মোটিভেশন #২০১৯-২০২৬...আমি কীভাবে হিদায়াতের পথে এলাম

  • Thread Author
"প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা তার পুরো জীবন বদলে দেয়। আমার জন্য ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল নিজেকে খুঁজে পাওয়ার, ভুল থেকে ফিরে আসার এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক দীর্ঘ সফর।

আমি জন্মসূত্রে মুসলিম ছিলাম, কিন্তু শুধু মুসলিম নাম ধারণ করাই যথেষ্ট নয়—এটা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। জীবনের নানা ঘটনা, পরীক্ষা, ভুল সিদ্ধান্ত, অনুশোচনা এবং আল্লাহর অসীম রহমত আমাকে ধীরে ধীরে দ্বীনের দিকে ফিরিয়ে এনেছে।

আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—হিদায়াত কোনো অর্জন নয়, এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আমি যদি আজ দ্বীনের কিছু বুঝে থাকি, কুরআন-সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করি, তাহলে তা শুধু আল্লাহর দয়া।
'আর আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, সে-ই হিদায়াতপ্রাপ্ত।— সূরা আল-আ'রাফ ৭:১৭৮

এই লেখায় আমি সংক্ষেপে তুলে ধরব ২০১৯ থেকে ২০২৬... পর্যন্ত আমার হিদায়াতের সফর

২০১৯ সাল...

২০১৯ সালে আমার জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল পড়াশোনা। পড়াশোনার প্রতি আমার অনেক আগ্রহ ছিল। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য আমি চেষ্টা করতাম, নিয়মিত পড়াশোনা করতাম এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম। আলহামদুলিল্লাহ, পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়া বা পরীক্ষায় নকল করার মতো বদঅভ্যাস আমার ছিল না।

তখন আল্লাহ সম্পর্কে আমার জ্ঞান ও উপলব্ধি আজকের মতো গভীর ছিল না। কিন্তু আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ছিল। আমি যা প্রয়োজন হতো, তা আল্লাহর কাছেই চাইতাম। সেই বিশ্বাসই আমার মধ্যে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করত। বিশেষ করে পরীক্ষার সময় এলে আমি আরও বেশি দোয়া করতাম, কুরআন তিলাওয়াত করতাম এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করতাম।

মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে আমার সংকোচ লাগত। নিজেকে ছোট মনে হওয়া কিংবা লজ্জার কারণে আমি সাধারণত কারো ওপর নির্ভর করতাম না। তাই নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়াগুলো অধিকাংশ সময় আল্লাহর কাছেই তুলে ধরতাম।

আর সে সময় আমি পর্দাও করতাম। যদিও তা শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ পর্দা ছিল না, তবুও ২০১৯ সালে আমি তৃতীয় স্তরের পর্দা পালন করতাম। আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—আল্লাহ ধীরে ধীরে আমাকে তাঁর দিকে টেনে নিচ্ছিলেন, যদিও তখন আমি তা উপলব্ধি করতে পারিনি।

“আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”— সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩

এই ছিল আমার হিদায়াতের সফরের শুরুর দিকের কিছু অধ্যায়।

২০২২ সালের শেষের দিকে...

২০২২ সালের শেষের দিকে আমি একটি সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ অনুভব করি। সেই আবেগ থেকেই একজনকে মেসেজের মাধ্যমে নিজের অনুভূতির কথা জানাই। কিন্তু আল্লাহর কী অপার রহমত! তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে এমনভাবে নিরুৎসাহিত করলেন যে, সেই পথ আর এগোয়নি।

তখন আমার ছোট হৃদয়ে অনেক কষ্ট এসেছিল। মানুষের স্বভাবই এমন—প্রত্যাখ্যান তাকে ব্যথিত করে। আমিও কেঁদেছিলাম। তবে সেই কান্না কোনো মানুষের সামনে নয়; যিনি আমার সকল গোপন কথা জানেন, যাঁর কাছে আমি সবসময় আশ্রয় খুঁজেছি, সেই আল্লাহর কাছেই।

সেদিন হয়তো আমি বুঝিনি, কিন্তু আজ দীর্ঘ পথ পেরিয়ে উপলব্ধি করি—এটিও ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উসিলা। তিনি আমাকে এমন একটি পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যা হয়তো আমার জন্য কল্যাণকর ছিল না।

সেই ঘটনার পর মানুষের প্রতি নির্ভরশীলতা আরও কমে যায়। জীবনের একটি ছোট আঘাত আমাকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছিল—আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত অর্থে কেউ স্থায়ী আশ্রয় নয়। মানুষের হৃদয় পরিবর্তন হয়, সম্পর্ক বদলে যায়, কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে ছেড়ে দেন না।

ধীরে ধীরে আমি নিজেকে সামলে নিই এবং আবার পড়াশোনার দিকে মনোযোগী হই। আজ মনে হয়, সেই কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর একটি অদৃশ্য রহমত লুকিয়ে ছিল। কারণ অনেক সময় আল্লাহ আমাদের যা চাই তা দেন না, বরং যা আমাদের জন্য উত্তম সেটার দিকেই পরিচালিত করেন।

# ২০২৪ সাল — হিদায়াতের এক স্মরণীয় বর্ষ

২০২৪ সাল আমার জীবনের একটি স্মরণীয় বছর। আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন মনে হয় এই বছরটি আমার হিদায়াতের সফরে এক বিশেষ মোড় হয়ে এসেছিল।

আমি আগে থেকেই মোটামুটি পর্দা করতাম। তাই আমার মধ্যে লজ্জাশীলতা (হায়া) ও শালীনতা ছিল। যদিও তখন মাহরাম-ননমাহরামের বিধান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছিল না, তবুও স্বভাবগতভাবেই আমি ননমাহরাম আত্মীয় বা অনাত্মীয় পুরুষদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা পছন্দ করতাম না। কোনো প্রয়োজন ছাড়া তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বা উঠাবসাও ছিল না।

অনেক সময় কোনো অনাত্মীয় ব্যক্তি হঠাৎ আমাদের বাড়িতে এলে অস্বস্তি অনুভব করতাম। কেন এমন লাগত, তখন বুঝতাম না। হয়তো আল্লাহ আমার ফিতরাতের মধ্যে শালীনতার প্রতি ভালোবাসা রেখে দিয়েছিলেন।

তখনও আমি কোনো দ্বীনি গ্রুপ, ফেসবুক পেজ বা ইসলামিক কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। একদিন হঠাৎ গুগলে কোনো একটি বিষয় সার্চ করতে গিয়ে মাহরাম ও ননমাহরাম সম্পর্কিত আলোচনা সামনে আসে। ঠিক কী সার্চ করেছিলাম তা আজ মনে নেই, কিন্তু সেই অনুসন্ধান আমার জীবনের একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়ে যায়।

এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, যথাসম্ভব ননমাহরামদের সামনে না যাওয়ার চেষ্টা করব এবং শরীয়তের পর্দাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করব।

এই সিদ্ধান্তের পর আমি একটি বিষয় অনুভব করলাম—সমাজের অনেক মানুষের কাছে যেন আমি অদ্ভুত হয়ে গেছি। অথচ আমি তো কারো ক্ষতি করিনি; আমি শুধু আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পর্দা করার চেষ্টা করেছি। তখন বুঝলাম, সত্যের পথে চলতে গেলে অনেক সময় মানুষ অপরিচিত হয়ে যায়।

কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কখনো একা ছেড়ে দেন না।

যখন চারপাশের কিছু বিষয় কষ্ট দিত, তখন আল্লাহ আমার হৃদয়ে প্রশান্তি নাযিল করতেন। সেই প্রশান্তির কথা মনে হলে আমার কুরআনের সেই আয়াতটি স্মরণ হয়—

"তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি (সাকীনাহ) নাযিল করেছেন, যাতে তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়।"

আমি কুরআন পড়তে শুরু করলাম। সূরা আন-নূর, সূরা আল-আহযাব, সূরা আন-নিসা—পর্দা ও শালীনতা সম্পর্কে আল্লাহর বাণীগুলো পড়তে লাগলাম। তখন মনে হলো, আমি তো কোনো ভুল পথে নেই। বরং আল্লাহর নির্দেশনার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

ধীরে ধীরে আমি উপলব্ধি করলাম, দ্বীনের পথে চলা সবসময় সহজ নয়। কখনো কখনো এই পথ মানুষকে অপরিচিত করে দেয়। কিন্তু সেই অপরিচিত হওয়ার মধ্যেও এক অনন্য সৌন্দর্য আছে। কারণ মানুষ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অপরিচিত হয়ে যায়, তবে সে ক্ষতিগ্রস্ত নয়; বরং সৌভাগ্যবান।

আল্লাহ তাআলা সকল গুরাবাকে (দ্বীনের কারণে অপরিচিত হয়ে যাওয়া মানুষদের) তাঁর হিদায়াত ও সত্যের ওপর অটল রাখুন।

আর আমি নিজেও একজন গুনাহগার বান্দী। আমার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমাকে হিদায়াতের ওপর অটল রাখেন, আমার ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন এবং আমার শেষ পরিণতি কল্যাণময় করেন।

আমীন।
Nabila
 
Back
Top