অন্যান্য কুরআন তেলাওয়াতের নিয়্যাত ও ফযীলতসমূহ

কুরআন তিলাওয়াতের নিয়্যাত ও ফযীলতসমূহ​


মো: তাজাম্মুল হক সালাফী​

ভুমিকা:​


ইসলামে যে কোনো ইবাদতের কবুলিয়াত এবং তার প্রতিদানের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। মহানবী মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا، أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ​

নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ীই ফল পাবে। সুতরাং যার হিজরত দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে যার জন্য সে হিজরত করেছে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং-১)।

মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কেবল একটি সাধারণ বই নয়, এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক জীবন্ত মুজিজা, নূর এবং হিদায়েতের আলো। তাই এই মহাগ্রন্থ গ্রন্থ তিলাওয়াতের পূর্বে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। একজন মুমিন যখন কেবল দায়িত্ব পালনের জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু মহান উদ্দেশ্য ও নিয়ত অন্তরে ধারণ করে কুরআন তিলাওয়াত করে, তখন তার এই ইবাদত এক অভূতপূর্ব আত্মিক রূপ লাভ করে। সঠিক নিয়তের মাধ্যমে সাধারণ তিলাওয়াতও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, অন্তরের রোগ থেকে মুক্তি এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মহাকল্যাণ লাভের এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাই তিলাওয়াত শুরুর আগে নিয়ত ঠিক করে নেওয়া কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত পাওয়ার জন্য জরুরী।

কুরআন তেলাওয়াতের নিয়্যাতসমূহ :​

১. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন​

কুরআন তিলাওয়াতের প্রধান এবং প্রথম নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর ভালোবাসা লাভ করা। লোকদেখানো বা সুনাম অর্জনের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করলে তা ইবাদত না হয়ে গুনাহের কারণ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا (110)​

"বলুন, আমি তো কেবল তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী নাযিল হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ আশা করে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকেও শরীক না করে।" [1]

রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যাদের বিচার করে জাহান্নামে পাঠানো হবে, তাদের মধ্যে একজন এমন ব্যক্তি যে কুরআন শিখেছিল ও তিলাওয়াত করেছিল যাতে মানুষ তাকে 'কারী' বা ভালো পাঠক বলেছিল। ফলে দুনিয়াতে সে তার প্রশংসা পেয়ে গেছে এবং আখিরাতে তার জন্য কোনো সওয়াব নেই। [2]

২. হেদায়েত ও সঠিক পথের দিশা লাভ​


কুরআন তিলাওয়াতের সময় অন্তরে এই নিয়ত রাখা যে, আমি এই মহান গ্রন্থ থেকে আমার জীবনের সঠিক পথ খুঁজে নেব এবং এর আদেশ-নিষেধ মেনে চলব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ﴾ "নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাপেক্ষা সরল ও সঠিক..."[3]

আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ "আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যত দিন তোমরা এ দুটি আঁকড়ে ধরে থাকবে, তত দিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না; আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।" [4]

৩. অন্তরের আরোগ্য (শিফা) ও মানসিক প্রশান্তি​


দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় আত্মিক রোগ (যেমন: হিংসা, অহংকার, লোকদেখানো মনোভাব) থেকে মুক্তি এবং হৃদয়ের প্রশান্তি লাভের নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ "আমি কুরআনে এমন কিছু নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য (শিফা) ও রহমত...।" [5]

তিনি আরও বলেন, ﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ "জেনে রেখো, আল্লাহর যিকির (স্মরণ/কুরআন তিলাওয়াত) দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।" [6]

৪. সওয়াব ও নেকি বৃদ্ধি করা​


কুরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর অসীম রহমত ও সওয়াব অর্জনের আশা অন্তরে রাখা। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لاَ أَقُولُ الْم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ.​

"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে। আর একটি নেকি দশটি নেকির সমান করা হয়। আমি বলি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর।" [7]

৫. কুরআনকে কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী বানানো​


হাশরের ময়দানের সেই কঠিন ও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কুরআন যেন আল্লাহর কাছে আমাদের ক্ষমার জন্য সুপারিশ করে, তিলাওয়াতের সময় এই নিয়ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ "তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো। কারণ, কিয়ামতের দিন কুরআন তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।" [8]

৬. আল্লাহর সাথে কথোপকথনের অনুভূতি​

তিলাওয়াত করার সময় মুমিনের মনে এই নিয়ত ও অনুভূতি থাকা উচিত যে, সে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর বাণী সরাসরি শুনছে এবং আল্লাহর সাথে কথা বলছে।

হাসান বসরী (রহ.) বলেন, "তোমাদের পূর্ববর্তীরা কুরআনকে তাদের রবের পক্ষ থেকে আসা বার্তা বা চিঠি মনে করত। তারা রাতে এটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করত এবং দিনে সে অনুযায়ী আমল করত।"

ফুযাইল (রহ.) বলেন, "কুরআন বহনকারী (হাফেজ বা আলেম) হলেন ইসলামের পতাকাবাহী। কুরআনের হকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁর উচিত হবে না আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত ব্যক্তিদের সাথে আমোদ-প্রমোদ করা, গাফেলদের সাথে গাফেল হওয়া কিংবা অনর্থক কাজে লিপ্তদের সাথে অনর্থক কাজে জড়িয়ে পড়া।”[9]
উপসংহার : সঠিক নিয়তের মাধ্যমে একজন মানুষের সাধারণ তিলাওয়াতও আল্লাহর আরশে কবুল হয়ে যায় এবং তা দুনিয়া ও আখিরাতে মহাকল্যাণ বয়ে আনে। তাই তিলাওয়াত শুরুর আগে অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও মনকে স্থির করে নিয়তগুলো স্মরণ করে নেওয়া উচিত।

কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলতসমূহ​


ভাবুন তো, আপনার মোবাইলে যদি এমন একটি অ্যাপ থাকত, যেটি খুললেই প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে আপনার অ্যাকাউন্টে দশগুণ করে পুরস্কার জমা হয়! আমরা কি সেটি ছেড়ে দিতাম? অথচ আল্লাহর কিতাব আমাদের ঘরে আছে, আমাদের হাতের নাগালে আছে—কিন্তু কতজন আমরা প্রতিদিন তা খুলে দেখি? আজকের আলোচনা সেই জায়গাটিতেই আমাদের একটু নাড়া দেওয়ার জন্য।

কুরআনের আলোকে তেলাওয়াতের ফযীলতসূমহ

১. কুরআনের পরিচয় ও মর্যাদা​


তেলাওয়াতের ফযীলত বোঝার আগে আমাদের বুঝতে হবে—আমরা কার কালাম তেলাওয়াত করছি। কুরআন কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়। এটি সৃষ্টিকর্তার কালাম, বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আসা সরাসরি বার্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ

অর্থ: নিশ্চয়ই এই কুরআন সেই পথের দিকে পরিচালিত করে, যা সবচেয়ে সরল ও সঠিক। [10]
আল্লাহ আরও বলেন: شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ
অর্থ: রমযান মাস—যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত হিসেবে এবং সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও (হক-বাতিলের) পার্থক্যকারী হিসেবে। [11]

ভাইয়েরা, একটু ভাবুন—যে কালামের নাযিল হওয়ার কারণে একটি মাস পুরো উম্মাহর কাছে সম্মানিত হয়ে গেল, সেই কালামের মর্যাদা কত উঁচু! আর আল্লাহর সেই কালামের তেলাওয়াত করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সৌভাগ্য ও মরযাদার বিষয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, «إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا، وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে কিছু জাতিকে সম্মানিত করেন এবং অন্যদের অপমানিত করেন। [12]

তাই কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আমাদের ইজ্জত-সম্মানের সাথে, আমাদের উত্থান-পতনের সাথে জড়িত।

২. কুরআনে তেলাওয়াতের নির্দেশ ও প্রশংসা ​

আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে তেলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তেলাওয়াতকারীদের প্রশংসা করেছেন।
ধীরস্থিরভাবে তেলাওয়াতের আদেশ : আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا​

অর্থ: আর তুমি কুরআন তেলাওয়াত করো ধীরে ধীরে, স্পষ্ট ও সুবিন্যস্তভাবে। [13]

এখানে শুধু “পড়ো” বলা হয়নি; বলা হয়েছে “তারতীলের সাথে পড়ো”—অর্থাৎ থেমে থেমে, বুঝে বুঝে, হৃদয় দিয়ে। তেলাওয়াত তাড়াহুড়োর বিষয় নয়, এটি আল্লাহর সাথে কথোপকথনের মুহূর্ত।
সালাতের সাথে তেলাওয়াতের নির্দেশ : আল্লাহ তাআলা বলেন-
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ​
অর্থ: তোমার প্রতি ওহীর মাধ্যমে যে কিতাব পাঠানো হয়েছে তা তেলাওয়াত করো এবং সালাত কায়েম করো। [14]
যথাযথ তেলাওয়াত করতে হবে : আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ أُولَٰئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ​
অর্থ: আমি যাদের কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথাযথভাবে তেলাওয়াত করে; তারাই এতে ঈমান রাখে। [15]

মুফাসসিরগণ বলেছেন, “হাক্কা তিলাওয়াতিহী” অর্থ—শুধু মুখে পড়া নয়; হালালকে হালাল জানা, হারামকে হারাম জানা, আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং কুরআনের অর্থ নিয়ে চিন্তা করা। অর্থাৎ তেলাওয়াত হলো আমলের প্রথম ধাপ, শেষ ধাপ নয়।

৩. তেলাওয়াতকারীরা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না​

আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً يَرْجُونَ تِجَارَةً لَنْ تَبُورَ (29) لِيُوَفِّيَهُمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدَهُمْ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّهُ غَفُورٌ شَكُورٌ (30) ​
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করে, যার কোনো ক্ষতি নেই। (এ কারণে) যে আল্লাহ তাদের প্রতিদান পূর্ণ করে দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বাড়িয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। [16]

সুবহানাল্লাহ! আমরা দুনিয়ার ব্যবসায় লাভ-লোকসানের হিসাব কষি, রাতে ঘুম হারাম করি। আর আল্লাহ বলছেন—কুরআন তেলাওয়াত এমন এক ব্যবসা, যেখানে লোকসান নেই। আর শুধু প্রতিদান নয়, নিজ অনুগ্রহে আরও বাড়িয়েও দেবেন। এখানে “শাকূর” শব্দটির মানে—তিনি সামান্য আমলেরও কদর করেন।

৪. তেলাওয়াত ঈমান বৃদ্ধি করে​


إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ​

অর্থ: প্রকৃত মুমিন তারাই, আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, আর যখন তাঁর আয়াত তাদের সামনে তেলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয় এবং তারা তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। [17]
এ আয়াত আমাদের শেখায়, ঈমান একটি স্থির জিনিস নয়—এটি বাড়ে এবং কমে। আর ঈমান বাড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি হলো কুরআন তেলাওয়াত।

৫.কুরআন আরোগ্য ও রহমত​

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِين​
অর্থ: আমি কুরআনে এমন কিছু নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। [18]

৬.তেলাওয়াতকারীর হৃদয় আল্লাহর ভয়ে কম্পিত হয়​

আল্লাহ বলেন-تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
যারা তাদের রবকে ভয় করে, এই কিতাব শুনলে তাদের শরীরের চামড়া শিহরিত হয়, তারপর আল্লাহর স্মরণে তাদের শরীর ও অন্তর নরম হয়ে যায়। [19]
আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার—শেষ কবে কুরআনের আয়াত পড়ে বা শুনে আমাদের হৃদয় এভাবে নরম হয়েছিল?

সহীহ হাদীসের আলোকে তেলাওয়াতের ফযীলতসমূহ ​

১. কুরআন শেখা ও শেখানোর মর্যাদা​

উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

অর্থ: তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। [20]দেখুন, সর্বোত্তমের মানদণ্ড ধনসম্পদ, পদমর্যাদা বা খ্যাতি নয়; সর্বোত্তম সে-ই, যে কুরআনের সাথে সম্পর্ক রাখে। ছোট্ট শিশুকে যে মা আলিফ-বা-তা শেখান, মসজিদে যে মক্তবের শিক্ষক আছেন—তাঁরা সবাই এই সুসংবাদের অধিকারী।

২. প্রতিটি হরফে দশ নেকী​


আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لاَ أَقُولُ الْم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ.
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ পড়ল, তার জন্য একটি নেকী; আর প্রতিটি নেকী দশগুণ করে দেওয়া হয়। আমি বলছি না যে ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি হরফ; বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ।” [21]
হিসাব করুন! “আলিফ-লাম-মীম” পড়লে তিনটি হরফ, প্রতিটিতে দশ নেকী—মোট ৩০ নেকী। সূরা ফাতিহা পড়লে কত নেকী? সূরা ইখলাস পড়লে? এক পৃষ্ঠা পড়লে? পুরো কুরআন একবার খতম করলে কত লক্ষ নেকী! আর এই প্রতিদান আমরা পাচ্ছি এমন একটি কাজে, যা কয়েক মিনিটেই করা যায়।

৩. দক্ষ তেলাওয়াতকারী ও কষ্ট করে তেলাওয়াতকারী—উভয়ের জন্য সুসংবাদ​

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ، وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ​

অর্থ: কুরআনে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত ও পুণ্যবান ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি আটকে আটকে কুরআন পড়ে এবং তা তার জন্য কষ্টকর, তার জন্য রয়েছে দুটি প্রতিদান। [22]
এই হাদীস আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য কত বড় আশার বার্তা! যাঁদের তিলাওয়াত এখনো আটকে যায়, উচ্চারণ কঠিন লাগে, বয়স হয়ে গেছে বলে শিখতে কষ্ট হয়—তাঁরা যেন হতাশ না হন। আপনার প্রতিটি আটকে যাওয়া, প্রতিটি কষ্টের জন্য আল্লাহর কাছে দ্বিগুণ প্রতিদান জমা হচ্ছে। শুধু শর্ত—চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

৪. মুমিন ও মুনাফিকের তেলাওয়াতের দৃষ্টান্ত​

আবূ মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَثَلُ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ: كَالأُتْرُجَّةِ طَعْمُهَا طَيِّبٌ، وَرِيحُهَا طَيِّبٌ، وَالَّذِي لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ: كَالتَّمْرَةِ طَعْمُهَا طَيِّبٌ وَلاَ رِيحَ لَهَا، وَمَثَلُ الفَاجِرِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ: كَمَثَلِ الرَّيْحَانَةِ رِيحُهَا طَيِّبٌ، وَطَعْمُهَا مُرٌّ، وَمَثَلُ الفَاجِرِ الَّذِي لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ: كَمَثَلِ الحَنْظَلَةِ طَعْمُهَا مُرٌّ، وَلاَ رِيحَ لَهَا "​

"যে মুমিন কুরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো কমলালেবুর মতো—যার স্বাদও উত্তম এবং সুঘ্রাণও চমৎকার। আর যে মুমিন কুরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো খেজুরের মতো—যার স্বাদ মিষ্টি কিন্তু কোনো সুঘ্রাণ নেই।" "পক্ষান্তরে, যে পাপাচারী (মুনাফিক/ফাজের) কুরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো রায়হান (সুগন্ধি) উদ্ভিদের মতো—যার ঘ্রাণ চমৎকার কিন্তু স্বাদ তিক্ত। আর যে পাপাচারী কুরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো মাকাল ফলের (হানযালাহ) মতো—যার স্বাদও তিক্ত এবং কোনো সুঘ্রাণও নেই।”[23]
এই হাদীসে তেলাওয়াতকারী মুমিনের চরিত্রের একটি সুন্দর ছবি আঁকা হয়েছে। তেলাওয়াতকারীর চারপাশে একটি সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে—তার আচরণে, কথায়, চেহারায় ও পরিবেশে।

৫. আল্লাহ মনোযোগ দিয়ে শোনেন​

আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, «لَمْ يَأْذَنِ اللَّهُ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَتَغَنَّى بِالقُرْآنِ
আল্লাহ কোনো কিছুর প্রতি এত মনোযোগ দিয়ে কান পাতেন না, যতটা মনোযোগ দিয়ে কান পাতেন এমন নাবীর প্রতি, যিনি সুমধুর কণ্ঠে স্পষ্টভাবে কুরআন তেলাওয়াত করেন। [24]
আর বারা ইবনে আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ
অর্থ: তোমরা তোমাদের কণ্ঠ দিয়ে কুরআনকে সুসজ্জিত করো। [25]
তাই সুর যেমনই হোক, ভুল-শুদ্ধ শিখে, সুন্দর করে পড়ার চেষ্টা করুন। ভালো কণ্ঠ না থাকলেও ক্ষতি নেই; আল্লাহ আপনার আন্তরিকতা দেখেন।

(৬) সূরা ইখলাসের মর্যাদা​

আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি অন্য একজনকে বারবার সূরা ইখলাস পড়তে শুনে সকালে রাসূল ﷺ-এর কাছে বিষয়টি ছোট করে বলল। তখন রাসূল ﷺ বললেন,

«وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ القُرْآنِ»​

যাঁর হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয়ই এই সূরা কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। [26]

৭. সাকীনা, প্রশান্তি ও বরকত নাযিল হয় ​

(ক) সাকীনা, রহমত ও ফেরেশতাদের ঘিরে রাখে।
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ، يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ، إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمِ السَّكِينَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ، ​

যখন কোনো দল আল্লাহর কোনো ঘরে (মসজিদে) একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং নিজেদের মধ্যে তা পড়ে-পড়ায়, তখন তাদের ওপর সাকীনা (প্রশান্তি) নাযিল হয়, রহমত তাদের ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর কাছে থাকা ফেরেশতাদের সামনে তাদের কথা আলোচনা করেন। [27]
ভাবুন! সৃষ্টিকুলের মালিক আসমানে ফেরেশতাদের মজলিসে আপনার নাম নিচ্ছেন। এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে?

(খ) সাহাবীর ঘটনা​

বারা ইবনে আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি (উসাইদ ইবনে হুদাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাতে সূরা কাহফ তেলাওয়াত করছিলেন, পাশে তাঁর ঘোড়া বাঁধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি লাফালাফি শুরু করল। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, মেঘের মতো কিছু একটি তাঁকে ঢেকে রেখেছে। সকালে নবী ﷺ-কে জানালে তিনি বললেন, ওটা ছিল সাকীনা, যা কুরআনের কারণে নাযিল হয়েছিল। [28]

(গ) অন্তরের প্রশান্তি
আল্লাহ কুরআনকেই ‘যিকর’ নাম দিয়েছেন:

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ​
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি এই যিকর (কুরআন) নাযিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক। [29]
আর যিকরের ফল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ (28) “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” [30]আজ আমাদের ঘরে সবকিছু আছে, তবু অশান্তি কেন? কারণ আমরা প্রশান্তির উৎস থেকে দূরে সরে গেছি।

৮. ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়​

আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, «لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ» তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিয়ো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, সেই ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। [31]
আবূ মাসঊদ আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, «الْآيَتَانِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ مَنْ قَرَأَهُمَا فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ . যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। [32]
আপনার ঘর কি কুরআনের আওয়াজে মুখরিত, নাকি শুধু টিভি আর মোবাইলের শব্দে ভরা?

৯. আয়তাল কুরসীর ফযীলত​

আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, শয়তান তাকে বলেছিল—"তুমি যখন রাতে ঘুমাতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসি পড়বে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বদাই তোমার জন্য একজন রক্ষক (ফেরেশতা) নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না।" পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ঘটনা শুনে বলেন, "সে (শয়তান) চরম মিথ্যাবাদী হলেও তোমাকে এই কথাটি সত্য বলেছে।" [33]
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবলেন-

«مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُولِ الْجَنَّةِ إِلَّا أَنْ يَمُوتَ»​
যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।[34]

আখিরাতে কুরআন তেলাওয়াতের প্রতিদান ​

১. কিয়ামতের দিন কুরআন সুপারিশ করবে এবং সূরা বাকারা ও আলে ইমরান ওকালতি করবে।​

আবূ উমামা বাহিলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:

اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ، اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ الْبَقَرَةَ، وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ، فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ، أَوْ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ، أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرٍ صَوَافَّ، تُحَاجَّانِ عَنْ أَصْحَابِهِمَا، اقْرَءُوا سُورَةَ الْبَقَرَةِ، فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ، وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ، وَلَا تَسْتَطِيعُهَا الْبَطَلَةُ»

“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কারণ কিয়ামতের দিন তা তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। তোমরা ‘জাহরাওয়াইন’ তথা দুটি উজ্জ্বল সুরা—সুরা আল-বাকারাহ এবং সুরা আলে ইমরান পাঠ করো; কেননা কিয়ামতের দিন এই সুরা দুটি এমনভাবে আসবে যেন তারা দুটি মেঘখণ্ড, অথবা দুটি ছায়া দানকারী মেঘের চাদর, অথবা ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখির দুটি দল, যারা তাদের পাঠকারীদের পক্ষে আল্লাহর দরবারে জোরালো যুক্তি বা ওকালতি করবে। তোমরা সুরা আল-বাকারাহ পাঠ করো; কারণ তা গ্রহণ করার মধ্যে রয়েছে বরকত (কল্যাণ) এবং তা বর্জন বা পরিত্যাগ করার মধ্যে রয়েছে আফসোস ও অনুতাপ। আর কোনো বাতিলপন্থী বা জাদুকর এর মোকাবিলা করার সামর্থ্য রাখে না।”[35]

২. জান্নাতে মর্যাদার সিঁড়ি হবে​

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কুরআনের সঙ্গীকে (জান্নাতে) বলা হবে, يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ: اقْرَأْ، وَارْتَقِ، وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنَّ مَنْزِلَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَؤُهَا "
“পড়তে থাকো আর উপরে উঠতে থাকো। দুনিয়ায় যেভাবে ধীরে ধীরে পড়তে, এখানেও সেভাবে পড়ো। কারণ তোমার স্থান হবে সেই জায়গায়, যেখানে তুমি শেষ আয়াতটি পড়বে।”
[36] সুবহানাল্লাহ! যে যত বেশি পড়বে, যত বেশি মুখস্থ করবে, জান্নাতে তার মর্যাদা তত উঁচু হবে।

৩. কুরআন আপনার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সাক্ষী​

আবূ মালিক আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন: وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ
অর্থ: আর কুরআন হয় তোমার পক্ষে প্রমাণ, নয়তো তোমার বিপক্ষে প্রমাণ। [37]
কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি তা পড়ি, বুঝি ও মানি, তবে কুরআন আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আর যদি ছেড়ে দিই, তবে বিপক্ষে। আল্লাহ বলেন, কিয়ামতের দিন রাসূল ﷺ আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন: وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
অর্থ: আর রাসূল বলবেন, হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার ক


[1] সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০।
[2] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯০৫।
[3] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৯।
[4] মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ৩৩৩৮।
[5] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮২।
[6] সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ২৮।
[7] সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং ২৯১০।
[8] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮০৪।
[9] ইমাম নববী (রহ.) তাঁর অপর বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ আল-মাজমু' শারহুল মুহাজ্জাব-এর ২য় খণ্ড, ১৬৯ পৃষ্ঠা (দারুল ফিকর সংস্করণ)।
[10] সূরা বনী ইসরাঈল/ইসরা ১৭:৯
[11] সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫
[12] সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮১৭।
[13] সূরা আল-মুযযাম্মিল ৭৩:৪।
[14] সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৫।
[15] সূরা আল-বাকারা ২:১২১।
[16] সূরা ফাতির ৩৫:২৯-৩০।
[17] সূরা আল-আনফাল ৮:২।
[18] সূরা বনী ইসরাঈল/ইসরা ১৭:৮২।
[19] সূরা আয-যুমার ৩৯:২৩।
[20] সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০২৭।
[21] জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯১০ , শাইখ আলবানীও সহীহ বলেছেন।
[22] সহীহ বুখারী ৪৯৩৭; সহীহ মুসলিম ৭৯৮।
[23] সহীহ বুখারী ৫০২০; সহীহ মুসলিম ৭৯৭।
[24] সহীহ বুখারী ৫০২৩; সহীহ মুসলিম ৭৯২।
[25] সুনানে আবূ দাঊদ ১৪৬৮; আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
[26] সহীহ বুখারী ৫০১৩; সহীহ মুসলিম ৮১১।
[27] সহীহ মুসলিম ২৬৯৯।
[28] সহীহ বুখারী ৫০১১; সহীহ মুসলিম ৭৯৬।
[29] সূরা আল-হিজর ১৫:৯।
[30] সূরা আর-রা’দ ১৩:২৮।
[31] সহীহ মুসলিম ৭৮০।
[32] সহীহ বুখারী ৫০০৮; সহীহ মুসলিম ৮০৭।
[33] সহীহ বুখারী: ২৩১১।
[34] সহীহা-৯৭২।
[35] মুসলিম-৮০৪।
[36] সুনানে আবূ দাঊদ ১৪৬৪; জামে তিরমিযী ২৯১৪; আলবানী সহীহ বলেছেন।
[37] সহীহ মুসলিম ২২৩।
 
Similar content Most view View more
Back
Top