অন্যান্য ইসলামে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও কর্তব্য

  • Thread Author
ইসলাম নারীজাতিকে যথার্থ মর্যাদা, সম্মান, অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান করেছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় অতিবাহিত হয়েছে, যখন নারী ছিল অবহেলিত, লাঞ্ছিত, নির্যাতিত এবং মূল্যহীন। বিশেষত জাহেলিয়াতের যুগে নারীকে পরিবার ও সমাজে বোঝা মনে করা হতো। কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে মানুষ লজ্জিত হতো, অপমান বোধ করত, এমনকি অনেকেই কন্যাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দিত। আল্লাহ তা‘আলা সেই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে বলেন,

وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ ۝ يَتَوَارَىٰ مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ ۚ أَيُمْسِكُهُ عَلَىٰ هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
“তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে অন্তরে জ্বলতে থাকে। সে লজ্জায় মানুষের কাছ থেকে আত্মগোপন করে, এ চিন্তায় যে, অপমান সহ্য করে তাকে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা কত নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়!”
(সূরা আন-নাহল ১৬:৫৮-৫৯)

আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন সেই নিরপরাধ কন্যার বিচারও উল্লেখ করেছেন, যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল:

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ ۝ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ
“আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
(সূরা আত-তাকওীর ৮১:৮-৯)

এভাবে ইসলাম আগমনের পূর্বে নারী যে কত ভয়াবহ অবমাননার শিকার ছিল, তা কুরআনই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

ইসলাম এসে এই বর্বরতার অবসান ঘটায় এবং নারীকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদার কথা ঘোষণা করে বলেন:

إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الْأُمَّهَاتِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর মাতাদের অবাধ্যতা হারাম করেছেন।”
(সহীহ আল-বুখারী, হা/৫৯৭৫; সহীহ মুসলিম, হা/৫৯৩)

এ হাদীস প্রমাণ করে, ইসলামে নারীর মর্যাদা মায়ের অবস্থানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।


শুধু তাই নয়, ইসলাম কন্যা সন্তানকে বোঝা নয়, বরং জান্নাতের মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ هَكَذَا
“যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে এভাবে থাকবে।”
(বর্ণনাকারী আনাস রা.; সহীহ মুসলিম, হা/২৬৩১)

আরও বলেন:

مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ
“যার তিনটি কন্যা থাকে, অতঃপর সে ধৈর্য ধরে তাদের লালন-পালন করে, তাদের খাদ্য, পানীয় ও পোশাকের ব্যবস্থা করে, তবে তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।”
(সুনান ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৬৯; শায়খ আলবানী, সহীহ)


এতে স্পষ্ট হয়, ইসলাম সেই কন্যাকেই জান্নাতের মাধ্যম বানিয়েছে, যাকে জাহেলিয়াতের মানুষ অপমানের কারণ মনে করত।


ইসলাম নারীকে শুধু মা বা কন্যা হিসেবে সম্মান দেয়নি; বরং স্ত্রী হিসেবেও তাকে মর্যাদা দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা নেককার নারীর গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন:

مُسْلِمَاتٍ مُؤْمِنَاتٍ قَانِتَاتٍ تَائِبَاتٍ عَابِدَاتٍ سَائِحَاتٍ
“তারা হবে মুসলিম, মুমিন, অনুগত, তওবাকারিণী, ইবাদতকারিণী ও সিয়াম পালনকারিণী।”
(সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৫)

এই আয়াতে একজন আদর্শ নারীর ছয়টি মৌলিক গুণ উল্লেখ করা হয়েছে: ইসলাম, ঈমান, আনুগত্য, তওবা, ইবাদত ও সিয়াম। অর্থাৎ একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য তার ঈমান, তাকওয়া ও চরিত্রে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তম নারীর বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

خَيْرُ نِسَائِكُمُ الْوَدُودُ الْوَلُودُ الْمُوَاسِيَةُ الْمُوَاتِيَةُ
“তোমাদের নারীদের মধ্যে উত্তম সেই নারী, যে স্বামীর প্রতি অনুরাগী, অধিক সন্তানপ্রসবকারিণী, সহানুভূতিশীলা ও সহযোগিনী।”
(সিলসিলাহ আস-সহীহাহ, হা/১৮৪৯)

এ হাদীস প্রমাণ করে, উত্তম নারী সে, যে পরিবারে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও প্রশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে।

ইসলাম নারীর লজ্জাশীলতা, শালীনতা ও পর্দাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ...
“আর আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এবং যা সাধারণত প্রকাশমান তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে...”
(সূরা আন-নূর ২৪:৩১)

আরও বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।”
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৩)


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ
“লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ।”
(সহীহ আল-বুখারী, হা/২৪; সহীহ মুসলিম, হা/৩৬)

অতএব পর্দা নারীর বন্দিত্ব নয়; বরং তার সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক।

ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে, আবার দায়িত্বও নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
“নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন পুরুষদের উপর তাদের কর্তব্য রয়েছে; তবে পুরুষদের তাদের উপর একটি স্তর মর্যাদা রয়েছে।”
(সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২২৮)


আরও বলেন:

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
“পুরুষেরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল অভিভাবক।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৩৪)

এই ‘কাওয়ামাহ’ বা নেতৃত্ব মর্যাদার নামে জুলুম নয়; বরং দায়িত্ব, ব্যয়ভার, রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহিতার দায়িত্ব।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।”
(সুনান আত-তিরমিযী, হা/৩৮৯৫; সহীহ)

অতএব ইসলামে স্বামীর নেতৃত্ব মানে কঠোরতা নয়; বরং দয়া, ন্যায়, স্নেহ ও দায়িত্বশীলতা। আর স্ত্রীর আনুগত্য মানে অপমান নয়; বরং পারিবারিক শৃঙ্খলা, ভারসাম্য ও জান্নাতের পথ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের স্বামীর অধিকার রক্ষার গুরুত্বও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

> فَإِنَّمَا هُوَ جَنَّتُكِ وَنَارُكِ
“তোমার স্বামীই তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম।”
(মুসনাদ আহমাদ, হা/১৯০২৫; শায়খ আলবানী, সহীহ)

অর্থাৎ স্বামীর হক আদায় করা একজন নারীর জান্নাত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


মূলত, ইসলামই সর্বপ্রথম নারীকে প্রকৃত সম্মান, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিয়েছে। জাহেলিয়াতের যুগে যে নারী ছিল অপমানিত, ইসলাম তাকে করেছে সম্মানিতা; যে কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, ইসলাম তাকে করেছে জান্নাতের মাধ্যম; যে নারী ছিল ভোগের বস্তু, ইসলাম তাকে করেছে মা, কন্যা, স্ত্রী ও জান্নাতের অধিকারিণী। তবে এই মর্যাদা অর্জনের জন্য নারীর কর্তব্য হলো ঈমান, লজ্জাশীলতা, পর্দা, ইবাদত, আনুগত্য ও উত্তম চরিত্র ধারণ করা। তখনই সে দুনিয়ায় সম্মানিতা এবং আখিরাতে সফলকাম হবে, ইন শা’আল্লাহ বিইযনিল্লাহ।
ওয়াল্লাহু আ'লাম!
 
Similar content Most view View more
Back
Top