খুতবা প্রতিবেশির হক

কুরআন ও স্বহীহ সুন্নাহের আলোকে ইসলামী খুতবাহ

প্রতিবেশির হক
​

লেখক ঃ তাজাম্মুল হক সালাফী​

ভূমিকা ঃ​


প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেশীর অবস্থান মানুষের সবচেয়ে কাছে, যাকে বিপদে সবার আগে পাশে পাওয়া যায় এবং যে কোনো ডাকে সে-ই সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয়। সে এমন এক ব্যক্তি, যার মুখাবয়ব মানুষ প্রতিদিন অবলোকন করে এবং নিজের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের চেয়েও তার সাথেই বেশি সাক্ষাৎ ঘটে। ইসলাম ধর্মে এই প্রতিবেশীর বহু অধিকার ও মর্যাদার কথা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আজ অধিকাংশ মানুষই ভুলে গেছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কিছু প্রতিবেশী অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে না, কারো ভুলত্রুটি ক্ষমা করে না এবং কোনো অপরাধ বা স্খলন মার্জনা করতে চায় না।"

পবিত্র কুরআনের আলোকপাত ঃ আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا ﴾ [النساء: 36].​

তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী। সূরা নিসা-৩৬।

প্রতিবেশীর প্রকারভেদ ঃ​


এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামী চিন্তাবিদগণ প্রতিবেশীকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছেন

ক) নিকটতম আত্মীয় প্রতিবেশী (وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى) ঃ যার তিনটি অধিকার রয়েছে—প্রতিবেশি হওয়ার অধিকার, মুসলিম হওয়ার অধিকার এবং আত্মীয়তার অধিকার।

খ) অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী (وَالْجَارِ الْجُنُبِ) ঃ যার দুটি অধিকার রয়েছে—প্রতিবেশি হওয়ার অধিকার এবং দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের অধিকার।

গ) অমুসলিম প্রতিবেশী: যার একটিই অধিকার রয়েছে— কেবল প্রতিবেশি হওয়ার অধিকার।

স্বহীহ হাদীসের আলোকে প্রতিবেশীর গুরুত্ব ঃ

ক) জিব্রীল আলাইহিস সালামের অবিরত অসীয়াত প্রতিবেশীর বিষয়ে -


قَالَ يَزِيدُ: عَنْ رَجُلٍ، مِنَ الْأَنْصَارِ، قَالَ: خَرَجْتُ مِنْ أَهْلِي أُرِيدُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا أَنَا بِهِ قَائِمٌ، وَرَجُلٌ مَعَهُ مُقْبِلٌ عَلَيْهِ، فَظَنَنْتُ أَنَّ لَهُمَا حَاجَةً، قَالَ: فَقَالَ الْأَنْصَارِيُّ: وَاللهِ لَقَدْ قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى جَعَلْتُ أَرْثِي لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، لَقَدْ قَامَ بِكَ الرَّجُلُ حَتَّى جَعَلْتُ أَرْثِي لَكَ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ، قَالَ: " وَلَقَدْ رَأَيْتُهُ "، قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَ: " أَتَدْرِي مَنْ هُوَ؟ " قُلْتُ: لَا، قَالَ: " ذَاكَ جِبْرِيلُ مَا زَالَ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ "، ثُمَّ قَالَ: " أَمَا إِنَّكَ لَوْ سَلَّمْتَ عَلَيْهِ رَدَّ عَلَيْكَ السَّلَامَ " ​

ইয়াজিদ (র.) এক আনসারী সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি (আনসারী সাহাবী) বলেন: "আমি পরিবার থেকে বের হয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। হঠাৎ আমি তাঁকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেলাম এবং একজন ব্যক্তি তাঁর মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি ভাবলাম তাদের কোনো জরুরি প্রয়োজন বা কাজ রয়েছে।" সেই আনসারী সাহাবী বলেন: "আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলেন যে, তাঁর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আমার মনে তাঁর প্রতি দয়া ও সহানুভূতি জেগে উঠল।" "অতঃপর ওই ব্যক্তি চলে গেলে আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! ওই ব্যক্তি আপনাকে এত দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল যে, আপনার এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা দেখে আমার মনে আপনার প্রতি অত্যন্ত দয়া হচ্ছিল।" তিনি (রাসূলুল্লাহ) বললেন: "তুমি কি তাকে দেখেছ?"আমি বললাম: "হ্যাঁ।"তিনি বললেন: "তুমি কি জানো সে কে?" আমি বললাম: "না।"তিনি বললেন: "তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আ.)। তিনি আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অনবরত ও এত বেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে (সম্পত্তির) উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।" অতঃপর তিনি (রাসূলুল্লাহ) বললেন: "শোনো! তুমি যদি তাকে সালাম দিতে, তবে তিনিও তোমার সালামের উত্তর দিতেন।"মুসনাদ আহমাদ-২০৩৫০, সহীহ। সহীহ তারগীব-২৫৭২

ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন ঃ

«مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বরাবরই আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অসীয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার মনে হয় যে অচিরেই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস বানিয়ে দিবেন (বুখারী-৬০১৫)।


খ) অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি উদারতা ঃ​


মহান সাহাবীগণ প্রতিবেশীদের—এমনকি অমুসলিম প্রতিবেশীদেরও—অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতেন। তাঁরা প্রতিবেশীদের সাথে সদয় ও উদার আচরণ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন, যদিও সেই প্রতিবেশীরা অমুসলিম হতেন।

عَنْ مُجَاهِدٍ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو ذُبِحَتْ لَهُ شَاةٌ فِي أَهْلِهِ، فَلَمَّا جَاءَ قَالَ: أَهْدَيْتُمْ لِجَارِنَا اليَهُودِيِّ؟ أَهْدَيْتُمْ لِجَارِنَا اليَهُودِيِّ؟ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»​

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর জন্য তার পরিবারে একটি ছাগল যবেহ করা হল। তিনি এসে বললেন, তোমরা কি আমাদের ইয়াহুদী প্রতিবেশীকে (মাংস) উপহার পাঠিয়েছ? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ প্রতিবেশীর অধিকার প্রসঙ্গে জিবরীল (আঃ) আমাকে অবিরত উপদেশ দিতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হল যে, হয়ত শীঘ্রই প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিবে। তিরমিযী-১৯৪৩, সহীহ-আলবানী।

গ) আল্লাহর সাহায্য লাভ ঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—


المسلم أخو المسلم: لا يظلمه، ولا يُسلمه، ومن كان في حاجة أخيه، كان الله في حاجته، ومن فرَّج عن مسلم كربةً، فرَّج الله

عنه بها كربةً من كرب يوم القيامة، ومن ستر مسلمًا، ستره الله يوم القيامة
​

এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে শত্রুর হাতে সঁপে দেবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর প্রধান প্রধান হকগুলি আলোচনা করা হল-

অধিকার ১ ঃ কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রতিবেশীর সাথে সদয় আচরণ করা।

প্রতিবেশীর সাথে সদয় আচরণ করা একটি মহৎ গুণ, যা হৃদয়কে কল্যাণের পথে প্রস্তুত করে তোলে; যখন একজন প্রতিবেশী তার পাশের বাড়ির মানুষটির কাছ থেকে সদিচ্ছা ও সদয় আচরণ অনুভব করেন, তখন তাঁর হৃদয় আশ্বস্ত হয়, আত্মা প্রশান্তি লাভ করে এবং মন-মানসিকতা উন্নত ও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে।

ক) প্রকৃত মুসলিম হওয়ার শর্ত ঃ


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ: قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا هُرَيْرَةَ كُنْ وَرِعًا، تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ، وَكُنْ قَنِعًا، تَكُنْ أَشْكَرَ النَّاسِ، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ، تَكُنْ مُؤْمِنًا، وَأَحْسِنْ جِوَارَ مَنْ جَاوَرَكَ، تَكُنْ مُسْلِمًا، وَأَقِلَّ الضَّحِكَ، فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ الْقَلْبَ»​

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে আবূ হুরায়রা! তুমি আল্লাহভীরু হয়ে যাও, তাহলে লোকেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী হতে পারবে। তুমি অল্পে তুষ্ট থাকো, তাহলে লোকেদের মধ্যে সর্বোত্তম কৃতজ্ঞ হতে পারবে। তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অন্যদের জন্যও তাই পছন্দ করবে, তাহলে পূর্ণ মুমিন হতে পারবে। তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচারী ও দয়াপরবশ হও, তাহলে মুসলিম হতে পারবে। তোমার হাসি কমাও, কেননা অধিক হাসি অন্তরাত্মাকে ধ্বংস করে (ইবনু মাজাহ-৪২১৭,সহীহ-আলবানী)।

খ)) প্রকৃত মুমিন হওয়ার শর্ত ঃ


مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتْ»​

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদয় আচরণ করে; যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে; এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" মুসলিম- ৪৮।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَأْخُذُ عَنِّي هَؤُلَاءِ الكَلِمَاتِ فَيَعْمَلُ بِهِنَّ أَوْ يُعَلِّمُ مَنْ يَعْمَلُ بِهِنَّ» ؟ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: فَقُلْتُ: أَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَأَخَذَ بِيَدِي فَعَدَّ خَمْسًا وَقَالَ: «اتَّقِ المَحَارِمَ تَكُنْ أَعْبَدَ النَّاسِ، وَارْضَ بِمَا قَسَمَ اللَّهُ لَكَ تَكُنْ أَغْنَى النَّاسِ، وَأَحْسِنْ إِلَى جَارِكَ تَكُنْ مُؤْمِنًا، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ تَكُنْ مُسْلِمًا، وَلَا تُكْثِرِ الضَّحِكَ، فَإِنَّ كَثْرَةَ الضَّحِكِ تُمِيتُ القَلْبَ»​

এমন কে আছে যে আমার নিকট হতে এ কথাগুলো গ্রহণ করবে এবং সে মুতাবিক নিজেও আমল করবে অথবা এমন কাউকে শিক্ষা দিবে যে অনুরূপ আমল করবে? আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমি আছি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং গুনে গুনে এ পাঁচটি কথা বললেনঃ তুমি হারাম সমুহ হতে বিরত থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় আবিদ বলে গণ্য হবে; তোমার ভাগ্যে আল্লাহ তা’আলা যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাতে খুশি থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা স্বনির্ভর বলে গণ্য হবে; প্রতিবেশীর সাথে ভদ্র আচরণ করলে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে; যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা-ই অন্যের জন্যও পছন্দ করতে পারলে প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে এবং অধিক হাসা থেকে বিরত থাক। কেননা অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক হৃদয়কে মৃতবৎ করে দেয় তিরমিযী-২৩০৫, হাসান-আলবানী।

প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের অন্যতম দিক হল-

উপহার আদান-প্রদান ঃ

উপহার আদান-প্রদান প্রতিবেশীর হৃদয়ে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। এটি মানুষের অন্তরকে জয় করে। এই বিষয়ে স্পষ্ট হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:


يَا أَبَا ذَرٍّ، إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً، فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، وَتَعَاهَدْ جِيرَانَك​

"হে আবু যার! যখন তুমি তরকারি রান্না করবে, তখন তাতে পানির পরিমাণ (ঝোল) বাড়িয়ে দিও এবং তোমার প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিও(মুসলিম-২৬২৫)।"

অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম বলেন-


إذا طَبَخْتَ قِدْرًا فَأَكْثِرْ مَرَقَتَهَا فَإِنَّهُ أَوْسَعُ لِلْأَهْلِ والجيران​

" যখন তুমি তরকারি রান্না করবে, তখন তাতে ঝোল বাড়িয়ে দি। নিশ্চয়ই এটি পরিবার ও প্রতিবেশীদের জন্য অধিক প্রশস্ততা আনে (সহীহ ইবনু হিব্বান-৫১৩, মুসলিমের শর্তে সহীহ )।"

عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا كَانَتْ تَقُولُ: وَاللهِ يَا ابْنَ أُخْتِي إِنْ كُنَّا لَنَنْظُرُ إِلَى الْهِلَالِ، ثُمَّ الْهِلَالِ، ثُمَّ الْهِلَالِ، ثَلَاثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ، وَمَا أُوقِدَ فِي أَبْيَاتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَارٌ، قَالَ: قُلْتُ: يَا خَالَةُ فَمَا كَانَ يُعَيِّشُكُمْ؟ قَالَتْ: «الْأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ، إِلَّا أَنَّهُ قَدْ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِيرَانٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، وَكَانَتْ لَهُمْ مَنَائِحُ، فَكَانُوا يُرْسِلُونَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَلْبَانِهَا، فَيَسْقِينَاهُ»​



মুসলিম আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ঃ আল্লাহর কসম, আমরা পরপর তিনটি চাঁদ (অর্থাৎ দুই মাস) দেখতাম, অথচ আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঘরে আগুন জ্বালানো হত না (রান্না হতো না)। আমি (ভাতিজা উরওয়াহ) জিজ্ঞেস করলাম: হে খালামণি! তাহলে আপনারা কী খেয়ে বেঁচে থাকতেন? তিনি বললেন: দুটি কালো জিনিস— খেজুর আর পানি। তবে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কিছু আনসার প্রতিবেশী ছিলেন, তাদের কিছু দুগ্ধবতী পশু ছিল। তারা আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে দুধ পাঠাতেন এবং তিনি আমাদের তা পান করতে দিতেন (মুসলিম-২৯৭২)।"

সামান্য উপহারকেও তুচ্ছ না ভাবা ঃ

নাবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতেন:


يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ، لَا تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا، وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ​

"হে মুসলিম নারীগণ! কোনো প্রতিবেশী যেন তার অপর প্রতিবেশীকে (উপহার দেওয়াকে) তুচ্ছ জ্ঞান না করে, তা যদি একটি ছাগলের পায়ের খুরও হয় (বুখারী-২৫৬৬)।"

এর অর্থ হলো: কোনো নারী যেন তার প্রতিবেশীকে কোনো কিছু উপহার দিতে লজ্জাবোধ বা তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি সেটি যদি এমন সাধারণ জিনিসও হয় যা সাধারণত খুব একটা উপকারে আসে না। (আল-ফাতহ: ১০/৪৪৫)।

নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার প্রদান ঃ

প্রতিবেশীর কর্তব্য হলো সাধ্যানুযায়ী সামান্য হলেও দেওয়া এবং সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী থেকে শুরু করা।


عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ لِي جَارَيْنِ فَإِلَى أَيِّهِمَا أُهْدِي؟ قَالَ: «إِلَى أَقْرَبِهِمَا مِنْكِ بَابًا»​

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার দুজন প্রতিবেশী আছে, আমি তাদের মধ্যে কার কাছে উপহার পাঠাব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:যার দরজা তোমার সবচেয়ে নিকটবর্তী( বুখারী-২২৫৯)।"

এর পেছনের মূল হিকমত বা দর্শন হল এই যে,— সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেখতে পায় তার প্রতিবেশীর ঘরে কী উপহার বা অন্যান্য জিনিস ঢুকছে, ফলে তার মনে সেটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে; যা দূরের প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে হয় না। এই হাদিসগুলো থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো— প্রতিবেশীকে খাবার উপহার দেওয়া মুস্তাহাব (উত্তম কাজ)। প্রতিবেশীদের মধ্যে উপহার আদান-প্রদান করা এবং সবার প্রতি সদাচরণ করা সম্ভব না হলে সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।



অধিকার ২: ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া ও অভাব দূর করা ঃ​


আমাদের জানা আবশ্যক যে, কোনো ব্যক্তি নিজে পেটপুরে খাবে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকবে-এটি ঈমানের পরিপন্থী। ইমাম তাবারানি ও হাকেম ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: "আমি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:

لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ​

"ঐ ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন নয়, যে নিজে তৃপ্ত হয়ে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে (আস-সিলসিলাতুস সাহীহাহ -১৪৯)।

ما آمن بي مَن بات شبعان وجاره جائع إلى جنبه وهو يعلم​

সে ব্যক্তি আমার প্রতি ঈমান আনেনি, যে নিজে পেট পুরে খেয়ে রাত কাটাল অথচ তার পাশে তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত রইল এবং সে তা জানত সহীহ জামি-৫৫০৫।"

সুতরাং ধনী প্রতিবেশীর জন্য তার প্রতিবেশীদের ক্ষুধার্ত রাখা হারাম। অতএব, তার উপর আবশ্যক হলো তাদের ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা করা, এবং তারা যদি বস্ত্রহীন হয় তবে তাদের পরিধেয় বস্ত্র দেওয়া এবং এ জাতীয় অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করা।"



অধিকার ৩ ঃ স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়া ঃ​


যখন কোনো মানুষ এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে চায়, তখন বিক্রয়যোগ্য বাড়িটি অন্য কারও আগে প্রথমে তার প্রতিবেশীর কাছে প্রস্তাব করবে। একইভাবে যদি সেটি কোনো একখণ্ড জমিও হয় (তবুও আগে প্রতিবেশীকে জানাবে)।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَتْ لَهُ أَرْضٌ فَأَرَادَ بَيْعَهَا، فَلْيَعْرِضْهَا عَلَى جَارِهِ»​

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম) বলেছেন: যার কোনো জমি আছে এবং সে তা বিক্রি করতে চায়, সে যেন তা প্রথমে তার প্রতিবেশীর কাছে পেশ করে(ইবনু মাজাহ-২৪৯৩) ।"



অধিকার ৪ ঃ আর্থিক সংকটে ঋণ দেওয়া ও ঋণ পরিশোধে সময় দেওয়া।​


প্রতিবেশী কোনো আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণ চাইলে সামর্থ্য থাকলে তাকে ঋণ দেওয়া মুসলমানদের পারস্পরিক সহযোগিতার অংশ। মহান আল্লাহ বলেন-

{وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ} [المائدة: 2].​

"সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে তোমরা একে অপরের সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরের সাহায্য করো না।" [আল-মায়িদাহ: ২]

অভাবীকে সময় দেওয়া ঃ

যদি কোনো ভায়ের টাকা ধার করে থাকে এবং পরিশোধের সময় চলে আসে, কিন্তু সে ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম না হয়, তবে তাকে সামর্থ্য হওয়া পর্যন্ত সময় দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন:


{ وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ } ​

আর যদি সে অভাবগ্রস্ত হয়, তবে স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া উচিত। [আল-বাকারাহ: ২৮০]

ঋণের হিসাব লিখে রাখতে হবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিশোধ করতে হবে।


{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ }​

হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পরের মধ্যে ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখে রাখো। [আল-বাকারাহ: ২৮২]।

ঋণ দ্রুত পরিশোধের তাগিদ ঃ

অতএব, যখন পরিশোধের সময় আসবে, তখন মৃত্যু আসার আগেই তা পরিশোধ করতে তাড়াহুড়ো করো। ইমাম তিরমিজি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন - তিনি বলেছেন:


نفس المؤمن معلّقة بدَينه حتى يقضى عنه ​

মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়-ইবনু মাজাহ-২৪১৩, সহীহ।

এবং ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:


القتل في سبيل الله يكفّر كل شيء إلا الدَّين ​

আল্লাহর রাস্তায় যারা শাহাদাত বরণ করে তাদের ঋণ ছাড়া বাকি সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হয় (মুসলিম-১৮৮৬)।

জ্ঞাতব্য ঃ

হাতেম আল-আসাম বলতেন ঃ
হাতেম আল-আসাম বলতেন, ৫টি বিষয় ছাড়া বাকি সবক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা শয়তানের পক্ষ থেকে। তার একটি হলো "ঋণ পরিশোধ করা" (বাকি চারটি: মেহমানকে খাবার খাওয়ানো, মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে এবং পাপ থেকে তাওবা)।



অধিকার ৫ ঃ অত্যাচারী বা অত্যাচারিত—সর্বাবস্থায় সাহায্য করা ।​


অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-বলেন

انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا نَنْصُرُهُ مَظْلُومًا، فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا؟ قَالَ: تَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِ​

তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে অত্যাচারী হোক বা অত্যাচারী । এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রাসূল, সে অত্যাচারিত হলে তো তাকে সাহায্য করব, কিন্তু সে যদি অত্যাচারী হয়, তবে তাকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন ঃ তিনি বললেন, তুমি তার হাত ধরে তাকে বিরত রাখবে (অর্থাৎ তাকে যুলুম করতে দিবে না) বুখারী-২৪৪৪। অন্য একটি বর্ণনায় আছে-

تحجزه أو تمنعه من الظلم؛ فإن ذلك نصره

তুমি তাকে অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখবে বা বাধা দেবে; এটাই তাকে সাহায্য করা-বুখারী ঃ ৬৯৫২।

সুতরাং, কোনো প্রতিবেশী যদি তার প্রতিবেশীর উপর বা অন্য কোনো মানুষের উপর অন্যায় করতে চায় বা অত্যাচার করতে চায়, তবে অপর প্রতিবেশীর দায়িত্ব হলো তাকে তা থেকে বাধা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে মীমাংসা করার চেষ্টা করা। তাই প্রতিবেশীর কর্তব্য হলো তার প্রতিবেশীদের মধ্যে শান্তি ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা। সে যেন সর্বদা শান্তি ও কল্যাণের মাধ্যম হয়, কোনো ধ্বংস বা ফাসাদের মাধ্যম না হয়।

পারস্পরিক শান্তি ও সুসম্পর্ক বজায় রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

{ لَّا خَیۡرَ فِی كَثِیر مِّن نَّجۡوَىٰهُمۡ إِلَّا مَنۡ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوۡ مَعۡرُوفٍ أَوۡ إِصۡلَـٰحِۭ بَیۡنَ ٱلنَّاسِۚ وَمَن یَفۡعَلۡ ذَ ٰ⁠لِكَ ٱبۡتِغَاۤءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ فَسَوۡفَ نُؤۡتِیهِ أَجۡرًا عَظِیم } [نساء: 114]​

তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই; তবে কল্যাণ আছে যে ব্যক্তি দান-খয়রাত, সৎকাজ বা মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এসব করবে, তাকে আমি অবশ্যই মহা পুরস্কার দান করব। [সূরা আন-নিসা: ১১৪]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-

{ إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ إِخۡوَة فَأَصۡلِحُوا۟ بَیۡنَ أَخَوَیۡكُمۡۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ } [الحجرات: 10]​

মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। [সূরা আল-হুজুরাত: ১০]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন –

«كُلُّ سُلاَمَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ يَعْدِلُ بَيْنَ النَّاسِ صَدَقَةٌ»​

মানুষের প্রতিটি জোড়ের (গ্রন্থির) জন্য প্রতিদিন সদকা দেওয়া আবশ্যক যে দিনটিতে সূর্য উদিত হয়। দুজনের মধ্যে ন্যায়বিচার বা মীমাংসা করে দেওয়া একটি সদকা (বুখারী-২৭০৭)।

كل سُلامى من الناس عليه صدقة، كل يوم تطلع فيه الشمس يعدل بين الاثنين صدقة، ويعين الرجل في دابته، فيحمله عليها أو يرفع له عليها متاعه صدقة، والكلمة الطيبة صدقة، وبكل خطوة يمشيها إلى الصلاة صدقة، ويميط الأذى عن الطريق صدقة ​



মানুষের প্রতিটি জোড়ের (গ্রন্থির) জন্য প্রতিদিন সদকা দেওয়া আবশ্যক যে দিনটিতে সূর্য উদিত হয়। দুজনের মধ্যে ন্যায়বিচার বা মীমাংসা করে দেওয়া একটি সদকা, কোনো ব্যক্তিকে তার সওয়ারিতে আরোহণ করতে সাহায্য করা বা তার মালপত্র তার ওপর তুলে দেওয়া একটি সদকা, ভালো কথা বলা একটি সদকা, সালাতের জন্য হেঁটে যাওয়া প্রতিটি কদম একটি সদকা এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়াও একটি সদকা (সহীহ তারগীব-২৮১৩)।

আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ» ، قَالُوا: بَلَى، قَالَ: «صَلَاحُ ذَاتِ البَيْنِ، فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ البَيْنِ هِيَ الحَالِقَةُ»​

আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত ও সদকার মর্যাদার চেয়েও উত্তম বিষয় সম্পর্কে জানাব না?। সাহাবীগণ বললেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ঃ পারস্পরিক সুসম্পর্ক স্থাপন বা মীমাংসা করা। কেননা পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়াই হলো দ্বীনকে মুণ্ডন বা ধ্বংস করে দেওয়া (তিরমিযী-২৫০৯)।



অধিকার ৬: শরয়ী জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া ঃ​


عَنْ عُمَرَ، قَالَ: كُنْتُ أَنَا وَجَارٌ لِي مِنَ الأَنْصَارِ فِي بَنِي أُمَيَّةَ بْنِ زَيْدٍ وَهِيَ مِنْ عَوَالِي المَدِينَةِ وَكُنَّا نَتَنَاوَبُ النُّزُولَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَنْزِلُ يَوْمًا وَأَنْزِلُ يَوْمًا، فَإِذَا نَزَلْتُ جِئْتُهُ بِخَبَرِ ذَلِكَ اليَوْمِ مِنَ الوَحْيِ وَغَيْرِهِ، وَإِذَا نَزَلَ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ



ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: "আমি এবং উমাইয়া ইবনু যায়েদ গোত্রের আমার এক আনসার প্রতিবেশী মদীনার উঁচু এলাকায় বসবাস করতাম। আমরা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে পালাক্রমে উপস্থিত হতাম। তিনি একদিন আসতেন, আর আমি একদিন আসতাম। আমি যখন আসতাম, সেদিনের ওহী ও অন্যান্য খবরাখবর আমি তাকে এসে জানাতাম। আর তিনি যখন আসতেন, তিনিও অনুরূপ করতেন।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৮৯)



অধিকার ৭ ঃ প্রতিবেশীর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করা।​


কোনো প্রতিবেশী যদি তার অন্য প্রতিবেশীর মধ্যে কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখে, তবে সে যেন তার প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করে। আর যখন তার সাথে কথা বলবে, তখন তার কথাকে ভালো অর্থে গ্রহণ করবে। কারণ মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ (12)
​
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবূলকারী, অসীম দয়ালু। [আল-হুজুরাত: ১২]



يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ، وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ، لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ، وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ، فَإِنَّهُ مَنِ اتَّبَعَ عَوْرَاتِهِمْ يَتَّبِعُ اللَّهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ يَتَّبِعِ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ»​

রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন ঃ হে সেসব লোক যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছে কিন্তু ঈমান অন্তরে প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গীবত করবে না। তোমরা মানুষের গোপন দোষ ত্রুটি অনুসন্ধান করো না। কারণ যে ব্যক্তি তাদের দোষ অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করবেন এবং তাকে তার ঘরের ভেতরেই লাঞ্ছিত করবেন।"আবূ দাঊদ-৪৮৮০, হাসান সহীহ।


​

অধিকার ৮ ঃ প্রতিবেশীর দেওয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করা ঃ​


প্রতিবেশীর সুবিধার্থে নিজের কিছু অধিকার ছেড়ে দেওয়া ঃ

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:


لا يمنع جار جاره أن يغرز خشبة في جداره مالي أراكم عنها معرضين؟، والله لأرمين بها بين أكتافكم".​

কোনো প্রতিবেশী যেন তার প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে খুঁটি বা কাঠ গাড়তে বাধা না দেয়।"এরপর আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন ঃ কী হলো, আমি তোমাদের এই সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখছি কেন? আল্লাহর কসম, আমি এটি তোমাদের কাঁধের ওপর নিক্ষেপ করবই [অর্থাৎ তোমাদের এটি মানতে বাধ্য করব]- বুখারী ঃ ২৪৬৩।

হাসান আল-বসরী (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন ঃ

প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ কেবল প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং উত্তম আচরণ হলো প্রতিবেশীর দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য ধারণ করা।"

প্রতিবেশি বেশি বেশি অত্যাচার করলে তাকে জব্দ করার ঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: «جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَشَكَا إِلَيْهِ جَارًا لَهُ، فقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ: «اصْبِرْ» ثُمَّ، قَالَ لَهُ فِي الرَّابِعَةِ أَوِ الثَّالِثَةِ: «اطْرَحْ مَتَاعَكَ فِي الطَّرِيقِ» فَفَعَلَ، قَالَ: فَجَعَلَ النَّاسُ يَمُرُّونَ بِهِ وَيَقُولُونَ: مَا لَكَ؟ فَيَقُولُ: آذَاهُ جَارُهُ، فَجَعَلُوا يَقُولُونَ: لَعَنَهُ اللَّهُ فَجَاءَهُ جَارُهُ، فقَالَ: رُدَّ مَتَاعَكَ، لَا وَاللَّهِ لَا أُوذِيكَ أَبَدًا.​

আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে তাঁর এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে তিনবার বললেন, "ধৈর্য ধরো।" এরপর তৃতীয় বা চতুর্থবার তিনি তাঁকে বললেন, "তোমার জিনিসপত্র রাস্তায় ফেলে দাও।" লোকটি তাই করলেন। পথচারীরা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করতে লাগল, "আপনার কী হয়েছে?" তিনি উত্তর দিতেন, "আমার প্রতিবেশী আমার ক্ষতি করেছে।" তখন তারা বলত, "আল্লাহ তার ওপর অভিসম্পাত করুন।" অবশেষে সেই প্রতিবেশী তাঁর কাছে এসে বলল, "তোমার জিনিসপত্র ফিরিয়ে নিয়ে যাও; আল্লাহর কসম, আমি আর কখনও তোমার ক্ষতি করব না (সহীহ ‍ইবনু হিব্বান-৫২০ হাসান সহীহ-আলবানী)।"

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর চমৎকার নসীহত ঃ

এক ব্যক্তি এসে বলল,"আমার এক প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দেয় ও গালিগালাজ করে।" তিনি বললেন: "তুমি যাও; সে যদি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর অবাধ্যতা করে থাকে, তবে তুমি তার ব্যাপারে আল্লাহর আনুগত্য (ধৈর্য ও সদাচরণ) করো।"


প্রতিবেশির অধিকার পূর্ণ করার ফযীলত ঃ​


১) সম্পদ ও আয়ু বৃদ্ধি পায় ঃ​


عَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهَا: " إِنَّهُ مَنْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنَ الرِّفْقِ، فَقَدْ أُعْطِيَ حَظَّهُ مِنْ خَيْرِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَصِلَةُ الرَّحِمِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَحُسْنُ الْجِوَارِ يَعْمُرَانِ الدِّيَارَ، وَيَزِيدَانِ فِي الْأَعْمَارِ "​

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত ঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম) তাঁকে বলেছিলেন,“ যাকে নম্রতার অংশ দেওয়া হয়েছে, তাকেই ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের অংশ দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, উত্তম চরিত্র ও প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ—এসব বিষয় ঘরবাড়িকে সমৃদ্ধ করে এবং আয়ু বৃদ্ধি করে (মুসনাদ আহমাদ-২৫২৫৯-সহীহ, সহীহা-৫১৯)।”

২) দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে ঃ

প্রতিবেশীর উচিত তার প্রতিবেশীর বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানো, যাতে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট সহজ করে দেন। ইমাম মুসলিম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন - তিনি বলেছেন ঃ

مَن يسَّر على مُعسِر، يسَّر الله عليه في الدنيا والآخرة، والله في عون العبد ما كان العبد في عون أخيه​

যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের অভাব সহজ করে দেয়, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার কাজ সহজ করে দেন। আর আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে (মুসলিম-২৬৯৯)।

​

৩) আল্লাহ ও রসূলকে ভালোবাসার পথ প্রশস্ত হয় ঃ​


إن أحببتم أن يحبكم الله تعالى ورسوله فأدوا إذا ائتمنتم واصدقوا إذا حدثتم وأحسنوا جوار من جاوركم​

আপনি যদি চান যে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আপনাকে ভালোবাসুন, তবে আপনার ওপর অর্পিত আমানত রক্ষা করুন, কথা বলার সময় সত্য বলুন এবং প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন। সহীহ জামি-১৪০৯।

৪) ভালো কাজের সার্টিফিকেট অর্জিত হয় ঃ​


عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَجُلٌ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَيْفَ لِي أَنْ أَعْلَمَ إِذَا أَحْسَنْتُ، وَإِذَا أَسَأْتُ؟ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِذَا سَمِعْتَ جِيرَانَكَ يَقُولُونَ: أَنْ قَدْ أَحْسَنْتَ، فَقَدْ أَحْسَنْتَ، وَإِذَا سَمِعْتَهُمْ يَقُولُونَ: قَدْ أَسَأْتَ، فَقَدْ أَسَأْتَ​

আবদুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত ঃ এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "আমি কীভাবে বুঝব যে আমি ভালো কাজ করেছি নাকি মন্দ কাজ করেছি?" নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন,"তোমার প্রতিবেশীরা যদি বলে যে তুমি ভালো কাজ করেছ, তবে তুমি ভালো কাজই করেছ; আর তারা যদি বলে যে তুমি মন্দ কাজ করেছ, তবে তুমি মন্দ কাজই করেছ।” ইবনু মাজাহ-৪২২৩ সহীহ-আলবানী।

​

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহ পরিণাম ​


১) ঈমান পূর্ণতা পাবে না ঃ

ক) নাবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) স্পষ্ট করেছেন যে, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি প্রকৃত বিশ্বাসী (মুমিন) নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন


مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلاَ يُؤْذِ جَارَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ​

যে ব্যক্তি আল্লাহতে ও আখিরাতের দিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ করে থাকে (সহীহ বুখারী-৬০১৮)।

এটি প্রমাণ করে যে, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া ঈমানের একটি অংশ। এজন্য আপনি দেখতে পাবেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ ব্যক্তির ঈমানকে অস্বীকার করেছেন যে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়।

খ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনবার কসম করে বলেছেন-

وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ» قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَايِقَهُ ​

আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়!" জিজ্ঞেস করা হল হে আল্লাহর রাসূল! কে সে? তিনি বললেন ঃ যার অন্যায়, অত্যাচার ও অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না (সহীহ বুখারী-৬০১৬)।

গ) নাবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُحِبَّ لِجَارِهِ - أَوْ قَالَ: لِأَخِيهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ​

সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার প্রতিবেশীর জন্য—অথবা তিনি বলেছেন ঃ তার ভাইয়ের জন্য—তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে (সহীহ মুসলিম-৪৫)।"

২) জাহান্নামে প্রবেশের কারণ:

عن أبي هريرة - رضي الله عنه - قال: قِيلَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ فُلَانَةً تَقُومُ اللَّيْلَ وَتَصُومُ النَّهَارَ وَتَفْعَلُ وَتَصَّدَّقُ وَتُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا؟ فَقَالَ: رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا خير فيها هى من أهل النار وَفُلَانَةٌ تُصَلِّي الْمَكْتُوبَةَ وَتَصَّدَّقُ بِأَثْوَارٍ وَلَا تُؤْذِي أَحَدًا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هى من أهل الجنة‍​



আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলা হলো, "হে আল্লাহর রাসূল! এক নারী রাতে সালাত আদায় করেন, দিনে সিয়াম রাখেন, সৎকর্ম করেন এবং দান-সদকা করেন; কিন্তু তিনি তাঁর কথাবার্তা বা জিহ্বা দ্বারা প্রতিবেশীদের কষ্ট দেন।" আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "তাঁর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই; তিনি জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত।" এরপর বলা হলো, "আর আরেকজন নারী আছেন যিনি কেবল ফরজ সালাত আদায় করেন, সামান্য পরিমাণ পনির (বা দইয়ের টুকরো) দান করেন এবং কাউকে কষ্ট দেন না।" আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "তিনি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।" মুসনাদ আহমাদ-৯৬৭৫, হাসান, আদাবুল মুফরাদ-১১৯, সহীহ, সহীহা-১৯০।

৩) ব্যভিচার ও চুরি ঃ দশগুণ বেশি পাপ ও কাবীরা গুনাহ।​


দশগুণ পাপ বেশিঃ

سَأَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْحَابَهُ عَنِ الزِّنَا؟ قَالُوا: حَرَامٌ، حَرَّمَهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ، فَقَالَ: «لِأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةٍ، أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ» ، وَسَأَلَهُمْ عَنِ السَّرِقَةِ؟ قَالُوا: حَرَامٌ، حَرَّمَهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُولُهُ، فَقَالَ: «لِأَنْ يَسْرِقَ مِنْ عَشَرَةِ أَهْلِ أَبْيَاتٍ، أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ بَيْتِ جَارِهِ» ​



আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীদের ব্যভিচার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা উত্তর দিলেন, "এটি হারাম; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এটি নিষিদ্ধ করেছেন।" তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির দশজন নারীর সাথে ব্যভিচার করা তার জন্য নিজের প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করার চেয়ে কম গুরুতর অপরাধ।" তিনি তাঁদেরকে চুরি সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা উত্তর দিলেন, "এটি হারাম; আল্লাহ—যিনি পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত—এবং তাঁর রাসূল এটি নিষিদ্ধ করেছেন।" তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির দশটি ঘর থেকে চুরি করা তার জন্য নিজের প্রতিবেশীর ঘর থেকে চুরি করার চেয়ে কম গুরুতর অপরাধ (আদাবুল মুফরাদ-১০৩, সহীহ)।"

কাবীরা ‍গুনাহ ঃ

আর এই জন্যই নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করাকে আল্লাহর নিকট অন্যতম বড় মহাপাপ হিসেবে গণ্য করেছেন।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ؟ قَالَ: «أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ» . قُلْتُ: إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيمٌ، قُلْتُ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: «وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ» . قُلْتُ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: «أَنْ تُزَانِيَ حَلِيلَةَ جَارِكَ»​

আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম: আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন ঃ তুমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক বা সমকক্ষ নির্ধারণ করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।" আমি বললাম: নিশ্চয়ই এটি অত্যন্ত বড় মহাপাপ। এরপর কোনটি? তিনি বললেন ঃ তোমার সন্তান তোমার সাথে আহারে শরিক হবে (খাবারের অভাব হবে)—এই ভয়ে তাকে হত্যা করা। আমি বললাম: এরপর কোনটি? তিনি বললেন ঃ তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া (সহীহ বুখারী-৪৪৭৭)।

৪) জান্নাতের পথে অন্তরায় ঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»​

আবূ হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম বলেন ঃ ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না (সহীহ মুসলিম-৪৬)।

৫) কিয়ামতের প্রথম বিচার ঃ


عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " أَوَّلُ خَصْمَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جَارَانِ "​

উকবা ইবনু ‘আমির (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে দু’জন ব্যক্তি বিবাদমান পক্ষ হিসেবে দাঁড়াবে, তারা হলো দু’জন প্রতিবেশী (মুসনাদ আহমাদ-১৭৩৭২ , সহীহুল জামি-২৫৬৩ )।”



প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার সাধারণ কিছু রূপ ঃ

ক) সম্মানহানি করা ঃ যেমন গালি দেওয়া, লানত করা, গালমন্দ করা, গীবত (পরনিন্দা) করা বা চোগলখোরী (এক জনের কথা অন্য জনের কাছে লাগানো) করা।

খ) উচ্চ শব্দে রেডিও, টিভি বা গান বাজানো ঃ


এর ফলে অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়। এমনকি উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করে অন্য ভাইয়ের সালাত বা ইবাদতের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ।

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ: اعْتَكَفَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ، فَسَمِعَهُمْ يَجْهَرُونَ بِالْقِرَاءَةِ، فَكَشَفَ السِّتْرَ، وَقَالَ: «أَلَا إِنَّ كُلَّكُمْ مُنَاجٍ رَبَّهُ، فَلَا يُؤْذِيَنَّ بَعْضُكُمْ بَعْضًا، وَلَا يَرْفَعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الْقِرَاءَةِ» ، أَوْ قَالَ: «فِي الصَّلَاةِ» ​

আবু সাঈদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম মসজিদে “ইতিকাফ” করাকালীন সাহাবীদেরকে উচ্চস্বরে কিরআত পাঠ করতে শুনে পর্দা উঠিয়ে বলেনঃ জেনে রাখ। তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের রবের সাথে গোপন আলাপ রত আছ। অতএব তোমরা (উচ্চস্বরে কিরআত পাঠের দ্বারা) একে অন্যকে কষ্ট দিও না তোমরা একে অন্যের চাইতে উচ্চস্বরে কিরআত পাঠ কর না আবূ দাউদ-১৩৩২, সহীহ-আলবানী।

যদি কুরআনের মাধ্যমেও আওয়াজ উঁচু করা নিষিদ্ধ হয়ে থাকে, তবে শয়তানের বাদ্যযন্ত্রের (গান-বাজনার) মাধ্যমে আওয়াজ উঁচু করার হুকুম কেমন হতে পারে—যা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়? আমরা আল্লাহর কাছে অবাধ্য লোকদের জন্য হেদায়েতের প্রার্থনা করি।

গ) সম্পদ বা ফলমূল প্রদর্শন করে কষ্ট দেওয়া ঃ নিজে পেটপুরে খাওয়া কিন্তু ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীকে না দেওয়া, সুন্দর পোশাক বা ফলমূল এনে দরিদ্র প্রতিবেশীর মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করা।

ঘ) বসতবাড়ির ক্ষতি করা ঃ প্রতিবেশীর দেয়ালের পাশে এমন গাছ লাগানো যার পানি চুয়ে দেয়ালের ক্ষতি করে, অথবা অনুমতি ছাড়া এমনভাবে উঁচু দেয়াল নির্মাণ করা যা তার রোদ ও বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।



উত্তম প্রতিবেশীর কয়েকটি অনন্য দৃষ্টান্ত ঃ

১) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ সাল্লাম) ও ইহুদি প্রতিবেশী।


عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: كَانَ غُلاَمٌ يَهُودِيٌّ يَخْدُمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَرِضَ، فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُهُ، فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ، فَقَالَ لَهُ: «أَسْلِمْ» ، فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهُوَ عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ: أَطِعْ أَبَا القَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَسْلَمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَقُولُ: «الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ»​

আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইয়াহূদী বালক, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমত করত, সে একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখার জন্য আসলেন। তিনি তার মাথার কাছে বসে তাকে বললেনঃ তুমি ইসলাম গ্রহণ কর, সে তখন তার পিতার দিকে তাকাল, সে তার কাছেই ছিল, পিতা তাকে বলল, আবূল কাসিম (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কুনিয়াত) এর কথা মেনে নাও, তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ইরশাদ করলেনঃ যাবতীয় প্রশংসা সে আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ১৩৫৬)।

২) আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর প্রতিবেশি ঃ

عَنْ مُجَاهِدٍ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو ذُبِحَتْ لَهُ شَاةٌ فِي أَهْلِهِ، فَلَمَّا جَاءَ قَالَ: أَهْدَيْتُمْ لِجَارِنَا اليَهُودِيِّ؟ أَهْدَيْتُمْ لِجَارِنَا اليَهُودِيِّ؟ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»​

মুজাহিদ (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ)-এর জন্য তার পরিবারে একটি ছাগল যবেহ করা হল। তিনি এসে দুবার বললেন ঃ তোমরা কি আমাদের ইয়াহুদী প্রতিবেশীকে (মাংস) উপহার পাঠিয়েছ? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ প্রতিবেশীর অধিকার প্রসঙ্গে জিবরীল (আঃ) আমাকে অবিরত উপদেশ দিতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হল যে, হয়ত শীঘ্রই প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিবে (তিরমিযী-১৯৪৩, সহীহ)।

عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو وَغُلَامُهُ يَسْلُخُ شَاةً فَقَالَ: يَا غُلَامُ إِذَا فَرَغْتَ فَابْدَأْ بِجَارِنَا الْيَهُودِيِّ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: الْيَهُودِيُّ أَصْلَحَكَ اللَّهُ؟ قَالَ: إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يوصى بالجار حتى خشينا أو رُؤِينا أنه سَيُورِّثُه)​

মুজাহিদ বর্ণনা করেন: আমি ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আমরের সাথে ছিলাম, যখন তাঁর খাদেম একটি ভেড়ার চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তিনি বললেন, “হে খাদেম, কাজ শেষ হলে আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীর (অংশ) দিয়ে শুরু করো।” উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞেস করল, “সেই ইহুদি—আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রতিবেশীর প্রতি সদয় আচরণের বিষয়ে এমনভাবে তাগিদ দিতে শুনেছি যে, আমাদের আশঙ্কা হয়েছিল—বা মনে হয়েছিল—তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারের অংশীদারই করে দেবেন (আদাবুল মুফরাদ-১২৮ সহীহ, ইরওয়া-৮৯১)।”

৩) ইমাম আবু হানিফা (রাহেমাহুল্লাহ) ও মদ্যপ প্রতিবেশী ঃ

ইমাম আবু হানিফা (রাহেমাহুল্লাহ)-এর ঘরের পাশে এক মুচি থাকত, যে প্রতিদিন রাতে মদ খেয়ে উচ্চস্বরে গান গেয়ে ইমাম সাহেবের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাত। একদিন রাতে কোনো আওয়াজ না পেয়ে ইমাম সাহেব খোঁজ নিয়ে জানলেন, পুলিশ তাকে ধরে জেলে নিয়ে গেছে। ইমাম সাহেব পরদিনই স্বয়ং গভর্নরের দরবারে গিয়ে নিজের মর্যাদা ব্যবহার করে সেই প্রতিবেশীকে মুক্ত করে আনেন। ইমাম সাহেবের এই ইহসান দেখে যুবকটি লজ্জিত হয় এবং মদ ছেড়ে খাঁটি তাওবা করে। রেফারেন্স: আল-খতিব আল-বাগদাদি, তারীখু বাগদাদ (বাগদাদের ইতিহাস), খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ৩৬১; ইমাম ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাযাম ফী তারীখিল উমাম, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১৩৩।

৪) আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহেমাহুল্লাহ) ও ইহুদী প্রতিবেশী ঃ

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও তাবেয়ী আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহেমাহুল্লাহ)-এর পাশের ঘরের এক ইহুদী অভাবের কারণে তার বাড়িটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে তার বাড়ির দাম সাধারণ মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ (২০০০ দিরহাম) নির্ধারণ করে বলে, "১০০০ দিরহাম বাড়ির দাম, আর বাকি ১০০০ দিরহাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের মতো উত্তম প্রতিবেশীর পাশে থাকার মূল্য!" ইবনে মুবারক (রাহেমাহুল্লাহ) এই কথা শুনে তাকে উপহারস্বরূপ ২০০০ দিরহাম দিয়ে দেন এবং বাড়ি বিক্রি করতে নিষেধ করেন। রেফারেন্স: ইমাম আল-কুরতুবী, আল-জামে লি-আহকামিল কুরআন (তাফসীরে কুরতুবী), সূরা আন-নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; ইমাম গাজালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২১২।

পরিশিষ্ট ও উপসংহার

সমাজ জীবনে প্রতিবেশীর হক আদায় করা কেবল সামাজিক ভদ্রতা নয়, বরং ঈমানের পূর্ণতার অপরিহার্য অংশ। ইবনে আল-মুকাফফা-এর সেই ঘটনাটি আমাদের জন্য শিক্ষণীয়—যখন তিনি জানতে পারলেন যে তার এক প্রতিবেশী ঋণের কারণে বাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছে, তখন তিনি তার প্রতিবেশিত্বের হক ও বাড়ির ছায়ার সম্মান রক্ষা করতে নিজেই তার ঋণের টাকা পরিশোধ করে দিলেন এবং বাড়ি বিক্রি করতে নিষেধ করলেন।

আসুন, আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতি যত্নবান হই। তাদের সুখ-দুঃখে অংশ নিই, সংকটে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই এবং আমাদের হাত ও মুখ থেকে তাদের নিরাপদ রাখি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিবেশীর হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।



 

Attachments

Back
Top