সিয়াম রমযান মাস ও আমাদের করণীয়

Joined
May 20, 2024
Threads
34
Comments
61
Reactions
462
রমযান মাস ও আমাদের করণীয়
আবদুর রাকিব নাদভী

সামনে রমযান মাস, রমযান মাস আগমনের পূর্বেই রমযান মাসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং রোযার অভ্যাস গড়ে তুলা উচিত। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান মাস আগমনের পূর্ব থেকেই রমযান মাসের জন্য প্রস্তুতি নিতেন এবং শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল সিয়াম পালন করতেন। আমাদেরও উচিত শাবান মাসে নফল সিয়াম পালনের মাধ্যমে রমযান মাসের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
* রমযানের আগমনে সালাফদের প্রস্তুতি:
সালাফে সালেহীন (পূর্ববর্তী সৎকর্মীদের) সাহাবি, তাবেয়ী‌, তাবে তাবেয়ীন এবং পূর্ববর্তী সৎকর্মী আলেমগণ রমযানের আগমনে বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিতেন, সীমাহীন আনন্দ প্রকাশ করতেন এবং এই বরকতময় মাস পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন।
* রমযান মাস বরকতময় মাস, যারাই এ মাস পাবে তাদের ওপর অপরিহার্য সিয়াম পালন করা। এই মর্মে বিশ্ব পালন কর্তা আল্লাহ তাআলা বলেন:হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সুরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৩)।
আর যারা অসুস্থ, অথবা ভ্রমন অবস্থায় রয়েছেন তাদেরকে বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশেষ ছাড় দিয়েছেন, তিনি স্বয়ং বলেন: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই মাসটি পাবে, সে সিয়াম পালন করবে। আর যে ব্যক্তি অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, জটিলতা কামনা করেন না। (সুরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৫)।
অনুরূপ দুগ্ধদানকারিনী ও গর্ভবতী মহিলাগণ যদি সিয়াম পালনে কষ্ট হয়, নিজের অথবা সন্তানের ঘতি আশঙ্কা করে, তাহলে তারা অসুস্থ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত, তাদের জন্য ছাড় রয়েছে, পরে রোযা কাযা করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ মুসাফির থেকে অর্ধেক সলাত হ্রাস করেছেন এবং মুসাফির, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিণীকে সিয়াম রাখার ব্যাপারে অবকাশ দিয়েছেন। (সুনান নাসায়ী হাদিস নং ২৩১৫ হাদীসের মান: হাসান)।
আর যারা এমন রোগে আক্রান্ত যা থেকে সুস্থতার আশা নেই বা এমন বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছেছে, সিয়াম পালনে একেবারেই অক্ষম তাদের জন্য বিশেষ করুণা এবং ছাড় রয়েছে, প্রত্যেক সিয়াম এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। আল্লাহর তাআলা বলেন: আর এটি (সিয়াম পালন) যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। (সুরা বাকারাহ আয়াত নং ১৮৫)।
* সিয়ামের ফজিলত: আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :যে ব্যক্তি ঈমানের অবস্থায় নেকির আশায় রমযানের সিয়াম পালন করে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৮)।
সাহল (রাঃ) থেকে বর্ণিত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: নিশ্চয়ই জান্নাতে রাইয়্যান নামক একটি দরজা আছে, এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন শুধু সওম পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাঁদের ব্যতীত আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেয়া হবে, সওম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তাঁরা ব্যতীত আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাঁদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। যাতে করে এ দরজাটি দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৬)।
কিছু করণীয়:
১) বেশি বেশি নফল সালাত পড়া বিশেষ করে তারাবীহ নামায পড়া: ‎এই মর্মে আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন যে, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন: যে ব্যক্তি রমযানের রাতে ঈমানের অবস্থায় নেকির আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তাঁর পূর্বের গুনাহ্‌ মাফ করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৭)।
২) বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা: আল্লাহ বলেন: "রমযান মাস হলো সে মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত, সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। (সূরা বাকারা: ১৮৫)
৩) নিরক্ষরতার কারণে যদি কেউ কুরআন তেলাওয়াতে সক্ষম না হয়, তাহলে কুরআন তেলাওয়াত করতে শিখার চেষ্টা করবে, এতে সক্ষম না হলে কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: .....আর রমাযানের প্রতি রাতেই জিবরীল (আ.) তাঁর ( রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অপরকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন।(সহিহ বুখারী হাদিস নং ৬, ১৯০২, ৩২২০)।
৪) বেশি বেশি দান ও খাইরাত করা: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমাযান মাসে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরীল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমাযানের প্রতি রাতেই জিবরীল (আ.) তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং তারা একে অপরকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রহমতের বায়ু চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন। (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৬, ১৯০২, ৩২২০)।
৫) একজন মুমিনের করণীয় তাঁর জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্তকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যস্ত রাখা, রমযান মাস আসলে ইবাদতের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করে দেওয়া, নেকির কাজে নিজেকে আগের চেয়ে বেশি অগ্রসর করা: আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: শায়তান ও দুষ্ট জিন্‌দেরকে রমযান মাসের প্রথম রাতেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং এর একটি দরজাও তখন আর খোলা হয় না, খুলে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো এবং এর একটি দরজাও তখন আর বন্ধ করা হয় না। (এ মাসে) একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিতে থাকেন: হে কল্যাণ অন্বেষণকারী! অগ্রসর হও। হে পাপা সক্ত! বিরত হও। আর বহু লোককে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ হতে এ মাসে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক রাতেই এরূপ হতে থাকে।
(জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৬৮২
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস)।
৬) আত্মা পরিশুদ্ধ ও উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা: রমযান মাস হল আত্মার পরিশুদ্ধ ও উত্তম চরিত্রের প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাস, মানুষের উচিত বেশি বেশি করে নেকির কাজে এগিয়ে যাওয়া এবং অশালীন ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা: আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: সিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মত কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুই বার বলে, আমি সওম পালন করছি। (সহিহ বুখারী হাদিস নং ১৮৯৪)।
৭) বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তেগফার করা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ভুলুন্ঠিত হোক তার নাক যার নিকট রমযান মাস এলো অথচ তার গুনাহ্‌ মাফ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা পার হয়ে গেল। (সুনান তিরমিযী হাদিস নং ৩৫৪৫ হাদিসের মান: হাসান সহিহ)।
৮) ইফতার করানো:‎ যাইদ ইবনে খালিদ আল জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে ইফতার করায়, তাকে সিয়াম পালন কারীর সমপরিমাণ নেকি দেওয়া হবে, সিয়াম পালন কারীর সাওয়াব হতে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না। (সুনান তিরমিযী হাদিস নং ৮০৭ হাদিসের মান: সহিহ)।
৯) শেষ দশকে কদর রাত অনুসন্ধান করা: এটি একটি মহিমান্বিত রাত, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ বলেন: নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাযিল করেছি কদর রাতে। তুমি কি জানো কদর রাত্রি কী? এটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এই রাতে ফেরেশতারা বর্গ ও জিবরাইল (আ.) তাঁদের রবের অনুমতিতে প্রত্যেক বিষয়ে অবতরণ করেন। এটি শান্তিময় রাত, যা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কদর: ১-৫)
আম্মা আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদ্‌রের অনুসন্ধান কর। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৭)।
১০) ইতেকাফ করা: আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমযানে দশ দিনের ই‘তিকাফ করতেন। যে বছর তিনি ইন্তিকাল করেন সে বছর তিনি বিশ দিনের ইতিকাফ করেছিলেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০৪৪)
১১) বেশি বেশি দুআ করা: কারণ দুআ হচ্ছে ইবাদতের মূল, দুআ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তাই এই পবিত্র মাস কে মূল্যায়ন করে বেশি বেশি দুআ করা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তিনজনের দু'আ ফিরিয়ে দেয়া হয় নাঃ ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু'আ, রোযাদারের ইফতারের সময়কালীন দু'আ এবং মাযলুমের দু'আ। (সুনান তিরমিযী হাদিস নং ২৫২৬ হাদিসের মান: সহিহ)।
১২) ফিতরা আদায় করা: ‎আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের সালাতের বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৫০৩)
উপসংহার: আমাদের উচিত এই বরকতময় মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। গুনাহ থেকে বিরত থাকা, নেক আমল বৃদ্ধি করা, বেশি বেশি দান-সদকা করা, পবিত্র আল কুরআন তিলাওয়াত করা, নামাজ-রোজার প্রতি যত্নবান হওয়া এবং আল্লাহর কাছে নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করা। হে আল্লাহ, আমাদের রব! তুমি আমাদের সবাইকে রমযান মাসে বেশি বেশি ইবাদত করে তোমার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করার তওফিক দাও। আমিন।
 
Back
Top