ার পথ আরেক জিনিস।
সাধারণ মানুষের প্রথা অনুযায়ী এবং শরীয়তের পরিভাষাতেও উদ্দেশ্যকৃত দিক হলো: সমগ্র পৃথিবীর জন্য স্থির দিকগুলো—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম। আর এটি সেই দিক যা স্থির ম্যাগনেটিক কম্পাস সব জায়গায় নির্দেশ করে। এটি পৃথিবীর নিজস্ব ও স্থায়ী দিক যা কখনো পরিবর্তিত হয় না
আমাদের শরীয়তে এই স্থির প্রথার ভিত্তিতেই কিবলার দিকে মুখ করা কাম্য, যে কোনো পথ দিয়ে সেখানে পৌঁছানো উদ্দেশ্য নয়। দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট।
[সোর্স: IslamQA; প্রশ্ন নং ২২৬৭৯১]
إذا كانت الأرض كروية فلماذا ليس ثمة إلا اتجاه واحد للقبلة ؟ - الإسلام سؤال وجواب
তুমি পৃথিবীর যেখানেই দাঁড়াও না কেন, তোমার সামনের দিকটি সবসময় পৃথিবীর পৃষ্ঠের সমান্তরালে থাকে। পৃথিবী গোল হওয়ার কারণে তুমি যখন কিবলার দিকে মুখ করো; তখন মূলত পৃথিবীর বক্রতা বরাবর একটি বক্ররেখাকে অনুসরণ করছো। তোমার দৃষ্টি সরাসরি মহাকাশের দিকে চলে যায় না, কারণ বায়ুমণ্ডল এবং আলোর প্রতিসরণ তোমাকে দিগন্তের দিকেই তাকাতে বাধ্য করে। আমরা সবসময় পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবরই কিবলা খুঁজি এবং এর অনুসরণ করি। এটা হলো পৃথিবীর স্থির দিক যা কখনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ দিক খোঁজার জন্য সমতল পৃথিবী হওয়া আবশ্যক নয় বরং গোলাকার পৃথিবীতেও সম্ভব এবং সবচেয়ে সঠিক। গোলাকার জিনিসের ওপর দিক মানে হলো সেই গোলকের কেন্দ্রকে ঠিক রেখে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুর ক্ষুদ্রতম কৌণিক দূরত্ব।
আব্দুর রহমান:- তাহলে তুমি বলছো যে, দিক এভাবে আঁকা-বাঁকা হয়ে যায়? এটা একদম বাজে কথা।
আব্দুল্লাহ:- গিয়ে পূর্বে নিজের সমতল পৃথিবীর সূর্য দেখ। কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত যে, সূর্য পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যাত্রা করে। দিক যদি এরূপ আঁকা-বাঁকা না হয় তাহলে সূর্য কিভাবে সমতল ম্যপে ১৮০ ডিগ্রি ঘুর্ণন করছে? সমতল ম্যপ অনুযায়ী যদি তুমি সোজা পশ্চিম দিকে যাত্রা কর তাহলে যাত্রা করতে করতে পৃথিবী থেকে নিচে পড়ে যাবে বা শেষ সীমানায় পৌছে যাবে। তোমাদের সমতল ম্যপেও সূর্য ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন মেরে এঁকে বেঁকে চলে। আর তোমাদের সমতল ম্যাপে দক্ষিণ দিক কয়েকটি বা নাই নাকি? উত্তর কে যদি কেন্দ্র করি তাহলে তো জাপানো দক্ষিণে আবার আমেরিকা দক্ষিণে। যেদিকে যাও সব দক্ষিণ । আগেও দক্ষিণ পরেও দক্ষিণ কারণ কেন্দ্র হলো উত্তর। এটা আবার কি ম্যাপ। মজা করা বাদ দিয়ে বললে, মুসলিম- অমুসলিম, গোলাবাদী-সমতলবাদী সবার ঐক্য আছে যে দিক এঁকে বেঁকে যাত্রা করে। তাই দিক নির্ণয় করার ক্ষেত্রে গোলাকারের যুক্তি তোমাদের সমতলের যুক্তি থেকে ভালো। গিয়ে পূর্বে নিজেদের ম্যাপে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সূর্যের যাত্রা দেখ; তাহলে বুঝতে পারবে দিক এঁকে বেঁকেও চলতে পারে।
পৃথিবীর নিজস্ব (প্রাকৃতিক) স্থির দিক রয়েছে, যা পৃথিবীর নিজের সাপেক্ষে কখনোই পরিবর্তিত হয় না, যদিও আপেক্ষিক অবস্থানের কারণে তা ভিন্ন মনে হতে পারে। এই স্থির দিকগুলোর ভিত্তিতে কিবলার দিকে মুখ করা কাম্য। এবং এরই ভিত্তিতে সবচেয়ে নিকটস্থ বিন্দুকে অনুসরণ করতে হবে। তাই গোলাকার হলেও কাবার দিকে মুখ করতে কোন অসুবিধা নেই ।
আব্দুর রহমান:- বায়তুল মামূর সম্পর্কে কি বলবে? বায়তুল মামুর কাবা বরাবর অবস্থিত। যদি পৃথিবী সমতল না হয় তাহলে বায়তুল মামুর ও কাবা কিভাবে বরাবর হবে?
আব্দুল্লাহ:- এর উত্তর পূর্বেই চলে গিয়েছে। কিন্তু তোমার বুদ্ধি মোটা তাই বুঝতে পারোনা। জীবনে বায়তুল মামুর দেখেছো? বায়তুল মামুর হলো গায়েবি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। গায়েবি বিষয় দিয়ে বাস্তব বিষয়ের প্রতি কিয়াস করলে তুমি প্রথভ্রষ্ট হবে। আল্লাহ প্রতিদিন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন। আমরা জানি যে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সবসময় রাতের শেষ তৃতীয়াংশ থাকে। তাহলে কি আল্লাহ পৃথিবীর আকাশেই সর্বদা থাকে? এবং আরশ কি ফাঁকা হয়ে যায়? যুক্তি কি বলে?
এরূপ আবার তোমার মতো অনেকেই সাত তবক জমিনের উদাহরণ দেয় যে, কিয়ামতের মাঠে সাত তবক জমিন ঘাড়ে তুলে দেওয়া হবে। অথচ এটাও গায়েবি বিষয়; কারণ, কিয়ামত হলো গায়েবি বিষয়। আবার কিয়ামতের সময় এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করা হবে তা কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত।
তাই গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা মূর্খতা ছাড়া কিছুই না। যার বাস্তবিক অবস্থা আমরা জানিনা তার উপর কিয়াস কখনও করবে না।
আব্দুর রহমান:- আল্লাহ তাআলা সূরা রহমানে বলেছেন যে, "হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও যমীনের সীমানা থেকে বের হতে পার, তাহলে বের হও।" তাহলে মানুষ কিভাবে মহাকাশে যেতে পারে?
আব্দুল্লাহ:- এখানেও একই উত্তর। এগুলো গায়েবের বিষয়। তুমি কি কখনো আসল আসমান দেখেছো? তাহলে তুমি তার উপর কিয়াস করছো কেন? তোমার কাছে আকাশ কোনটি? আমরা যা দেখি এবং যেইখানে মেঘ থাকে, সুবহে সাদিক, সুবহে কাযিব, দিন রাত দেখি এটা আসল আসমান? এটা আসল আসমান নয় বরং বায়ুমণ্ডলিও আকাশ; যার প্রমাণ হাজার হাজার আছে। মানুষ পৃথিবী থেকে এক বিশেষ বেলুন উড়িয়ে এই মেঘ, সুবহে সাদিক,রাত দিন যুক্ত বায়ুমণ্ডল খুবই সহজে অতিক্রম করতে পারে। কুরআন ও হাদীসে এটাকেও আসমান বলা হয়েছে মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে কারণ কুরআন ও হাদীস মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের মধ্যে যে সপ্ত আসল আকাশের কথা বলা হয়েছে এটা গায়েবি বিষয় কারণ মানুষ তা দেখতে পারে না। মানুষের দৃষ্টি আসল আকাশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না বরং মানুষ আকাশের নিচের কোটি কোটি তারকা নক্ষত্র ইত্যাদির মধ্যে অল্প কিছু দেখতে পারে। আসল আকাশ হলো গায়বি বিষয়। আর সপ্ত জমিনও গায়েবি বিষয় কারণ কেউ তা দেখেনি।
তুমি যেই আয়াতের কথা বলছো সেখানে أقطار শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আরবিতে ‘قطر’ (কুতর বা ব্যাস) বলতে কোনো জিনিসের দুই বিপরীত প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বোঝায়। কুতর বা ব্যাস ওই জিনিসের সীমানার ভেতরেই থাকে, তার বাইরে নয়। ইমাম বায়হাকি একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যেখানে
নবীজি (সা.) বলেছেন:
“যদি কোনো ব্যক্তি জনমানবহীন প্রান্তরে আজান ও ইকামত দিয়ে নামাজ পড়ে, তবে তার পেছনে ফেরেশতাদের এমন কাতার হয় যার দুই প্রান্ত (قطراه) দেখা যায় না...”
এখানে ‘قطراه’ অর্থ হলো চারদিকে এর বিস্তৃতি। একইভাবে পৃথিবীর ‘কুতর’ বা ব্যাস হলো এর ঘনত্ব বা গভীরতা—অর্থাৎ এক প্রান্ত থেকে শুরু করে কেন্দ্র ভেদ করে অপর প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব। পৃথিবীর ব্যাস ভেদ করতে হলে এর পৃষ্ঠ থেকে ভেতরের দিকে খুঁড়ে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হতে হবে, যা মানুষের সামর্থ্যে অসম্ভব। মানুষ রাশিয়ার কোলা সুপারডিপ বোরহোল বা জার্মানির মতো জায়গায় মাত্র ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন করতে পেরেছে, এরপর প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। যদি মানুষ পৃথিবীর ব্যাস বা গভীরতাই ভেদ করতে না পারে, তবে আসমানের ব্যাস কীভাবে ভেদ করবে?
এই আকাশ এবং যমিন সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামতের দিন এই জমিনকে অন্যরূপ প্রদান করবেন। আসলে এগুলো গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করা অজ্ঞতার শামীল। আসমানের সিমানা চাঁদ, মঙ্গল ইত্যাদি গ্রহ থেকেও এতদূর বিস্তৃত যে, মানুষ আসল আসমান দেখতে পারে না। যখন আসল আসমানিই দেখতে পারে না তখন তার সীমানা পার করবে কিভাবে? মানুষ আল্লাহর মৃত্যু দূতের পাকড়াও বা কিয়ামতের শাস্তি থেকে পালায়ন করতে সক্ষম নয়।
আব্দুর রহমান:- পৃথিবী সমতল এই বিষয়ে পূর্ববর্তী সকলের ইজমা রয়েছে। তাই ইজমা মেনে নিন এবং গোলাকার মতবাদ কে উপেক্ষা করুন।
আব্দুল্লাহ:- পূর্ববর্তী কেন? বরং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের ইজমা রয়েছে যে পৃথিবী সমতল কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। আলেমরা একমত হয়েছেন যে, মানুষের পর্যাবেক্ষনে একটি বড় গোলকের পৃষ্ঠকে মানুষ সমতল দেখে থাকে। অর্থাৎ কুরআন-হাদীস ও ইজমার আলোকে পৃথিবী সমতল; কিন্তু তা মানুষের পর্যাবেক্ষনের আলোকে। ভৌগলিক বা আকৃতির আলোকে নয়।
ইজমা কিভাবে প্রমাণিত হয় জানেন? ইজমা প্রমাণিত হওয়ায় জন্য প্রথম শর্তই হলো ইজমার বিষয়টি আলেমদের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ থাকবে অথবা গভির জ্ঞানের অধিকারী কোন নির্ভরযোগ্য বিদ্বান ইজমার বিষয়টি বর্ণনা করবেন।
কোন ইমাম ইজমার কথা বলেছেন? কোন ইমাম বলেছেন যে, পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতল এই ব্যাপারে ইজমা আছে? বরং আমরা এর উল্টো দেখতে পায়।
ইমাম ইবনে হাযম, ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কায়্যুম, ইবনে জাওযি সহ অনেকেই ইজমার উল্লেখ করেছেন। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ সকল ফকিহ তাহকিক করেছেন এবং তারাও ইজমা মেনে নিয়েছে। কিন্তু তোমার মত অভার স্মার্ট অল্লামারা মেনে নেইনি। এই সব হাজার হাজার ইমাম ফকিহ তোমার থেকে ভালো বুঝতেন কুরআন-হাদীস এবং সালাফদের বক্তব্য। সালাফরা কুরআন ও হাদীসের বাহ্যিক আয়াত এবং মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে বুঝতেন। কিন্তু ইজমা মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে পৃথিবী দেখতে কেমন এই বিষয়ে নকল করা হয়নি বরং ভৌগলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবী কেমন এই বিষয়ে ইজমা রয়েছে। দুই বিষয় ভিন্ন। তাই ইমাম ইবনে হাযম এর মতো কট্টর যাহেরি মাযহাবের অনুসারীও ব্যাক্তিও ইজমা নকল করেছেন।
তাই পৃথিবীর ভৌগলিক আকৃতি সমতলের উপর ইজমা আছে এটা বলা হাস্যকর। হ্যাঁ। মানবিক পর্যাবেক্ষনের আলোকে পৃথিবী সমতল এই বিষয়ে সবাই একমত। কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে এসব আলোচনা করেছেন যেন, মানুষ অনুধাবন করে উপকৃত হতে পারে এবং আল্লাহ ক্ষমতা ও অনুগ্রহ বুঝতে পারে।
ইজমা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। তাই দেখ আমি ইজমাকে দূরে সরে দিয়ে তোমার সাথে কুরআন- হাদীস এবং বাস্তববিক দৃশ্যমান বিষয় দিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু তুমি বারবার ইজমা-ইজমা করছো। তুমি ইজমার কথা না বললে আমি ইজমার নিয়ে বলতামই না। কারণ কুরআন ও হাদীসই যথেষ্ট।
অতএব এতো দীর্ঘ আলোচনা করার পর প্রমাণিত হলো যে, এটি কোন আকিদার বিষয় নয় কারণ, আকিদার বিষয় হতে হলে কুরআন- হাদীসের সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। কিন্তু প্রথমেই প্রমাণ করা হয়েছে যে, কুরআনের ও হাদীসের কোথাও পৃথিবীর আকৃতি কে সমতল বলা হয়নি বরং কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করেছে এবং মানুষ তা অনুধাবন করেছে। তারপর সুস্পষ্ট নয় এমন আয়াত ও হাদীসের উপর কিয়াস নিয়ে আলোচনা করলাম তোমার সাথে কিন্তু তাতেও কিছু প্রমাণ করতে পারলে না বরং তোমার কিয়াসের উত্তম জবাব দেওয়া হয়েছে। যদি তোমার কিয়াস সহীহ হতো তাও কিছু যায় আসতো না কারণ এভাবে কিয়াস করে আকিদার বিষয় প্রমাণ হয় না বরং দলিল লাগে। যদিও তোমার কিয়াস সব বোকামো এবং তাই তোমার সব কিছু বিফলে গেছে এবং উত্তম জবাব দেওয়া হয়েছে।
যদি আরও কোন যুক্তি থাকে যা গায়েবি বিষয়ের বাহিরে বলতে পারো কিন্তু গায়েবি বিষয়ের উপর কিয়াস করে বাস্তব বিষয়ে ফিট করবে না। আর কোন প্রশ্ন আছে?
আব্দুর রহমান:- ..... নাই তবে আমি গোলাকার পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক ভুল ধরে প্রমাণিত করতে পারি যে, বিজ্ঞান বলে পৃথিবী গোলাকার এটা ভুল।
আব্দুল্লাহ:- এখন থাকুক ভাই। পরে এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা হবে। রাত অনেক হয়েছে পড়ে কথা হবে। আসলে ভাই, আমার উদ্যেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে, কুরআন ও হাদীস মানুষের হিদায়াতের জন্য পর্যাবেক্ষনের আলোকে আলোচনা করে যেন তা মানুষের উপকার করে। কুরআন কোন বৈজ্ঞানিক সুত্র, থিসিস শিখানোর গ্রন্থ নয়। কুরআনের বিষয় বস্তু আর বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা। বিজ্ঞান যেরূপ মহাকাশের আলোকে বলে যে, পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার বা চাঁদে গিয়েছিলাম; এইসব বিষয়ে কুরআনের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই কারণ উভয়ের উদ্যেশ্য ভিন্ন। যদিও আমি গোলাকার বিশ্বাস করি কিন্তু আমার কোন পড়োয়া নেই যে মানুষ বিজ্ঞানের আলোকে পৃথিবীকে কি প্রমাণ করলো। এটা না আকিদার বিষয়, আর না কুরআনে এই বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা আছে। ভাই জাঝাকাল্লাহু খয়রন।
আব্দুর রহমান:- দেখে শুনে যাইয়েন ভাই। জাঝাকাল্লাহু খয়রন।
Last edited: