বিবাহ ও দাম্পত্য নারী অধিকার নিয়ে কুরআনের উপর অমুসলিমদের অভিযোগের জবাব।

Joined
Nov 17, 2023
Threads
426
Comments
551
Solutions
1
Reactions
13,868
১. শস্যক্ষেত্রের আয়াত (সূরা আল-বাকারা ২:২২৩)

আপত্তি: স্ত্রীকে "শস্যক্ষেত্র" বলে বস্তুনিষ্ঠ বা অপমান করা হয়েছে।

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

এই আয়াতে মূলত নারীর সম্মানহানি নয়, বরং বংশবিস্তার এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের একটি গভীর ও মার্জিত রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। আরবদের একটি কুসংস্কার ছিল যে, নির্দিষ্ট বিশেষ ভঙ্গিতে স্ত্রীর সাথে মিলিত হলে সন্তান টেরা বা ট্যারাকানা হয়। আল্লাহ এই কুসংস্কার দূর করতে আয়াতটি নাজিল করেন।

কুরআনের দলিল:

نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ ۖ وَقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُمْ ۚ
অনুবাদ:"তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব, তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে গমন করতে পারো। আর তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম ভালো কাজ পাঠাও..." (সূরা আল-বাকারা ২:২২৩)

সহিহ হাদিসের দলিল:

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، وَأَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ وَعَمْرٌو النَّاقِدُ - وَاللَّفْظُ لأَبِي بَكْرٍ - قَالُوا حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنِ ابْنِ الْمُنْكَدِرِ سَمِعَ جَابرًا يَقُولُ كَانَتِ الْيَهُودُ تَقُولُ إِذَا أَتَى الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ مِنْ دُبُرِهَا فِي قُبُلِهَا كَانَ الْوَلَدُ أَحْوَلَ فَنَزَلَتْ ( نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ)
অনুবাদ: জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইয়াহুদীরা বলত, কোন লোক স্ত্রীর পেছন দিক থেকে তার যোনী দ্বারে সঙ্গম করলে এতে সন্তান টেরা চক্ষু বিশিষ্ট হবে। এ প্রসঙ্গে নাযিল হয় অর্থাৎ "স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার"- (সূরা আল বাকারাহ ২ঃ ২২৩)। (সহীহ মুসলিম:-ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৪০০, ইসলামীক সেন্টার ৩৩৯৯ হা.এ ৩৪২৭)।

শস্যক্ষেত্র যেমন একজন কৃষকের কাছে অবহেলার বস্তু নয়, বরং তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যা সে পরম যত্নে আগলে রাখে এবং সেখান থেকে সে উত্তম ফসল (সন্তান) আশা করে—তেমনি স্ত্রীকে ভালোবাসার ও যত্নে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরপরই বলা হয়েছে "নিজেদের জন্য অগ্রিম ভালো কাজ পাঠাও", যার ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন—সহবাসের পূর্বে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং স্ত্রীর সাথে সদয় আচরণ করা।

এছাড়াও সহবাসের ক্ষেত্রে সর্বদা স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা দেখতে বলেছে ইসলাম। বিবাহ হলো একটি পবিত্র বন্ধন যেখানে, অবশ্যই মেয়ের অনুমতি প্রয়োজন। একজন পুরুষ যখন বিবাহের প্রস্তাব দেয় তখন সেই মেয়ে চাইলে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। বিবাহের প্রস্তাব অর্থই হলো যে, যদি নারীর কোন শারীরিক সমস্যা না থাকে তাহলে যখন চাইবে তখন তার সঙ্গীনির সাথে সহবাসে লিপ্ত হতে পারে। এটা মেয়েদের প্রতি অন্যায় নয় কারণ, বিবাহের প্রস্তাব মেয়ে মেনে নিয়েছিল এবং এর জন্য পুরুষের কাছে মোহরানা ধার্য করেছিল। মেয়ে চাইলে প্রত্যাখ্যান করে দিত পারতো প্রস্তাব কিন্তু মেয়ে এটি জেনেই প্রস্তাব স্বীকার করে। তারপরেও ইসলাম হায়েজ- নেফাস, পুং মৈথুন সহ নারীর যদি কোন শারীরিক সমস্যা থাকে তাহলে স্বামীকে সহবাস করতে বাঁধা দান করে। অর্থাৎ এখানে স্ত্রীকে খাটো ও ভোগবিলাসের বস্তু বলা হয়নি বরং সম্পূর্ণ মর্যাদা ও নারীর যাবতীয় কল্যাণের ও ক্ষতি অপসারণের দিকেও সুদৃঢ় ভাবে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।

২. শয্যা বর্জন ও প্রহারের আয়াত (সূরা আন-নিসা ৪:৩৪)

আপত্তি: অবাধ্যতার জন্য স্ত্রীকে প্রহার করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

এখানে আয়াতের শুরু থেকে পড়লে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। এখানে সেসব স্ত্রীলোকের কথা বলা হয়েছে, যারা স্বামীদের আনুগত্য করে না কিংবা যারা এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে। ইসলাম এখানে কত সুন্দরই না সমাধান দিয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা সংশোধনের জন্য পুরুষদেরকে যথাক্রমে তিনটি উপায় বাতলে দিয়েছেন। অর্থাৎ স্ত্রীদের পক্ষ থেকে যদি নাফরমানী সংঘটিত হয় কিংবা এমন আশংকা দেখা দেয়, তবে প্রথম পর্যায়ে তাদের সংশোধন হল যে, নরমভাবে তাদের বোঝাবে। যদি তাতে বিরত না হয়, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের বিছানা নিজের থেকে পৃথক করে দেবে। যাতে এই পৃথকতার দরুন সে স্বামীর অসন্তুষ্টি উপলব্ধি করে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে। তারপর যদি তাতেও সংশোধন না হয়, তবে মৃদুভাবে মারবে, তিরস্কার করবে। আর তার সীমা হল এই যে, শরীরে যেন সে মারধরের প্রতিক্রিয়া কিংবা যখম না হয়। কিন্তু এই পর্যায়ের শাস্তি দানকেও রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করেননি, বরং তিনি বলেছেন, ‘ভালো লোক এমন করে না।’ [ইবন হিব্বান ৯/৪৯৯, নং- ৪১৮৯, আবু দাউদ ২১৪৬, ইবন মাজাহ ১৯৮৫] যাই হোক, এ সাধারণ মারধরের মাধ্যমেই যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তবুও উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেল (তাফসিরে জাকারিয়া সূরা নিসা:৩৪)।

হাদীসে এসেছে,
عن جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اتَّقُوا اللهَ فِى النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللهِ وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ فَإِنْ فَعَلْنَ ذٰلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
অনুবাদ:- জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, তাদেরকে তোমরা আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ। আল্লাহর বাক্যের সাহায্যে তাদের লজ্জাস্থানকে বৈধ করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল, তারা এমন কাউকে তোমাদের বিছানা মাড়াতে দেবে না, যাকে তোমরা অপছন্দ কর। এমন করলে তাদেরকে হালকাভাবে প্রহার কর। আর প্রচলিত নিয়মে তাদের খাওয়া-পরার দায়িত্ব তোমাদের উপর (মুসলিম ৩০০৯)

এখানে ضرب غير مبرح বলতে বুঝায়, তাতে কেটে-ফুটে না যায় এবং কঠিন ব্যথা না হয়।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ক্ষতিকর নয় এমন প্রহার (ضرب غير مبرح) কী? তিনি বলেছিলেন, "মেসওয়াক বা অনুরূপ কিছু দিয়ে মৃদু আঘাত করা" (তাবারি সূরা নিসা:৩৪)

এটি কোনো শাস্তির প্রহার নয়, বরং কেবলই ভালোবাসার অভিমান বা প্রতীকী সতর্কবার্তা।


৩. উত্তরাধিকারে অর্ধেক অংশ (সূরা আন-নিসা ৪:১১)

আপত্তি: কন্যাকে পুত্রের অর্ধেক দিয়ে বৈষম্য করা হয়েছে।

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

ইসলামে অর্থনৈতিক দায়িত্বের সাথে অধিকারের ভারসাম্য (Financial Responsibility) রাখা হয়েছে। একজন পুরুষের ওপর তার নিজের, স্ত্রীর, সন্তানদের, এমনকি মা-বাবারও ভরণপোষণের দায়িত্ব ফরজ। পক্ষান্তরে, নারীর নিজের ভরণপোষণের কোনো দায়িত্ব নেই। বিয়ের আগে বাবা-ভাই এবং বিয়ের পর স্বামী তার ভরণপোষণ দেবে।

নারী যে অংশ পায়, তা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব সঞ্চয়। তাকে সেখান থেকে ১ টাকাও সংসারে খরচ করতে হয় না। অন্যদিকে পুরুষ দ্বিগুণ পেয়েও পুরোটা পরিবারের পেছনে খরচ করতে বাধ্য থাকে। ফলে দিনশেষে অর্থনৈতিকভাবে নারীই বেশি লাভবান ও সুরক্ষিত থাকে।


৪. বহুবিবাহের অনুমতি (সূরা আন-নিসা ৪:৩)

আপত্তি: পুরুষকে ৪টি বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, নারীকে কেন নয়?

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

ইসলামে বহুবিবাহ কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশেষ অনুমতি এবং এর শর্ত হচ্ছে "ইনসাফ বা সমতা"। তৎকালীন সময়ে যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পুরুষদের মৃত্যুহার বেশি ছিল, যার ফলে সমাজে বিধবা ও এতিম নারীদের সংখ্যা বেড়ে যেত। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতেই এই বিধান।

কুরআনের দলিল:

فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً
অনুবাদ:"...তাহলে নারীদের মধ্য থেকে তোমাদের পছন্দমত দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করো। আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে মাত্র একজনকে (বিয়ে করো)।" (সূরা আন-নিসা ৪:৩)

সহিহ হাদিসের দলিল:
যারা স্ত্রীদের মাঝে সমতা রক্ষা করতে পারবে না, তাদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে:

حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ الطَّيَالِسِيُّ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، عَنِ النَّضْرِ بْنِ أَنَسٍ، عَنْ بَشِيرِ بْنِ نَهِيكٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا، جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ

অনুবাদ: আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুই’জন স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো, কিয়ামতের দিন সে পঙ্গু অবস্থায় উপস্থিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-২১৩৩)।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে,নারীর জন্য বহুভর্তৃকত্ব (Polyandry) নিষিদ্ধ কেন?

জীববৈজ্ঞানিক ও বংশপরিচয় (Paternity) রক্ষার খাতিরে এটি অসম্ভব। একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকলে গর্ভের সন্তানের আসল পিতা কে, তা নির্ণয় করা প্রাকৃতিকভাবে জটিল এবং তা পারিবারিক ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটাত।


৫. ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের বিধান (সূরা আল-মায়িদা ৫:৫, সূরা আল-বাকারা ২:২২১)

আপত্তি: মুসলিম পুরুষ আহলে-কিতাব (ইহুদি/খ্রিস্টান) নারীকে বিয়ে করতে পারলে, মুসলিম নারী কেন অমুসলিম পুরুষকে পারবে না?

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

ইসলামে পারিবারিক জীবনের মূল ভিত্তি হলো ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

কুরআনের দলিল:

وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ ۚ
অনুবাদ: "আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে..." (সূরা আল-বাকারা ২:২২১)
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ
অনুবাদ: "...এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে (আহলে কিতাব), তাদের সচ্চরিত্রা নারীদের তোমাদের জন্য হালাল করা হলো।" (সূরা আল-মায়িদা ৫:৫)

একজন মুসলিম পুরুষ যখন একজন খ্রিস্টান বা ইহুদি নারীকে ঘরে আনে, তখন মুসলিম স্বামী হিসেবে তার ওপর ফরজ হলো ঈসা (আঃ) বা মূসা (আঃ)-কে সম্মান করা। কারণ এই নবীদের বিশ্বাস না করলে মুসলিমের ঈমানই থাকে না। ফলে অমুসলিম স্ত্রী তার ঘরে সম্পূর্ণ ধর্মীয় শ্রদ্ধা পায়।

কিন্তু একজন অমুসলিম পুরুষ (খ্রিস্টান, ইহুদি বা হিন্দু) যখন একজন মুসলিম নারীকে বিয়ে করবে, সে কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আল্লাহর রসূল বা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করে না। ফলশ্রুতিতে, সেই পরিবারে মুসলিম নারীর ধর্মীয় অনুভূতি, ইবাদত এবং তার সন্তানদের ইসলামি বিশ্বাসের ওপর প্রচণ্ড আঘাত বা মানসিক নির্যাতন আসার পথ উন্মুক্ত হয়। নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান রক্ষার জন্যই ইসলাম এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

৬. তালাকের একতরফা ক্ষমতা ও নারীর অধিকার (সূরা আল-বাকারা ২:২২৯)

আপত্তি: তালাকের ক্ষমতা কেবল পুরুষের, নারীর অবস্থান এখানে সীমিত।

খণ্ডন ও সঠিক ব্যাখ্যা:

ইসলামে বিবাহ একটি সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তি। যেহেতু পুরুষকে বিয়ের সময় 'মোহরানা' দিতে হয় এবং বৈবাহিক জীবনের পর পুরো সংসারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করতে হয়, তাই হঠকারী সিদ্ধান্ত এড়াতে তালাকের প্রাথমিক অধিকার পুরুষের হাতে দেওয়া হয়েছে। তবে ইসলাম নারীকে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছে, যাকে 'খুলা' (خلع) বলা হয়।

কুরআনের দলিল:

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ ۗ
অনুবাদ:"...যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে না, তবে স্ত্রী যা দিয়ে (মোহরানা বা তার অংশ ফেরত দিয়ে) নিজেকে মুক্ত করে নেবে, তাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারা ২:২২৯)

সহিহ হাদিসের দলিল (খুলার বাস্তব উদাহরণ):

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ امْرَأَةَ ثَابِتِ بْنِ قَيْسٍ، أَتَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ثَابِتُ بْنُ قَيْسٍ مَا أَعْتِبُ عَلَيْهِ فِي خُلُقٍ وَلاَ دِينٍ، وَلَكِنِّي أَكْرَهُ الْكُفْرَ فِي الإِسْلاَمِ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ أَتَرُدِّينَ عَلَيْهِ حَدِيقَتَهُ ‏"‏‏.‏ قَالَتْ نَعَمْ‏.‏ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ اقْبَلِ الْحَدِيقَةَ وَطَلِّقْهَا تَطْلِيقَةً ‏"‏‏.‏
অনুবাদ: ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, সাবেত ইবনে কাইসের স্ত্রী রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! সাবেতের চরিত্র বা দ্বীনদারির ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু আমি মুসলিম হয়ে কুফরি করা পছন্দ করি না (অর্থাৎ স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় অবাধ্য হওয়ার ভয় করছি)।' রসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি তার বাগানটি (যা মোহর হিসেবে পেয়েছিলে) ফিরিয়ে দেবে?' সে বলল, 'হ্যাঁ'। তখন রসূলুল্লাহ (সাঃ) সাবেতকে বললেন, 'বাগানটি গ্রহণ করো এবং তাকে এক তালাক দিয়ে দাও।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৫২৭৩)।

খুলা হল:- স্ত্রী যদি বিশেষ কোন কারণে স্বামীর সাথে বসবাস করতে নারায হয় তাহলে স্বামী তার নিকট থেকে অথবা তার প্রতিনিধির পক্ষ থেকে বিনিময় গ্রহণ করে স্ত্রীকে পৃথক করে দেয়াকে খুলা বলা হয়।

খুলার ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকতে হবে। যদি স্বামী সম্মতি প্রদান না করে তাহলে স্ত্রী বিচারকের শরণাপন্ন হয়ে তার মাধ্যমে খুলা করবে।

যেহেতু স্বামী মোহরানা দেওয়া সহ স্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তাই তালাক মূলত স্বামীর অধিকার কারণ, যাবতীয় মানবিক প্রয়োজন সহ পারিবারিক জীবন পরিচালনায় একটি ছেলের যেমন একটি মেয়ে প্রয়োজন, তেমনি একটি মেয়ের একটি ছেলের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে পুরুষ বাড়তি মোহরানা আদায় করে; তাই তালাকের অধিকার পুরুষ কে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও একজন মহিলা একজন পুরুষের তুলনায় অধিক স্নেহময় ও আবেগ তাড়িত হয়। আবেগ দিয়ে ফয়সালা করা হলে তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই পুরুষ কে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে।

তাছাড়াও মেয়ে অনুমতি নিয়েই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। একজন পুরুষ চাইলেই মেয়েকে বিবাহ করতে পারে না বরং মেয়ের অনুমতি আবশ্যক। ইসলাম এখানে ভারসাম্য রক্ষা করেছে যে, বিবাহ করার জন্য মেয়ের অনুমতি লাগবে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ করবে ছেলে।

যদি একবারেই স্বামীর সাথে কোন বৈধ কারণে বণিবণা না
হয় তাহলে, ইসলাম স্ত্রীকে খুলার অধিকার দিয়েছে।

সুতরাং ইসলামের বিধান এখানে কত সুন্দর যা সবার অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
 
Back
Top