ভ্রান্তি নিরসন "পুরুষের চুল লম্বা করার বিধান"

Joined
Jan 8, 2025
Threads
7
Comments
9
Reactions
87
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وبعد
পুরুষের চুল লম্বা করার আচরণটি আমাদের সমাজে বিদ্যমান এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এটি করে থাকে। এর বিধান নিয়ে অনেক মানুষের মনে অস্পষ্টতা রয়েছে এবং এ বিষয়ে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন। তাই আমি মানুষের চুল লম্বা করার অবস্থাভেদে এর বিধানটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে পছন্দ করছি। সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে, নবী করীম ﷺ তাঁর ব্যস্ততা ও অবসরের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা ভেদে বিভিন্ন ধরনে চুল লম্বা রাখতেন:

১. কানের লতি পর্যন্ত চুল রাখা (একে ওয়াফরা বলা হয়), হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন:
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم له شعر يبلغ شحمة أذنيه
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল ছিল তাঁর দুই কানের লতি পর্যন্ত। (বূখারী- ৩৫৫১, মুসলিম- ২৩৩৭, আবূ দাউদ-৪০৭২, নাসায়ী- ৫৩২৯, মুসনাদে আবু ইয়ালা-১৬৯৯, কিছু পরিবর্তন সহ এসেছে, এখানে আবূ দাউদের মতনটা উল্লেখ করা হয়েছে)।

সহীহ মুসলিমে (হা/২৩৩৭) এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল তাঁর দুই কানের অর্ধেক পর্যন্ত ছিল।

২. কান ও কাঁধের মাঝামাঝি পর্যন্ত চুল রাখা (একে লিম্মাহ বলা হয়): হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন:
كان شعر رسول الله صلى الله عليه وسلم بين أذنيه وعاتقه
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল তাঁর কান ও কাঁধের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল। (বূখারী-৫৫৬৫, মুসলিম- ২৩৩৮, নাসায়ী- ৫০৫৩)।

উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন:
كان شعر رسول الله صلى الله عليه وسلم فوق الوفرة ودون الجمّة
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল ওয়াফরা (কানের লতি) এর নিচে এবং জুম্মাহ (কাঁধ) এর উপরে ছিল। (তিরমিজি- ১৭৫৫, আবু দাউদ- ৪১৮৭, আলবানী হাদিসটিকে সহীহ্ বলেছেন।)।

৩. কাঁধ পর্যন্ত চুল রাখা (একে জুম্মাহ বলা হয়):হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত:
أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يضرب شعرُه منكبيه
নবী করীম ﷺ এর চুল তাঁর দুই কাঁধ স্পর্শ করত। (বূখারী- ৫৫৬৩, মুসলিম- ২৩৩৮)।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চুল অধিকাংশ সময় এমনই থাকতো। আর হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণিত নয় যে, তিনি তাঁর চুল কাঁধের নিচে নামিয়ে রাখতেন যেমনটি নারীরা সচরাচর চুল লম্বা করে থাকে। এটি স্পষ্ট যে, চুল কাঁধের নিচে নেমে গেলে তিনি তা কেটে ফেলতেন। সুনান গ্রন্থগুলোতে বেণী করা সম্পর্কিত যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, তার সনদ সহীহ নয় এবং এর মতন সহীহ হাদিসসমূহের বিরোধী। ইমাম বুখারী একে মুনকাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া ইবাদতের উদ্দেশ্য যেমন, হজ বা ওমরাহ ব্যতীত নবী করীম ﷺ কখনো চুল মুণ্ডন করেছেন বলে বর্ণিত হয়নি।

পুরুষের চুল লম্বা করার বিধান নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে দুটি মত রয়েছে, এটি কি সুন্নাত নাকি কেবল একটি মুবাহ তথা জায়েজ:

১. প্রথম মত: চুল লম্বা রাখা সুন্নাত এটি হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। ইমাম মারদাওয়ী রহ. তার (আল-ইনসাফ- খন্ড:১/১২২পৃ.) গ্রন্থে বলেন: আমাদের মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী চুল রাখা মুস্তাহাব এবং এটিই ইমামগণের অভিমত।

ইবনে কুদামা রহ. তার (আল-মুগনী- খন্ড:১/১১১পৃ.) গ্রন্থে বলেন: চুল রাখা তা কেটে ফেলার চেয়ে উত্তম। আবু ইসহাক বলেন, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে চুল রাখে, তিনি উত্তরে বলেছিলেন: এটি একটি উত্তম সুন্নাত; আমাদের পক্ষে সম্ভব হলে আমরাও চুল রাখতাম। (ইমাম আহমদ রহ. থেকে দুইটা মত বর্ণিত হয়েছে আরেকটি সামনে উল্লেখ করা হয়েছে)।

তাঁদের দলীল: নবী করীম ﷺ নিজে চুল লম্বা রেখেছেন এবং তাঁর কাজ সুন্নাত হিসেবে গণ্য।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
من كان له شعر فليكرمه
যার চুল আছে, সে যেন তার যত্ন নেয়। (আবু দাউদ- ৪১৬৩, ত্ববারানী ফি মুজামিল আউসাত- ৮৪৮৫, বাইহাকি ফি শুয়াবিল ইমান- ৬৪৫৫, আলবানী হাদিসটি হাসান সহীহ্ বলেছেন।)

হযরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ এক শিশুকে দেখলেন যার মাথার কিছু অংশের চুল মুণ্ডন করা হয়েছে এবং কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে (একে القزع বলা হয়)। তিনি তাদের এটি করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন:
احلقوه كله أو اتركوه كله
হয় পুরো মাথার চুল মুণ্ডন করো, নয়তো পুরোটা রেখে দাও। (মুসনাদে আহমদ- ৫৬১৫, আবু দাউদ- ৪১৯৫, নাসায়ী কুবরা- ৯২৫০, আলবানী সহীহ্ আবু দাউদে উল্লেখ করেছেন)।

২. দ্বিতীয় মত: চুল লম্বা রাখা কেবল একটি মুবাহ তথা জায়েজ কাজ।

যারা বলে এটি সুন্নাত নয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ চুল কেটে ফেলাকেই রাখা অপেক্ষা উত্তম মনে করেন। এটি হাম্বলী মাযহাবের একটি পক্ষ, হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইবনে আবদিল বার সহ আরও অনেকের অভিমত।

তাঁদের দলীল: তাঁদের মতে, নবী করীম ﷺ এর চুল রাখা ছিল তৎকালীন আরবের প্রথা বা অভ্যাসের অংশ (العادة), এটি ইবাদত হিসেবে অনুসরণের বিষয় নয়। এছাড়া তাঁর পক্ষ থেকে এমন কোনো মৌখিক উক্তি আসেনি যা একে সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত করে। তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সেই নির্দেশকে দলীল হিসেবে পেশ করেন যেখানে তিনি চুল ছোট করার আদেশ দিয়েছেন এবং একে পছন্দ করেছেন।

হযরত ওয়ায়েল বিন হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلِي شَعْرٌ طَوِيلٌ، فَلَمَّا رَآنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ذُبَابٌ ذُبَابٌ قَالَ: فَرَجَعْتُ فَجَزَزْتُهُ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ مِنَ الْغَدِ، فَقَالَ: إِنِّي لَمْ أَعْنِكَ، وَهَذَا أَحْسَنُ
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসতাম। আমার মাথায় লম্বা চুল ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে দেখে বললেনঃ মাছি, মাছি। তিনি বলেন, আমি ফিরে এসে চুল কেটে ফেললাম। পরদিন সকালে আমি তাঁর নিকট গেলে তিনি বললেনঃ আমি তো তোমাকে কষ্ট দেইনি। আর এরূপ (চুল) খুবই চমৎকার। (সুনানে আবু দাউদ- ৪১৯০, ইবনে আবি শায়বা- ২৬৭২৬ কিছু পরিবর্তনসহ, বাইহাকি তার শুয়াবুল ইমানে- ৬০৫৫ কাছাকাছি শব্দে বর্ণনা করেছেন, ইমাম আবু দাউদ বলেন হাদিসটি রেওয়ায়েত করে চুপ থেকেছেন আর ইমাম আবু দাউদ বলেন (মুকাদিমাহ ইবনুস সালাহ- পৃষ্ঠা ২০)- যে হাদীস সম্পর্কে আমি কিছু বলিনি, সেটি আমলযোগ্য বা দলিল হিসেবে গ্রহণের উপযোগী। ইমাম আলবানী রহ. হাদিসটি সহিহ্ বলেছেন)।

ইমাম তহাবী (মুশকিলুল আসার- খন্ড:৮/৪৩৬,হা-৩৩৬৭) গ্রন্থে বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, চুল কাটা চুল লম্বা করার চেয়ে বেশি সুন্দর। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ যাকে (أحسن) অধিক সুন্দর বলেছেন, তার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। অতএব সেই উত্তমটি গ্রহণ করা এবং তার বিপরীতটি বর্জন করা আবশ্যক।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (তারজিহ): পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পুরুষের চুল লম্বা রাখা একটি মুবাহ বা সাধারণ বৈধ কাজ, এটি সুন্নাত নয়। এর কারণগুলো হলো:

১. স্বাভাবিক স্বভাব ও প্রথার প্রভাব: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর এই আচরণটি বাহ্যত তাঁর জাতির প্রথা ও অভ্যাসের অনুগামী ছিল। এটি কোনো শরয়ি বিধিবিধান বা তাকলিফ (বাধ্যবাধকতা) নয়। এখানে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, শরীয়ত প্রদাতা একে ইবাদত হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন, যেমন ডান দিক থেকে শুরু করা, কাফেরদের থেকে ভিন্ন হওয়া, নারীদের থেকে ভিন্ন হওয়া অথবা কোনো মন্দ স্বভাব প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে এটি করা হয়েছে। যখন কোনো কাজের পেছনে এমন কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে না, তখন তা মানুষের সাধারণ স্বভাবজাত কাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং শরীয়ত সেখানে কোনো বিশেষ বিধান আরোপ করে না।

উসুলবিদগণের মতে, রাসূল ﷺ এর কাজ তিন প্রকার: শরয়ি, জিবলি (স্বভাবজাত) এবং একটি বিতর্কিত শ্রেণি যা এই দুটির মাঝামাঝি। চুল লম্বা রাখা এই শেষোক্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এর পেছনে কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়নি, তাই একে স্বভাবজাত কাজ হিসেবে গণ্য করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। উসূলুটি সম্পর্কে বিস্তারিত: dorar.net

২. বর্ণিত দলীলগুলোর বিশ্লেষণ: চুল রাখা সংক্রান্ত হাদিসগুলো নিরঙ্কুশ কোনো নির্দেশ দেয় না, তাই এখান থেকে চুল লম্বা করার মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। বরং এগুলো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে শিষ্টাচার ও নির্দেশনামূলক।

আর যার চুল আছে সে যেন তার যত্ন নেয়, এই হাদিসটিতে যাদের চুল লম্বা, তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, তেল দেওয়া এবং আঁচড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি মুসলমানদের চুল লম্বা করতে উৎসাহিত করে না। বরং এর উদ্দেশ্য হলো, কেউ যদি চুল লম্বা রাখে তবে সে যেন পরিচ্ছন্ন থাকে। এখানে যত্ন নেওয়া সুন্নাত, চুল লম্বা রাখা সুন্নাত নয়। যেমনটি নবীজী ﷺ আবু কাতাদা (রা.) কে বলেছিলেন। আবু কাতাদা (রা.)-এর বড় চুল ছিল, তিনি জিজ্ঞাসা করলে নবীজী ﷺ তাকে এর যত্ন নিতে এবং প্রতিদিন আঁচড়াতে বলেন। এমনকি আবু কাতাদা (রা.) রাসূলের এই নির্দেশের কারণে দিনে দুবার তেল লাগাতেন। (আউনুল মাবুদ- খন্ড:১১/১৬৯পৃ.)।

এরপর হাদিসে এসেছে- হয় পুরোটা মুণ্ডন করো অথবা পুরোটা ছেড়ে দাও। এই হাদিসটিও চুল লম্বা করার পক্ষে দলীল নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এটি বলেছিলেন (القزع) তথা মাথার কিছু অংশ কামানো ও কিছু রাখা এর প্রতিবাদে। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, হয় পুরোটা কামাও নতুবা পুরোটা রাখো। কারণ আংশিক কামানো ইহুদিদের সাদৃশ্য এবং এক প্রকার বিকৃতি। এখানে চুল রাখা যে সুন্নাত, তা রাসূলের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এখানে মুণ্ডন করা এবং রাখা দুটির মধ্যে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। যদি রাখা সুন্নাত হতো, তবে তিনি মুণ্ডন করার ইখতিয়ার দিতেন না, বরং রাখার নির্দেশ দিতেন।

৩. হজ ও ওমরায় চুল মুণ্ডন করা: চুল রাখা যে কেবল মুবাহ বা বৈধ কাজ, তার অন্যতম বড় প্রমাণ হলো হজ ও ওমরায় নবী করীম ﷺ এর চুল মুণ্ডন করা। যদি চুল লম্বা রাখা একটি স্থায়ী সুন্নাত হতো, তবে তিনি ইবাদতের ক্ষেত্রেও তা মুণ্ডন না করে সবসময় রেখে দিতেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে শরীয়ত কর্তৃক চুল মুণ্ডন বা ছোট করার প্রতি উৎসাহ প্রদান একথাই প্রমাণ করে যে, ইবাদতের বাইরে চুল রাখা কেবল একটি সাধারণ বৈধ কাজ, কোনো ধর্মীয় বিশেষ বিধান নয়।

৪. শরীয়তের মৌখিক নির্দেশের অনুপস্থিতি: যদি চুল লম্বা রাখা শরীয়তের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা নির্দেশ হতো, তবে নবী করীম ﷺ তাঁর উম্মতকে অবশ্যই সে বিষয়ে নির্দেশ দিতেন, যেমনটি তিনি দাড়ি লম্বা রাখার ক্ষেত্রে নির্দেশ দিয়েছেন। অথবা তিনি এমন কোনো কারণ বর্ণনা করতেন যা এর নেক আমল হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে। কিন্তু তাঁর থেকে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না; বরং বর্ণিত আছে যে, জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি তাঁর সন্তানদের চুল মুণ্ডন করে দিয়েছিলেন। (আবু দাউদ-৪১৯২, নাসায়ী- ৫২২৭ কিছু পরিবর্তনসহ, মুসনাদে আহমেদ-১৭৫০ লম্বা হাদিস, ইমাম নববী রহ. রিয়াদুস সালেহীনে- ৫২৮ বলেন বূখারী মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর সবদ সহীহ্, আলবানী সহীহ্ নাসায়ী-৫২৪২ এ উল্লেখ করেছেন)।

এছাড়া ওয়াইল বিন হুজর (রা.) যখন তাঁর লম্বা চুল কেটে ফেললেন, তখন নবীজী ﷺ সেটিকে অধিক সুন্দর বলে প্রশংসা করেছিলেন। (যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে)।


শরীয়তের দৃষ্টিতে মানুষের শরীরের চুল তিন প্রকার:
১. যেটি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: যেমন দাড়ি।
২. যেটি ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: যেমন লজ্জাস্থানের চুল, বগলের চুল এবং গোঁফ।
৩. যেটির ব্যাপারে শরীয়ত নীরব থেকেছে: যেমন হাত, পা ও শরীরের অন্যান্য অংশের চুল। মাথার চুলও এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

সারকথা হলো, মাথার চুল লম্বা রাখা একটি মুবাহ জায়েজ কাজ। এর মূল বিধানের দিক থেকে এতে কোনো সওয়াব বা গুনাহ নেই। অর্থাৎ, চুল লম্বা রাখা কোনো বিশেষ ইবাদত নয় এবং তা মুণ্ডন করাও কোনো গুনাহ বা পাপ নয় যতক্ষণ না এর সাথে প্রশংসা বা নিন্দার কোনো বিশেষ কারণ যুক্ত হয়।




এর প্রয়োগিক বিধান নিম্নরূপ:

হজ ও ওমরার ক্ষেত্রে চুল মুণ্ডন করা মুস্তাহাব বা উত্তম। আর হজ-ওমরাহ ব্যতীত অন্য সময় ইবাদত মনে করে বা বৈরাগ্য সাধনের উদ্দেশ্যে চুল মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ। এবং সাদৃশ্য অবলম্বনে করা, যদি এমন কোনো গোষ্ঠীর অনুকরণে চুল লম্বা করা হয় যাদের অনুকরণ করা নিষিদ্ধ (যেমন নারী বা ফাসেকদের সাদৃশ্য), তবে তা হারাম। সামাজিক প্রথা অনুযায়ী: যদি সামাজিক রীতি বা প্রথার সাথে মিল রেখে কেউ চুল রাখে, তবে তা বৈধ। ক্ষেত্রবিশেষে এটি উত্তমও হতে পারে।

এখন যারা চুল লম্বা রাখেন, তাদেরকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে এক শ্রেণির বিবরণ ও তাদের শরয়ি বিধান এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রথম শ্রেণি: যারা দ্বীনদারি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে চুল লম্বা রাখেন এবং যাদের মধ্যে নেককার ও সৎ মানুষের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। তাদের এই কাজটি প্রশংসনীয় এবং এর জন্য সওয়াবের আশা করা যায়, যদি নিচের দুটি বিষয় লক্ষ্য রাখা হয়:

১. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরণের নিয়ত করা:
নবী করীম ﷺ এর অনুসরণের সাধারণ নির্দেশনার আলোকে এই নিয়ত করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآَخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব: ২১)।

২. কোনো শরয়ি নিষিদ্ধ বিষয় না থাকা: যেমন, চুল রাখা যেন নিজ সমাজের প্রথা বা রীতির পরিপন্থী না হয় অথবা এটি যেন পাপাচারী ও ফাসেকদের বিশেষ প্রতীক বা বেশভূষা না হয়ে দাঁড়ায়। যদি কোনো সমাজের প্রচলিত রীতি চুল লম্বা না রাখার পক্ষে হয়, তবে সেখানে চুল রাখা মাকরূহ। কারণ এটি লিবাসুশ শুহরাহ (লোক দেখানো বা অদ্ভুত পোশাক/সাজ) এবং জনবিচ্ছিন্নতা হিসেবে গণ্য হয়, যা মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। আবার যদি এটি ফাসেকদের বিশেষ বেশভূষা হয়, তবে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হারাম। কারণ লক্ষ্যের বিধান মাধ্যমের ওপরও প্রযোজ্য হয়। সালাফগণ এ ধরনের বিষয়কে নিন্দা করেছেন।

ইবনে আবি শায়বা বর্ণনা করেছেন:
كان عمر بن عبد العزيز إذا كان يوم الجمعة بعث الأحراس فيأخذون بأبواب المسجد ، ولا يجدون رجلا موفر الشعر يعني مبذر الشعر إلا جزوه.
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) জুমার দিনে প্রহরী পাঠাতেন, তারা মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো। তারা যদি কাউকে অতিরিক্ত অবিন্যস্ত বা লম্বা চুল বিশিষ্ট পেত, তবে তা কেটে দিত। (মুসান্নাফ- খন্ড:৬/৬০পৃ. এবং হা-৩৪৫৬)।

ইমাম ইবনে আব্দিল বার (রহ.) বলেন: আমাদের যুগের অবস্থা এমন হয়েছে যে, সৈন্যবাহিনী ছাড়া আর কেউ চুল রাখে না; আলেম, সৎ ও সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিরা এটি এড়িয়ে চলেন। ফলে বর্তমানে (লম্বা চুল) নির্বোধদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবী করীম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন-
من تشبه بقوم فهو منهم أو حشر معهم
যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে (অথবা তাদের সাথেই হাশর হবে)। (আত তামহিদ- খন্ড:৬/৮০পৃ.)।

ইমাম ইবনে মুফলিহ তার (আদাবুশ শরইয়্যাহ- খন্ড:৩/৩২৯পৃ.) গ্রন্থে বলেন: বলা উচিত যে, চুল রাখা ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক যতক্ষণ তা লোক দেখানো, ব্যক্তিত্বের হানি বা নিজের অবমাননার পর্যায়ে না পৌঁছায়, যেমনটি পোশাকের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে। যা ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর কথা থেকে বুঝা যায়।

যে ব্যক্তি কেবল অনুসরণের উদ্দেশ্যে চুল লম্বা করেন কিন্তু উপরোক্ত বিষয়গুলো (সামাজিক রীতি ও ফাসেকদের সাদৃশ্য বর্জন) খেয়াল করেন না, তিনি সওয়াব হাসিল করতে গিয়ে উল্টো শরয়ি নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হন। তাই একজন ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো, শরীয়তের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ফকীহ বা সম্যক অবগত হওয়া, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করা এবং সুন্নাহর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা।

দ্বিতীয় শ্রেণি: যারা কাফেরদের অন্ধ অনুকরণে, নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বনে অথবা নারীদের আকৃষ্ট করা ও তাদের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করার মতো মন্দ উদ্দেশ্যে চুল লম্বা করে এবং যাদের চালচলনে পাপাচার ও লক্ষ্যহীনতার ছাপ স্পষ্ট।
এই কাজটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এর কর্তা গুনাহগার ও শরীয়ত বিরোধী। কারণ তার উদ্দেশ্যটিই শরীয়তগতভাবে নিষিদ্ধ। তাছাড়া সে এই কাজের মাধ্যমে গুনাহর কাজে সাহায্য নিচ্ছে; আর উসূল হলো- যেকোনো বৈধ কাজ যখন কোনো হারামের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটিও হারামে পরিণত হয়। কারণ লক্ষ্যের বিধান মাধ্যমের ওপরও প্রযোজ্য হয়। কাফের, নারী এবং পাপাচারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের অনেক টেক্সট বা দলিল রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। (আবু দাউদ-৪০৩১, মুসনাদে আহমদ- ৫১১৪, ইমাম ইরাকি হাদিসটির সনদ সহীহ্ বলেছেন)।

আর যার মধ্যে প্রকাশ্য পাপাচার বিদ্যমান, সে যদি চুল লম্বা করার ক্ষেত্রে নবী করীম ﷺ এর অনুসরণের দাবি করে, তবে তার সেই দাবি মিথ্যা; কারণ সে অন্যান্য বহু ক্ষেত্রে সুন্নাহর চরম বিরোধিতা করছে।


সমাপনী নসিহত:
১. পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে প্রভাবিত যুবকদের প্রতি: আমি আপনাদের এই নসিহত করছি যে, আপনারা আল্লাহর কাছে তওবা করুন, মাথার চুল ছোট করুন এবং আধুনিক ফ্যাশন ও পশ্চিমা সংস্কৃতির হারাম বিষয়গুলো অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকুন।

২. দ্বীনদার ও সৎ ব্যক্তিদের প্রতি: আমি আপনাদের নসিহত করছি যে, আপনারা আপনাদের সমাজের নেককার ও সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিদের প্রথা বা রীতির প্রতি লক্ষ্য রাখুন। পাপাচারীদের সাদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভয়ে অথবা সুরুচিশীল ও নেককার ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কায় চুল লম্বা করবেন না। বরং শরীয়তের উদ্দেশ্যগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন এবং বড় আলেমদের বক্তব্যগুলো যাচাই করুন। আমাদের শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) তাঁর (ফাতাওয়ায়ে নূর আলাদ দারব- ২২তম খণ্ড, ২ পৃষ্ঠা) গ্রন্থে বলেছেন: মাথার চুল লম্বা রাখাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ নবী করীম (সা.)-এর চুল কখনো কখনো তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হতো। সুতরাং এটি মূলগতভাবে বৈধ। তবে তা সত্ত্বেও, এই বিষয়টি প্রথা ও সামাজিক রীতিনীতির العرف والعادة ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো সমাজে এমন প্রথা প্রচলিত থাকে যে, কেবল নিচু স্তরের বা অভদ্র স্বভাবের লোকেরাই চুল লম্বা রাখে, তবে মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য চুল লম্বা রাখা উচিত নয়। কারণ সমাজের মানুষের নিকট এবং তাদের প্রথা অনুযায়ী এটি কেবল নিচু স্তরের মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুতরাং, পুরুষের মাথার চুল লম্বা রাখার বিষয়টি সেসব বৈধ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা মানুষের প্রথা ও অভ্যাসের অনুগামী। যদি সমাজে এমন প্রথা থাকে যে উচ্চ-নিচু, সম্মানী-সাধারণ নির্বিশেষে সবাই চুল লম্বা রাখে, তবে এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু যদি তা কেবল হীন বা নীচু প্রকৃতির লোকদের মাঝে দেখা যায়, তবে সম্মানী ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের তা পরিহার করা উচিত।

এখানে এই প্রশ্ন তোলা যাবে না যে, নবী (সা.) তো সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান মানুষ হওয়া সত্ত্বেও চুল লম্বা রাখতেন, তাহলে আমরা কেন পারব না?। কারণ আমাদের মতে, চুল রাখা বা বড় করা কোনো সুন্নাতে ইবাদাহ নয়; বরং এটি তৎকালীন সামাজিক প্রথা ও অভ্যাসের অনুকরণ মাত্র।

والله أعلم وصلى الله وسلم على نبينا محمد وآله وصحبه أجمعين

মূল লেখক: শায়েখ খালেদ বিন সাউদ আল-বুলিহিদ (হাফি.)
অনুবাদক, সংস্কারক, তাখরিজ: আমির হামজা
অধ্যায়ণরত: ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়- কুষ্টিয়া।
 
Back
Top