অন্যান্য আল্লাহর ৫টি প্রতিশ্রুতি

আল্লাহ তাআলার পাঁচটি প্রতিশ্রুতি​

মো: তাজাম্মুল হক সালাফী​

মানুষের প্রতিশ্রুতি যেখানে দুর্বলতা, অক্ষমতা এবং অনিশ্চয়তায় ঘেরা; সেখানে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ঈমানদার বান্দার জন্য এক পরম আশ্রয় ও নিশ্চিত আশার বাণী। মহান আল্লাহর এই অটল বিশ্বস্ততার ওপর ভরসা করেই একজন মুমিন জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতিতেও মানসিক শান্তি ও অবিচল আস্থা খুঁজে পায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সর্বদা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন এবং পরম সত্তা হিসেবে তাঁর এই ওয়াদা রক্ষা করার ধরণ সৃষ্টি বা মানুষের প্রতিশ্রুতির মতো নয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا (122)​

"আল্লাহর ওয়াদা সত্য, আর আল্লাহর চেয়ে সত্যবাদী আর কে হতে পারে?" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২২)।

তিনি আরো বলেন-


إِنَّ اللَّهَ لَا يُخْلِفُ الْمِيعَادَ (9)​

"নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতির খেলাফ করেন না।" (সূরা আল-ইমরান: ৯)

মানবজাতির প্রতি আল্লাহর দেওয়া সত্য ও অপরিবর্তনীয় প্রতিশ্রুতিগুলি হল :-

প্রতিশ্রুতি – ১ : তিনি বান্দার দুআ কবুল করেন ।​

আল্লাহ তাআলার নিকটে বান্দা দুআ করলে, আল্লাহ তাআলা দুআ কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :​


وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ (60)​

"তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০)

মহানবী (সা.) বলেছেন:

«إِنَّ رَبَّكُمْ تَبَارَكَ وَتَعَالَى حَيِيٌّ كَرِيمٌ، يَسْتَحْيِي مِنْ عَبْدِهِ إِذَا رَفَعَ يَدَيْهِ إِلَيْهِ، أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا»

"নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দয়ালু। যখন তাঁর কোনো বান্দা তাঁর দিকে হাত তোলে, তখন তিনি তা শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জিত হন।" (আবু দাউদ-১৪৮৮, সহীহ)।

■ মুসা নবী (আ.)-এর দুআ:



فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ (24)

"অতঃপর মুসা মহিলা দুটির ছাগলগুলোকে পানি পান করালেন এবং ছায়াতে আশ্রয় নিলেন। অতঃপর বললেন ঃ হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণই অবতীর্ণ করবে, আমি তারই ভিখারি।" (সূরা আল-কাসাস: ২৪)।

মুসা (আ.) যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন:

  • অসাবধানতাবশত একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গিয়েছিল (ভয় ছিল)।
  • কোনো ঘরবাড়ি, পরিবার, চাকরি বা নিরাপত্তা ছিল না।
আল্লাহর পক্ষ থেকে সমাধান:

  • খাবার: শুয়াইব (আ.)-এর বাড়ি থেকে আতিথেয়তা ও খাবার পেয়েছিলেন।
  • আশ্রয় ও কর্মসংস্থান: ৮-১০ বছরের জন্য কাজের সুযোগ পান।
  • পরিবার: শুয়াইব (আ.)-এর কন্যাকে বিয়ে করার সৌভাগ্য লাভ করেন।
■ উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন-

إِنِّي لَا أَحْمِلُ هَمَّ الْإِجَابَةِ، وَلَكِنْ هَمَّ الدُّعَاءِ، فَإِذَا أُلْهِمْتُمُ الدُّعَاءَ، فَإِنَّ الْإِجَابَةَ مَعَهُ،


"আমি দুআ কবুল হওয়ার চিন্তা করি না, বরং আমার চিন্তা থাকে দুআ করার (তাওফিক পাওয়ার) ব্যাপারে। কারণ, যখন আমাকে দুআ করার তাওফিক (অনুপ্রেরণা) দেওয়া হয়, তখন নিশ্চয়ই তার সাথে উত্তর বা কবুলিয়াতও চলে আসে।" ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-জাওয়াবুল কাফী (পৃষ্ঠা: ১৭)।

তিন ব্যক্তির দুআ ও আল্লাহর সাহায্য : নেক আমলের উসিলা দিয়ে দুআ করার পর গুহা থেকে মুক্তি পাওয়ার এই সুপরিচিত শিক্ষণীয় ঘটনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমসহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

মূল হাদীস :

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, "তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে তিন ব্যক্তি একদা সফরে বের হয়েছিল। পথিমধ্যে তারা বৃষ্টির মুখে পড়লে একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ পাহাড় থেকে একটি বিশাল পাথর খণ্ড ধসে পড়ে গুহার মুখটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, 'আল্লাহর কসম! নিজেদের করা কোনো খাঁটি নেক আমলের উসিলা দিয়ে দুআ করা ছাড়া আজ এই পাথর থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।' অতঃপর তারা প্রত্যেকে নিজের জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সৎ কাজটি স্মরণ করে আল্লাহর কাছে এভাবে দুআ করতে লাগল:

  • প্রথম ব্যক্তির দুআ (পিতামাতার সেবা): প্রথমজন বলল, 'হে আল্লাহ! আমার বৃদ্ধ পিতামাতা ছিলেন। প্রতিদিন আমি মাঠ থেকে পশু চরিয়ে ফিরে এসে পরিবারের কাউকে দেওয়ার আগে আমার পিতামাতাকে দুধ পান করাতাম। একদিন আমার ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যায় এবং এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি পাত্রে দুধ নিয়ে তাদের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম, কিন্তু তাদের ঘুম ভাঙানো পছন্দ করলাম না। এদিকে আমার ক্ষুধার্ত সন্তানরা আমার পায়ের কাছে এসে খাবারের জন্য কাঁদছিল। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সকাল হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আমি যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যই এই কাজটি করে থাকি, তবে আমাদের ওপর থেকে এই পাথরটি একটু সরিয়ে দাও।'
  • ফলাফল: তার এই দুআর পর পাথরটি সামান্য সরে গেল, কিন্তু বের হওয়ার মতো পথ হলো না।
  • দ্বিতীয় ব্যক্তির দুআ (ব্যভিচার থেকে আত্মরক্ষা): দ্বিতীয়জন বলল, 'হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল, যাকে আমি দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসতাম। একবার তীব্র অভাবের তাড়নায় সে আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসে। আমি তাকে শর্ত দিলাম যে, সে যদি আমার কুপ্রস্তাবে সাড়া দেয়, তবে আমি তাকে একশত স্বর্ণমুদ্রা দেব। নিরুপায় হয়ে সে রাজি হলো। কিন্তু যখনই আমি তার ওপর উপবেশন করলাম (পাপকাজে লিপ্ত হতে গেলাম), তখন সে কেঁদে উঠে বলল, "ওহে আল্লাহর বান্দা! আল্লাহকে ভয় করো এবং অন্যায়ভাবে আমার সতীত্ব নষ্ট করো না।" তার এই কথা শুনে আমি আল্লাহর ভয়ে কামভাব থাকা সত্ত্বেও তাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলাম এবং সেই অর্থও তাকে দিয়ে দিলাম। হে আল্লাহ! আমি যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যই এই পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে থাকি, তবে পাথরটি আরও একটু সরিয়ে দাও।'
    ফলাফল: পাথরটি আরও একটু সরে গেল, কিন্তু তখনও বের হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা হলো না।
  • তৃতীয় ব্যক্তির দুআ (আমানতদারী ও সততা): তৃতীয়জন বলল, 'হে আল্লাহ! আমি একবার কিছু শ্রমিক নিয়োগ করেছিলাম এবং কাজ শেষে সবাইকে মজুরি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু একজন শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি না নিয়েই চলে যায়। আমি তার সেই পাওনা টাকাটি রেখে না দিয়ে তা দিয়ে কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু করি এবং তা থেকে অনেক সম্পদ ও গবাদিপশু তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পর সেই শ্রমিকটি আমার কাছে ফিরে এসে বলল, "হে আল্লাহর বান্দা! আমার পাওনা মজুরিটুকু আমাকে দিয়ে দিন।" আমি তাকে বললাম, "এই যে সামনে যত উট, গরু, ছাগল ও দাস দেখতে পাচ্ছ, এসবই তোমার মজুরির সম্পদ, সব নিয়ে যাও।" সে ভাবল আমি তার সাথে উপহাস করছি, কিন্তু আমি তাকে আশ্বস্ত করলে সে একটি জিনিসও না রেখে সব নিয়ে চলে গেল। হে আল্লাহ! আমি যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্যই এই আমানত রক্ষা করে থাকি, তবে আমাদের সম্পূর্ণ মুক্ত করে দাও।'
    ফলাফল: তার এই দুআর সাথে সাথেই পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং তারা তিনজনই সুস্থ ও নিরাপদে গুহা থেকে বের হয়ে চলে গেল." ১. সহীহ বুখারী: হাদীস নং ২২১৫ (অধ্যায়: ক্রয়-বিক্রয়), ২. সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ২৭৪৩।
  • দুআর উত্তর পেতে হলে নির্দেশিত কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে:
খাদ্য ও উপার্জন হালাল ও পবিত্র হতে হবে।

তাড়াহুড়ো করা যাবে না।

একাগ্রচিত্তে বা মন দিয়ে দুআ করতে হবে।

প্রতিশ্রুতি – ২ : আল্লাহকে স্মরণ করলে, তিনিও আমাদের স্মরণ করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন-


فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ (152)​

"সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫২)

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِي، فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ ذَكَرْتُهُ فِي مَلَإٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ، وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ بِشِبْرٍ تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ بَاعًا، وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً "


আল্লাহ তা’আলা ঘোষনা করেন, আমি সেইরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই। (সহীহ বুখারী-৭৪০৫)

ইউনুস নবী (আ.)-এর আল্লাহকে স্মরণ ও তাঁর সাহায্য:

وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ (87)

আর স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, ‘আপনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই’। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম’ (আম্বিয়া-৮৭) ।


যখন ইউনুস (আ.) তিমির পেটে বন্দি ছিলেন, তখন তিনি আল্লাহকে স্মরণ করে দুআ করেছিলেন: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুন্তু মিনাজ যা-লিমীন।" সুখের দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করার কারণেই কঠিন সময়ে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছিলে।

সুখের সময় আল্লাহর স্মরণ, বিপদে তাঁর সাহায্য ঃ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট উপদেশ রয়েছে যে, আমরা যদি সুখের সময়ে আল্লাহকে স্মরণ করি, তবে তিনি বিপদের সময়ে আমাদের সাহায্য করবেন। তিনি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تَعَرَّفْ إِلَى اللهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ

"তুমি সুখের সময়ে আল্লাহকে চেনো (স্মরণ করো); তবে তিনি তোমাকে কঠিন সময়ে সাহায্য করবেন এবং মনে রাখবেন।" (সহীহূল জামি সাগীর-২৯৬১)

তাঁর স্মরণ ও মানসিক শান্তি: আল্লাহ তাআলা বলেন-

الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ (28)


"যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল চিত্ত প্রশান্ত হয়।" (সূরা আর-রাদ: ২৮)।

আল্লাহর স্মরণ ও তঁার বিশেষ সান্নিধ্য লাভ: হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِي،


"বান্দা যখনই আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথেই থাকি।" (বুখারী)

সর্বোত্তম আমল আল্লাহর স্মরণ :

«أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَرْضَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ، وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ، وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ إِعْطَاءِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ، وَمِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ، وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ؟» قَالُوا: وَمَا ذَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «ذِكْرُ اللَّهِ» وَقَالَ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ: «مَا عَمِلَ امْرُؤٌ بِعَمَلٍ أَنْجَى لَهُ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ»


"আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা তোমাদের সমস্ত কাজের মধ্যে সর্বোত্তম, তোমাদের মালিকের কাছে সবচেয়ে পবিত্র এবং তোমাদের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়? তা হলো আল্লাহর স্মরণ (জিকির)।" (সুনানে তিরমিজি-৩৩৭৭ সহীহ-)

লক্ষণীয় বিষয়:

  • সকাল ও সন্ধ্যার আজকার (দুআ ও জিকির) নিয়মিত করা।
  • কাজ করার সময় বা ভ্রমণের সময় জিহ্বা সর্বদা জিকির দ্বারা আর্দ্র রাখা।
  • দৈনন্দিন জীবনে জিকিরের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া।
  • এমন ভালো মজলিস বা সভায় অংশ নেওয়া যেখানে আল্লাহকে স্মরণ করার সুযোগ পাওয়া যায়।
প্রতিশ্রুতি – ৩ : তঁার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলে তিনি নিয়ামাত বৃদ্ধি করবেন । তিনি বলেন-

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ (7)


"যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের (নিয়ামত) বাড়িয়ে দেবো।" (সূরা ইব্রাহিম: ৭)

কৃতজ্ঞতার ৩টি স্তর ও অকৃতজ্ঞতার পরিণতি :

নাবী (সা.)-এর আদর্শ:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ حَتَّى تَتَفَطَّرَ قَدَمَاهُ، فَقَالَتْ عَائِشَةُ: لِمَ تَصْنَعُ هَذَا يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَقَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ؟ قَالَ: «أَفَلاَ أُحِبُّ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا شَكُورًا


আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "আল্লাহ যখন আপনার অতীতের এবং ভবিষ্যতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তখন কেন আপনি রাত জেগে এত সলাত পড়েন যে আপনার পা ফুলে যায়?" নবী (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন: "আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?" [বুখারী-৪৮৩৭]।

শুকরের (কৃতজ্ঞতার) ৩টি স্তর: পণ্ডিতগণ স্পষ্ট করেছেন যে কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়, এর তিনটি স্তর রয়েছে:

অন্তরের কৃতজ্ঞতা: মনে-প্রাণে স্বীকার করা যে সমস্ত নিয়ামত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এসেছে。

মুখের কৃতজ্ঞতা: অনবরত 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা এবং আল্লাহর প্রশংসা করা。

শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কৃতজ্ঞতা: প্রাপ্ত নিয়ামতগুলো (যেমন স্বাস্থ্য, সম্পদ, সময়) কেবল আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যবহার করা।

অকৃতজ্ঞতার পরিণাম :

নিয়ামতের কুফরি বা অকৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন-

وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ (7)

"আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর [সূরা ইব্রাহিম: ৭] (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে নিয়ামত টিকে থাকে ও বৃদ্ধি পায়; আর অকৃতজ্ঞ হলে বিদ্যমান নিয়ামতও হারিয়ে যায়)।

ব্যবহারিক নির্দেশনা:

  • ছোট ছোট নিয়ামত পেলেও মন থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস করুন।
  • প্রতিদিন শারীরিক সুস্থতা, পরিবার ও খাদ্যের জন্য 'আলহামদুলিল্লাহ' বলুন।
প্রতিশ্রুতি – ৪ : ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার করলে, তিনি সুরক্ষা করবেন । ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত :

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ (33)

আর আল্লাহ এমন নন যে, তাদেরকে আযাব দেবেন এ অবস্থায় যে, তুমি তাদের মাঝে বিদ্যমান এবং আল্লাহ তাদেরকে আযাব দানকারী নন এমতাবস্থায় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে। আনফাল-৩৩। এই আয়াত েথকে বোঝা যায় যে, দুনিয়াতে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার জন্য দুটি আশ্রয়কেন্দ্র (আমান) ছিল:

নবী (সা.)-এর সশরীরে মানুষের মাঝে জীবিত থাকা :

سَمِعَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ أَبُو جَهْلٍ: اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا هُوَ الحَقَّ مِنْ عِنْدِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ، " فَنَزَلَتْ: {وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ، وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ. وَمَا لَهُمْ أَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللَّهُ وَهُمْ يَصُدُّونَ عَنِ المَسْجِدِ الحَرَامِ} [الأنفال: 34] "


আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আবূ জাহেল বলেছিল, ’’হে আল্লাহ! এটা যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয়, তবে আমাদের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দাও। তখনই নাযিল হল- وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ * وَمَا لَهُمْ أَنْ لاَ يُعَذِّبَهُمُ اللَّهُ وَهُمْ يَصُدُّونَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ‏)‏ الآيَةَ আল্লাহ এমন নহেন যে, তুমি তাদের মধ্যে থাকবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং আল্লাহ এমনও নহেন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন, এবং তাদের কি-বা বলবার আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন না যখন তারা লোকদের মসজিদুল হারাম থেকে নিবৃত করে? (যদিও তারা এর তত্ত্বাবধায়ক নয়, মুত্তাকীগণই এর তত্ত্বাবধায়ক; কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা অবগত নয়) (৮: ৩৩-৩৪)। [সহীহ বুখারী-৪৬৪৮]

ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা ("আল্লাহ তাদের ওপর আযাব দেবেন না যখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে")।

নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর প্রথম আশ্রয়টি হারিয়ে গেছে। এখন আমাদের কাছে কেবল দ্বিতীয় আশ্রয়টি অর্থাৎ 'ইস্তিগফার' বাকি রয়েছে।

وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ (33)

"আল্লাহ তাদের ওপর আযাব দেবেন না যখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে।" (সূরা আল-আনফাল: ৩৩)।

«مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ، جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ»

"যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ দেখাবেন, সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর করে স্বস্তি দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারেনি।" (আবু দাউদ-১৫১৮, সহীহ)

নূহ নবী (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে যে উপদেশ দিয়েছিলেন (সূরা নূহ: ১০-১২): এটি দুনিয়াতে ইস্তিগফারের সুফল বর্ণনা করার সবচেয়ে সুন্দর আয়াত:

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا (10) يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا (11) وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا (12)



আমি বললাম : তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।" (ক্ষমা প্রার্থনা কেবল পরকালের জন্যই নয়, বরং দুনিয়াতে সম্পদ, বৃষ্টি, সন্তান ও সুখ বৃদ্ধিরও কারণ)। [সূরা নূহ : ১০-১২]

হাসান আল-বসরীর ঘটনা ও আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য

হাসান আল-বসরী (রহ.)-এর বিখ্যাত ঘটনা:


  • এক ব্যক্তি অনাবৃষ্টির (বৃষ্টি না হওয়া) অভিযোগ করল।
  • অন্য এক ব্যক্তি দারিদ্র্যের কথা জানাল।
  • তৃতীয় একজন সন্তান না হওয়ার দুঃখ প্রকাশ করল।
  • চতুর্থ ব্যক্তি তার বাগানে ফলন না হওয়ার কথা বলল।
হাসান আল-বসরী (রহ.) সবাইকে একটিই সাধারণ উপদেশ দিয়েছিলেন, তাহলো: "তোমরা আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করো।" উপস্থিত মানুষজন এতে আশ্চর্য হলে তিনি তাদের সূরা নূহের ১০-১২ নম্বর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনান। কুরতুবী।

ব্যবহারিক নির্দেশনা: সাইয়েদুল ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠমত দুআ ।

سَيِّدُ الاستِغفارِ أن تَقولَ: اللهُمَّ أنتَ رَبِّي لا إلَهَ إلَّا أنتَ، خَلَقتَني وأنا عَبدُك، وأنا على عَهدِك ووَعدِك ما استَطَعتُ، أعوذُ بك مِن شَرِّ ما صَنَعتُ، أبوءُ لك بنِعمَتِك عَلَيَّ، وأبوءُ لك بذَنبي، فاغفِرْ لي؛ فإنَّه لا يَغفِرُ الذُّنوبَ إلَّا أنتَ. قال: ومَن قالها مِنَ النَّهارِ موقِنًا بها، فماتَ مِن يَومِه قَبلَ أن يُمسيَ، فهو مِن أهلِ الجَنَّةِ، ومَن قالها مِنَ اللَّيلِ وهو موقِنٌ بها، فماتَ قَبلَ أن يُصبِحَ، فهو مِن أهلِ الجَنَّةِ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার হলো বান্দার এ দু’আ পড়া—

আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, খালাকতানী ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা 'আলা 'আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাসতাতাতু, আ'উযুবিকা মিন শাররি মা সনা'তু, আবূউ লাকা বিনি'মাতিকা 'আলাইয়্যা, ওয়া আবূউ লাকা বিযাম্বী, ফাগফিরলী ফায়িন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আন্তা।"

"হে আল্লাহ তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। কারন তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।

যে ব্যাক্তি দিনের (সকাল) বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইস্তিগফার পড়বে আর সন্ধা হওয়ার আগেই সে মারা যাবে, সে জান্নাতী হবে। আর যে ব্যাক্তি রাতের (প্রথম) বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ দু’আ পড়ে নেবে আর সে ভোর হওয়ার আগেই মারা যাবে সে জান্নাতী হবে। বুখারী ঃ ৬৩০৬

  • প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০ বার একাগ্রতার সাথে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পাঠ করুন。
প্রতিশ্রুতি – ৫ : আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করলে, তিনি বান্দাকে সাহায্য করবেন ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ (7)

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে (তাঁর দ্বীনকে) সাহায্য করো, তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় রাখবেন।" (সূরা মুহাম্মদ: ৭)

নবী (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন:

فَقَالَ: يَا غُلاَمُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ، احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلاَّ بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الأَقْلاَمُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ.

তিনি বললেনঃ হে তরুণ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহ্ তা’আলার (বিধি-নিষেধের) রক্ষা করবে, আল্লাহ তা’আলা তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ্ তা’আলাকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহ তা’আলার নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহ্ তা’আলার নিকটেই কর।

আর জেনে রাখো, যদি সকল উন্মাতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা’আলা তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সকল ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ্ তা’আলা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে। (তিরমিজি- ২৫১৬, সহীহ)।

ইতিহাস ও তাফসীরের আলোতে :

■ বদর যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য : আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের তাঁদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ফলে পানি সংক্রান্ত যাবতীয় সম্যসার সমাধান হয়, মরুভূমিতে চলাফেরা করতে সুবিধে হয় এবং শয়তান পানি সংক্রান্ত তাঁদের অন্তরের যে কু-ভাবনা সঞ্চারিত করেছিল তাও দূরীভূত হয় (ইবনু কাসীর)। আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِذْ يُغَشِّيكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلَى قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ

স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন তাঁর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাস্বরূপ এবং আকাশ থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর যাতে এর মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করেন, আর তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করেন, তোমাদের অন্তরসমূহ দৃঢ় রাখেন এবং এর মাধ্যমে তোমাদের পা-সমূহ স্থির রাখেন।(সূরা আল-আনফাল: ১১)
।

ওমর (রা.)-এর শাসন আমলের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা: খলীফা ওমর (রা.) পারস্য বিজয়ের লক্ষ্যে কাদেসিয়ার যুদ্ধের প্রাক্কালে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং তাঁর সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে এই ঐতিহাসিক চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন।

মূল আরবী নসিহত (আংশিক):

"...فَإِنِّي آمُرُكَ وَمَنْ مَعَكَ مِنَ الأَجْنَادِ بِتَقْوَى اللَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ ، فَإِنَّ تَقْوَى اللَّهِ أَفْضَلُ الْعُدَّةِ عَلَى الْعَدُوِّ ، وَأَقْوَى الْمَكِيدَةِ فِي الْحَرْبِ ، وَآمُرُكَ وَمَنْ مَعَكَ أَنْ تَكُونُوا أَشَدَّ احْتِرَاسًا مِنَ الْمَعَاصِي مِنْكُمْ مِنْ عَدُوِّكُمْ ، فَإِنَّ ذُنُوبَ الْجَيْشِ أَخْوَفُ عَلَيْهِمْ مِنْ عَدُوِّهِمْ ، وَإِنَّمَا يُنْصَرُ الْمُسْلِمُونَ بِمَعْصِيَةِ عَدُوِّهِمْ لِلَّهِ..."

মূল বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ:


"আমি আপনাকে এবং আপনার সাথে থাকা সৈন্যদের সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করার (তাকওয়া অবলম্বন) নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা আল্লাহর ভয়ই হচ্ছে শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে উত্তম প্রস্তুতি এবং যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কৌশল। আমি আপনাকে ও আপনার সঙ্গীদের নির্দেশ দিচ্ছি যে, আপনারা শত্রুর চেয়ে নিজেদের পাপ বা অবাধ্যতাকে বেশি ভয় করুন। কারণ, একটি বাহিনীর নিজস্ব পাপ তাদের জন্য শত্রুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। মুসলমানরা কেবল শত্রুর আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতার কারণেই (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সাহায্যপ্রাপ্ত হয়—তা না হলে আমাদের তো তাদের সমপরিমাণ শক্তি বা সংখ্যা নেই। যদি আমরাও পাপে লিপ্ত হয়ে তাদের সমান হয়ে যাই, তবে শক্তির বিচারে তারা আমাদের ওপর জয়ী হবে।" ফিকহুস সুন্নাহ , খণ্ড-২. পৃ-৬৪২।

সারসংক্ষেপ: এটি কোনো সরাসরি হাদিস (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী) নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসে খলিফা উমর (রা.)-এর যুদ্ধকালীন রণকৌশল ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনার একটি অনন্য দলিল।

■ আল্লাহ তাআলা বলেন –

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ (7)

হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর,তাহলে তিনি তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদযুগলকে অবিচল রাখবেন। সূরা মুহাম্মাদ-৭

হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) তঁার তাফসীরে বলেছেন:


"যে বান্দা তার যবান, অন্তর ও শরীর দিয়ে আল্লাহর নির্দেশনাবলী বাস্তবায়ন করে এবং তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে ইহকালের সমস্ত বিপদ-আপদ ও পরকালের শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তার মনকে সুদৃঢ় রাখবেন।"

■ ইমাম আস-সাদী (রহ.)-এর তাফসীর:

"যারা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে, মানুষকে এর দিকে আহ্বান জানায় এবং শারীরিক, আর্থিক, জবান ও অন্তরের মাধ্যমে এর জন্য শ্রম দেয়, আল্লাহ তাদের ইহকাল ও পরকালে সাহায্য করবেন এবং তাদের পা ও অন্তরকে সুদৃঢ় রাখবেন।"

আমাদের করণীয় :

আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত-

ক) নিজের জীবনে দ্বীনকে জীবিত করা:
আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা মানে শুধু মুখে বলা নয়; বরং আমাদের ঘরবাড়ি ও কর্মক্ষেত্রে আল্লাহর বাণীকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।

খ) ধর্মীয় আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানো: মসজিদ, মাদ্রাসা এবং বিভিন্ন দ্বীনি উদ্যোগে শারীরিক ও আর্থিকভাবে আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করা।

গ) তাকওয়া বা ধর্মনিষ্ঠা বজায় রাখা: সংকটের সময়েও আল্লাহকে ভুলে না গিয়ে তাঁর আদেশগুলো পুরোপুরি মেনে চলা। তবেই আল্লাহ আমাদের পা পিছলে যেতে দেবেন না এবং সুদৃঢ় রাখবেন।
 

Attachments

Similar content Most view View more
Back
Top