- Joined
- Dec 28, 2025
- Threads
- 3
- Comments
- 3
- Reactions
- 21
- Thread Author
- #1
অনুচ্ছেদ-১
জেনে রাখো – আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন – আমাদেরকে আমাদের রব দুনিয়াতে এই জন্য পাঠাননি যে, এই দুনিয়া আমাদের জন্য স্থায়ী নিবাস হয়ে থাকবে, তবে যেন এই দুনিয়া আমাদের জন্য যাত্রাপথের একটি বিরামস্থল ও দুর্গের ন্যায় আবাসস্থল হয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো: আমাদের মহান রব আমাদেরকে যেই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন অর্থাৎ যেই দায়িত্ব দিয়ে আমাদের নিকট তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন শুধু সেই দায়িত্বটুকু সম্পাদনের কথা বলা। এই জন্যই তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আর সেই দায়িত্বের কারণেই আমাদেরকে এই আবাসস্থলে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, এরপরে একদিন এখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে এই দুই নিবাসের যে কোনো একটিতে গমন করতে হবে:
“নিশ্চয় নেককারগণ বেহেশতে অবস্থান করবেন, আর পাপিষ্ঠরা জাহান্নামে অবস্থান করবে” (আল ইনফিত্বার: ১৩,১৪) এরপরে আল্লাহ তা'আলা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিলেন কারা নেককার, আর কারা পাপিষ্ঠ। মহান আল্লাহ বলেন:
“যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে প্রবেশ করবে এমন বাগানসমূহে, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়, আর এটাই হলো মহা সাফল্য, আর যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর সীমাসমূহ লঙ্ঘন করবে, সে স্থায়ীভাবে এমন জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যেখানে তার জন্য রয়েছে লাঞ্চনাদায়ক শান্তি” (আন নিসা: ১৩,১৪)।
বিধায় আমাদের জন্য এটা অনুসন্ধান করা উচিত: এই আনুগত্যটি কেমন? আর এই অবাধ্যতা কেমন? আমরা অনুসন্ধান করতে যেয়ে দেখলাম আল্লাহ তা'আলা বলছেন:
"আমি কিতাবটিতে কোনো কিছুর বর্ণনা বাদ রাখিনি" (আল আন'আম: ৩৮)
তিনি আরো বলেছেন:
"আমি এই গ্রন্থটি আপনার প্রতি এই জন্যই নাযিল করেছি যাতে আপনি তাদেরকে তাদের মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দেন এবং মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ নাযিল করেছি” (আন নাহল: ৬৪)
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং তোমাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য করো। যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ করো, তাহলে সেই বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাক" (আন নিসা: ৫৯)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম” (আল মায়িদাহঃ ৩)।
সুতরাং আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারলাম (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) যিনি আমাদের রব আমাদেরকে যেই দীন পালনের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যেই দীনের অনুসরণ ব্যতীত আমাদের জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার অন্য কোনো উপায় রাখেননি। সেই দীন সম্পর্ণরূপে কুরআন, তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ এবং উম্মার ইজমা' এর মাঝে স্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। আর দীন পরিপূর্ণ হয়েছে।
সুতরাং এখানে কোনো সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নেই, আর আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে: প্রত্যেকটি বিষয় সংরক্ষিত, সুদৃঢ়। দলীল হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী:
"নিশ্চয় আমি যিকর নাযিল করেছি, আর আমিই তা সংরক্ষণ করব” (আল হিজর: ৯)।
এখান থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিতরূপে নিঃসংশয়ে ছুহীহ সাব্যস্ত হলো: কারো জন্য কোনো বিষয়ে ফাতাওয়া দেওয়া, বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং দীনের কোনো বিষয়ে আমল করা কুরআনের দলীল অথবা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত ছুহীহ দলীল অথবা আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মতানৈক্য বিহীন সুনিশ্চিত ইজমা' ব্যতীত বৈধ হবে না।
আর যে কোনো বিষয়কে সাব্যস্ত বা খণ্ডন করবে তার বক্তব্য কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত গ্রহণযোগ্য হবে না। যেহেতু একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর সাব্যস্তকারী বা খণ্ডনকারী নেই।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার সম্পর্কে কোনো সংবাদ প্রদান করা জায়েয হবে না একমাত্র এমন সংবাদের মাধ্যম ব্যতীত, যা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হয়ত কুরআনে অথবা সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে। বৈধতা একজন বৈধকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে, নিষেধাজ্ঞা একজন নিষিদ্ধকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে, আর ফরয একজন ফরয সাব্যস্তকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে। তাই কোনো বৈধকারী, নিষিদ্ধকারী এবং ফরয সাব্যস্তকারী একমাত্র সকল সৃষ্টির স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। যিনি ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই।
‘ইজমা' সম্পর্কিত আলোচনা এবং ‘ইজমা' এর পরিচয়:
আমরা ‘ইজমা' দ্বারা এই জন্য শুরু করলাম যে, ‘ইজমা' এর ব্যাপারে কারো মতানৈক্য নেই। সুতরাং আমরা আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে বলতে পারি: যখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ছহীহ সূত্রে ‘ইজমা' এর অনুসরণ করা ফরয সাব্যস্ত হলো আমাদের পূর্বে বর্ণিত আলোচনা এবং মহান আল্লাহর এই বাণী দ্বারা:
"যার কাছে হেদায়েতের পথ স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও সে রসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের রাস্তা ছেড়ে ভিন্ন রাস্তায় চলে, আমি তাকে তারই পথের অভিমুখী করে দেবো এবং আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। জাহান্নাম কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল" (আন নিসা: ১১৫)
আর মহান আল্লাহ তা'আলা মতানৈক্যের নিন্দা করেছেন এবং তা হারাম করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না” (সূরা আলি 'ইমরান: ১০৩)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
"তোমরা বাদানুবাদ করো না, তাহলে তোমরা পঙ্গু হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি-সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে" (আল আনফাল: ৪৬)।
আর দীনের মাঝে হয়ত ইজমা' থাকবে নয়ত মতানৈক্য থাকবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে সংবাদ প্রদান করলেন যে, মতানৈক্য তাঁর নিকট থেকে আসেনি।
মহান আল্লাহ বলেন:
"যদি (এই কুরআন) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট থেকে আসত, তাহলে তাতে তারা অনেক পারস্পরিক বৈপরীত্য (মতানৈক্য) দেখতে পেত" (আন নিসা: ৮২)।
সুতরাং বাধ্যতামূলকভাবে এটা ছুহীহ সাব্যস্ত হলো যে ইজমা' আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে। যেহেতু সত্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে, আর দুনিয়াতে ইজমা' আর ইখতিলাফ-মতানৈক্য ছাড়া কিছুই নেই। সেহেতু ইখতিলাফ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নয়।
সুতরাং ইজমা' ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকল না, যা নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসেছে। আর যে এই বিষয়টি জানার পরে বা তার নিকট এই বিষয়ে দলীল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও এই বিষয়ে মতানৈক্য করে, সে উক্ত আয়াতে বর্ণিত হুমকির উপযুক্ত।
অতএব আমরা আমাদের উপরে ফরযকৃত ইজমা' এর দিকে দৃষ্টি দিলাম। সেখানে আমরা দেখলাম যে, এটা দুইটি তাৎপর্যের যে কোনো একটি থেকে মুক্ত নয়।
ক. হয়ত ইজমা' ইসলামের শুরু হতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া বা ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত প্রত্যেক যুগেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অথবা
খ. এক যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আর অন্য যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপরে যেই ইজমা'র অনুসরণ ফরয করেছেন হয় ইসলামের শুরু হতে ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে সেই ইজমা' প্রতিষ্ঠিত (স্থায়ী) থাকবে। কিন্তু বিষয়টি যদি এমন হতো, তাহলে তিনি কোনো মানুষের জন্য ইজমা'র অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতেন না, যেহেতু এরপরে নিঃসন্দেহে আরো অনেক যুগ আসবে, যাদের ইজমা' এখনো সাব্যস্ত হয়নি, যার ফলে তা পরিপূর্ণ হয়নি, আর এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার আদেশ বাত্বিল সাব্যস্ত হয়ে যেত। আর এটা কুফর, যা ঐ সকল ব্যক্তিদের থেকে সংঘটিত হয়েছে, যারা এটাকে জেনে বুঝে বিদ্বেষ পোষণ করে জায়েয সাব্যস্ত করেছে। অতএব এই তাৎপযটি সন্দেহতীতরূপে বাত্বিল সাব্যস্ত হয়।
আর আরেকটি তাৎপর্য অবশিষ্ট থাকে তা হলো: সকল যুগ নয় বরং কোনো একটি যুগের ইজমা' সাব্যস্ত হওয়া। যার ফলে আমরা যখন এই বিষয়ে অনুসন্ধান করলাম যাতে করে এটা জানতে পারি যে, সেটা কোন যুগ, যেই যুগের ইজমা'র অনুসরণের অনুমতি দিয়েছেন এবং যেই যুগের ইজমা' থেকে বের হয়ে আসতে না করেছেন? তখন আমরা দেখলাম এই বিষয়টি তিনটি অবস্থা থেকে মুক্ত নয়।
১. হয়ত উক্ত যুগটি ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর যুগের পরবর্তী কোনো যুগ হবে অথবা
২. শুধু ছাহাবীগণের যুগ হবে অথবা
৩। ছাহাবীগণের যুগ এবং তাদের পরবর্তী কোনো যুগ, যেই যুগের মানুষরাও কোনো একটি বিষয়ের উপরে ইজমা' করেছে, ফলে ইজমা' সংঘটিত হয়েছে।
যদি আমরা প্রথম মতের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো মতটি সম্পূর্ণ ভুল, দুইটি শক্তিশালী দলীলের কারণে:
একটি কারণ হলো: এই মতটি বাত্বিল এই ব্যাপারে সকলেই একমত, এমন মতের কথা কেউ কখনো বলেনি।
দ্বিতীয় কারণ হলো: এটা দলীল বিহীন দাবি। আর যেই মত এমন ভিত্তিহীন, তা দুইটি দলীলের ভিত্তিতে নিশ্চিতরূপে বর্জিত হবে:
এক: আল্লাহ তা'আলার বাণী: "যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তোমাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থিত করো" (আন নামল: ৬৪)। কিন্তু তারা তাদের দাবিতে সত্যবাদী নয়।
দুই: এমন দাবিদার তার প্রতিপক্ষকে তার দাবির ন্যায় আরেকটি দাবি করতে বাঁধা দিতে পারবে না। ফলে একজন বলবে সেটা হলো দ্বিতীয় যুগ, আর অপরজন বলবে বরং সেটা হলো তৃতীয় যুগ, আর তৃতীয়জন বলবে বরং সেটা হলো চতুর্থ যুগ। আর এটা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তিকর। সুতরাং এই মতটিও বর্জিত হয়ে গেল আলহামদু লিল্লাহ।
এরপরে আমরা এই দ্বিতীয় মতের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি, এটা হলো তাদের মত, যারা বলে: নিশ্চয় ঐ যুগ, যেই যুগের মানুষদের ইজমা' এর অনুসরণের আদেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন, তা হলো শুধুমাত্র ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম -এর যুগ। যেই মতটিকে আমরা দু'টি দলীলের কারণে ছুহীহ মনে করছি।
এক: এই মতের উপরে সকলের ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কারো এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই, কখনো দুইজন মুসলিম এই বিষয়ে মতানৈক্য করতে পারে না যে, ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর জামাত যেই বিষয়ে কোনো দ্বিমত না করে নিশ্চিতরূপে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, যেই ইজমা' অকাট্যরূপে ছুহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত ছহীহ ইজমা', যেই বিষয়ে কারো জন্য মতানৈক্য করা বৈধ নয়।
দুই: এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে যে, দীন পূর্ণতা লাভ করেছে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম” (আল মায়েদাহ: ৩),
আর যখন এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হল, তখন এই দীনের মাঝে কোনোকিছু অতিরিক্ত করার বিষয়টিও বাত্বিল বলে সাব্যস্ত হল, আর দীন পরিপূর্ণ হয়েছে তা সঠিক সাব্যস্ত হল। আমরা এই বিষয়ে একমত হলাম যে, সম্পূর্ণ দীন মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ধার্যকৃত অধ্যাদেশ। আর যখন বিষয়টি এমনি, তখন এটা নিশ্চিত যে, যেই বিষয় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে জানা যায়নি, তা জানার একমাত্র পথ হল নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী আসে। অন্যথায় যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দিকে এমন বিষয়কে সম্বন্ধ করল, যেই বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি; তাহলে সে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে এমন মন্তব্য করল, যেই বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই, আর এটা শিরকের সাথে জড়িত এবং ইবলীসের উপদেশ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“আপনি বলুন! নিশ্চয় আমার রব নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল প্রকার অশ্লীল কর্মসমূহ, অপরাধ, অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করাকে। আর তোমাদের জন্য আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি এমন বিষয়কে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতে এবং তোমাদের জন্য আল্লাহর উপরে এমন কথা আরোপ করতে, যেই বিষয় সম্পর্কে তোমাদের জ্ঞান নেই” (আল আ'রাফ: ৩৩)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
“তোমরা শয়ত্বানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চিত সে তোমাদের স্পষ্ট শত্রু, সে তোমাদেরকে একমাত্র কুকর্ম, অশ্লীল কর্মের আদেশ দেয় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা আরোপ করতে, যা তোমরা জান না” (আল বাক্বারাহ: ১৬৮-১৬৯)।
এখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ তা'আলা যা উদ্দেশ্য করেছেন তা জানার একমাত্র পথ হল আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর দীন শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকেই আসবে। সুতরাং ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তাকে বলতে শুনেছেন। তাদের ইজমা' হল ঐ ইজমা', যার অনুসরণ করা ফরয, যেহেতু তারা সেটা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, আর তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার থেকে বর্ণনা করেছেন।
এরপরে আমরা তৃতীয় মতের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম, আর তা হল ছাহাবাগণের ইজমা' ছুহীহ ইজমা', আর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের ইজমা'ও ইজমা'। যদিও এই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – থেকে কোনো ইজমা' বর্ণিত হয়নি। ফলে এটাকে আমরা বাত্বিল মনে করছি, যেহেতু এটা তিন অবস্থার যেকোনো একটি থেকে মুক্ত নয়:
১. হয়ত সেই যুগের লোকজন এমন বিষয়ে ইজমা' করবে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – ইজমা' করেছেন। অথবা
২. হয়ত এমন বিষয়ে তারা ইজমা' করেছে, যেই বিষয়ে তাদের কারো মত সংরক্ষিত আছে, তবে তাদের সকল থেকে এই বিষয়ে কোনো মত সংরক্ষিত হয়নি। অথবা
৩. পরবর্তী যুগের ইজমা' সংঘটিত হওয়া এমন বিষয়ে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – থেকে কোনো ইজমা' এবং ইখতিলাফের বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
যদি তাদের পরবর্তী যুগের মানুষের ইজমা' এমন বিষয়ের উপরে হয়, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা' সাব্যস্ত আছে, তাহলে আমরা ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা' আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তাদের ইজমা' তাদের পরবর্তীদের জন্য অনুসরণ করা ওয়াজিব হবে। ছাহাবাগণের পরবর্তীদের ইজমা' ছাহাবাগণের ইজমা' এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার দ্বারা তাদের ইজমা' এর নিশ্চয়তার মাঝে কোনো নতুন শক্তি বৃদ্ধি হবে না। যেমন পরবর্তীদের মতানৈক্য তাদের ইজমা’ এর মাঝে কোনো দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারবে না যদি তারা মতানৈক্য করে থাকে।
বরং যে তাদের বিরোধিতা করে এবং এই বিষয়ে জেনে শুনে ‘ইজমা’ কে লঙ্ঘন করে, তাহলে সে কাফের যদি তার নিকট এই ব্যাপারে দলীল প্রতিষ্ঠিত করা হয়ে থাকে এবং বিষয়টি তার নিকট স্পষ্ট হয়ে যায় আর এরপরেও সে সত্যের বিরোধিতা করে। যদি পরবর্তী যুগের মানুষদের ইজমা’ এমন বিষয়ে সংঘটিত হয় যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকাটা ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তাহলে এটা বাত্বিল, কারণ একটি মাসআলায় ইজমা’ ও ইখতিলাফ একত্রিত হতে পারে না। যেহেতু উভয়টি একটি অপরটির বিপরীত, আর দুইটি বিপরীতমুখী বিষয় কখনো একত্রিত হতে পারে না। আর যখন ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকা ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তখন তাদের পরবর্তীদের জন্য এমন বিবেচনামূলক বিষয়কে নিষিদ্ধ করা জায়েয নেই, যা তাদের জন্য বৈধ ছিল। আর এমন ইজতিহাদকে যা তাদেরকে উক্ত মাসআলায় মতানৈক্যের দিকে নিয়ে গিয়েছে, যখন তাদের পরবর্তী কোনো মানুষ দলীলের মাধ্যমে সেই স্থানে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো কোনো ছাহাবার দলীল পৌঁছেছিল যেহেতু দীন– আমাদের পূর্বের বক্তব্য অনুসারে – নতুনভাবে সৃষ্টি হবে না, আর যা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পরে কোনো সময় বৈধ ছিল, তা সর্বযুগেই বৈধ থাকবে, আর যা কোনো সময়ের জন্য হারাম ছিল, তা এরপরে আর কখনো হালাল হবে না।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ণ করে দিলাম” (আল মায়িদাহ: ৩)।
আরেকটি দলীল: আর তা হল ঐ পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তাদের সঙ্গে একমত হওয়া ছাহাবাগণ নিঃসন্দেহে তারা মুমিনদের একটি অংশ – যদি তাদের মধ্যে এমন ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকেন, যাদের থেকে মতানৈক্যের বর্ণনা পাওয়া যায় – আর যেহেতু – তারা মুমিনদের একটি অংশ এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাহলে এখানে ইজমা’ হওয়ার বিষয়টিও বাত্বিল বলে গণ্য হবে। কেননা ইজমা’ হল সকল মুমিনদের সম্মতি, আংশিক মুমিনদের সম্মতি নয়। যেহেতু আল্লাহ তা’আলা এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য করো আর যদি তোমরা মতানৈক্যে লিপ্ত হও, তাহলে সেই মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনে থাক" (আন নিসা: ৫৯)
আর যখন কোনো বিষয়ে আংশিক মানুষ ইজমা’ করবে আর আংশিক মানুষ করবে না, তখন সেটা মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হবে, যেই বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা একদলকে বাদ দিয়ে আরেকদলের অনুসরণের আদেশ দেননি। বরং আল্লাহ ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সেই বিষয়টিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং এই মতটিও নিঃসন্দেহে বাত্বিল সাব্যস্ত হল, যা বাত্বিল হওয়ার ব্যাপারে সামান্য সংশয় নেই, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
এরপরে আমরা দৃষ্টিপাত করলাম তৃতীয় প্রকারের দিকে, যা হল পরবর্তী যুগের ইজমা’ সংঘটিত হওয়া এমন বিষয়ে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম থেকে কোনো ইজমা’ এবং ইখতিলাফের বর্ণনা পাওয়া যায়নি। তবে কোনো ছাহাবা থেকে উক্ত বিষয়ে কোনো মত পাওয়া গিয়েছে আর কোনো ছাহাবা থেকে পাওয়া যায়নি এমনটা ধরে নিলে অথবা ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর মধ্যে কারো থেকেই এই বিষয়ে কোনো মত পাওয়া যায়নি এই অবস্থাতেও এই ইজমা’ ছহীহ হয় না দুইটি দলীলের কারণে:
এক: তারা হলেন মুমিনদের একটি অংশ মাত্র, পূর্ণ দল নন। আর ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর পরবর্তীতে কোনো যুগের মুসলিমদের উপরে জামী’উল মুমিনীন বা মুমিনদের পূর্ণ দল এই শব্দটি প্রয়োগ করা হয়নি, কেননা তাদের পূর্বে সর্বোত্তম মুমিনগণ গত হয়েছেন। বিধায়, ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরের প্রত্যেক যুগের মুমিনগণ নিঃসন্দেহে মুমিনদের একটি অংশ মাত্র।
আর এই ভিত্তিতে তাদের ইজমা’ মুমিনদের ইজমা’ রূপে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি বাত্বিল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তা’আলা কখনো আমাদের উপরে মুমিনদের একটি অংশ বা দলের পথের অনুসরণকে আর কোনো একটি অংশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্য করাকে ওয়াজিব করেননি। আর ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – তাদের যুগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের পূর্ণ দল বা জামা’আত ছিলেন, যেহেতু তাদের সঙ্গে তারা ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না, বিধায় তাদের ইজমা’কে সকল মুমিনের ইজমা’ বলা নিঃসন্দেহে নিশ্চিতরূপে ছহীহ, সকল প্রশংসা আল্লাহ রব্বল আলামীনের জন্য।
আর উক্ত মতটি সামগ্রিকভাবে বাত্বিল সাব্যস্ত হল যেহেতু কোনো মুমিনের জন্য দীনের মাঝে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে ওয়াজিব সাব্যস্ত করেননি এমন বিষয়কে ওয়াজিব সাব্যস্ত করা বৈধ নয়। তাছাড়া ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরবর্তী কোনো যুগের মানুষদের ইজমা’কে অকাট্যরূপে বিশ্বাস করা জায়েয নেই, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ ইজমা’ করেননি। বরং যে এমন ইজমা’কে অকাট্যরূপে মেনে নেয়, সে নিঃসন্দেহে মিথ্যুক। কেননা ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরবর্তী তাবে’ঈন ও তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের সকল বক্তব্য সংগ্রহ করা ও হুবহু হিসাব করে রাখা সম্ভব নয়। কারণ তারা দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন – সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হিন্দুস্তান এর শেষসীমা, খুরাসান, আরমীনীয়াহ, আযারবায়যান, জাযীরাহ, শাম, মিছ্বর, আফ্রীকাহ, আন্দালুস, বরবর অঞ্চলসমূহ, ইয়েমেন, জাযীরাতুল আরব, ‘ইরাক্ব, আহওয়ায, পারস্য, কিরমা, মাকরান, সিজিস্তান, আরদাবীল এবং এই শহরগুলোর মধ্যে।
আর এটা অসম্ভব যে, কোনো মানুষ এই শহরগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষদের প্রত্যেকেরই মত সংগ্রহ করতে পারবে। আর তাদের ঐ বিষয়ের উপরে ইজমা’ করা নিশ্চিতরূপে ছহীহ, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ ইজমা’ করেছেন একটি স্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে: আর তা হল এটা নিশ্চিত যে, এটা ছঁহীহরূিপে সাব্যস্ত যে, তাদের মধ্য থেকে যে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা’ এর উপরে একমত পোষণ করেছেন সে মুমিন, আর যে উক্ত ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে না জেনে, তার বক্তব্য অর্থহীন অকেজো, আর যে এই বিষয়ে তাদের ইজমা’ আছে জেনেও তাদের ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে, সে কাফের, সে এর দ্বারা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বের হয়ে গেল, যাদের ইজমা’ ইজমা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এই বিধান ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রজোয্য নয়, যে নিজের যুগের মানুষদের ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে।
বরং একমাত্র ছাহাবাগণ — রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম — এর ইজমা’কেই নিশ্চিতরূপে মেনে নেওয়া ছহীহ। কারণ তাদের সংখ্যা ছিল গণনাযোগ্য, যারা মক্কা ও মদীনাতে সমবেত ছিলেন। তাদের ব্যাপারে এই বিষয়টি নিশ্চিত ছিল যে, তারা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুগত ছিলেন। আর যে নাবী আলাইহিস সালাম এর বিরুদ্ধাচারণকে বৈধ মনে করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং সে ঈমানের সীমা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। মুমিনদের দল থেকে দূরে সরে গিয়েছে। সুতরাং সন্দেহাতীত ইয়াক্বীনের দ্বারা এটা ছহীহ সাব্যস্ত হয় যে, আমাদের জন্য অনুসরণ করা ফরয এমন ইজমা’ হল শুধুমাত্র ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা’। আর এটাও সম্ভব নয় যে, তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ কোনো ভুলের উপরে ইজমা’ করবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা এই বিষয়ের দায়ভার নিজেই নিয়েছেন এই কথার দ্বারা:
“তারা সর্বদা মতানৈক্য করতে থাকবে, তবে যাদের উপরে আপনার রব মেহেরবানি করবে, তারা মতানৈক্য করবে না” (হূদ: ১১৮, ১১৯)।
আর কুরআনের ভাষায় মেহেরবানি একমাত্র মুহসিন ব্যক্তিদের জন্য। আর যখন এটা নিশ্চিতরূপে জানা যাবে যে, এই বিষয়ে কোনো মতানৈক্য নেই, তখন সেটা এমন ইজমা’ বলে বিবেচিত হবে, যা রহমতকে আবশ্যক করে। আর এটা নিশ্চিত ইজমা’ অন্যকিছু নয়, আর যদি উক্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিতরূপে এটা জানা না যায় যে, উক্ত বিষয়ে রহমতকে আবশ্যককারী ইজমা’ আছে কি-না তাহলে সেটা মতানৈক্য ছাড়া অন্যকিছু নয়। আর কুরআনের ভাষ্যনুযায়ী রহমতকে আবশ্যককারী বিষয় ছাড়া অন্যকোনো বিষয়ের উপরে ইজমা’ হওয়া জায়েয নেই। এর পাশাপাশি আমাদের বর্ণনাও বিদ্যমান আছে, যা আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন ইউসূফ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন ফাতাহ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আব্দুল ওয়াহহাব বিন ‘ঈসা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন’আলী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট মুসলিম বিন হাজ্জাজ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট সাঈদ বিন মানছুর, আবূর রবী’ আল আতাকী এবং কুতায়বাহ বর্ণনা করেছেন, তারা বলেন: আমাদের নিকট হাম্মাদ — যায়েদের পুত্র — আয়্যুব আস সাখতিয়ানী থেকে, তিনি আবূ ক্বিলাবাহ থেকে, তিনি আবূ আসমা আর রাহাবী থেকে, তিনি ছাওবান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"আমার উম্মতের একদল ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত সর্বদা হকের উপরে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে, তাদেরকে যারা লাঞ্চনা করার চেষ্টা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার আদেশ তথা ক্বিয়ামত না আসবে" ছুহীহ মুসলিম (হা/১৯২০)।
আমাদের নিকট আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ আল হামাদানী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদেরকে আবু ইসহাক বালখী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ফারাবরী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বুখারী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হুমায়দী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ওয়ালীদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ইবনু জাবির বর্ণনা করেছেন – যিনি আব্দুর রহমান বিন ইয়াযীদ বিন জাবির এর সন্তান – তিনি বলেন: আমার নিকট উমাইর বিন হানী বর্ণনা করেছেন, তিনি মু'আবীয়াকে বলতে শুনেছেন: আমি আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
"আমার একদল সর্বদা আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যারা তাদের বিরোধিতা করে, তারাও তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এমনকি ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এই অবস্থাতেই থাকবে" ছুহীহ মুসলিম (হা/১০৩৭)।
আবূ মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহু তা'আলা বলেন: আমরা ইতোপূর্বে তৃতীয় প্রকার বাত্বিল সাব্যস্ত করতে যেয়ে যা উল্লেখ করলাম, তা দ্বারা তাদের মতও বাত্বিল সাব্যস্ত হয় যারা বলে: নিশ্চয় ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর একদল থেকে ছহীহ সূত্রে যা প্রমাণিত হয়েছে, সেই বিষয়ে অন্যদের থেকে যদি কোনো অস্বীকৃতি বা প্রত্যাখ্যানমূলক বক্তব্য না জানা যায়, তাহলে সেটা তাদের পক্ষ থেকে সংঘটিত ইজমা' বলে বিবেচিত হবে। কেননা এটা মুমিনদের একটি অংশের মত যেমনটি আমরা উল্লেখ করলাম। আর তাছাড়াও যে উক্ত মতাদর্শীর মতকে বাদ দিয়ে অন্যকোনো মতকে অকাট্য মনে করল, সেও উক্ত মতাদর্শীর সাথে সহমত পোষণ করল, কারণ সে এমন বিষয়ের অনুসরণ করল, যেই বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই আর এটা অপরাধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"যেই বিষয়ে আপনার কোনো জ্ঞান নেই, সেই বিষয়ের অনুসরণ আপনি করবেন না, নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে" (আল ইসরা: ৩৬)
প্রত্যেক মানুষ যেনো নিজের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে। আর এই বিষয় নিয়ে যেন চিন্তা করে যে, আল্লাহ তা'আলা তার কর্ণ, চক্ষু ও অন্তরের এমন বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন, যেই বিষয়ে তার নিকট কোনো দৃঢ় জ্ঞান নেই। আর যে কোনো মানুষকে কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে অকাট্য দলীল মনে করল, যেই বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান তাকে দেওয়া হয়নি, সে বিপদের মুখোমুখি হবে। আর এই ক্ষেত্রে তার গুনাহ হবে।
যদি বলা হয়: তারা হলেন শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রগামীতার অধিকারী, যদি তারা কোনো বিষয় অস্বীকার করতেন, তাহলে সেই বিষয়ে তারা চুপ থাকতেন না। আমরা বলব: আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে এটার বাস্তবতা হল এমন, যদি তোমার নিকট ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হতো, যে তারা প্রত্যেকে উক্ত বিষয়ে জেনে শুনেও চুপ থেকেছেন। আর এটা তাদের কোনো বক্তার মতের মাঝে বিদ্যমান থাকার কোনো পথ নেই। কেননা ছাহাবাগণ — রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – বিভিন্ন শহরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছেন: ইয়েমেন, মক্কা, কুফা, বন্ধুরা, রিক্কা, শাম, মিসর, বাহরাইন ও অন্যান্য অঞ্চলসমূহে।
তাই এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হয়, যে ব্যক্তি ছাহাবাগণ খলীফা হোক বা না হোক- থেকে বর্ণিত কোনো বক্তব্যের ব্যাপারে এই দাবি করে যে, তাদের সকলেই এই বিষয়ে জানতে পেরেছেন, তাহলে সে নিঃসন্দেহে তাদের সকলের ব্যাপারে মনগড়া মন্তব্য করল। আর তাদের একমাত্র ঐ ইজমা’কেই অকাট্যরূপে মানতে হবে, যেই ইজমা’ এর ব্যাপারে এটা জানা যাবে যে, তারা উক্ত ইজমা’ এর বিষয়টি জানতেন। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত ছলাত, রমযান মাসের ছিয়াম, কা'বা ঘরের হজ্জ, মৃত প্রাণির গোশত, রক্ত, শুকরের গোশত, মদ হারাম হওয়া ও এমন সকল বিষয় হারাম হওয়ার ব্যাপারে, যেই বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, তারা উক্ত বিষয়ে জানতেন এবং সেটা তারা নিশ্চিতরূপে সন্দেহাতীতভাবে স্বীকার করেছেন, এটা এই জন্য যে, তাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র একশ আটত্রিশ জন থেকেই ফাতাওয়া বর্ণিত হয়েছে, অথচ তাদের সংখ্যা বিশ হাজার থেকে বেশী। সুতরাং এই মতের প্রবক্তারা কোনো দলীল ছাড়াই যেই দাবি করেছে তা সম্পূর্ণ বাত্বিল।
আর হানাফী, শাফ'ঈ ও মালেকীগণ, যারা এই ইজমা' এর দ্বারা দলীল পেশ করে – যখন তা তাদের তাক্বলীদের সাথে মিলে যায়। সুতরাং তারা হল আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টির মধ্যে ছাহাবাগণের একত্রিত দলের মতের সর্বাধিক পরিপন্থি।
যেই বিষয়ে ছাহাবাগণের মতের বিপরীত কোনো মত পাওয়া যায় না। যেমন মুস্তাহাদ্বাহ (ইস্তিহাদ্বাহ রোগে আক্রান্ত) নারীর জন্য প্রত্যেক ছলাত অথবা একত্রে আদায়যোগ্য দুই ছলাত আদায় করার ক্ষেত্রে গোসল করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ‘আলী ও ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত বর্ণনার সাথে তাদের দ্বিমত পোষণ করা। আয়িশা থেকে বর্ণিত: "যে প্রত্যেক দিন যুহরের ছালাতের সময় গোসল করে" এই বর্ণনার সাথে তাদের দ্বিমত পোষণ করা। যেখানে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মধ্যে এর বিপরীত কোনো মত পাওয়া যায় না। এছাড়াও আরো অনেক বর্ণনা আছে, যেই মাসআলাগুলোর সংখ্যা দুইশতাধিক, যেগুলোকে আমরা সংকলন করেছি (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) কিতাবে।
হ্যাঁ, তারা ছহীহ নিশ্চিত ইজমা' এর বিরোধিতা করেছে। যেমন তারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকল ছাহাবাগণের বিরোধিতা করেছে। খায়বার এর বাসীন্দাদেরকে খায়বার এর জমী বর্গা চাষে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রদান করার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে। তারা এই বিষয়ে বলে: কিন্তু আমরা তোমাদেরকে বহিষ্কার করে দিব যখন আমাদের ইচ্ছা হবে – আবূ বকর ও উমারের খিলাফতকাল পর্যন্ত। কিন্তু তাদের এই মতের কোনো বিরোধী নেই। এমন দৃষ্টান্ত আরো অনেক বিদ্যমান, যা আমরা পরীক্ষা করে তাদের বিপক্ষে প্রয়োগ করেছি। তাওফীক্ব একমাত্র আল্লাহ তা’আলার নিকটে।
বই: আন নাবযাতুল কাফীয়াহ।
লেখক: ইমাম ইবন হাযম আন্দালুসী রহ।
জেনে রাখো – আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন – আমাদেরকে আমাদের রব দুনিয়াতে এই জন্য পাঠাননি যে, এই দুনিয়া আমাদের জন্য স্থায়ী নিবাস হয়ে থাকবে, তবে যেন এই দুনিয়া আমাদের জন্য যাত্রাপথের একটি বিরামস্থল ও দুর্গের ন্যায় আবাসস্থল হয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো: আমাদের মহান রব আমাদেরকে যেই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন অর্থাৎ যেই দায়িত্ব দিয়ে আমাদের নিকট তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন শুধু সেই দায়িত্বটুকু সম্পাদনের কথা বলা। এই জন্যই তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আর সেই দায়িত্বের কারণেই আমাদেরকে এই আবাসস্থলে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, এরপরে একদিন এখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে এই দুই নিবাসের যে কোনো একটিতে গমন করতে হবে:
“নিশ্চয় নেককারগণ বেহেশতে অবস্থান করবেন, আর পাপিষ্ঠরা জাহান্নামে অবস্থান করবে” (আল ইনফিত্বার: ১৩,১৪) এরপরে আল্লাহ তা'আলা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিলেন কারা নেককার, আর কারা পাপিষ্ঠ। মহান আল্লাহ বলেন:
“যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে প্রবেশ করবে এমন বাগানসমূহে, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়, আর এটাই হলো মহা সাফল্য, আর যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অবাধ্যতা করবে এবং তাঁর সীমাসমূহ লঙ্ঘন করবে, সে স্থায়ীভাবে এমন জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যেখানে তার জন্য রয়েছে লাঞ্চনাদায়ক শান্তি” (আন নিসা: ১৩,১৪)।
বিধায় আমাদের জন্য এটা অনুসন্ধান করা উচিত: এই আনুগত্যটি কেমন? আর এই অবাধ্যতা কেমন? আমরা অনুসন্ধান করতে যেয়ে দেখলাম আল্লাহ তা'আলা বলছেন:
"আমি কিতাবটিতে কোনো কিছুর বর্ণনা বাদ রাখিনি" (আল আন'আম: ৩৮)
তিনি আরো বলেছেন:
"আমি এই গ্রন্থটি আপনার প্রতি এই জন্যই নাযিল করেছি যাতে আপনি তাদেরকে তাদের মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দেন এবং মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ নাযিল করেছি” (আন নাহল: ৬৪)
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং তোমাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য করো। যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ করো, তাহলে সেই বিষয়টি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাক" (আন নিসা: ৫৯)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম” (আল মায়িদাহঃ ৩)।
সুতরাং আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারলাম (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) যিনি আমাদের রব আমাদেরকে যেই দীন পালনের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যেই দীনের অনুসরণ ব্যতীত আমাদের জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার অন্য কোনো উপায় রাখেননি। সেই দীন সম্পর্ণরূপে কুরআন, তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ এবং উম্মার ইজমা' এর মাঝে স্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। আর দীন পরিপূর্ণ হয়েছে।
সুতরাং এখানে কোনো সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নেই, আর আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে: প্রত্যেকটি বিষয় সংরক্ষিত, সুদৃঢ়। দলীল হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী:
"নিশ্চয় আমি যিকর নাযিল করেছি, আর আমিই তা সংরক্ষণ করব” (আল হিজর: ৯)।
এখান থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিতরূপে নিঃসংশয়ে ছুহীহ সাব্যস্ত হলো: কারো জন্য কোনো বিষয়ে ফাতাওয়া দেওয়া, বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়া এবং দীনের কোনো বিষয়ে আমল করা কুরআনের দলীল অথবা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত ছুহীহ দলীল অথবা আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মতানৈক্য বিহীন সুনিশ্চিত ইজমা' ব্যতীত বৈধ হবে না।
আর যে কোনো বিষয়কে সাব্যস্ত বা খণ্ডন করবে তার বক্তব্য কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত গ্রহণযোগ্য হবে না। যেহেতু একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর সাব্যস্তকারী বা খণ্ডনকারী নেই।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার সম্পর্কে কোনো সংবাদ প্রদান করা জায়েয হবে না একমাত্র এমন সংবাদের মাধ্যম ব্যতীত, যা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে হয়ত কুরআনে অথবা সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে। বৈধতা একজন বৈধকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে, নিষেধাজ্ঞা একজন নিষিদ্ধকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে, আর ফরয একজন ফরয সাব্যস্তকারীর অস্তিত্বের দাবি রাখে। তাই কোনো বৈধকারী, নিষিদ্ধকারী এবং ফরয সাব্যস্তকারী একমাত্র সকল সৃষ্টির স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। যিনি ছাড়া আর কোনো সত্য উপাস্য নেই।
‘ইজমা' সম্পর্কিত আলোচনা এবং ‘ইজমা' এর পরিচয়:
আমরা ‘ইজমা' দ্বারা এই জন্য শুরু করলাম যে, ‘ইজমা' এর ব্যাপারে কারো মতানৈক্য নেই। সুতরাং আমরা আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে বলতে পারি: যখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ছহীহ সূত্রে ‘ইজমা' এর অনুসরণ করা ফরয সাব্যস্ত হলো আমাদের পূর্বে বর্ণিত আলোচনা এবং মহান আল্লাহর এই বাণী দ্বারা:
"যার কাছে হেদায়েতের পথ স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও সে রসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের রাস্তা ছেড়ে ভিন্ন রাস্তায় চলে, আমি তাকে তারই পথের অভিমুখী করে দেবো এবং আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। জাহান্নাম কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থল" (আন নিসা: ১১৫)
আর মহান আল্লাহ তা'আলা মতানৈক্যের নিন্দা করেছেন এবং তা হারাম করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না” (সূরা আলি 'ইমরান: ১০৩)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
"তোমরা বাদানুবাদ করো না, তাহলে তোমরা পঙ্গু হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি-সামর্থ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে" (আল আনফাল: ৪৬)।
আর দীনের মাঝে হয়ত ইজমা' থাকবে নয়ত মতানৈক্য থাকবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এই মর্মে সংবাদ প্রদান করলেন যে, মতানৈক্য তাঁর নিকট থেকে আসেনি।
মহান আল্লাহ বলেন:
"যদি (এই কুরআন) আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট থেকে আসত, তাহলে তাতে তারা অনেক পারস্পরিক বৈপরীত্য (মতানৈক্য) দেখতে পেত" (আন নিসা: ৮২)।
সুতরাং বাধ্যতামূলকভাবে এটা ছুহীহ সাব্যস্ত হলো যে ইজমা' আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে। যেহেতু সত্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে, আর দুনিয়াতে ইজমা' আর ইখতিলাফ-মতানৈক্য ছাড়া কিছুই নেই। সেহেতু ইখতিলাফ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নয়।
সুতরাং ইজমা' ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকল না, যা নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এসেছে। আর যে এই বিষয়টি জানার পরে বা তার নিকট এই বিষয়ে দলীল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও এই বিষয়ে মতানৈক্য করে, সে উক্ত আয়াতে বর্ণিত হুমকির উপযুক্ত।
অতএব আমরা আমাদের উপরে ফরযকৃত ইজমা' এর দিকে দৃষ্টি দিলাম। সেখানে আমরা দেখলাম যে, এটা দুইটি তাৎপর্যের যে কোনো একটি থেকে মুক্ত নয়।
ক. হয়ত ইজমা' ইসলামের শুরু হতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া বা ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত প্রত্যেক যুগেই প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অথবা
খ. এক যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, আর অন্য যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপরে যেই ইজমা'র অনুসরণ ফরয করেছেন হয় ইসলামের শুরু হতে ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে সেই ইজমা' প্রতিষ্ঠিত (স্থায়ী) থাকবে। কিন্তু বিষয়টি যদি এমন হতো, তাহলে তিনি কোনো মানুষের জন্য ইজমা'র অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতেন না, যেহেতু এরপরে নিঃসন্দেহে আরো অনেক যুগ আসবে, যাদের ইজমা' এখনো সাব্যস্ত হয়নি, যার ফলে তা পরিপূর্ণ হয়নি, আর এর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার আদেশ বাত্বিল সাব্যস্ত হয়ে যেত। আর এটা কুফর, যা ঐ সকল ব্যক্তিদের থেকে সংঘটিত হয়েছে, যারা এটাকে জেনে বুঝে বিদ্বেষ পোষণ করে জায়েয সাব্যস্ত করেছে। অতএব এই তাৎপযটি সন্দেহতীতরূপে বাত্বিল সাব্যস্ত হয়।
আর আরেকটি তাৎপর্য অবশিষ্ট থাকে তা হলো: সকল যুগ নয় বরং কোনো একটি যুগের ইজমা' সাব্যস্ত হওয়া। যার ফলে আমরা যখন এই বিষয়ে অনুসন্ধান করলাম যাতে করে এটা জানতে পারি যে, সেটা কোন যুগ, যেই যুগের ইজমা'র অনুসরণের অনুমতি দিয়েছেন এবং যেই যুগের ইজমা' থেকে বের হয়ে আসতে না করেছেন? তখন আমরা দেখলাম এই বিষয়টি তিনটি অবস্থা থেকে মুক্ত নয়।
১. হয়ত উক্ত যুগটি ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর যুগের পরবর্তী কোনো যুগ হবে অথবা
২. শুধু ছাহাবীগণের যুগ হবে অথবা
৩। ছাহাবীগণের যুগ এবং তাদের পরবর্তী কোনো যুগ, যেই যুগের মানুষরাও কোনো একটি বিষয়ের উপরে ইজমা' করেছে, ফলে ইজমা' সংঘটিত হয়েছে।
যদি আমরা প্রথম মতের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো মতটি সম্পূর্ণ ভুল, দুইটি শক্তিশালী দলীলের কারণে:
একটি কারণ হলো: এই মতটি বাত্বিল এই ব্যাপারে সকলেই একমত, এমন মতের কথা কেউ কখনো বলেনি।
দ্বিতীয় কারণ হলো: এটা দলীল বিহীন দাবি। আর যেই মত এমন ভিত্তিহীন, তা দুইটি দলীলের ভিত্তিতে নিশ্চিতরূপে বর্জিত হবে:
এক: আল্লাহ তা'আলার বাণী: "যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তোমাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থিত করো" (আন নামল: ৬৪)। কিন্তু তারা তাদের দাবিতে সত্যবাদী নয়।
দুই: এমন দাবিদার তার প্রতিপক্ষকে তার দাবির ন্যায় আরেকটি দাবি করতে বাঁধা দিতে পারবে না। ফলে একজন বলবে সেটা হলো দ্বিতীয় যুগ, আর অপরজন বলবে বরং সেটা হলো তৃতীয় যুগ, আর তৃতীয়জন বলবে বরং সেটা হলো চতুর্থ যুগ। আর এটা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তিকর। সুতরাং এই মতটিও বর্জিত হয়ে গেল আলহামদু লিল্লাহ।
এরপরে আমরা এই দ্বিতীয় মতের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি, এটা হলো তাদের মত, যারা বলে: নিশ্চয় ঐ যুগ, যেই যুগের মানুষদের ইজমা' এর অনুসরণের আদেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন, তা হলো শুধুমাত্র ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম -এর যুগ। যেই মতটিকে আমরা দু'টি দলীলের কারণে ছুহীহ মনে করছি।
এক: এই মতের উপরে সকলের ইজমা' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কারো এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই, কখনো দুইজন মুসলিম এই বিষয়ে মতানৈক্য করতে পারে না যে, ছাহাবীগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর জামাত যেই বিষয়ে কোনো দ্বিমত না করে নিশ্চিতরূপে ঐকমত্য পোষণ করেছেন, যেই ইজমা' অকাট্যরূপে ছুহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত ছহীহ ইজমা', যেই বিষয়ে কারো জন্য মতানৈক্য করা বৈধ নয়।
দুই: এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে যে, দীন পূর্ণতা লাভ করেছে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম” (আল মায়েদাহ: ৩),
আর যখন এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হল, তখন এই দীনের মাঝে কোনোকিছু অতিরিক্ত করার বিষয়টিও বাত্বিল বলে সাব্যস্ত হল, আর দীন পরিপূর্ণ হয়েছে তা সঠিক সাব্যস্ত হল। আমরা এই বিষয়ে একমত হলাম যে, সম্পূর্ণ দীন মহান আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ধার্যকৃত অধ্যাদেশ। আর যখন বিষয়টি এমনি, তখন এটা নিশ্চিত যে, যেই বিষয় আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে জানা যায়নি, তা জানার একমাত্র পথ হল নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী আসে। অন্যথায় যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার দিকে এমন বিষয়কে সম্বন্ধ করল, যেই বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি; তাহলে সে আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে এমন মন্তব্য করল, যেই বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই, আর এটা শিরকের সাথে জড়িত এবং ইবলীসের উপদেশ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“আপনি বলুন! নিশ্চয় আমার রব নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল প্রকার অশ্লীল কর্মসমূহ, অপরাধ, অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করাকে। আর তোমাদের জন্য আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি এমন বিষয়কে আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করতে এবং তোমাদের জন্য আল্লাহর উপরে এমন কথা আরোপ করতে, যেই বিষয় সম্পর্কে তোমাদের জ্ঞান নেই” (আল আ'রাফ: ৩৩)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
“তোমরা শয়ত্বানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, নিশ্চিত সে তোমাদের স্পষ্ট শত্রু, সে তোমাদেরকে একমাত্র কুকর্ম, অশ্লীল কর্মের আদেশ দেয় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা আরোপ করতে, যা তোমরা জান না” (আল বাক্বারাহ: ১৬৮-১৬৯)।
এখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহ তা'আলা যা উদ্দেশ্য করেছেন তা জানার একমাত্র পথ হল আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আর দীন শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকেই আসবে। সুতরাং ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তাকে বলতে শুনেছেন। তাদের ইজমা' হল ঐ ইজমা', যার অনুসরণ করা ফরয, যেহেতু তারা সেটা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, আর তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার থেকে বর্ণনা করেছেন।
এরপরে আমরা তৃতীয় মতের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম, আর তা হল ছাহাবাগণের ইজমা' ছুহীহ ইজমা', আর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের ইজমা'ও ইজমা'। যদিও এই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – থেকে কোনো ইজমা' বর্ণিত হয়নি। ফলে এটাকে আমরা বাত্বিল মনে করছি, যেহেতু এটা তিন অবস্থার যেকোনো একটি থেকে মুক্ত নয়:
১. হয়ত সেই যুগের লোকজন এমন বিষয়ে ইজমা' করবে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – ইজমা' করেছেন। অথবা
২. হয়ত এমন বিষয়ে তারা ইজমা' করেছে, যেই বিষয়ে তাদের কারো মত সংরক্ষিত আছে, তবে তাদের সকল থেকে এই বিষয়ে কোনো মত সংরক্ষিত হয়নি। অথবা
৩. পরবর্তী যুগের ইজমা' সংঘটিত হওয়া এমন বিষয়ে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – থেকে কোনো ইজমা' এবং ইখতিলাফের বর্ণনা পাওয়া যায়নি।
যদি তাদের পরবর্তী যুগের মানুষের ইজমা' এমন বিষয়ের উপরে হয়, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা' সাব্যস্ত আছে, তাহলে আমরা ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা' আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর তাদের ইজমা' তাদের পরবর্তীদের জন্য অনুসরণ করা ওয়াজিব হবে। ছাহাবাগণের পরবর্তীদের ইজমা' ছাহাবাগণের ইজমা' এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার দ্বারা তাদের ইজমা' এর নিশ্চয়তার মাঝে কোনো নতুন শক্তি বৃদ্ধি হবে না। যেমন পরবর্তীদের মতানৈক্য তাদের ইজমা’ এর মাঝে কোনো দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারবে না যদি তারা মতানৈক্য করে থাকে।
বরং যে তাদের বিরোধিতা করে এবং এই বিষয়ে জেনে শুনে ‘ইজমা’ কে লঙ্ঘন করে, তাহলে সে কাফের যদি তার নিকট এই ব্যাপারে দলীল প্রতিষ্ঠিত করা হয়ে থাকে এবং বিষয়টি তার নিকট স্পষ্ট হয়ে যায় আর এরপরেও সে সত্যের বিরোধিতা করে। যদি পরবর্তী যুগের মানুষদের ইজমা’ এমন বিষয়ে সংঘটিত হয় যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকাটা ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তাহলে এটা বাত্বিল, কারণ একটি মাসআলায় ইজমা’ ও ইখতিলাফ একত্রিত হতে পারে না। যেহেতু উভয়টি একটি অপরটির বিপরীত, আর দুইটি বিপরীতমুখী বিষয় কখনো একত্রিত হতে পারে না। আর যখন ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মাঝে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকা ছহীহ সাব্যস্ত হয়েছে, তখন তাদের পরবর্তীদের জন্য এমন বিবেচনামূলক বিষয়কে নিষিদ্ধ করা জায়েয নেই, যা তাদের জন্য বৈধ ছিল। আর এমন ইজতিহাদকে যা তাদেরকে উক্ত মাসআলায় মতানৈক্যের দিকে নিয়ে গিয়েছে, যখন তাদের পরবর্তী কোনো মানুষ দলীলের মাধ্যমে সেই স্থানে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো কোনো ছাহাবার দলীল পৌঁছেছিল যেহেতু দীন– আমাদের পূর্বের বক্তব্য অনুসারে – নতুনভাবে সৃষ্টি হবে না, আর যা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পরে কোনো সময় বৈধ ছিল, তা সর্বযুগেই বৈধ থাকবে, আর যা কোনো সময়ের জন্য হারাম ছিল, তা এরপরে আর কখনো হালাল হবে না।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ণ করে দিলাম” (আল মায়িদাহ: ৩)।
আরেকটি দলীল: আর তা হল ঐ পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তাদের সঙ্গে একমত হওয়া ছাহাবাগণ নিঃসন্দেহে তারা মুমিনদের একটি অংশ – যদি তাদের মধ্যে এমন ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকেন, যাদের থেকে মতানৈক্যের বর্ণনা পাওয়া যায় – আর যেহেতু – তারা মুমিনদের একটি অংশ এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তাহলে এখানে ইজমা’ হওয়ার বিষয়টিও বাত্বিল বলে গণ্য হবে। কেননা ইজমা’ হল সকল মুমিনদের সম্মতি, আংশিক মুমিনদের সম্মতি নয়। যেহেতু আল্লাহ তা’আলা এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য করো আর যদি তোমরা মতানৈক্যে লিপ্ত হও, তাহলে সেই মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনে থাক" (আন নিসা: ৫৯)
আর যখন কোনো বিষয়ে আংশিক মানুষ ইজমা’ করবে আর আংশিক মানুষ করবে না, তখন সেটা মতানৈক্যপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হবে, যেই বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা একদলকে বাদ দিয়ে আরেকদলের অনুসরণের আদেশ দেননি। বরং আল্লাহ ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সেই বিষয়টিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং এই মতটিও নিঃসন্দেহে বাত্বিল সাব্যস্ত হল, যা বাত্বিল হওয়ার ব্যাপারে সামান্য সংশয় নেই, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
এরপরে আমরা দৃষ্টিপাত করলাম তৃতীয় প্রকারের দিকে, যা হল পরবর্তী যুগের ইজমা’ সংঘটিত হওয়া এমন বিষয়ে, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম থেকে কোনো ইজমা’ এবং ইখতিলাফের বর্ণনা পাওয়া যায়নি। তবে কোনো ছাহাবা থেকে উক্ত বিষয়ে কোনো মত পাওয়া গিয়েছে আর কোনো ছাহাবা থেকে পাওয়া যায়নি এমনটা ধরে নিলে অথবা ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর মধ্যে কারো থেকেই এই বিষয়ে কোনো মত পাওয়া যায়নি এই অবস্থাতেও এই ইজমা’ ছহীহ হয় না দুইটি দলীলের কারণে:
এক: তারা হলেন মুমিনদের একটি অংশ মাত্র, পূর্ণ দল নন। আর ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর পরবর্তীতে কোনো যুগের মুসলিমদের উপরে জামী’উল মুমিনীন বা মুমিনদের পূর্ণ দল এই শব্দটি প্রয়োগ করা হয়নি, কেননা তাদের পূর্বে সর্বোত্তম মুমিনগণ গত হয়েছেন। বিধায়, ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরের প্রত্যেক যুগের মুমিনগণ নিঃসন্দেহে মুমিনদের একটি অংশ মাত্র।
আর এই ভিত্তিতে তাদের ইজমা’ মুমিনদের ইজমা’ রূপে সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি বাত্বিল হয়ে যায়। আর আল্লাহ তা’আলা কখনো আমাদের উপরে মুমিনদের একটি অংশ বা দলের পথের অনুসরণকে আর কোনো একটি অংশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আনুগত্য করাকে ওয়াজিব করেননি। আর ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – তাদের যুগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের পূর্ণ দল বা জামা’আত ছিলেন, যেহেতু তাদের সঙ্গে তারা ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না, বিধায় তাদের ইজমা’কে সকল মুমিনের ইজমা’ বলা নিঃসন্দেহে নিশ্চিতরূপে ছহীহ, সকল প্রশংসা আল্লাহ রব্বল আলামীনের জন্য।
আর উক্ত মতটি সামগ্রিকভাবে বাত্বিল সাব্যস্ত হল যেহেতু কোনো মুমিনের জন্য দীনের মাঝে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে ওয়াজিব সাব্যস্ত করেননি এমন বিষয়কে ওয়াজিব সাব্যস্ত করা বৈধ নয়। তাছাড়া ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরবর্তী কোনো যুগের মানুষদের ইজমা’কে অকাট্যরূপে বিশ্বাস করা জায়েয নেই, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ ইজমা’ করেননি। বরং যে এমন ইজমা’কে অকাট্যরূপে মেনে নেয়, সে নিঃসন্দেহে মিথ্যুক। কেননা ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর পরবর্তী তাবে’ঈন ও তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের সকল বক্তব্য সংগ্রহ করা ও হুবহু হিসাব করে রাখা সম্ভব নয়। কারণ তারা দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন – সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হিন্দুস্তান এর শেষসীমা, খুরাসান, আরমীনীয়াহ, আযারবায়যান, জাযীরাহ, শাম, মিছ্বর, আফ্রীকাহ, আন্দালুস, বরবর অঞ্চলসমূহ, ইয়েমেন, জাযীরাতুল আরব, ‘ইরাক্ব, আহওয়ায, পারস্য, কিরমা, মাকরান, সিজিস্তান, আরদাবীল এবং এই শহরগুলোর মধ্যে।
আর এটা অসম্ভব যে, কোনো মানুষ এই শহরগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষদের প্রত্যেকেরই মত সংগ্রহ করতে পারবে। আর তাদের ঐ বিষয়ের উপরে ইজমা’ করা নিশ্চিতরূপে ছহীহ, যেই বিষয়ে ছাহাবাগণ ইজমা’ করেছেন একটি স্পষ্ট দলীলের ভিত্তিতে: আর তা হল এটা নিশ্চিত যে, এটা ছঁহীহরূিপে সাব্যস্ত যে, তাদের মধ্য থেকে যে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা’ এর উপরে একমত পোষণ করেছেন সে মুমিন, আর যে উক্ত ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে না জেনে, তার বক্তব্য অর্থহীন অকেজো, আর যে এই বিষয়ে তাদের ইজমা’ আছে জেনেও তাদের ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে, সে কাফের, সে এর দ্বারা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বের হয়ে গেল, যাদের ইজমা’ ইজমা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এই বিধান ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রজোয্য নয়, যে নিজের যুগের মানুষদের ইজমা’ এর বিরোধিতা করেছে।
বরং একমাত্র ছাহাবাগণ — রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম — এর ইজমা’কেই নিশ্চিতরূপে মেনে নেওয়া ছহীহ। কারণ তাদের সংখ্যা ছিল গণনাযোগ্য, যারা মক্কা ও মদীনাতে সমবেত ছিলেন। তাদের ব্যাপারে এই বিষয়টি নিশ্চিত ছিল যে, তারা আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুগত ছিলেন। আর যে নাবী আলাইহিস সালাম এর বিরুদ্ধাচারণকে বৈধ মনে করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং সে ঈমানের সীমা থেকে বের হয়ে গিয়েছে। মুমিনদের দল থেকে দূরে সরে গিয়েছে। সুতরাং সন্দেহাতীত ইয়াক্বীনের দ্বারা এটা ছহীহ সাব্যস্ত হয় যে, আমাদের জন্য অনুসরণ করা ফরয এমন ইজমা’ হল শুধুমাত্র ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর ইজমা’। আর এটাও সম্ভব নয় যে, তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ কোনো ভুলের উপরে ইজমা’ করবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা এই বিষয়ের দায়ভার নিজেই নিয়েছেন এই কথার দ্বারা:
“তারা সর্বদা মতানৈক্য করতে থাকবে, তবে যাদের উপরে আপনার রব মেহেরবানি করবে, তারা মতানৈক্য করবে না” (হূদ: ১১৮, ১১৯)।
আর কুরআনের ভাষায় মেহেরবানি একমাত্র মুহসিন ব্যক্তিদের জন্য। আর যখন এটা নিশ্চিতরূপে জানা যাবে যে, এই বিষয়ে কোনো মতানৈক্য নেই, তখন সেটা এমন ইজমা’ বলে বিবেচিত হবে, যা রহমতকে আবশ্যক করে। আর এটা নিশ্চিত ইজমা’ অন্যকিছু নয়, আর যদি উক্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিতরূপে এটা জানা না যায় যে, উক্ত বিষয়ে রহমতকে আবশ্যককারী ইজমা’ আছে কি-না তাহলে সেটা মতানৈক্য ছাড়া অন্যকিছু নয়। আর কুরআনের ভাষ্যনুযায়ী রহমতকে আবশ্যককারী বিষয় ছাড়া অন্যকোনো বিষয়ের উপরে ইজমা’ হওয়া জায়েয নেই। এর পাশাপাশি আমাদের বর্ণনাও বিদ্যমান আছে, যা আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন ইউসূফ, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন ফাতাহ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আব্দুল ওয়াহহাব বিন ‘ঈসা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট আহমাদ বিন’আলী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট মুসলিম বিন হাজ্জাজ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট সাঈদ বিন মানছুর, আবূর রবী’ আল আতাকী এবং কুতায়বাহ বর্ণনা করেছেন, তারা বলেন: আমাদের নিকট হাম্মাদ — যায়েদের পুত্র — আয়্যুব আস সাখতিয়ানী থেকে, তিনি আবূ ক্বিলাবাহ থেকে, তিনি আবূ আসমা আর রাহাবী থেকে, তিনি ছাওবান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"আমার উম্মতের একদল ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত সর্বদা হকের উপরে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে, তাদেরকে যারা লাঞ্চনা করার চেষ্টা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলার আদেশ তথা ক্বিয়ামত না আসবে" ছুহীহ মুসলিম (হা/১৯২০)।
আমাদের নিকট আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ আল হামাদানী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদেরকে আবু ইসহাক বালখী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ফারাবরী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট বুখারী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হুমায়দী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ওয়ালীদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট ইবনু জাবির বর্ণনা করেছেন – যিনি আব্দুর রহমান বিন ইয়াযীদ বিন জাবির এর সন্তান – তিনি বলেন: আমার নিকট উমাইর বিন হানী বর্ণনা করেছেন, তিনি মু'আবীয়াকে বলতে শুনেছেন: আমি আল্লাহর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
"আমার একদল সর্বদা আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যারা তাদের বিরোধিতা করে, তারাও তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এমনকি ক্বিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এই অবস্থাতেই থাকবে" ছুহীহ মুসলিম (হা/১০৩৭)।
আবূ মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহু তা'আলা বলেন: আমরা ইতোপূর্বে তৃতীয় প্রকার বাত্বিল সাব্যস্ত করতে যেয়ে যা উল্লেখ করলাম, তা দ্বারা তাদের মতও বাত্বিল সাব্যস্ত হয় যারা বলে: নিশ্চয় ছাহাবাগণ রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম এর একদল থেকে ছহীহ সূত্রে যা প্রমাণিত হয়েছে, সেই বিষয়ে অন্যদের থেকে যদি কোনো অস্বীকৃতি বা প্রত্যাখ্যানমূলক বক্তব্য না জানা যায়, তাহলে সেটা তাদের পক্ষ থেকে সংঘটিত ইজমা' বলে বিবেচিত হবে। কেননা এটা মুমিনদের একটি অংশের মত যেমনটি আমরা উল্লেখ করলাম। আর তাছাড়াও যে উক্ত মতাদর্শীর মতকে বাদ দিয়ে অন্যকোনো মতকে অকাট্য মনে করল, সেও উক্ত মতাদর্শীর সাথে সহমত পোষণ করল, কারণ সে এমন বিষয়ের অনুসরণ করল, যেই বিষয়ে তার কোনো জ্ঞান নেই আর এটা অপরাধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"যেই বিষয়ে আপনার কোনো জ্ঞান নেই, সেই বিষয়ের অনুসরণ আপনি করবেন না, নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে" (আল ইসরা: ৩৬)
প্রত্যেক মানুষ যেনো নিজের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে। আর এই বিষয় নিয়ে যেন চিন্তা করে যে, আল্লাহ তা'আলা তার কর্ণ, চক্ষু ও অন্তরের এমন বক্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন, যেই বিষয়ে তার নিকট কোনো দৃঢ় জ্ঞান নেই। আর যে কোনো মানুষকে কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে অকাট্য দলীল মনে করল, যেই বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান তাকে দেওয়া হয়নি, সে বিপদের মুখোমুখি হবে। আর এই ক্ষেত্রে তার গুনাহ হবে।
যদি বলা হয়: তারা হলেন শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রগামীতার অধিকারী, যদি তারা কোনো বিষয় অস্বীকার করতেন, তাহলে সেই বিষয়ে তারা চুপ থাকতেন না। আমরা বলব: আল্লাহ তা'আলার তাওফীকে এটার বাস্তবতা হল এমন, যদি তোমার নিকট ছহীহ সূত্রে প্রমাণিত হতো, যে তারা প্রত্যেকে উক্ত বিষয়ে জেনে শুনেও চুপ থেকেছেন। আর এটা তাদের কোনো বক্তার মতের মাঝে বিদ্যমান থাকার কোনো পথ নেই। কেননা ছাহাবাগণ — রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – বিভিন্ন শহরে বিভক্ত হয়ে গিয়েছেন: ইয়েমেন, মক্কা, কুফা, বন্ধুরা, রিক্কা, শাম, মিসর, বাহরাইন ও অন্যান্য অঞ্চলসমূহে।
তাই এই বিষয়টি ছহীহ সাব্যস্ত হয়, যে ব্যক্তি ছাহাবাগণ খলীফা হোক বা না হোক- থেকে বর্ণিত কোনো বক্তব্যের ব্যাপারে এই দাবি করে যে, তাদের সকলেই এই বিষয়ে জানতে পেরেছেন, তাহলে সে নিঃসন্দেহে তাদের সকলের ব্যাপারে মনগড়া মন্তব্য করল। আর তাদের একমাত্র ঐ ইজমা’কেই অকাট্যরূপে মানতে হবে, যেই ইজমা’ এর ব্যাপারে এটা জানা যাবে যে, তারা উক্ত ইজমা’ এর বিষয়টি জানতেন। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত ছলাত, রমযান মাসের ছিয়াম, কা'বা ঘরের হজ্জ, মৃত প্রাণির গোশত, রক্ত, শুকরের গোশত, মদ হারাম হওয়া ও এমন সকল বিষয় হারাম হওয়ার ব্যাপারে, যেই বিষয়গুলোর ব্যাপারে নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, তারা উক্ত বিষয়ে জানতেন এবং সেটা তারা নিশ্চিতরূপে সন্দেহাতীতভাবে স্বীকার করেছেন, এটা এই জন্য যে, তাদের মধ্য হতে শুধুমাত্র একশ আটত্রিশ জন থেকেই ফাতাওয়া বর্ণিত হয়েছে, অথচ তাদের সংখ্যা বিশ হাজার থেকে বেশী। সুতরাং এই মতের প্রবক্তারা কোনো দলীল ছাড়াই যেই দাবি করেছে তা সম্পূর্ণ বাত্বিল।
আর হানাফী, শাফ'ঈ ও মালেকীগণ, যারা এই ইজমা' এর দ্বারা দলীল পেশ করে – যখন তা তাদের তাক্বলীদের সাথে মিলে যায়। সুতরাং তারা হল আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টির মধ্যে ছাহাবাগণের একত্রিত দলের মতের সর্বাধিক পরিপন্থি।
যেই বিষয়ে ছাহাবাগণের মতের বিপরীত কোনো মত পাওয়া যায় না। যেমন মুস্তাহাদ্বাহ (ইস্তিহাদ্বাহ রোগে আক্রান্ত) নারীর জন্য প্রত্যেক ছলাত অথবা একত্রে আদায়যোগ্য দুই ছলাত আদায় করার ক্ষেত্রে গোসল করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ‘আলী ও ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত বর্ণনার সাথে তাদের দ্বিমত পোষণ করা। আয়িশা থেকে বর্ণিত: "যে প্রত্যেক দিন যুহরের ছালাতের সময় গোসল করে" এই বর্ণনার সাথে তাদের দ্বিমত পোষণ করা। যেখানে ছাহাবাগণ – রদ্বীয়াল্লাহু আনহুম – এর মধ্যে এর বিপরীত কোনো মত পাওয়া যায় না। এছাড়াও আরো অনেক বর্ণনা আছে, যেই মাসআলাগুলোর সংখ্যা দুইশতাধিক, যেগুলোকে আমরা সংকলন করেছি (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) কিতাবে।
হ্যাঁ, তারা ছহীহ নিশ্চিত ইজমা' এর বিরোধিতা করেছে। যেমন তারা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকল ছাহাবাগণের বিরোধিতা করেছে। খায়বার এর বাসীন্দাদেরকে খায়বার এর জমী বর্গা চাষে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রদান করার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে। তারা এই বিষয়ে বলে: কিন্তু আমরা তোমাদেরকে বহিষ্কার করে দিব যখন আমাদের ইচ্ছা হবে – আবূ বকর ও উমারের খিলাফতকাল পর্যন্ত। কিন্তু তাদের এই মতের কোনো বিরোধী নেই। এমন দৃষ্টান্ত আরো অনেক বিদ্যমান, যা আমরা পরীক্ষা করে তাদের বিপক্ষে প্রয়োগ করেছি। তাওফীক্ব একমাত্র আল্লাহ তা’আলার নিকটে।
বই: আন নাবযাতুল কাফীয়াহ।
লেখক: ইমাম ইবন হাযম আন্দালুসী রহ।
Attachments