ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার সুন্নাহর অগ্রাধিকার (ফিকহী নীতি)

  • Thread Author
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কীভাবে ফতোয়া দিতেন, তা তিনি নিজেই স্পষ্ট করে গেছেন। আল-খতিব আল-বাগদাদী ও ইমাম ইবনে আব্দুল বার তাঁর ফতোয়া প্রদানের ক্রমিক নিয়ম বর্ণনা করেছেন:

প্রথমত: আল্লাহর কিতাব (কুরআন)।

দ্বিতীয়ত: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস (সহিহ, হাসান এমনকি মুরসাল হাদিসকেও তিনি সাধারণ কিয়াসের চেয়ে অগ্রাধিকার দিতেন)।



তৃতীয়ত: সাহাবিদের মতামত (আছার)।



চতুর্থত: যখন কুরআন, সুন্নাহ বা সাহাবিদের কোনো আসার পাওয়া যেত না, কেবল তখনই তিনি 'কিয়াস' বা গবেষণার আশ্রয় নিতেন।



ইমাম আবু হানিফা বলেন

"আমি আল্লাহর কিতাব থেকে দলিল গ্রহণ করি। সেখানে না পেলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করি। আর সেখানেও না পেলে সাহাবিগণের মতামত গ্রহণ করি..."

— রেফারেন্স: জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি (ইবনে আব্দুল বার, ২/৯০৭); তারিখে বাগদাদ (খতিব বাগদাদী, ১৩/৩৬৮)।



ইমাম হাফিজ ইবনে কাছীর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া' (البداية والنهاية)-এর ১০ম খণ্ডে, ১৫০ হিজরীর ঘটনাবলী অংশে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ইন্তেকালের বিবরণী ও জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর প্রশংসা, তাকওয়া, জ্ঞান ও চরিত্রের বিষদ বিবরণ দিয়েছেন।

"যে ব্যক্তি ফিকহ শাস্ত্রে গভীরতা অর্জন করতে চায়, সে যেন আবু হানিফা ও তাঁর সঙ্গীদের আঁকড়ে ধরে। কারণ ফিকহ শাস্ত্রে সকল মানুষই আবু হানিফার মুখাপেক্ষী (عيال على أبي حنيفة)।"

— (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ১০৭-১০৮)



ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারি (রহ.) তাঁর রচনাবলীতে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে যে প্রশংসা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন, তার সংক্ষিপ্ত রূপ নিচে দেওয়া হলো:

উচ্চমানের তাকওয়া ও ঈমানী দৃঢ়তা: খলিফা আল-মনসুরের অন্যায্য শাসনের অধীনে প্রধান বিচারকের পদ প্রত্যাখ্যান করা এবং এর জন্য অত্যাচার ও কারাবরণ সহ্য করাকে তাবারি তাঁর সর্বোচ্চ খোদাভীতি ও আপসহীন চরিত্রের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইরাক ও কুফার শ্রেষ্ঠ ফকীহ: তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন তৎকালীন কুফা ও সমগ্র ইরাক অঞ্চলের ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র)-এর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ও শ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় ইমাম।

ফিকহী গবেষণায় সর্বোচ্চ মর্যাদা: তাঁর বিখ্যাত 'ইখতিলাফুল ফুকাহা' গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফার ইজতিহাদ ও মতামতকে অন্যান্য বড় মুজতাহিদ ইমামদের সমতুল্য সম্মান দিয়ে মৌলিক ফিকহী দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

অধ্যায়/পরিচ্ছেদ: ১৫০ হিজরীর ঘটনাবলী (ذكر وفاة أبي حنيفة رحمه الله / আবু হানিফার ইন্তেকালের বিবরণ)

খণ্ড ও পৃষ্ঠা:

দারুল মাআরিফ সংস্করণ (মিসর): খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৮–৩৯।

দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ সংস্করণ (বৈরুত): খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৯৬–৪৯৭



এগুলো তো বললাম আমাদের ইমাম আবু হানিফার সম্পর্কে এখন আসি আমাদের মাযহাবের হাদিসের পন্ডিতদের বিবরণে





১. প্রাচ্যের বিখ্যাত ক্লাসিক্যাল মুহাদ্দিসগণ ।





১. ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী (রহ.) [মৃত্যু: ৩২১ হিজরী]

হানাফী মাযহাবের সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রথম সারির মুহাদ্দিসদের একজন। তিনি হাদিসের সনদ ও ফিকহী প্রয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই অসাধারণ পারদর্শী ছিলেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: শারহু মাআনিল আছার (شرح معاني الآثار) এবং বায়ানু মুশকিলিল আছার।



২. ইমাম জামালুদ্দীন আজ-যাইলাঈ (রহ.) [মৃত্যু: ৭৬২ হিজরী]

হাদিসের সনদ যাচাই বা 'তাখরীজ' শাস্ত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানীসহ (রহ.) পরবর্তী যুগের বহু শাফেঈ মুহাদ্দিস তাঁর কাজের ওপর নির্ভর করেছেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: নাসবুর রায়াহ লি-আহাদীসিল হিদায়াহ (نصب الراية)।



৩. ইমাম বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) [মৃত্যু: ৮৫৫ হিজরী]

তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ ও মুহাদ্দিস। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর 'সহিহ বুখারী'-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ তিনি রচনা করেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: উমদাতুল ক্বারী শারহু সহিহিল বুখারী (عمدة القاري) - এটি ২৫+ খণ্ডের সুবিশাল একটি শরাহ।



৪. মোল্লা আলী আল-ক্বারী (রহ.) [মৃত্যু: ১০১৪ হিজরী]

মক্কা মোয়াজ্জমায় অবস্থানকারী এই মহান মুহাদ্দিস ও ফকীহ হাদিসের বিভিন্ন মূল কিতাবের অসাধারণ ব্যাখ্যা লিখে গেছেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: মিরকাতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাসাবীহ (مرقاة المفاتيح)।



২. ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিসগণ



উপমহাদেশে হাদিস চর্চার পুনর্জাগরণ ও প্রসারে হানাফী মুহাদ্দিসদের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর:



৫. আল্লামা আব্দুল হাই লখনভী (রহ.) [মৃত্যু: ১৩০৪ হিজরী]

কম বয়সে ইন্তেকাল করলেও তিনি হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের (বর্ণনাকারীদের যাচাই) ওপর বহু কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: আল-রাফ'উ ওয়াত-তাকমীল (الرفع والتكميل) এবং জাফারুল আমানী।



৬. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) [মৃত্যু: ১৩৫২ হিজরী]

তৎকালীন যুগের অন্যতম সেরা স্মৃতিধরের অধিকারী এই হাদিস বিশারদকে বহু আলেম "তাঁর যুগের ইবনে হাজার আসকালানী" বলে অভিহিত করেছেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: ফয়জুল বারী শারহু সহিহিল বুখারী (فيض الباري)।



৭. আল্লামা জাফর আহমাদ উসমানী (রহ.) [মৃত্যু: ১৩৯৪ হিজরী]

হানাফী ফিকহের মূল ভিত্তি যে সরাসরি সহিহ হাদিস—তা প্রমাণ করার জন্য তিনি বিশাল এক হাদিস
সংকলন তৈরি করেন।

বিখ্যাত গ্রন্থ: ই'লাউস সুনান (إعلاء السنن) - এটি ২০ খণ্ডের একটি সুবিশাল হাদিস ও ফিকহী প্রমাণের বিশ্বকোষ।
 
Back
Top