Altruistic
Uploader
Salafi User
- Joined
- Nov 17, 2023
- Threads
- 429
- Comments
- 566
- Solutions
- 1
- Reactions
- 14,105
- Thread Author
- #1
একদা আব্দুল্লাহ আলোচনা করছিল যে, একজন মহিলা বিবাহের সময় শর্ত দিতে পারে যে, স্বামীর উপর দ্বিতীয় বিবাহ করা ততদিন নিষিদ্ধ যতদিন সে স্ত্রী হিসেবে থাকবে। আব্দুল্লাহর এই কথা আব্দুর রহমান শুনতে পেয়ে বললেন যে,
আব্দুর রহমান:- এটি আল্লাহর বৈধ বিষয়কে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করার বাতিল শর্ত। তাই এই শর্ত পূরণ করা হবে না। এর উপর ইজমা নেই। এরূপ শর্তের কোন গুরুত্ব নেই যা একটি জায়েয কাজকে নিষিদ্ধ করে খাস দলিল ছাড়া। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা ওয়ালার শর্ত করার পরেও পালন করেন নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ শত শত শর্ত হলেও বাতিল বলেছেন যা আল্লাহর কিতাব বিরোধী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর মধু হারাম করে নিয়েছিলেন তাই আল্লাহ তাকে সতর্ক করেছিলেন।
একাধিক বিবাহ জায়েয যা আল্লাহ ফয়সালা দিয়েছেন। আল্লাহর যায়েজ ফয়ছালা নিজের বা কারোও উপর সাধারণ ভাবে হারাম করে নেওয়া ও দেওয়া বৈধ নয়।
তবে স্ত্রী যদি বলে যে, একাধিক বিবাহ করলে আমি তালাক নিব, তাহলে তালাক নিতে পারে কারণ এটা কোন হারাম শর্ত নয় বরং হালাল শর্ত। এটাকে তালাকে তাফবিজ বলা হয় এবং এটা জায়েয রয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ، مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
“যেসব শর্ত পূরণ করা সবচেয়ে বেশি কর্তব্য, তা হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে তোমরা নারীদের বৈধভাবে গ্রহণ করেছ (অর্থাৎ নিকাহর শর্ত)।”
— সহীহ বুখারী: 2721, 5151; সহীহ মুসলিম: 1418।
তাই এরূপ শর্ত পূরণ করা বৈধ।
আব্দুর রহমান:- শর্ত দুই প্রকার। বৈধ শর্ত ও অবৈধ শর্ত। এখানে বৈধ শর্তের কথা বলা হয়েছে কারণ, ইমাম বুখারী এই হাদীস بَاب الشُّرُوطِ فِي النِّكَاحِ অধ্যায়ে নিয়ে এসেছেন এবং এর পরবর্তী হাদীসই নিয়ে এসেছেন بَاب الشُّرُوطِ الَّتِي لاَ تَحِلُّ فِي النِّكَاحِ অর্থাৎ সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা অধিক কর্তব্য কিন্তু তা অবৈধ শর্ত হতে পারবে না কারণ, অবৈধ শর্তের ইসলামে কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই। ইমাম বুখারী পরপর তাই এই দুই বাবে দুই হাদীস নিয়ে এসেছেন যেন মানুষ এটা না বুঝে যে, স্ত্রীর সব শর্তই মানতে হবে। স্ত্রীর অবৈধ শর্ত বিন্দু পরিমাণ গ্রহণযোগ্য নয় কারণ , অবৈধ শর্ত একদম মারদুদ। অবৈধ শর্ত পূরণ করার ক্ষেত্রে শরিয়তে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অবৈধ শর্ত পালন করে আল্লাহর নাফরমানি করে সৃষ্টির কোন অনুগত ইসলামে নেই। সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে,
‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরাহ্ (রাযি.) আমার কাছে এসে বলল, আমি আমার মালিক পক্ষের সাথে নয় উকিয়া দেয়ার শর্তে মুকাতাবা[1] করেছি- প্রতি বছর যা হতে এক উকিয়া করে দেয়া হবে। আপনি (এ ব্যাপারে) আমাকে সাহায্য করুন। আমি বললাম, যদি তোমার মালিক পক্ষ পছন্দ করে যে, আমি তাদের একবারেই তা পরিশোধ করব এবং তোমার ওয়ালা-এর অধিকার আমার হবে, তবে আমি তা করব। তখন বারীরাহ্ (রাযি.) তার মালিকদের নিকট গেল এবং তাদের তা বলল। তারা তা অস্বীকার করল। বারীরাহ্ (রাযি.) তাদের নিকট হতে (আমার কাছে) এল। আর তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সে বলল, আমি (আপনার) সে কথা তাদের কাছে পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য ওয়ালার অধিকার সংরক্ষণ ছাড়া রাযী হয়নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনলেন, ‘আয়িশাহ (রাযি.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তা সবিস্তারে জানালেন। তিনি বললেন, তুমি তাকে নিয়ে নাও এবং তাদের জন্য ওয়ালার শর্ত মেনে নাও। কেননা, ওয়ালা এর হক তারই, যে আযাদ করে। ‘আয়িশাহ (রাযি.) তাই করলেন। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হাম্দ ও সানা বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, লোকদের কী হলো যে, তারা এমন শর্তারোপ করে যা আল্লাহর বিধানে নেই। আল্লাহর বিধানে যে শর্তের উল্লেখ নেই, তা বাতিল বলে গণ্য হবে, শত শর্ত হলেও। আল্লাহর ফায়সালাই সঠিক, আল্লাহর শর্তই সুদৃঢ়। ওয়ালার হাক্ব তো তারই, যে মুক্ত করে। (৪৫৬) (সহীহ বুখারী তাওহীদ পাব: ২১৬৮,আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৩৪)
সুতরাং শর্ত তো অবশ্যই পালন করতে হবে তবে তা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে অবৈধ শর্ত হতে পারবে না। সুতরাং স্ত্রীর শর্ত যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে এই সাধারণ শর্তের হাদীস নিয়ে এসে কিয়াস করা নিষিদ্ধ যা ইমাম বুখারী পরপর হাদীস এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাস ভাবে বলেছেন যে, আল্লাহর কিতাবের বিরোধী কোন শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাই স্ত্রীর শর্ত যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে এই হাদীস পেশ করার কোন মূল্য নেই।
আব্দুল্লাহ:- স্বামী যদি নিকাহর সময় স্বেচ্ছায় এই শর্ত মেনে নেন, তাহলে তিনি আল্লাহর হালালকে হারাম করেননি; বরং নিজের একটি জায়েজ অধিকার চুক্তির মাধ্যমে ত্যাগ করেছেন।
যেমন কেউ যদি মানত করে, আল্লাহর কসম, আমি চার মাস আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করব না।”
রাসূল ﷺ তো এক মাস তার স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার শপথ করেছেন।
কোনো জায়েজ অধিকার স্বেচ্ছায় নিজের ওপর সীমাবদ্ধ করা সবসময় হালালকে হারাম ঘোষণা করা নয়।
আব্দুর রহমান:- ভাই, ঈলা করা হয় কিসের জন্য? প্রয়োজনের খাতিরে স্ত্রীর সংশোধন বা শাসনের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার কসম করা জায়েজ। কিন্তু চার মাসের বেশি বা স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঈলা করা হারাম ও জুলুম। ঈলা হলো কোন কারণের জন্য শাস্তি স্বরূপ। কিন্তু শর্ত দিয়ে এখানে কোন অন্যায়ের জন্য স্বামীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে যে, অন্য বিবাহ করতে পারবে না? বিনা দোষে কি স্ত্রীর সাথে ঈলা করা বৈধ?
ঈলা হলো স্ত্রীর অন্যায়মূলক কার্জের শাস্তি। শাসকও কারো অন্যায় মূলক কার্জের শাস্তির জন্য মানুষের জন্য কোন বৈধ বিষয়কে সাময়িক অবৈধ করতে পারে। এখানে অন্যায়ের শাসনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না বরং শর্ত নিয়ে। ঈলার সাথে বিবাহের শর্ত গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ঈলা আর শর্ত অঙ্গীকার এক নয়। স্বামী তো এখনো অন্যায় করেনি তাহলে তাকে শাস্তি কিসের?
আরও একটি কথা বলে রাখি যে, কসম ও শর্ত এক নয়। ইসলামী শরিয়তে আল্লাহর নামে কসম (হলফ) করা এবং সাধারণ শর্ত বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা এবং এদের শরয়ী হুকুমও ভিন্ন।
আল্লাহর নামে কসম (অসম/হলফ): যখন কেউ সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর নাম বা সিফাত (গুণাবলী) উল্লেখ করে কোনো কথা বলে (যেমন: "আল্লাহর কসম," "আল্লাহর নামে কসম করে বলছি"), তখন তা শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি আনুষ্ঠানিক হলফ বা কসম হিসেবে গণ্য হয়।
শর্ত/অঙ্গীকার করা: কসমের শব্দ উচ্চারণ না করে কাউকে কেবল কথা দেওয়া, শর্ত করা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়াকে বলা হয় ওয়াদা (وَعْد) বা আহদ (عَهْد)।
যা মূল স্বত্বাগত ভাবে বৈধ; তার উপর শর্ত আরোপ করাও বৈধ যদি শরীয়ত বিরোধী শর্ত না হয়। যদি শরীয়ত বিরোধী শর্ত হয় তাহলে তা কার্যকর হবে না এবং সে শর্ত মেনে নিয়ে পূরণ না করলেও গুনাহ নেই যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা শর্ত করার পরেও পালন করে নি। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা হারাম বিষয়ের অঙ্গীকার করেছেন কারণ, এখানে মূল সত্যাগত বিষয় হলো "গোলামের সম্পদ" যা বৈধ বিষয়। অনুরূপ ভাবে মধু খাওয়া বা দ্বিতীয় বিবাহ করা মূল সত্ত্বাগত বিষয় হলো " মধু ও দ্বিতীয় বিবাহ" যা একটি ঐচ্ছিক কাজ যা কেউ কিয়ামত পর্যন্ত না করলেও সমস্যা নেই; তাই এর উপর শর্তারোপ করা যাবে। কিন্তু শর্ত যদি কোন হারাম বিষয়ের হয় তাহলে তা কার্যকর হবে না এবং সে শর্ত মেনে নিয়ে পূরণ না করলেও গুনাহ নেই।
আর যা মূল স্বত্বাগত ভাবেই হারাম তার কল্পনা করাই হারাম আর তার উপর শর্ত আরোপ করা তো আরও দূরের বিষয় যেমন:- মদ, জুয়া, জেনা-ব্যভিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো মূল সত্বাগত ভাবে হারাম এবং এগুলোর শর্ত করাও গুনাহ, শর্ত মেনে নেওয়াও গুনাহ, শর্ত পূরণ করাও গুনাহ কারণ এর মূল সত্বায় অবৈধ ও হারাম।
তবে মূল সত্বাগত বৈধ ও অবৈধ যাই হোক ; যদি আল্লাহর নামে কসম করে ভঙ্গ করা হয় তাহলে তা গুনাহের কাজ। এখানে শর্ত ভঙ্গের গুনাহ নয় বরং কসম ভঙ্গের গুনাহ হবে। সত্বাগত বৈধ বিষয়ের শর্ত ভাঙায় কোন গুনাহ হয় না তবে কসম করলে গুনাহ ও কাফফারা দিতে হবে।
আব্দুল্লাহ:- আপনি দুটো বিষয় এক করে ফেলছেন। ৪ টি বিবাহ করা মূলত ঐচ্ছিক কাজ যা করা বাধ্যতামূলক নয়। তাই স্বামী যদি তার তার হক্ক ছেড়ে একের অধিক বিবাহকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেয় তাহলে সমস্যা নেই কারণ, এটি মুবাহ হক্ক স্বামীর; এবং স্বামী তা নিজেই ছেড়ে দিয়েছে।
আব্দুর রহমান:- মুবাহ কাজ কে কি নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ? একজন মানুষ কি আল্লাহর মুবাহকৃত ঐচ্ছিক কাজকে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নিতে পারে? মধু খাওয়া তো ঐচ্ছিক কাজ তাহলে, স্ত্রী যদি এমন শর্ত দেয় যে, আমি তোমার স্ত্রী থাকা অবস্থায় তোমার জন্য মধু খাওয়া নিষিদ্ধ; তাহলে কি এই শর্ত বৈধ হবে?
উত্তর হলো, মুবাহ কাজ কে সাধারণ ভাবে কেউ নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখেনা । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা বৈধ করেছেন তা নিষিদ্ধ করার কেউ নেই। তবে কেউ যদি কোন দোষক্রটি করে তাহলে তাকে শাস্তি স্বরূপ মুবাহ কাজ থেকে বিরত রাখা বৈধ কারণ, এটি দোষের শাস্তি ; যেমন স্ত্রীর সাথে ঈলা করার বিষয়টি পূর্বেই বলেছি।
সূরা তাহরিম এর আয়াত নাজিল হওয়ার পূর্বে ঐচ্ছিক মুবাহ কাজকে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ ছিল কারণ তা পূর্ববর্তী শরীয়ত থেকে চলে আসছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের উপর মধু/ দাসীকে নিষিদ্ধ করে নেওয়া স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তখনও মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়ে এরূপ আমল করা রহিত হয়নি কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন অবৈধ কাজ করতেই পারেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর কাজ প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী শরীয়ত থেকে ঐচ্ছিক বিষয় কে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেওয়া যে বৈধ ছিল; তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ও বৈধ ছিল তাই তিনি করেছিলেন।
হযরত ইয়াকুব (আঃ) বা অন্যান্য নবীদের আমলে মানত করার বিধান ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি ইবাদতের মাধ্যম। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে যেকোনো বৈধ বিষয়ে, এমনকি নিজের পছন্দের খাবার বা বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ওপর হারাম বা বর্জন করার মানত করাও জায়েজ ছিল (যেমনটি হযরত ইয়াকুব আঃ করেছিলেন)। তবে আমাদের শরীয়তে মানতের পরিধি নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিজের জন্য হালাল বিষয় কে হারাম করে নিয়েছিলেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:-
"তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ইসরাঈল (ইয়াকুব) নিজের জন্য যা হারাম করেছিলেন তা ব্যতীত সমস্ত খাদ্যই বনী ইসরাঈলের জন্য হালাল ছিল..."
— (সূরা আল-ইমরান: ৯৩)
ইয়াকুব (আঃ)-এর পর থেকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন পর্যন্ত বনী ইসরাঈলের জন্য উটের গোশত ও দুধ (এবং ইয়াকুব আঃ-এর বর্জন করা অন্যান্য নির্দিষ্ট খাবার) নিষিদ্ধ হিসেবেই বহাল রাখা হয়েছিল। ইয়াকুব (আঃ) নিজের ওপর যা হারাম করেছিলেন, তা মূলতঃ আল্লাহর সরাসরি অবতীর্ণ শরীয়তের কোনো নিষেধ ছিল না। কিন্তু তিনি বনী ইসরাঈলের জাতির পিতা হওয়ায় তাঁর সন্তানরা তা শ্রদ্ধাভরে মেনে চলতে শুরু করে। পরবর্তীতে হযরত মুসা (আঃ)-এর ওপর যখন তাওরাত নাজিল হয়, তখন বনী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, সীমা লঙ্ঘন এবং তাদের নিজস্ব অভ্যাসের কারণে আল্লাহ তাআলা শাস্তিস্বরূপ ও পরীক্ষা হিসেবে বেশ কিছু জিনিস (যার মধ্যে ইয়াকুব আঃ-এর বর্জন করা বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল) তাদের জন্য শরীয়তগতভাবেই হারাম ঘোষণা করে দেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"ইউহুদিদের জুলুম- অত্যাচার এবং বহু লোককে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেওয়ার কারণে আমি তাদের জন্য বহু উৎকৃষ্ট জিনিস হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল ছিল।"
— (সূরা আন-নিসা: ১৬০)
অতএব, হযরত মুসা (আঃ) থেকে শুরু করে পরবর্তী তাওরাত অনুসারী নবীদের (যেমন: হযরত দাউদ, সুলাইমান, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া আঃ) যুগেও এই নিষেধাজ্ঞা আসমানী শরীয়ত হিসেবেই বহাল ছিল। তারপর ঈসা (আঃ) এসে তাওরাতের এই কঠোর ও শাস্তিমূলক বিধানগুলোর কিছু অংশ শিথিল ও হালাল করেন। তিনি বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাদের জন্য আগের কঠিন শরীয়তের কিছু জিনিস হালাল করতে এসেছেন। কুরআনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বক্তব্য এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:-
"আর আমি এসেছি আমার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারীরূপে এবং তোমাদের জন্য পূর্বে যেসব জিনিস হারাম ছিল, তার মধ্য থেকে কতকগুলোকে হালাল করে দেওয়ার জন্য..."
— (সূরা আল-ইমরান: ৫০)
ঈসা (আঃ) যেসব হারামকৃত জিনিস বনী ইসরাঈলের জন্য পুনরায় হালাল ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে উটের গোশত ও এর চর্বি/দুধ অন্যতম ছিল।
তখনও মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়কে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ ছিল যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর মধু/দাসী নিষিদ্ধ করে নিয়েছিলেন। এটি কোন গুনাহ ছিল না; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন অবৈধ কাজ করতেই পারে না বরং এটি ছিল পূর্ববর্তী শরিয়ত থেকে চলে আসা একটি মুবাহ বিষয় যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বৈধ বিষয় করার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা তাহরিমের আয়াত নাজিল করে মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়কেউ নিজের উপর নিষিদ্ধ করা হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:-
" হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
— (সূরা আত-তাহরীম: ১)
সুতরাং ঐচ্ছিক বা মুবাহ বিষয়কেও নিষিদ্ধ করা বৈধ নয় বরং আল্লাহর কুরআনের খেলাপ। তাই একের অধিক বিবাহ করা যদিও মুবাহ বা ঐচ্ছিক; কিন্তু এই জায়েজ বিষয় কে কেউ নিষিদ্ধ করে দেওয়ার বা নেওয়ার অধিকার রাখে না। একারনেই স্ত্রীর স্বামীর একাধিক বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল ও হারাম।
আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়। অনেকেই আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এর আবু জাহেলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাবের বিষয় নিয়ে দলিল দেন যা স্পষ্ট বাতিল। পূর্বে আমরা বর্ণনাটি দেখে নেই :-
" আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) ...... আলী ইবনু হুসায়ন (রহঃ) হতে রিওয়ায়াত করেন যে, হুসায়ন ইবনু আলী (রাযিঃ) এর শাহাদতের পর ইয়াযীদ ইবনু মু'আবিয়াহ (রাযিঃ) এর নিকট হতে তারা যখন মাদীনায় এলেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে বললেন, আপনার কোন প্রয়োজন থাকলে আমাকে বলবেন। আমি বললাম, না। মিসওয়ার বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তলোয়ারটি কি আপনি আমাকে দান করবেন? কেননা আমার ভয় হয় যে, লোকেরা এটি আপনার নিকট হতে আয়ত্ত করে নিবে। আল্লাহর শপথ আপনি যদি সে তলোয়ারটি আমাকে দিয়ে দেন তাহলে যতক্ষণ আমার জীবন থাকে এটি কেউ ছুইতে পারবে না। (মিসওয়ার আরো বলেন)
ফাতিমার জীবিতাবস্থায় আলী (রাযিঃ) আবূ জাহলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ ব্যাপার নিয়ে মানুষদের সম্মুখে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে শুনেছি। আমি তখন সদ্য বালিগ বয়সের। তখন তিনি বললেন, ফাতিমাহ আমারই অংশ। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার দীনের সম্পর্কে ফিতনায় না পতিত হয়। তারপর তিনি আবদ-ই-শামস গোষ্ঠীয় তার জামাতার আলোচনা করলেন, তার আত্মীয়তার প্রশংসা করলেন এবং বললেন, সে আমায় যা বলেছে সত্য বলেছে, সে আমার সাথে ওয়াদা করেছে, আর তা পালন করেছে। আর আমি কোন হালালকে হারাম করি না, বা হারামকে হালাল করি না, তবে আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শক্রর কন্যা কক্ষনো এক স্থানে একত্র হতে পারে না। ( সহীহ মুসলিম হাদীস একাডেমী ৬২০৩,ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০৮৮, ইসলামিক সেন্টার ৬১২৮)
অনেকেই এই হাদীস দিয়ে দলিল দিয়ে থাকে কিন্তু তা গ্রহণ যোগ্য নয় কারণ, এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবারের জন্য একটি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা (خصائص)। এটি আমাদের জন্য নয়। আমরা যদি কোনো মেয়েকে বিয়ে করি, এরপর তার পিতার শত্রুর মেয়েকেও বিয়ে করতে চাই (যদি অন্য কোনো শরঈ নিষেধাজ্ঞা না থাকে, যেমন—দুই সগিরা বোনকে একত্রে বিয়ে না করা ইত্যাদি), তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে একদম হালাল ও বৈধ। এছাড়াও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিয়েছেন যে, "আমি কোন হালালকে হারাম করি না, বা হারামকে হালাল করি না, তবে আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শক্রর কন্যা কক্ষনো এক স্থানে একত্র হতে পারে না।" যা এই বিধান যে খাস তা স্পষ্ট করে দেয়।
হযরত আলী (রা.)-এর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল নবুওয়াতের বিশেষ মর্যাদা স্বরূপ যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিশেষ ভাবে দেওয়া হয়েছে। ফাতেমা (রা.) ছিলেন সাইয়্যেদাতু নিসাই আহলিল জান্নাহ (জান্নাতী নারীদের সর্দার) এবং রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। এই বিয়েতে ফাতেমা (রা.) মানসিকভাবে প্রচণ্ড কষ্ট পেতেন, যা প্রকারান্তরে রাসূল (সা.)-কে কষ্ট দিত। আর নবীকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকা উম্মতের ওপর ওয়াজিব। ইমাম আবু দাউদ এটি بَابُ مَا يُكْرَهُ أَنْ يُجْمَعَ بَيْنَهُنَّ مِنَ النِّسَاءِ নিয়ে এসেছেন যে,
"আল-মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মসজিদের মিম্বারের উপর বলতে শুনেছিঃ হিশাম ইবনুল মুগীরাহর বংশের লোকেরা তাদের বংশের এক কন্যাকে আলী ইবনু আবূ তালিবের বিয়ে দিতে অনুমতি চাইছে। কিন্তু আমি অনুমতি দিবো না, তারপরও আমি অনুমতি দিবো না, অনুমতি দিবো না। অবশ্য আবূ তালিবের পুত্র আমার কন্যাকে তালাক দিলে সে তাদের কন্যা বিয়ে করতে পারবে। কারণ আমার কন্যা আমার দেহেরই একটি অংশ। যেটা তার অপছন্দ, সেটা আমার অপছন্দ এবং তাকে যা দুঃখ দেয়, তা আমাকেও দুঃখ দেয়।"
অর্থাৎ ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা কে দুঃখ দেওয়া অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দুঃখ দেওয়া। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দুঃখ দেওয়া হারাম; বরং নিজের জানের থেকেও বেশি ভালো বাসতে হবে তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া যাবে না। আম ভাবে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয় তা হারাম। এছাড়াও কিছু বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে; যার কিছু বোঝার সুবিধার্থে উল্লেখ করা হলো।
[১] যেমন ভাবে রাসূলের কন্যার বিবাহ রাসূল কে কষ্ট দিবে দেখে সতীন নিয়ে আসা বৈধ নয় তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের বিবাহ করা বৈধ নয় কারণ তাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনের মধ্যে বলেছেন:-
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا ۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا
অনুবাদ: "আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া তোমাদের জন্য সঙ্গত নয় এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণকে বিবাহ করাও তোমাদের জন্য কখনো বৈধ নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট এটি এক ঘোরতর অপরাধ।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩)
[২] সাধারণভাবে মানুষ পরস্পরের সাথে উঁচু স্বরে কথা বলতে পারে, যা গুনাহ নয়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানে আল্লাহ তাআলা উম্মতকে নির্দেশ দিলেন তাঁর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখতে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
অনুবাদ: "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; এতে তোমাদের অজান্তেই তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হয়ে যাবে।"
(সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ২)
[৩] আমরা একে অপরকে নাম ধরে ডাকি, যা একেবারেই সাধারণ বিষয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাধারণ মানুষের মতো "ইয়া মুহাম্মদ" (হে মুহাম্মদ) বলে নাম ধরে ডাকা উম্মতের জন্য হারাম করা হয়েছিল।
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا
অনুবাদ: "তোমরা রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মতো গণ্য করো না।"
(সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩)
[৪] কারো ঘরে যাওয়ার সময় আমরা হয়তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি বা স্বাভাবিকভাবে কথা বলি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহের নিজস্ব কিছু পবিত্রতা ও নিয়ম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁর কোনো কষ্ট বা ব্যাঘাত না ঘটে।
فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ
অনুবাদ: "অতঃপর খাওয়া শেষ হলে তোমরা চলে যাও, সেখানে আলাপে মশগুল হয়ে পোড়ো না। নিশ্চয়ই এটি নবীকে কষ্ট দেয়..."
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩)
উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ও তার পরিবারের জন্য কিছু খাস বিষয় ছিলো ; যা দিয়ে আম ভাবে দলিল নেওয়া বৈধ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া , "নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের" চাইতেও বড় গুনাহ। সুতরাং যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয় তা হারাম। ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিবাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ ছিল তাই তা খাস ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এমন খাস হাদীস দিয়ে দলিল গ্রহণ সঠিক নয়। এছাড়াও সহীহ মুসলিমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিস্কার করে বলেছেন যে, "আমি কোন হালালকে হারাম করি না" যা আরও মজবুত করে যে এটা খাস বিষয় ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সম্মানে।
আব্দুল্লাহ:- ভাই, আপনি ভুল বুঝছেন; একাধিক বিবাহকে কেউ হারাম করে না বরং ঐচ্ছিক বিষয় কে সীমাবদ্ধ করে নেয়।
আব্দুর রহমান:- প্রিয় ভাইজান, এটা শুধু শব্দের অদল বদল। আচ্ছা, আমাকে বলুন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি হালাল মধু/দাসী কে হারাম ভাবতেন? নাকি হালালই ভাবতেন কিন্তু নিজের উপর সীমাবদ্ধ করে নিয়েছিলেন?
স্পষ্ট উত্তর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কোন হালাল কে হারাম ভাবতেন না বরং হালাল জানতেন; কিন্তু নিজের উপর সীমাবদ্ধ করে নিয়েছিলেন।
আপনি বলুন যে, স্ত্রী যদি শর্ত দেয় যে, আমি আকদে থাকার ১০ বছর বা ২০ বছর বা ৫০ বছর তোমার জন্য মধু খাওয়া নিষিদ্ধ; তাহলে এটা কি বৈধ? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা তার কিতাবে বৈধ করছেন তা আপনি কোন শক্তিতে ১০ বছর বা ২০ বছর বা ৫০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করতে পারেন?
সুতরাং, প্রমাণিত হলো এটা শুধু শব্দের খেলা। কোন কিছু নিষিদ্ধের বিপরীত হলো --> কোন কিছু নিষিদ্ধ নয়। অথচ এখানে স্ত্রী অনির্দিষ্ট নিষিদ্ধ আরোপিত করছে। বিষয়টি কোন বস্তুকে হালাল-হারাম ভাবা নিয়ে নয়; বরং হালাল বস্তুকে কি নিষিদ্ধ করা যায়? তা নিয়ে। আপনি এটাকে যেই নামে ডাকুন না কেন, তা শুধু শব্দের অদল বদল। আল্লাহ এটাকে সূরা তাহরিমে চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
এছাড়া আরও একটি আছার নিয়ে মানুষ সংশয়ে ভোগে যে, এক ব্যক্তি উমর রাদিআল্লাহু আনহুর নিকটে এসে বললো:-
" 'হে আমিরুল মুমিনীন! আমি এই মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং তার জন্য শর্ত দিয়েছিলাম যে সে তার নিজ বাড়িতেই থাকবে (তাকে স্থানান্তর করব না)। কিন্তু এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে অমুক স্থানে স্থানান্তরিত হব।' উমর (রা.) বললেন, 'তার শর্ত বহাল থাকবে।' লোকটি বলল, 'তাহলে তো পুরুষরা ধ্বংস হয়ে গেল! কারণ কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তালাক দিতে (বা বিচ্ছেদ ঘটাতে) চায়, তবে সে তালাক দিয়েই ছাড়বে।' তখন উমর (রা.) বললেন, 'মুমিনগণ তাদের অধিকারের সীমানায় নিজ নিজ শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।'"
এই আছারের মধ্যে কোন দলিল নেই কারণ, উমর (রা.) যে ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের ফয়সালা দিয়েছিলেন (যেমন: স্ত্রীকে তার নিজের শহর বা বাড়ি থেকে না সরানো), সেখানে আল্লাহর দেওয়া কোনো স্বতন্ত্র অধিকার খর্ব হয় না। বাসস্থান নির্ধারণ করা শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাই এটি একটি বিশুদ্ধ ও বৈধ (জায়েজ) শর্ত। কিন্তু বহুবিবাহ শরিয়ত কর্তৃক সরাসরি প্রদত্ত একটি অধিকার, তাই এটিকে শর্ত দিয়ে পুরোপুরি রহিত করা আর উমর (রা.)-এর ফয়সালা এক নয়। তাই যারা এটাকে পেশ করে তারা ভুল করে ।
উপরের বিস্তারিত আলোনায় আশাকরি দিবালোকের ন্যায় বুঝতে পেরেছেন যে, বিবাহের সময় স্ত্রীর বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল কারণ,
[১] শরীয়তের সুস্পষ্ট বিষয় কে কোন শর্ত সাধারণ ভাবে বাতিল করতে পারে না বরং এরূপ শর্তের বিন্দু পরিমাণ দাম নেই। শাসক কর্তৃক শাস্তি দেওয়া বা দোষের কারণে ঈলা করা শরীয়তেরই বিষয়। স্বামীর উপর শর্ত আরোপ আর অন্যায় দোষের শাস্তি এক নয়।
[২] কোন সুস্পষ্ট দলিল নেই যা একাধিক বিবাবের গ্রহনযোগ্যতাকে শর্ত দিয়ে বাতিল করা যায় বরং শর্ত অবৈধ হয়ে নিজেই বাতিল । শর্তের আম হাদীসের উপর কিয়াস করাও বাতিল কারণ তা শুধুমাত্র বৈধ শর্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে যে একাধিক বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল শর্ত। আল্লাহ একাধিক বিবাহ কে বৈধ করেছেন যা কোন অবৈধ শর্ত বাতিল করতে পারে না।
[৩] মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়েও শর্ত দিয়ে নিষিদ্ধ করা বা করে নেওয়া হারাম; যা আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানিয়ে দিয়েছেন। একজন স্ত্রীর জন্য এটি বৈধ নয় যে, আমি বেঁচে থাকতে মধু খাওয়া যাবে না বরং মধু খাওয়া নিষিদ্ধ তোমার উপর; বা স্ত্রীর শর্ত দেওয়া যে, একাধিক বিবাহ করা তোমার জন্য নিষিদ্ধ; যা বাতিল এবং এর কোন মূল্যই নেই।
[৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া হারাম। তাই যা তার মর্যাদার খেলাফ ও তাকে কষ্ট দেয় তা করা নিষিদ্ধ। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের খাস বিশেষত্ব।
উপরের আলোচনা স্পষ্ট হওয়ার পর এখন আমরা হারাম শর্তের প্রভাব আলোচনা করবো। তাহলো:-
[ক] যদি কেউ শরয়ী বিধান বিরোধী কোন শর্ত দেয় এবং অন্যকেউ তা গ্রহণ করে কিন্তু কসম করে না। অর্থাৎ কেউ হারাম শর্ত দিল এবং অন্য কেউ তার অঙ্গীকার করলো শুধু; তাহলে এই শর্ত ভঙ্গের জন্য কোন কিছুই হবে না এবং গোনাহও হবে না যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা করেছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শে।
[খ] কিন্তু যদি হারাম শর্ত গ্রহনের অঙ্গীকার এর সাথে কসম করে; তাহলেও শর্ত মারদূদ এবং এর জন্য কিছুই হয় না। তবে কসমের মর্যাদার জন্য তাকে ইসতিগফার করতে হবে এবং কাফফারা দিতে হবে। সোজা কথায় হারাম শর্তের কোন গুরুত্বই নেই; কিন্তু কসমের মর্যাদা রয়েছে।
[গ] কেউ যদি নিজের উপর কোনো বৈধ বিষয় নিষিদ্ধ করে নেয় তাহলে তাকেও ইসতিগফার করতে হবে এবং কাফফারা দিতে হবে কারণ, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধু/দাসীকে নিজের জন্য নিষিদ্ধের পূর্বে বৈধ ছিল। তারপর সূরা আত তাহরীমের মাধ্যমে তা চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়।
কারো শর্ত ছাড়া নিজের উপর নিজেই হারাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা গুনাহ ও কাফফারা যুক্ত; যেমন সূরা আত তাহরীমে রয়েছে। অন্য কেউ কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী কোন শর্ত দিলে তা ভঙ্গ করলেও কিছু হয় না; যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা করেছিলেন। তবে যে অবস্থায় কসম করা হোক; ইসতিগফার করবে ও কাফফারা দিতে হবে কসমের জন্য।
অবৈধ শর্ত সর্বদাই পরিত্যক্ত। তাই শরীয়তের সুস্পষ্ট মুবাহ বা জায়েয কার্জকেও শর্ত দিয়ে সাধারণ ভাবে বদলানো যায় না বরং শর্তটিই মারদুদ হয়ে যায়। একাধিক বিবাহকে নিষিদ্ধের শর্ত তাই বাতিল এবং এই বিষয়ে কিয়াসও অনেক অনেক অনেক দূর্বল বা মারদূদ। তবে স্ত্রী চাইলে তালাকে তাফবিজ নিতে পারে কারণ, তালাকে তাফবিজ জায়েয ও শরীয়ত সিদ্ধ বিষয়। স্ত্রী স্বামীকে বলতে পারে যে, তোমার একাধিক বিবাহ আটকে দেওয়ার অধিকার আমার নেই এবং আমার জন্য তা বৈধ নয়; তুমি যদি একাধিক বিবাহ করো করতে পারো কারণ আল্লাহ তোমাকে অধিকার দিয়েছেন। তবে তুমি যদি একাধিক বিবাহ করো তাহলে আমি তালাকে তাফবিজ নিয়ে নিব। তালাকে তাফবিজ একটি গ্রহণযোগ্য শর্ত। আর পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, শর্ত যদি কুরআন সুন্নাহর বিরোধী না হয় তাহলে তা মান্য করতে হবে; আর শর্ত যদি কুরআন সুন্নাহর বিরোধী হয় তাহলে সেই শর্তই গৃহীত হয়না বরং মারদুদ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে হেদায়েত দিন এবং সকল আলেমদের মতোবিরোধ কে পাশে রেখে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের তৌফিক দিন, আমীন। পূর্ববর্তী যারা ইজতিহাদ করে একটি হারাম বিষয় কে হালাল বলে গিয়েছেন; সেই সকল সম্মানিত ব্যাক্তিদের কে সততা ও ইজতিহাদের জন্য নেকি দান করুন, আমীন। এখনোও যাদের অন্তরে ইখলাস রয়েছে এবং নিজেদের বুঝের সীমাবদ্ধতার জন্য একটি সুস্পষ্ট হারাম বিষয় কে হালাল ভাবে; তাদেরকেউ আপনি হেদায়েত দিন এবং প্রতিদান দান করুন, আমীন। সকলের উপর তোমার রহমত এক নয়; তাই যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যেই মতামত অনুসরণ করে; তুমি তার প্রচেষ্টা অনুযায়ী তার সততাকে পুরস্কৃত কর, আমীন। হে রাব্বুল আলামীন, আমাদের সবাইকে হারম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন এবং আপনার সন্তুষ্টিমূলক কার্জে জন্য জীবন কে উৎসর্গ করে নিন, আমিন।
অতিরিক্ত সংযোজন:- অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, হারাম শর্ত তো বাতিল; কিন্তু বিবাহের কি হবে?
উত্তর হলো:- বিবাহ হয়ে যাবে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু অবৈধ শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। দুইটি ভিন্ন বিষয়। দলিল হিসেবে বারিরাহ রাদিআল্লাহু আনহার সহীহ মারফু হাদীস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি বাতিল করেন নি বরং শর্তকে বাতিল করেছেন কারণ তা সরাসরি আল্লাহর বিধানের বিপরীত।
চুক্তি সঠিক হওয়ার ফরজিয়াত পূরন হলে তা সঠিক হয়ে যায়। যদি কোন এক্সটা শর্ত দেয় এবং তা যদি ওহীর সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে পালন করতে হবে। আর যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তা বাতিল হয়ে যাবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহার চুক্তি বাতিল করেন নি কারণ, চুক্তির লেনদেন একদম সঠিক ছিল; কিন্তু এক্সট্রা শর্ত ছিল সরাসরি আল্লাহর বিধানের বিপরীত তাই শুধু শর্ত বাতিল হয়।
অনুরূপ ভাবে, একটি বিবাহ সঠিক হওয়ার জন্য ওলী ও স্বাক্ষীর উপস্থিতীতে ইযাব কবুল হতে হয়। যদি ওলী ও স্বাক্ষীর উপস্থিতীতে ইযাব কবুল হয়ে যায় তাহলেই বিবাহ সঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এর উপর যদি কেউ এরূপ শর্ত আরোপ করে যা স্পষ্ট শরীয়ত বিরোধী যে, স্ত্রী বললো তুমি মধু খাবে না যতদিন আমি জীবিত আছি; তাহলে এমন শর্ত পূরণ করা হবে না এবং স্বামী যদি মধু খায় তবুও কোন গুনাহ হবে না কারণ, সুস্পষ্ট হালাল বিষয় কে কেউ সাধারণ ভাবে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করতে পারে না। তেমনি স্ত্রী যদি শর্ত করে যে, আমি থাকা পর্যন্ত অন্য বিবাহ করা নিষিদ্ধ তোমার জন্য; তাবে তা বাতিল কারণ, স্ত্রী থাকা অবস্থায় বিবাহ করা হালাল আল্লাহ সরাসরি করেছেন, কোন শর্ত এটাকে সাধারণ ভাবে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করতে পারে না।
মূলকথা হলো, চুক্তি সঠিক হয়ে যাবে কিন্তু শর্ত বাতিল হয়ে যাবে যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ মারফু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
আব্দুর রহমান:- এটি আল্লাহর বৈধ বিষয়কে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করার বাতিল শর্ত। তাই এই শর্ত পূরণ করা হবে না। এর উপর ইজমা নেই। এরূপ শর্তের কোন গুরুত্ব নেই যা একটি জায়েয কাজকে নিষিদ্ধ করে খাস দলিল ছাড়া। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা ওয়ালার শর্ত করার পরেও পালন করেন নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ শত শত শর্ত হলেও বাতিল বলেছেন যা আল্লাহর কিতাব বিরোধী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর মধু হারাম করে নিয়েছিলেন তাই আল্লাহ তাকে সতর্ক করেছিলেন।
একাধিক বিবাহ জায়েয যা আল্লাহ ফয়সালা দিয়েছেন। আল্লাহর যায়েজ ফয়ছালা নিজের বা কারোও উপর সাধারণ ভাবে হারাম করে নেওয়া ও দেওয়া বৈধ নয়।
তবে স্ত্রী যদি বলে যে, একাধিক বিবাহ করলে আমি তালাক নিব, তাহলে তালাক নিতে পারে কারণ এটা কোন হারাম শর্ত নয় বরং হালাল শর্ত। এটাকে তালাকে তাফবিজ বলা হয় এবং এটা জায়েয রয়েছে।
আব্দুল্লাহ:- হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ، مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
“যেসব শর্ত পূরণ করা সবচেয়ে বেশি কর্তব্য, তা হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে তোমরা নারীদের বৈধভাবে গ্রহণ করেছ (অর্থাৎ নিকাহর শর্ত)।”
— সহীহ বুখারী: 2721, 5151; সহীহ মুসলিম: 1418।
তাই এরূপ শর্ত পূরণ করা বৈধ।
আব্দুর রহমান:- শর্ত দুই প্রকার। বৈধ শর্ত ও অবৈধ শর্ত। এখানে বৈধ শর্তের কথা বলা হয়েছে কারণ, ইমাম বুখারী এই হাদীস بَاب الشُّرُوطِ فِي النِّكَاحِ অধ্যায়ে নিয়ে এসেছেন এবং এর পরবর্তী হাদীসই নিয়ে এসেছেন بَاب الشُّرُوطِ الَّتِي لاَ تَحِلُّ فِي النِّكَاحِ অর্থাৎ সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা অধিক কর্তব্য কিন্তু তা অবৈধ শর্ত হতে পারবে না কারণ, অবৈধ শর্তের ইসলামে কোন গ্রহনযোগ্যতা নেই। ইমাম বুখারী পরপর তাই এই দুই বাবে দুই হাদীস নিয়ে এসেছেন যেন মানুষ এটা না বুঝে যে, স্ত্রীর সব শর্তই মানতে হবে। স্ত্রীর অবৈধ শর্ত বিন্দু পরিমাণ গ্রহণযোগ্য নয় কারণ , অবৈধ শর্ত একদম মারদুদ। অবৈধ শর্ত পূরণ করার ক্ষেত্রে শরিয়তে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অবৈধ শর্ত পালন করে আল্লাহর নাফরমানি করে সৃষ্টির কোন অনুগত ইসলামে নেই। সহীহ মারফু হাদীসে এসেছে,
‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারীরাহ্ (রাযি.) আমার কাছে এসে বলল, আমি আমার মালিক পক্ষের সাথে নয় উকিয়া দেয়ার শর্তে মুকাতাবা[1] করেছি- প্রতি বছর যা হতে এক উকিয়া করে দেয়া হবে। আপনি (এ ব্যাপারে) আমাকে সাহায্য করুন। আমি বললাম, যদি তোমার মালিক পক্ষ পছন্দ করে যে, আমি তাদের একবারেই তা পরিশোধ করব এবং তোমার ওয়ালা-এর অধিকার আমার হবে, তবে আমি তা করব। তখন বারীরাহ্ (রাযি.) তার মালিকদের নিকট গেল এবং তাদের তা বলল। তারা তা অস্বীকার করল। বারীরাহ্ (রাযি.) তাদের নিকট হতে (আমার কাছে) এল। আর তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সে বলল, আমি (আপনার) সে কথা তাদের কাছে পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য ওয়ালার অধিকার সংরক্ষণ ছাড়া রাযী হয়নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনলেন, ‘আয়িশাহ (রাযি.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তা সবিস্তারে জানালেন। তিনি বললেন, তুমি তাকে নিয়ে নাও এবং তাদের জন্য ওয়ালার শর্ত মেনে নাও। কেননা, ওয়ালা এর হক তারই, যে আযাদ করে। ‘আয়িশাহ (রাযি.) তাই করলেন। এরপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে আল্লাহর হাম্দ ও সানা বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, লোকদের কী হলো যে, তারা এমন শর্তারোপ করে যা আল্লাহর বিধানে নেই। আল্লাহর বিধানে যে শর্তের উল্লেখ নেই, তা বাতিল বলে গণ্য হবে, শত শর্ত হলেও। আল্লাহর ফায়সালাই সঠিক, আল্লাহর শর্তই সুদৃঢ়। ওয়ালার হাক্ব তো তারই, যে মুক্ত করে। (৪৫৬) (সহীহ বুখারী তাওহীদ পাব: ২১৬৮,আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০১৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ২০৩৪)
সুতরাং শর্ত তো অবশ্যই পালন করতে হবে তবে তা আল্লাহর বিধানের বিপরীতে অবৈধ শর্ত হতে পারবে না। সুতরাং স্ত্রীর শর্ত যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে এই সাধারণ শর্তের হাদীস নিয়ে এসে কিয়াস করা নিষিদ্ধ যা ইমাম বুখারী পরপর হাদীস এনে বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাস ভাবে বলেছেন যে, আল্লাহর কিতাবের বিরোধী কোন শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাই স্ত্রীর শর্ত যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে এই হাদীস পেশ করার কোন মূল্য নেই।
আব্দুল্লাহ:- স্বামী যদি নিকাহর সময় স্বেচ্ছায় এই শর্ত মেনে নেন, তাহলে তিনি আল্লাহর হালালকে হারাম করেননি; বরং নিজের একটি জায়েজ অধিকার চুক্তির মাধ্যমে ত্যাগ করেছেন।
যেমন কেউ যদি মানত করে, আল্লাহর কসম, আমি চার মাস আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করব না।”
রাসূল ﷺ তো এক মাস তার স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার শপথ করেছেন।
কোনো জায়েজ অধিকার স্বেচ্ছায় নিজের ওপর সীমাবদ্ধ করা সবসময় হালালকে হারাম ঘোষণা করা নয়।
আব্দুর রহমান:- ভাই, ঈলা করা হয় কিসের জন্য? প্রয়োজনের খাতিরে স্ত্রীর সংশোধন বা শাসনের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার কসম করা জায়েজ। কিন্তু চার মাসের বেশি বা স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঈলা করা হারাম ও জুলুম। ঈলা হলো কোন কারণের জন্য শাস্তি স্বরূপ। কিন্তু শর্ত দিয়ে এখানে কোন অন্যায়ের জন্য স্বামীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে যে, অন্য বিবাহ করতে পারবে না? বিনা দোষে কি স্ত্রীর সাথে ঈলা করা বৈধ?
ঈলা হলো স্ত্রীর অন্যায়মূলক কার্জের শাস্তি। শাসকও কারো অন্যায় মূলক কার্জের শাস্তির জন্য মানুষের জন্য কোন বৈধ বিষয়কে সাময়িক অবৈধ করতে পারে। এখানে অন্যায়ের শাসনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না বরং শর্ত নিয়ে। ঈলার সাথে বিবাহের শর্ত গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ঈলা আর শর্ত অঙ্গীকার এক নয়। স্বামী তো এখনো অন্যায় করেনি তাহলে তাকে শাস্তি কিসের?
আরও একটি কথা বলে রাখি যে, কসম ও শর্ত এক নয়। ইসলামী শরিয়তে আল্লাহর নামে কসম (হলফ) করা এবং সাধারণ শর্ত বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা এবং এদের শরয়ী হুকুমও ভিন্ন।
আল্লাহর নামে কসম (অসম/হলফ): যখন কেউ সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর নাম বা সিফাত (গুণাবলী) উল্লেখ করে কোনো কথা বলে (যেমন: "আল্লাহর কসম," "আল্লাহর নামে কসম করে বলছি"), তখন তা শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি আনুষ্ঠানিক হলফ বা কসম হিসেবে গণ্য হয়।
শর্ত/অঙ্গীকার করা: কসমের শব্দ উচ্চারণ না করে কাউকে কেবল কথা দেওয়া, শর্ত করা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়াকে বলা হয় ওয়াদা (وَعْد) বা আহদ (عَهْد)।
যা মূল স্বত্বাগত ভাবে বৈধ; তার উপর শর্ত আরোপ করাও বৈধ যদি শরীয়ত বিরোধী শর্ত না হয়। যদি শরীয়ত বিরোধী শর্ত হয় তাহলে তা কার্যকর হবে না এবং সে শর্ত মেনে নিয়ে পূরণ না করলেও গুনাহ নেই যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা শর্ত করার পরেও পালন করে নি। এখানে কেউ বলতে পারবে না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা হারাম বিষয়ের অঙ্গীকার করেছেন কারণ, এখানে মূল সত্যাগত বিষয় হলো "গোলামের সম্পদ" যা বৈধ বিষয়। অনুরূপ ভাবে মধু খাওয়া বা দ্বিতীয় বিবাহ করা মূল সত্ত্বাগত বিষয় হলো " মধু ও দ্বিতীয় বিবাহ" যা একটি ঐচ্ছিক কাজ যা কেউ কিয়ামত পর্যন্ত না করলেও সমস্যা নেই; তাই এর উপর শর্তারোপ করা যাবে। কিন্তু শর্ত যদি কোন হারাম বিষয়ের হয় তাহলে তা কার্যকর হবে না এবং সে শর্ত মেনে নিয়ে পূরণ না করলেও গুনাহ নেই।
আর যা মূল স্বত্বাগত ভাবেই হারাম তার কল্পনা করাই হারাম আর তার উপর শর্ত আরোপ করা তো আরও দূরের বিষয় যেমন:- মদ, জুয়া, জেনা-ব্যভিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো মূল সত্বাগত ভাবে হারাম এবং এগুলোর শর্ত করাও গুনাহ, শর্ত মেনে নেওয়াও গুনাহ, শর্ত পূরণ করাও গুনাহ কারণ এর মূল সত্বায় অবৈধ ও হারাম।
তবে মূল সত্বাগত বৈধ ও অবৈধ যাই হোক ; যদি আল্লাহর নামে কসম করে ভঙ্গ করা হয় তাহলে তা গুনাহের কাজ। এখানে শর্ত ভঙ্গের গুনাহ নয় বরং কসম ভঙ্গের গুনাহ হবে। সত্বাগত বৈধ বিষয়ের শর্ত ভাঙায় কোন গুনাহ হয় না তবে কসম করলে গুনাহ ও কাফফারা দিতে হবে।
আব্দুল্লাহ:- আপনি দুটো বিষয় এক করে ফেলছেন। ৪ টি বিবাহ করা মূলত ঐচ্ছিক কাজ যা করা বাধ্যতামূলক নয়। তাই স্বামী যদি তার তার হক্ক ছেড়ে একের অধিক বিবাহকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেয় তাহলে সমস্যা নেই কারণ, এটি মুবাহ হক্ক স্বামীর; এবং স্বামী তা নিজেই ছেড়ে দিয়েছে।
আব্দুর রহমান:- মুবাহ কাজ কে কি নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ? একজন মানুষ কি আল্লাহর মুবাহকৃত ঐচ্ছিক কাজকে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নিতে পারে? মধু খাওয়া তো ঐচ্ছিক কাজ তাহলে, স্ত্রী যদি এমন শর্ত দেয় যে, আমি তোমার স্ত্রী থাকা অবস্থায় তোমার জন্য মধু খাওয়া নিষিদ্ধ; তাহলে কি এই শর্ত বৈধ হবে?
উত্তর হলো, মুবাহ কাজ কে সাধারণ ভাবে কেউ নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখেনা । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা বৈধ করেছেন তা নিষিদ্ধ করার কেউ নেই। তবে কেউ যদি কোন দোষক্রটি করে তাহলে তাকে শাস্তি স্বরূপ মুবাহ কাজ থেকে বিরত রাখা বৈধ কারণ, এটি দোষের শাস্তি ; যেমন স্ত্রীর সাথে ঈলা করার বিষয়টি পূর্বেই বলেছি।
সূরা তাহরিম এর আয়াত নাজিল হওয়ার পূর্বে ঐচ্ছিক মুবাহ কাজকে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ ছিল কারণ তা পূর্ববর্তী শরীয়ত থেকে চলে আসছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের উপর মধু/ দাসীকে নিষিদ্ধ করে নেওয়া স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তখনও মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়ে এরূপ আমল করা রহিত হয়নি কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন অবৈধ কাজ করতেই পারেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর কাজ প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী শরীয়ত থেকে ঐচ্ছিক বিষয় কে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করে নেওয়া যে বৈধ ছিল; তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ও বৈধ ছিল তাই তিনি করেছিলেন।
হযরত ইয়াকুব (আঃ) বা অন্যান্য নবীদের আমলে মানত করার বিধান ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক একটি ইবাদতের মাধ্যম। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে যেকোনো বৈধ বিষয়ে, এমনকি নিজের পছন্দের খাবার বা বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ওপর হারাম বা বর্জন করার মানত করাও জায়েজ ছিল (যেমনটি হযরত ইয়াকুব আঃ করেছিলেন)। তবে আমাদের শরীয়তে মানতের পরিধি নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিজের জন্য হালাল বিষয় কে হারাম করে নিয়েছিলেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:-
"তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে ইসরাঈল (ইয়াকুব) নিজের জন্য যা হারাম করেছিলেন তা ব্যতীত সমস্ত খাদ্যই বনী ইসরাঈলের জন্য হালাল ছিল..."
— (সূরা আল-ইমরান: ৯৩)
ইয়াকুব (আঃ)-এর পর থেকে হযরত ঈসা (আঃ)-এর আগমন পর্যন্ত বনী ইসরাঈলের জন্য উটের গোশত ও দুধ (এবং ইয়াকুব আঃ-এর বর্জন করা অন্যান্য নির্দিষ্ট খাবার) নিষিদ্ধ হিসেবেই বহাল রাখা হয়েছিল। ইয়াকুব (আঃ) নিজের ওপর যা হারাম করেছিলেন, তা মূলতঃ আল্লাহর সরাসরি অবতীর্ণ শরীয়তের কোনো নিষেধ ছিল না। কিন্তু তিনি বনী ইসরাঈলের জাতির পিতা হওয়ায় তাঁর সন্তানরা তা শ্রদ্ধাভরে মেনে চলতে শুরু করে। পরবর্তীতে হযরত মুসা (আঃ)-এর ওপর যখন তাওরাত নাজিল হয়, তখন বনী ইসরাঈলের অবাধ্যতা, সীমা লঙ্ঘন এবং তাদের নিজস্ব অভ্যাসের কারণে আল্লাহ তাআলা শাস্তিস্বরূপ ও পরীক্ষা হিসেবে বেশ কিছু জিনিস (যার মধ্যে ইয়াকুব আঃ-এর বর্জন করা বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল) তাদের জন্য শরীয়তগতভাবেই হারাম ঘোষণা করে দেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"ইউহুদিদের জুলুম- অত্যাচার এবং বহু লোককে আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেওয়ার কারণে আমি তাদের জন্য বহু উৎকৃষ্ট জিনিস হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল ছিল।"
— (সূরা আন-নিসা: ১৬০)
অতএব, হযরত মুসা (আঃ) থেকে শুরু করে পরবর্তী তাওরাত অনুসারী নবীদের (যেমন: হযরত দাউদ, সুলাইমান, জাকারিয়া, ইয়াহইয়া আঃ) যুগেও এই নিষেধাজ্ঞা আসমানী শরীয়ত হিসেবেই বহাল ছিল। তারপর ঈসা (আঃ) এসে তাওরাতের এই কঠোর ও শাস্তিমূলক বিধানগুলোর কিছু অংশ শিথিল ও হালাল করেন। তিনি বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাদের জন্য আগের কঠিন শরীয়তের কিছু জিনিস হালাল করতে এসেছেন। কুরআনে হযরত ঈসা (আঃ)-এর বক্তব্য এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:-
"আর আমি এসেছি আমার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারীরূপে এবং তোমাদের জন্য পূর্বে যেসব জিনিস হারাম ছিল, তার মধ্য থেকে কতকগুলোকে হালাল করে দেওয়ার জন্য..."
— (সূরা আল-ইমরান: ৫০)
ঈসা (আঃ) যেসব হারামকৃত জিনিস বনী ইসরাঈলের জন্য পুনরায় হালাল ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে উটের গোশত ও এর চর্বি/দুধ অন্যতম ছিল।
তখনও মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়কে নিজের উপর নিষিদ্ধ করে নেওয়া বৈধ ছিল যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর মধু/দাসী নিষিদ্ধ করে নিয়েছিলেন। এটি কোন গুনাহ ছিল না; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন অবৈধ কাজ করতেই পারে না বরং এটি ছিল পূর্ববর্তী শরিয়ত থেকে চলে আসা একটি মুবাহ বিষয় যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বৈধ বিষয় করার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা তাহরিমের আয়াত নাজিল করে মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়কেউ নিজের উপর নিষিদ্ধ করা হারাম ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:-
" হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
— (সূরা আত-তাহরীম: ১)
সুতরাং ঐচ্ছিক বা মুবাহ বিষয়কেও নিষিদ্ধ করা বৈধ নয় বরং আল্লাহর কুরআনের খেলাপ। তাই একের অধিক বিবাহ করা যদিও মুবাহ বা ঐচ্ছিক; কিন্তু এই জায়েজ বিষয় কে কেউ নিষিদ্ধ করে দেওয়ার বা নেওয়ার অধিকার রাখে না। একারনেই স্ত্রীর স্বামীর একাধিক বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল ও হারাম।
আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়। অনেকেই আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এর আবু জাহেলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাবের বিষয় নিয়ে দলিল দেন যা স্পষ্ট বাতিল। পূর্বে আমরা বর্ণনাটি দেখে নেই :-
" আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রহঃ) ...... আলী ইবনু হুসায়ন (রহঃ) হতে রিওয়ায়াত করেন যে, হুসায়ন ইবনু আলী (রাযিঃ) এর শাহাদতের পর ইয়াযীদ ইবনু মু'আবিয়াহ (রাযিঃ) এর নিকট হতে তারা যখন মাদীনায় এলেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ্ তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে বললেন, আপনার কোন প্রয়োজন থাকলে আমাকে বলবেন। আমি বললাম, না। মিসওয়ার বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তলোয়ারটি কি আপনি আমাকে দান করবেন? কেননা আমার ভয় হয় যে, লোকেরা এটি আপনার নিকট হতে আয়ত্ত করে নিবে। আল্লাহর শপথ আপনি যদি সে তলোয়ারটি আমাকে দিয়ে দেন তাহলে যতক্ষণ আমার জীবন থাকে এটি কেউ ছুইতে পারবে না। (মিসওয়ার আরো বলেন)
ফাতিমার জীবিতাবস্থায় আলী (রাযিঃ) আবূ জাহলের মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ ব্যাপার নিয়ে মানুষদের সম্মুখে মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে শুনেছি। আমি তখন সদ্য বালিগ বয়সের। তখন তিনি বললেন, ফাতিমাহ আমারই অংশ। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার দীনের সম্পর্কে ফিতনায় না পতিত হয়। তারপর তিনি আবদ-ই-শামস গোষ্ঠীয় তার জামাতার আলোচনা করলেন, তার আত্মীয়তার প্রশংসা করলেন এবং বললেন, সে আমায় যা বলেছে সত্য বলেছে, সে আমার সাথে ওয়াদা করেছে, আর তা পালন করেছে। আর আমি কোন হালালকে হারাম করি না, বা হারামকে হালাল করি না, তবে আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শক্রর কন্যা কক্ষনো এক স্থানে একত্র হতে পারে না। ( সহীহ মুসলিম হাদীস একাডেমী ৬২০৩,ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬০৮৮, ইসলামিক সেন্টার ৬১২৮)
অনেকেই এই হাদীস দিয়ে দলিল দিয়ে থাকে কিন্তু তা গ্রহণ যোগ্য নয় কারণ, এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবারের জন্য একটি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা (خصائص)। এটি আমাদের জন্য নয়। আমরা যদি কোনো মেয়েকে বিয়ে করি, এরপর তার পিতার শত্রুর মেয়েকেও বিয়ে করতে চাই (যদি অন্য কোনো শরঈ নিষেধাজ্ঞা না থাকে, যেমন—দুই সগিরা বোনকে একত্রে বিয়ে না করা ইত্যাদি), তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে একদম হালাল ও বৈধ। এছাড়াও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দিয়েছেন যে, "আমি কোন হালালকে হারাম করি না, বা হারামকে হালাল করি না, তবে আল্লাহর শপথ! আল্লাহর রসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শক্রর কন্যা কক্ষনো এক স্থানে একত্র হতে পারে না।" যা এই বিধান যে খাস তা স্পষ্ট করে দেয়।
হযরত আলী (রা.)-এর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল নবুওয়াতের বিশেষ মর্যাদা স্বরূপ যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিশেষ ভাবে দেওয়া হয়েছে। ফাতেমা (রা.) ছিলেন সাইয়্যেদাতু নিসাই আহলিল জান্নাহ (জান্নাতী নারীদের সর্দার) এবং রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। এই বিয়েতে ফাতেমা (রা.) মানসিকভাবে প্রচণ্ড কষ্ট পেতেন, যা প্রকারান্তরে রাসূল (সা.)-কে কষ্ট দিত। আর নবীকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকা উম্মতের ওপর ওয়াজিব। ইমাম আবু দাউদ এটি بَابُ مَا يُكْرَهُ أَنْ يُجْمَعَ بَيْنَهُنَّ مِنَ النِّسَاءِ নিয়ে এসেছেন যে,
"আল-মিসওয়ার ইবনু মাখরামা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মসজিদের মিম্বারের উপর বলতে শুনেছিঃ হিশাম ইবনুল মুগীরাহর বংশের লোকেরা তাদের বংশের এক কন্যাকে আলী ইবনু আবূ তালিবের বিয়ে দিতে অনুমতি চাইছে। কিন্তু আমি অনুমতি দিবো না, তারপরও আমি অনুমতি দিবো না, অনুমতি দিবো না। অবশ্য আবূ তালিবের পুত্র আমার কন্যাকে তালাক দিলে সে তাদের কন্যা বিয়ে করতে পারবে। কারণ আমার কন্যা আমার দেহেরই একটি অংশ। যেটা তার অপছন্দ, সেটা আমার অপছন্দ এবং তাকে যা দুঃখ দেয়, তা আমাকেও দুঃখ দেয়।"
অর্থাৎ ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা কে দুঃখ দেওয়া অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দুঃখ দেওয়া। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দুঃখ দেওয়া হারাম; বরং নিজের জানের থেকেও বেশি ভালো বাসতে হবে তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া যাবে না। আম ভাবে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয় তা হারাম। এছাড়াও কিছু বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে; যার কিছু বোঝার সুবিধার্থে উল্লেখ করা হলো।
[১] যেমন ভাবে রাসূলের কন্যার বিবাহ রাসূল কে কষ্ট দিবে দেখে সতীন নিয়ে আসা বৈধ নয় তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের বিবাহ করা বৈধ নয় কারণ তাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনের মধ্যে বলেছেন:-
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا ۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا
অনুবাদ: "আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া তোমাদের জন্য সঙ্গত নয় এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণকে বিবাহ করাও তোমাদের জন্য কখনো বৈধ নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট এটি এক ঘোরতর অপরাধ।"
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩)
[২] সাধারণভাবে মানুষ পরস্পরের সাথে উঁচু স্বরে কথা বলতে পারে, যা গুনাহ নয়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানে আল্লাহ তাআলা উম্মতকে নির্দেশ দিলেন তাঁর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখতে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
অনুবাদ: "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; এতে তোমাদের অজান্তেই তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হয়ে যাবে।"
(সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ২)
[৩] আমরা একে অপরকে নাম ধরে ডাকি, যা একেবারেই সাধারণ বিষয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাধারণ মানুষের মতো "ইয়া মুহাম্মদ" (হে মুহাম্মদ) বলে নাম ধরে ডাকা উম্মতের জন্য হারাম করা হয়েছিল।
لَّا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُم بَعْضًا
অনুবাদ: "তোমরা রাসূলের আহ্বানকে তোমাদের একে অপরকে আহ্বানের মতো গণ্য করো না।"
(সূরা আন-নূর, আয়াত: ৬৩)
[৪] কারো ঘরে যাওয়ার সময় আমরা হয়তো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি বা স্বাভাবিকভাবে কথা বলি। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহের নিজস্ব কিছু পবিত্রতা ও নিয়ম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাঁর কোনো কষ্ট বা ব্যাঘাত না ঘটে।
فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ
অনুবাদ: "অতঃপর খাওয়া শেষ হলে তোমরা চলে যাও, সেখানে আলাপে মশগুল হয়ে পোড়ো না। নিশ্চয়ই এটি নবীকে কষ্ট দেয়..."
(সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩)
উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ও তার পরিবারের জন্য কিছু খাস বিষয় ছিলো ; যা দিয়ে আম ভাবে দলিল নেওয়া বৈধ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া , "নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের" চাইতেও বড় গুনাহ। সুতরাং যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেয় তা হারাম। ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিবাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কষ্টের কারণ ছিল তাই তা খাস ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এমন খাস হাদীস দিয়ে দলিল গ্রহণ সঠিক নয়। এছাড়াও সহীহ মুসলিমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিস্কার করে বলেছেন যে, "আমি কোন হালালকে হারাম করি না" যা আরও মজবুত করে যে এটা খাস বিষয় ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সম্মানে।
আব্দুল্লাহ:- ভাই, আপনি ভুল বুঝছেন; একাধিক বিবাহকে কেউ হারাম করে না বরং ঐচ্ছিক বিষয় কে সীমাবদ্ধ করে নেয়।
আব্দুর রহমান:- প্রিয় ভাইজান, এটা শুধু শব্দের অদল বদল। আচ্ছা, আমাকে বলুন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি হালাল মধু/দাসী কে হারাম ভাবতেন? নাকি হালালই ভাবতেন কিন্তু নিজের উপর সীমাবদ্ধ করে নিয়েছিলেন?
স্পষ্ট উত্তর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কোন হালাল কে হারাম ভাবতেন না বরং হালাল জানতেন; কিন্তু নিজের উপর সীমাবদ্ধ করে নিয়েছিলেন।
আপনি বলুন যে, স্ত্রী যদি শর্ত দেয় যে, আমি আকদে থাকার ১০ বছর বা ২০ বছর বা ৫০ বছর তোমার জন্য মধু খাওয়া নিষিদ্ধ; তাহলে এটা কি বৈধ? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা তার কিতাবে বৈধ করছেন তা আপনি কোন শক্তিতে ১০ বছর বা ২০ বছর বা ৫০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করতে পারেন?
সুতরাং, প্রমাণিত হলো এটা শুধু শব্দের খেলা। কোন কিছু নিষিদ্ধের বিপরীত হলো --> কোন কিছু নিষিদ্ধ নয়। অথচ এখানে স্ত্রী অনির্দিষ্ট নিষিদ্ধ আরোপিত করছে। বিষয়টি কোন বস্তুকে হালাল-হারাম ভাবা নিয়ে নয়; বরং হালাল বস্তুকে কি নিষিদ্ধ করা যায়? তা নিয়ে। আপনি এটাকে যেই নামে ডাকুন না কেন, তা শুধু শব্দের অদল বদল। আল্লাহ এটাকে সূরা তাহরিমে চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
এছাড়া আরও একটি আছার নিয়ে মানুষ সংশয়ে ভোগে যে, এক ব্যক্তি উমর রাদিআল্লাহু আনহুর নিকটে এসে বললো:-
" 'হে আমিরুল মুমিনীন! আমি এই মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং তার জন্য শর্ত দিয়েছিলাম যে সে তার নিজ বাড়িতেই থাকবে (তাকে স্থানান্তর করব না)। কিন্তু এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে অমুক স্থানে স্থানান্তরিত হব।' উমর (রা.) বললেন, 'তার শর্ত বহাল থাকবে।' লোকটি বলল, 'তাহলে তো পুরুষরা ধ্বংস হয়ে গেল! কারণ কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীকে তালাক দিতে (বা বিচ্ছেদ ঘটাতে) চায়, তবে সে তালাক দিয়েই ছাড়বে।' তখন উমর (রা.) বললেন, 'মুমিনগণ তাদের অধিকারের সীমানায় নিজ নিজ শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।'"
এই আছারের মধ্যে কোন দলিল নেই কারণ, উমর (রা.) যে ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের ফয়সালা দিয়েছিলেন (যেমন: স্ত্রীকে তার নিজের শহর বা বাড়ি থেকে না সরানো), সেখানে আল্লাহর দেওয়া কোনো স্বতন্ত্র অধিকার খর্ব হয় না। বাসস্থান নির্ধারণ করা শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাই এটি একটি বিশুদ্ধ ও বৈধ (জায়েজ) শর্ত। কিন্তু বহুবিবাহ শরিয়ত কর্তৃক সরাসরি প্রদত্ত একটি অধিকার, তাই এটিকে শর্ত দিয়ে পুরোপুরি রহিত করা আর উমর (রা.)-এর ফয়সালা এক নয়। তাই যারা এটাকে পেশ করে তারা ভুল করে ।
উপরের বিস্তারিত আলোনায় আশাকরি দিবালোকের ন্যায় বুঝতে পেরেছেন যে, বিবাহের সময় স্ত্রীর বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল কারণ,
[১] শরীয়তের সুস্পষ্ট বিষয় কে কোন শর্ত সাধারণ ভাবে বাতিল করতে পারে না বরং এরূপ শর্তের বিন্দু পরিমাণ দাম নেই। শাসক কর্তৃক শাস্তি দেওয়া বা দোষের কারণে ঈলা করা শরীয়তেরই বিষয়। স্বামীর উপর শর্ত আরোপ আর অন্যায় দোষের শাস্তি এক নয়।
[২] কোন সুস্পষ্ট দলিল নেই যা একাধিক বিবাবের গ্রহনযোগ্যতাকে শর্ত দিয়ে বাতিল করা যায় বরং শর্ত অবৈধ হয়ে নিজেই বাতিল । শর্তের আম হাদীসের উপর কিয়াস করাও বাতিল কারণ তা শুধুমাত্র বৈধ শর্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর পূর্বেই প্রমাণ করা হয়েছে যে একাধিক বিবাহ না করার শর্ত দেওয়া বাতিল শর্ত। আল্লাহ একাধিক বিবাহ কে বৈধ করেছেন যা কোন অবৈধ শর্ত বাতিল করতে পারে না।
[৩] মুবাহ বা ঐচ্ছিক বিষয়েও শর্ত দিয়ে নিষিদ্ধ করা বা করে নেওয়া হারাম; যা আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানিয়ে দিয়েছেন। একজন স্ত্রীর জন্য এটি বৈধ নয় যে, আমি বেঁচে থাকতে মধু খাওয়া যাবে না বরং মধু খাওয়া নিষিদ্ধ তোমার উপর; বা স্ত্রীর শর্ত দেওয়া যে, একাধিক বিবাহ করা তোমার জন্য নিষিদ্ধ; যা বাতিল এবং এর কোন মূল্যই নেই।
[৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কষ্ট দেওয়া হারাম। তাই যা তার মর্যাদার খেলাফ ও তাকে কষ্ট দেয় তা করা নিষিদ্ধ। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের খাস বিশেষত্ব।
উপরের আলোচনা স্পষ্ট হওয়ার পর এখন আমরা হারাম শর্তের প্রভাব আলোচনা করবো। তাহলো:-
[ক] যদি কেউ শরয়ী বিধান বিরোধী কোন শর্ত দেয় এবং অন্যকেউ তা গ্রহণ করে কিন্তু কসম করে না। অর্থাৎ কেউ হারাম শর্ত দিল এবং অন্য কেউ তার অঙ্গীকার করলো শুধু; তাহলে এই শর্ত ভঙ্গের জন্য কোন কিছুই হবে না এবং গোনাহও হবে না যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা করেছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরামর্শে।
[খ] কিন্তু যদি হারাম শর্ত গ্রহনের অঙ্গীকার এর সাথে কসম করে; তাহলেও শর্ত মারদূদ এবং এর জন্য কিছুই হয় না। তবে কসমের মর্যাদার জন্য তাকে ইসতিগফার করতে হবে এবং কাফফারা দিতে হবে। সোজা কথায় হারাম শর্তের কোন গুরুত্বই নেই; কিন্তু কসমের মর্যাদা রয়েছে।
[গ] কেউ যদি নিজের উপর কোনো বৈধ বিষয় নিষিদ্ধ করে নেয় তাহলে তাকেও ইসতিগফার করতে হবে এবং কাফফারা দিতে হবে কারণ, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধু/দাসীকে নিজের জন্য নিষিদ্ধের পূর্বে বৈধ ছিল। তারপর সূরা আত তাহরীমের মাধ্যমে তা চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়।
কারো শর্ত ছাড়া নিজের উপর নিজেই হারাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা গুনাহ ও কাফফারা যুক্ত; যেমন সূরা আত তাহরীমে রয়েছে। অন্য কেউ কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী কোন শর্ত দিলে তা ভঙ্গ করলেও কিছু হয় না; যেমন আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা করেছিলেন। তবে যে অবস্থায় কসম করা হোক; ইসতিগফার করবে ও কাফফারা দিতে হবে কসমের জন্য।
অবৈধ শর্ত সর্বদাই পরিত্যক্ত। তাই শরীয়তের সুস্পষ্ট মুবাহ বা জায়েয কার্জকেও শর্ত দিয়ে সাধারণ ভাবে বদলানো যায় না বরং শর্তটিই মারদুদ হয়ে যায়। একাধিক বিবাহকে নিষিদ্ধের শর্ত তাই বাতিল এবং এই বিষয়ে কিয়াসও অনেক অনেক অনেক দূর্বল বা মারদূদ। তবে স্ত্রী চাইলে তালাকে তাফবিজ নিতে পারে কারণ, তালাকে তাফবিজ জায়েয ও শরীয়ত সিদ্ধ বিষয়। স্ত্রী স্বামীকে বলতে পারে যে, তোমার একাধিক বিবাহ আটকে দেওয়ার অধিকার আমার নেই এবং আমার জন্য তা বৈধ নয়; তুমি যদি একাধিক বিবাহ করো করতে পারো কারণ আল্লাহ তোমাকে অধিকার দিয়েছেন। তবে তুমি যদি একাধিক বিবাহ করো তাহলে আমি তালাকে তাফবিজ নিয়ে নিব। তালাকে তাফবিজ একটি গ্রহণযোগ্য শর্ত। আর পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে, শর্ত যদি কুরআন সুন্নাহর বিরোধী না হয় তাহলে তা মান্য করতে হবে; আর শর্ত যদি কুরআন সুন্নাহর বিরোধী হয় তাহলে সেই শর্তই গৃহীত হয়না বরং মারদুদ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে হেদায়েত দিন এবং সকল আলেমদের মতোবিরোধ কে পাশে রেখে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের তৌফিক দিন, আমীন। পূর্ববর্তী যারা ইজতিহাদ করে একটি হারাম বিষয় কে হালাল বলে গিয়েছেন; সেই সকল সম্মানিত ব্যাক্তিদের কে সততা ও ইজতিহাদের জন্য নেকি দান করুন, আমীন। এখনোও যাদের অন্তরে ইখলাস রয়েছে এবং নিজেদের বুঝের সীমাবদ্ধতার জন্য একটি সুস্পষ্ট হারাম বিষয় কে হালাল ভাবে; তাদেরকেউ আপনি হেদায়েত দিন এবং প্রতিদান দান করুন, আমীন। সকলের উপর তোমার রহমত এক নয়; তাই যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যেই মতামত অনুসরণ করে; তুমি তার প্রচেষ্টা অনুযায়ী তার সততাকে পুরস্কৃত কর, আমীন। হে রাব্বুল আলামীন, আমাদের সবাইকে হারম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন এবং আপনার সন্তুষ্টিমূলক কার্জে জন্য জীবন কে উৎসর্গ করে নিন, আমিন।
অতিরিক্ত সংযোজন:- অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, হারাম শর্ত তো বাতিল; কিন্তু বিবাহের কি হবে?
উত্তর হলো:- বিবাহ হয়ে যাবে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু অবৈধ শর্ত বাতিল হয়ে যাবে। দুইটি ভিন্ন বিষয়। দলিল হিসেবে বারিরাহ রাদিআল্লাহু আনহার সহীহ মারফু হাদীস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি বাতিল করেন নি বরং শর্তকে বাতিল করেছেন কারণ তা সরাসরি আল্লাহর বিধানের বিপরীত।
চুক্তি সঠিক হওয়ার ফরজিয়াত পূরন হলে তা সঠিক হয়ে যায়। যদি কোন এক্সটা শর্ত দেয় এবং তা যদি ওহীর সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে পালন করতে হবে। আর যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তা বাতিল হয়ে যাবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহার চুক্তি বাতিল করেন নি কারণ, চুক্তির লেনদেন একদম সঠিক ছিল; কিন্তু এক্সট্রা শর্ত ছিল সরাসরি আল্লাহর বিধানের বিপরীত তাই শুধু শর্ত বাতিল হয়।
অনুরূপ ভাবে, একটি বিবাহ সঠিক হওয়ার জন্য ওলী ও স্বাক্ষীর উপস্থিতীতে ইযাব কবুল হতে হয়। যদি ওলী ও স্বাক্ষীর উপস্থিতীতে ইযাব কবুল হয়ে যায় তাহলেই বিবাহ সঠিক হয়ে যায়। কিন্তু এর উপর যদি কেউ এরূপ শর্ত আরোপ করে যা স্পষ্ট শরীয়ত বিরোধী যে, স্ত্রী বললো তুমি মধু খাবে না যতদিন আমি জীবিত আছি; তাহলে এমন শর্ত পূরণ করা হবে না এবং স্বামী যদি মধু খায় তবুও কোন গুনাহ হবে না কারণ, সুস্পষ্ট হালাল বিষয় কে কেউ সাধারণ ভাবে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করতে পারে না। তেমনি স্ত্রী যদি শর্ত করে যে, আমি থাকা পর্যন্ত অন্য বিবাহ করা নিষিদ্ধ তোমার জন্য; তাবে তা বাতিল কারণ, স্ত্রী থাকা অবস্থায় বিবাহ করা হালাল আল্লাহ সরাসরি করেছেন, কোন শর্ত এটাকে সাধারণ ভাবে সাময়িক বা চিরস্থায়ী নিষিদ্ধ করতে পারে না।
মূলকথা হলো, চুক্তি সঠিক হয়ে যাবে কিন্তু শর্ত বাতিল হয়ে যাবে যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ মারফু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।