- Joined
- Apr 20, 2023
- Threads
- 7
- Comments
- 11
- Reactions
- 95
- Thread Author
- #1
সিয়াম পালনকারীর জন্য ১০ টি নসীহত
ড. আব্দুর রাযযাক্ব আল বাদর হাফিঃ
সংক্ষিপ্ত অনুবাদ ও সংযোজন - তাওহীদুর রহমান সালাফী।
রমাযান মাসের একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে সিয়াম সাধনা।
আমরা সিয়াম পালন করি এর মানে এটা নয় যে, এমনিতেই পরিপূর্ণ প্রতিদান পেয়ে যাবো বরং এর জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক বিষয়ের প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
নবী ﷺ বলেছেন -
رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ.
“কত রোযাদার আছে যাদের রোযার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।” (ইবনে মাজাহ্ 1690)
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, সিয়াম পালনের সাথে আরও কিছু বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়াও ইমাম গাযালী রহিঃ সিয়াম পালনকারীদের তিনটা স্তর বর্ণনা করেছেন। (ইহয়ায়ু উলুমিদ্দীন 1/234)
যাইহোক আমরা যদি আমাদের সিয়ামকে সর্বোত্তম করতে চাই তাহলে নিম্নলিখিত ১০ টি নসীহতের উপর আমল করার চেষ্টা করবো।
১. إِخْلَاصُ النِّيَّةِ فِي الصِّيَامِ وَكُلِّ الْعِبَادَاتِ
সিয়ামসহ সকল ইবাদতে নিয়তকে একনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধ রাখা।
প্রত্যেক ইবাদতে নিজের নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা বিশেষ করে সিয়াম পালনে।
ইবাদতে নিয়ত বিশুদ্ধ করা খুব কঠিন কাজ যেমন ইমাম সুফিয়ান সাওরী রহিঃ বলেন
«مَا عَالَجْتُ شَيْئًا أَشَدَّ عَلَيَّ مِنْ نِيَتيِ ، إنَّها تَقْلَّبُ عَلَيَّ »
“আমার নিয়তকে ঠিক করার চেয়ে বেশি কঠিন কোনো কিছু পায়নি, আমার কাছে সেটা বারবার পরিবর্তন হতে থাকে” (আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবুস সামি, খতীব বাগদাদী 2/288)
সিয়াম রাখা অবস্থায় লোকের সামনে নিজের সিয়ামকে নিয়ে প্রশংসা করা উচিত নয়। যেমন - আমি সিয়াম পালন করছি তো বেশি ভালো লাগছে, সারা বছর সিয়াম থাকলে আমার জন্য ভালো ইত্যাদি।
২. الإِكْثَارُ مِنْ ذِكْرِ اللهِ অধিকহারে আল্লাহ্কে স্মরণ করা (যিকিরে মশগুল থাকা)।
সিয়াম অবস্থায় অধিকহারে আল্লাহ্কে স্বরণ করা।
যে কোনো ইবাদতে আল্লাহ্ তাআলা কে স্বরণ করলে সেই ইবাদতের মর্যাদা অধিক বেড়ে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল কায়য়ুম রহিঃ বলেন - ইবাদত কারীর মধ্যে সেই ব্যক্তি বেশি উত্তম যে তার ঈবাদতে অধিক পরিমাণে আল্লাহ্কে স্বরণ করে, সুতরাং সর্বোত্তম সিয়াম পালনকারী সে, যে অধিকহারে আল্লাহ্কে স্বরণ করে অনুরূপভাবে অন্যান্য ইবাদতেও। (আল-ওয়াবিলুস সায়য়িব ১/৭৫)
*৩. حِفْظُ الصِّيَامِ مِنَ الْمُحَرَّمَاتِ وَالذُّنُوبِ
সিয়ামকে গুনাহ ও হারাম কাজ থেকে হেফাজত করা*
সিয়ামকে হারাম জিনিস থেকে সুরক্ষিত রাখা। যেমন - মিথ্যা কথা, ধোঁকা দেওয়া, গালমন্দ করা, পরনিন্দা ও পরিচর্যা ইত্যাদি।
নবী ﷺ বলেছেন -
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।(বুখারী 1903)
অন্যত্রে নবী ﷺ বলেছেন -
" أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ " . قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ . فَقَالَ " إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ "
তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের অধিকার তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম 6473)
শুধুমাত্র পানাহার না করেই পরিপূর্ণ সিয়াম পালন করা যায় না বরং তার সাথে অন্যান্য হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
قال ابن رجب رحمه الله: " قال بعض السلف: أهون الصيام : ترك الشراب والطعام.
ইবনে রজব আল-হাম্বলী রহিঃ বলেন কতিপয় সালাফ বলেছেন যে, সবচেয়ে সহজতর সিয়াম হচ্ছে পানাহার পরিহার করা। (লাতাইফুল মাআরিফ 155)
৪. الْحِفَاظُ عَلَى الْفَرَائِضِ، خَاصَّةً الصَّلَاةَ فِي وَقْتِهَا
ফরয ইবাদতসমূহ বিশেষত সময়মতো ও খুশূসহ সালাত আদায় করা*
সিয়াম অবস্থায় ফরয বিধান গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা বিশেষ ভাবে পাঁচ ওয়াক্ত স্বলাতের প্রতি। আর সম্ভব হলে মসজিদে বসে বসে এক স্বলাতের পর আরেক স্বলাতের জন্য অপেক্ষা করা নাহলে কম পক্ষে আযানের কিছুক্ষণ আগে বা জামাতের আগে এসে অপেক্ষা করা।
*৫. الْعِنَايَةُ بِالْقُرْآنِ
কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা (তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুধাবন)।*
কুরআনের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
যেহেতু রামাযান মাস কুরআনের কারণেই ফযীলতপূর্ণ অতএব এই মাসে বিশেষ করে কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক বাড়ানো উচিত, তেলাওয়াত করে হোক অথবা অর্থসহ পড়ে।
কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত ।
নবী ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ {الم} حَرْفٌ، وَلَكِنْ {أَلِفٌ} حَرْفٌ، وَ{لَامٌ} حَرْفٌ، وَ{مِيمٌ} حَرْفٌ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য এর এর কারণে একটি সাওয়াব আছে। আর সাওয়াবটি তার দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।”
[হাসান] - [সুনানে তিরমিযি - 2910]
كَانَ جِبْرِيْلُ يَلْقَاهُ فِيْ كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ.
রামাযান মাসে প্রত্যেক রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যখন জিব্রাঈল (আঃ) দেখা করতেন, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। (বুখারী 3220)
ইবনে রজব আল-হাম্বলী রহিঃ কতিপয় সালাফের ব্যাপারে বলেন যে, কেউ কেউ তিন দিনে কুরআন পড়ে শেষ করতেন, কেউ সাত দিনে আবার কেউ দশ দিনে।
এছাড়াও ইমাম মালিক রহিঃ ব্যাপারে বলেন যে, রামাযান মাস আগমন হলে তিনি হাদীস এবং অন্যান্য দারস ছেড়ে কুরআনের দিকে মনোনিবেশ করতেন। (লাতাইফুল মাআরিফ 318)
উল্লেখ্য যে, তিন দিনের কমে কুরআন শেষ করার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেটা ফযীলত পূর্ণ সময় ও ফযীলত পূর্ণ জায়গার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। (লাতাইফুল মাআরিফ 319)
৬.
اغْتِنَامُ الْوَقْتِ وَعَدَمُ تَضْيِيعِهِ فِي رَمَضَانَ
রামাযানের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো এবং সময় নষ্ট না করা।
বিশেষ করে রামাযান মাসে প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সময় নষ্ট করা হতে বিরত থাকতে হবে কারণ এর জন্য আল্লাহ্ তাআলা হিসাব নিবেন।
নবী ﷺ বলেছেন -
«لا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَومَ القِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ؟
“কিয়ামতের দিন বান্দার পা দু’খানি সরবে না। (অর্থাৎ আল্লাহর দরবার থেকে যাওয়ার তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না।) যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে; তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কিসে ব্যয় করেছে? (সহীহ- তিরমিযী)
ইমাম ইবনুল কায়য়ুম রহিঃ বলেছেন
إضاعة الوقت أشد من الموت؛ لأن إضاعة الوقت تقطعك عن الله، والدار الآخرة، والموت يقطعك عن الدنيا، وأهلها.
সময় নষ্ট করা মৃত্যুর চেয়ে কঠিন ব্যাপার, কারণ সময় নষ্ট করলে আল্লাহ্ ও পরকাল থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়, আর মৃত্যু দুনিয়া ও দুনিয়া বাসী থেকে সম্পূর্ণ ছিন্ন করে। (আল ফাওয়াইদ 44)
৭. أَنْ يَكُونَ الصِّيَامُ وَالْقِيَامُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا
ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সিয়াম ও কিয়াম করা।
রবের নিকট নেকির উদ্দেশ্যেই সিয়াম পালন করা।
সিয়ামের ফযীলতের বিশ্বাস রেখে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করতে হবে।
৮. الْعِنَايَةُ بِالْعَطَاءِ وَالإِحْسَانِ إِلَى النَّاسِ দান-সাদাকাহ্ করা ও মানুষের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা।.
রামাযান মাস বিশেষ ভাবে দান খয়রাতের মাস অতএব এই মাসে নিজ সাধ্যমত অধিক পরিমাণে দান সাদাক্বাহ্ করা উচিত।
لَرَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرِيْلُ أَجْوَدُ بِالْخَيْرِ مِنْ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যখন জিব্রাঈল (আঃ) দেখা করতেন, তখন তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য পাঠানো বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন। (বুখারী 3220)
*৯. الْحِرْصُ عَلَى التَّفَقُّهِ فِي أَحْكَامِ الصِّيَامِ
সিয়ামের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা।
ইবাদতের পদ্ধতি যদি শুদ্ধ না হয় তাহলে সেটা রবের নিকট গৃহীত হবে না তাই যেকোন ইবাদতের পূর্বে সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরী ।
অনুরূপ ভাবে রামাযান মাসের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা উচিত।
*১০. الْعِنَايَةُ بِالدُّعَاءِ وَالإِكْثَارُ مِنْهُ
দুআর প্রতি যত্নবান হওয়া এবং অধিকহারে দুআ করা।
মহান আল্লাহ বলেন
وَ اِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لِیۡ وَ لۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ لَعَلَّهُمۡ یَرۡشُدُوۡنَ
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (বাকারা 186)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন,
ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ لاَ تُرَدُّ دَعْوَةُ الْوَالِدِ، وَدَعْوَةُ الصَّائِمِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ-
‘তিন ব্যক্তির দো‘আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ১. সন্তানের জন্য পিতার দো‘আ। ২. ছায়েমের দো‘আ ও ৩. মুসাফিরের দো‘আ’।(বায়হাকী হা/৬৩৯২; সহীহুল জামে‘ হা/৩০৩২)
পরিশেষে রবের নিকট প্রার্থনা করি যে, তুমি আমাদের সিয়াম-কিয়াম ও অন্যান্য ইবাদত কবূল করো। আমীন....
ড. আব্দুর রাযযাক্ব আল বাদর হাফিঃ
রমাযান মাসের একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে সিয়াম সাধনা।
আমরা সিয়াম পালন করি এর মানে এটা নয় যে, এমনিতেই পরিপূর্ণ প্রতিদান পেয়ে যাবো বরং এর জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক বিষয়ের প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
নবী ﷺ বলেছেন -
رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ.
“কত রোযাদার আছে যাদের রোযার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।” (ইবনে মাজাহ্ 1690)
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, সিয়াম পালনের সাথে আরও কিছু বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়াও ইমাম গাযালী রহিঃ সিয়াম পালনকারীদের তিনটা স্তর বর্ণনা করেছেন। (ইহয়ায়ু উলুমিদ্দীন 1/234)
যাইহোক আমরা যদি আমাদের সিয়ামকে সর্বোত্তম করতে চাই তাহলে নিম্নলিখিত ১০ টি নসীহতের উপর আমল করার চেষ্টা করবো।
১. إِخْلَاصُ النِّيَّةِ فِي الصِّيَامِ وَكُلِّ الْعِبَادَاتِ
সিয়ামসহ সকল ইবাদতে নিয়তকে একনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধ রাখা।
প্রত্যেক ইবাদতে নিজের নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা বিশেষ করে সিয়াম পালনে।
ইবাদতে নিয়ত বিশুদ্ধ করা খুব কঠিন কাজ যেমন ইমাম সুফিয়ান সাওরী রহিঃ বলেন
«مَا عَالَجْتُ شَيْئًا أَشَدَّ عَلَيَّ مِنْ نِيَتيِ ، إنَّها تَقْلَّبُ عَلَيَّ »
“আমার নিয়তকে ঠিক করার চেয়ে বেশি কঠিন কোনো কিছু পায়নি, আমার কাছে সেটা বারবার পরিবর্তন হতে থাকে” (আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবুস সামি, খতীব বাগদাদী 2/288)
সিয়াম রাখা অবস্থায় লোকের সামনে নিজের সিয়ামকে নিয়ে প্রশংসা করা উচিত নয়। যেমন - আমি সিয়াম পালন করছি তো বেশি ভালো লাগছে, সারা বছর সিয়াম থাকলে আমার জন্য ভালো ইত্যাদি।
২. الإِكْثَارُ مِنْ ذِكْرِ اللهِ অধিকহারে আল্লাহ্কে স্মরণ করা (যিকিরে মশগুল থাকা)।
সিয়াম অবস্থায় অধিকহারে আল্লাহ্কে স্বরণ করা।
যে কোনো ইবাদতে আল্লাহ্ তাআলা কে স্বরণ করলে সেই ইবাদতের মর্যাদা অধিক বেড়ে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল কায়য়ুম রহিঃ বলেন - ইবাদত কারীর মধ্যে সেই ব্যক্তি বেশি উত্তম যে তার ঈবাদতে অধিক পরিমাণে আল্লাহ্কে স্বরণ করে, সুতরাং সর্বোত্তম সিয়াম পালনকারী সে, যে অধিকহারে আল্লাহ্কে স্বরণ করে অনুরূপভাবে অন্যান্য ইবাদতেও। (আল-ওয়াবিলুস সায়য়িব ১/৭৫)
*৩. حِفْظُ الصِّيَامِ مِنَ الْمُحَرَّمَاتِ وَالذُّنُوبِ
সিয়ামকে গুনাহ ও হারাম কাজ থেকে হেফাজত করা*
সিয়ামকে হারাম জিনিস থেকে সুরক্ষিত রাখা। যেমন - মিথ্যা কথা, ধোঁকা দেওয়া, গালমন্দ করা, পরনিন্দা ও পরিচর্যা ইত্যাদি।
নবী ﷺ বলেছেন -
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।(বুখারী 1903)
অন্যত্রে নবী ﷺ বলেছেন -
" أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ " . قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ . فَقَالَ " إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ "
তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের অধিকার তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মুসলিম 6473)
শুধুমাত্র পানাহার না করেই পরিপূর্ণ সিয়াম পালন করা যায় না বরং তার সাথে অন্যান্য হারাম জিনিস থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
قال ابن رجب رحمه الله: " قال بعض السلف: أهون الصيام : ترك الشراب والطعام.
ইবনে রজব আল-হাম্বলী রহিঃ বলেন কতিপয় সালাফ বলেছেন যে, সবচেয়ে সহজতর সিয়াম হচ্ছে পানাহার পরিহার করা। (লাতাইফুল মাআরিফ 155)
৪. الْحِفَاظُ عَلَى الْفَرَائِضِ، خَاصَّةً الصَّلَاةَ فِي وَقْتِهَا
ফরয ইবাদতসমূহ বিশেষত সময়মতো ও খুশূসহ সালাত আদায় করা*
সিয়াম অবস্থায় ফরয বিধান গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা বিশেষ ভাবে পাঁচ ওয়াক্ত স্বলাতের প্রতি। আর সম্ভব হলে মসজিদে বসে বসে এক স্বলাতের পর আরেক স্বলাতের জন্য অপেক্ষা করা নাহলে কম পক্ষে আযানের কিছুক্ষণ আগে বা জামাতের আগে এসে অপেক্ষা করা।
*৫. الْعِنَايَةُ بِالْقُرْآنِ
কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা (তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুধাবন)।*
কুরআনের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হবে।
যেহেতু রামাযান মাস কুরআনের কারণেই ফযীলতপূর্ণ অতএব এই মাসে বিশেষ করে কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক বাড়ানো উচিত, তেলাওয়াত করে হোক অথবা অর্থসহ পড়ে।
কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত ।
নবী ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ {الم} حَرْفٌ، وَلَكِنْ {أَلِفٌ} حَرْفٌ، وَ{لَامٌ} حَرْفٌ، وَ{مِيمٌ} حَرْفٌ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করবে তার জন্য এর এর কারণে একটি সাওয়াব আছে। আর সাওয়াবটি তার দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।”
[হাসান] - [সুনানে তিরমিযি - 2910]
كَانَ جِبْرِيْلُ يَلْقَاهُ فِيْ كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ.
রামাযান মাসে প্রত্যেক রাতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যখন জিব্রাঈল (আঃ) দেখা করতেন, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। (বুখারী 3220)
ইবনে রজব আল-হাম্বলী রহিঃ কতিপয় সালাফের ব্যাপারে বলেন যে, কেউ কেউ তিন দিনে কুরআন পড়ে শেষ করতেন, কেউ সাত দিনে আবার কেউ দশ দিনে।
এছাড়াও ইমাম মালিক রহিঃ ব্যাপারে বলেন যে, রামাযান মাস আগমন হলে তিনি হাদীস এবং অন্যান্য দারস ছেড়ে কুরআনের দিকে মনোনিবেশ করতেন। (লাতাইফুল মাআরিফ 318)
উল্লেখ্য যে, তিন দিনের কমে কুরআন শেষ করার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেটা ফযীলত পূর্ণ সময় ও ফযীলত পূর্ণ জায়গার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। (লাতাইফুল মাআরিফ 319)
৬.
اغْتِنَامُ الْوَقْتِ وَعَدَمُ تَضْيِيعِهِ فِي رَمَضَانَ
রামাযানের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো এবং সময় নষ্ট না করা।
বিশেষ করে রামাযান মাসে প্রতিটা মুহূর্তকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সময় নষ্ট করা হতে বিরত থাকতে হবে কারণ এর জন্য আল্লাহ্ তাআলা হিসাব নিবেন।
নবী ﷺ বলেছেন -
«لا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَومَ القِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ؟
“কিয়ামতের দিন বান্দার পা দু’খানি সরবে না। (অর্থাৎ আল্লাহর দরবার থেকে যাওয়ার তাকে অনুমতি দেওয়া হবে না।) যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে; তার আয়ু সম্পর্কে, সে তা কিসে ব্যয় করেছে? (সহীহ- তিরমিযী)
ইমাম ইবনুল কায়য়ুম রহিঃ বলেছেন
إضاعة الوقت أشد من الموت؛ لأن إضاعة الوقت تقطعك عن الله، والدار الآخرة، والموت يقطعك عن الدنيا، وأهلها.
সময় নষ্ট করা মৃত্যুর চেয়ে কঠিন ব্যাপার, কারণ সময় নষ্ট করলে আল্লাহ্ ও পরকাল থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়, আর মৃত্যু দুনিয়া ও দুনিয়া বাসী থেকে সম্পূর্ণ ছিন্ন করে। (আল ফাওয়াইদ 44)
৭. أَنْ يَكُونَ الصِّيَامُ وَالْقِيَامُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا
ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সিয়াম ও কিয়াম করা।
রবের নিকট নেকির উদ্দেশ্যেই সিয়াম পালন করা।
সিয়ামের ফযীলতের বিশ্বাস রেখে এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করতে হবে।
৮. الْعِنَايَةُ بِالْعَطَاءِ وَالإِحْسَانِ إِلَى النَّاسِ দান-সাদাকাহ্ করা ও মানুষের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা।.
রামাযান মাস বিশেষ ভাবে দান খয়রাতের মাস অতএব এই মাসে নিজ সাধ্যমত অধিক পরিমাণে দান সাদাক্বাহ্ করা উচিত।
لَرَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم حِيْنَ يَلْقَاهُ جِبْرِيْلُ أَجْوَدُ بِالْخَيْرِ مِنْ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে যখন জিব্রাঈল (আঃ) দেখা করতেন, তখন তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য পাঠানো বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন। (বুখারী 3220)
*৯. الْحِرْصُ عَلَى التَّفَقُّهِ فِي أَحْكَامِ الصِّيَامِ
সিয়ামের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা।
ইবাদতের পদ্ধতি যদি শুদ্ধ না হয় তাহলে সেটা রবের নিকট গৃহীত হবে না তাই যেকোন ইবাদতের পূর্বে সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরী ।
অনুরূপ ভাবে রামাযান মাসের বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা উচিত।
*১০. الْعِنَايَةُ بِالدُّعَاءِ وَالإِكْثَارُ مِنْهُ
দুআর প্রতি যত্নবান হওয়া এবং অধিকহারে দুআ করা।
মহান আল্লাহ বলেন
وَ اِذَا سَاَلَکَ عِبَادِیۡ عَنِّیۡ فَاِنِّیۡ قَرِیۡبٌ ؕ اُجِیۡبُ دَعۡوَۃَ الدَّاعِ اِذَا دَعَانِ ۙ فَلۡیَسۡتَجِیۡبُوۡا لِیۡ وَ لۡیُؤۡمِنُوۡا بِیۡ لَعَلَّهُمۡ یَرۡشُدُوۡنَ
আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (বাকারা 186)
নবী করীম (সঃ) বলেছেন,
ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ لاَ تُرَدُّ دَعْوَةُ الْوَالِدِ، وَدَعْوَةُ الصَّائِمِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ-
‘তিন ব্যক্তির দো‘আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ১. সন্তানের জন্য পিতার দো‘আ। ২. ছায়েমের দো‘আ ও ৩. মুসাফিরের দো‘আ’।(বায়হাকী হা/৬৩৯২; সহীহুল জামে‘ হা/৩০৩২)
পরিশেষে রবের নিকট প্রার্থনা করি যে, তুমি আমাদের সিয়াম-কিয়াম ও অন্যান্য ইবাদত কবূল করো। আমীন....