পবিত্রতা মোজার উপর মাস্হ করার বিধান কি?

Joined
Mar 24, 2024
Threads
26
Comments
31
Reactions
275
মোজা বুঝাতে আরবীতে দুটি শব্দ রয়েছে: খুফ্ফ (الخف) অর্থাৎ চামড়ার মোজা এবং জাওরাব (الجورب) অর্থাৎ কাপড়, পশম ইত্যাদির মোজা। ‘জাওরাব’-এর উপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাসহ করেছেন কিনা সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সাহাবী তা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ফকীহগণ মতভেদ করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফার মতে ‘জাওরাব’-এর উপর মাসহ করা বৈধ নয়। ইমাম আবূ ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে ‘জাওরাব’ যদি পুরু হয়, পায়ের চামড়া প্রকাশ না করে তবে তার উপর মাসহ করা বৈধ। ইমাম যাইলায়ী উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আযম মৃত্যুর পূর্বে নিজ মত পরিত্যাগ করে তাঁর ছাত্রদ্বয়ের মত গ্রহণ করেন।[1]

পক্ষান্তরে বহুসংখ্যক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ওযু অবস্থায় চামড়ার মোজা পরিধান করা হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওযূ করার সময় মোজা না খুলে মোজার উপর আদ্র হাত বুলিয়ে মুছে নিতেন বা মাস্হ করতেন। তিনি স্বগৃহে অবস্থানকারীর জন্য ২৪ ঘণ্টা এবং মুসাফিরের জন্য ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত এরূপ মাস্হ করার অনুমতি দিয়েছেন।

খারিজীগণ মোজার উপর মাস্হ করার বৈধতা অস্বীকার করেন। শীয়াগণ মোজাবিহীন পদযুগল মাসহ করা বৈধ বলেন। বিষয়টি কর্মের, আকীদার বিষয় নয়। তবে চামড়ার মোজার উপর মাস্হ মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এরূপ বিষয়ের বৈধতা অস্বীকার করার অর্থ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত একটি কর্মকে অবৈধ বলে মনে করা, নিজেদেরকে তাঁর চেয়েও বেশি মুত্তাকী ও কুরআন বুঝার ক্ষেত্রে নিজেদেরকে তাঁর চেয়ে পারঙ্গম বলে মনে করা। এগুলি সবই কুফরের নামান্তর। এজন্যই ইমাম আবূ হানীফা ও অন্যান্য ইমাম বিষয়টি আকীদার মধ্যে উল্লেখ করেছেন।

এখানে ইমাম আবূ হানীফা বলেছেন যে, খুফ্ফ বা চামড়ার মোজার উপর মাস্হ করা সুন্নাত। ওসিয়্যাহ গ্রন্থে তিনি একে ওয়াজিব বলেছেন। তিনি বলেন:


وَنُقِرُّ بِأَنَّ الْمَسْحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ وَاجِبٌ لِلْمُقِيْمِ يَوْماً وَلَيْلَةً، وَلِلْمُسَافِرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيْهَا؛ لأَنَّ الْحَدِيْثَ وَرَدَ هَكَذَا، فَمَنْ أَنْكَرَهُ فَإِنَّهُ يُخْشَى عَلَيْهِ الْكُفْرُ؛ لأَنَّهُ قَرِيْبٌ مِنَ الْخَبَرِ الْمُتَوَاتِرِ.


‘‘নিজ গৃহে অবস্থানকারী বা মুকীমের জন্য এক দিন এক রাত ও মুসাফিরের জন্য তিন দিন তিন রাত্রি মোজার উপর মাস্হ করা ওয়াজিব বলে আমরা স্বীকার করি। কারণ হাদীসে এরূপই বর্ণিত হয়েছে। যদি কেউ তা অস্বীকার করে তবে তার কাফির হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ তা মুতাওয়াতির হাদীস হওয়ার নিকটবর্তী।’’[2]

অর্থাৎ, মোজার উপর মাস্হ করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবন-পদ্ধতি ও ইবাদত পদ্ধতির অংশ। তিনি যেভাবে যতটুকু গুরুত্ব দিয়ে তা করেছেন, সেভাবে ততটকু গুরুত্ব দিয়ে তা গ্রহণ করা সুন্নাত। একে সুন্নাহ নির্দেশিত বৈধ কর্ম হিসেবে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। মোজার উপর মাস্হ না করলে গোনাহ হয় না। তবে মাস্হ না করে মোজা খুলে পা ধোয়াকে বেশি তাকওয়া মনে করা বা মাস্হ করাকে না-জায়েয মনে করা একটি বিদআত বা নব-উদ্ভাবিত বিশ্বাস। এরূপ আকীদা পোষণকারী সুন্নাহ নির্দেশিত ওয়াজিব আকীদা পরিত্যাগের জন্য পাপী।

[1] মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান, আল-মাবসূত ১/৯১; যাইলায়ী, তাবয়ীনুল হাকায়িক ১/৫২।

[2] ইমাম আবূ হানীফা, আল-ওয়াসিয়্যাহ, পৃ. ৭৮।

_______________________________________________

خف এর সংজ্ঞা:

দুই টাখনুকে ঢেঁকে রাখে এমন চামড়ার জুতাকে خف বলা হয়।[1] পাঁয়ে বেড়ে থাকা দুই হাড্ডিকে কা’ব বলা হয়।

المسح এর আভিধানিক অর্থঃ

مسح শব্দটি مسح মাসদার হতে গৃহীত। কোন বস্ত্তর উপর মৃদু হাত বুলানোকে মাসাহ বলা হয়।[2] আর মোজার উপর মাসাহ করা বলতে বুঝায়, ওযূতে দু’পা ধোয়ার বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট মোজার উপর ভিজা হাত বুলানো।[3]

মোজার উপর মাসাহ করার ব্যাপারে শরীয়াতের বিধান:

বিদ্বানগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কোন ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে পবিত্রতা অর্জন করে মোজা পরিধান করার পর ওযূ নষ্ট হয়ে গেলে সে মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ করতে পারবে।[4] ইবনুল মুবারাক বলেন, মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই, বরং তা বৈধ। এক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ) এর সাহাবীদের পক্ষ থেকে মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ করা মাকরূহ ও জায়েয উভয়টিই বর্ণিত আছে। [5] তবে রাসূল (ﷺ) থেকে মুতওয়াতির পর্যায়ের সহীহ হাদীস দ্বারা এটা শরীয়াত সম্মত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

عَنْ هَمَّامٍ، قَالَ: بَالَ جَرِيرٌ، ثُمَّ تَوَضَّأَ، وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِ، فَقِيلَ: تَفْعَلُ هَذَا؟ فَقَالَ: نَعَمْ،্রرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ بَالَ، ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى خُفَّيْهِগ্ধ . قَالَ الْأَعْمَشُ: قَالَ إِبْرَاهِيمُ:্রكَانَ يُعْجِبُهُمْ هَذَا الْحَدِيثُ لِأَنَّ إِسْلَامَ جَرِيرٍ، كَانَ بَعْدَ نُزُولِ الْمَائِدَةِগ্ধ

অর্থাৎ: হাম্মাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদিন জারীর পেশাব করার পর ওযূ করলেন এবং মোজার ওপর শুধু মাসাহ করলেন। তাকে প্রশ্ন করা হলো (সম্ভবতঃ প্রশ্নকারী হাম্মাম নিজেই) আপনি এরূপ করছেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ! আমি রাসূলুললস্নাহ্ (ﷺ) কে দেখেছি, তিনি পেশাব করার পর ওযূ করে মোজার ওপর মাসাহ করেছেন। ইবরাহীম বলেন, জারীরের এ কথাটি তাদের কাছে খুবই ভাল লেগেছে। কেননা, জারীর সূরা মায়েদা নাযিল হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন।[6]

মোজার উপর মাসাহ করার বিধান:

জমহুর বিদ্বানের মতে, মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ করা বৈধ। তবে এর চেয়ে পা ধৌত করার উত্তম। আর হাম্বলী মাযহারের মতে, এ ব্যাপারে অবকাশ থাকার কারণে মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ করা উত্তম।[7]

বিশুদ্ধ অভিমত: প্রত্যেক ব্যক্তির পায়ের অবস্থা অনুযায়ী উত্তম হওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হবে। সুতরাং যে মোজা পরিধান করবে সে তার উপর মাসাহ করবে এবং মোজা খুলবে না। এতে মহানাবী (ﷺ) ও সাহাবাদের অনুসরণ করা হবে। আর যে ব্যক্তির পা খোলা থাকবে তার জন্য পা ধৌত করা উত্তম। আর পা খোলা থাকলে তাতে মোজা পরিধান করে তার উপর মাসাহ করার প্রয়াস চালাবে না[8] এবং মোজা পরে থাকলে, সময়ের মধ্যে তা খুলে পা ধৌত করারও প্রয়াস চালাবে না। আল্লাহ্‌ ভাল জানেন।

মোজাদ্বয়ের উপর মাসাহ করার সময়সীমা:

ইসলামী শরীয়াত মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিন রাত ও মুকীমের জন্য একদিন একরাত মোজার উপর মাসাহ করার সময় সীমা নির্ধারণ করেছে। এটা জমহুর বিদ্বান তথা হানাফী, হাম্বলী মাযহাবের অভিমত। নতুন অভিমত অনুযায়ী এটা ইমাম শাফেঈ এর প্রকাশ্য অভিমত। জাহেরী মাযহাবও এ অভিমত পেশ করেছেন।[9] এর প্রমাণ নিমণরূপ:

عَنْ عَلِيٍّ ؓ قَالَ:্রجَعَلَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِلْمُسَافِرِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيَهُنَّ، وَيَوْمًا وَلَيْلَةً لِلْمُقِيمِ - يَعْنِي فِي الْمَسْحِ

(১) আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) মুসাফিরের জন্য তিন দিন-তিন রাত এবং মুকীমের জন্য এক দিন ও এক রাত মোজার উপর মাসাহ করার অনুমতি দিয়েছেন।[10]

عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ الْأَشْجَعِيِّ، " أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَمَرَ بِالْمَسْحِ عَلَى الْخُفَّيْنِ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ: ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ لِلْمُسَافِرِ وَلَيَالِيهِنَّ ، وَلِلْمُقِيمِ يَوْمٌ وَلَيْلَةٌ "

(২) আওফ বিন মালিক আল আশয়ারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (ﷺ) তাবুক যুদ্ধের দিন মুসাফিরের জন্য তিন দিন-তিন রাত এবং মুকীমের জন্য এক দিন ও এক রাত মোজার উপর মাসাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।[11]

(৩) সফওয়ান বিন আস্সাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:

كَانَ يَأْمُرُنَا إِذَا كُنَّا سَفَرًا أَوْ مُسَافِرِينَ أَنْ لَا نَنْزِعَ خِفَافَنَا ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ وَلَيَالِيهِنَّ، إِلَّا مِنْ جَنَابَةٍ، وَلَكِنْ مِنْ غَائِطٍ وَبَوْلٍ وَنَوْمٍ

অর্থাৎ: আমরা যখন সফরে থাকতাম, তখন রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে জানাবাতের অপবিত্রতা ছাড়া তিনদিন ও তিন রাত আমাদের মোজা না খুলতে নির্দেশ দিতেন। তবে পেশাব-পায়খানা ও ঘুমের কারণে কোন সমস্যা হতো না।[12]

এ ক্ষেত্রে ইমাম মালিক (রাহি.) এর বিপরীত মত প্রকাশ করেছেন। আর এটা ইমাম শাফেঈর (রাহি.) পুরাতন অভিমত। তাদের মতে মোজার উপর মাসাহ করার কোন সময়সীমা নেই। বরং যতক্ষণ পর্যন্ত মোজা খোলা না হবে ও জুনুবী না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মোজার উপর মাসাহ করা যাবে। এটা লাইস (রাহি.) এরও অভিমত।[13] তারা কিছু যঈফ হাদীস দ্বারা দলীল দিয়ে থাকেন, তন্মধ্যে-

عَنْ أُبَيِّ بْنِ عِمَارَةَ، قَالَ يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ: وَكَانَ قَدْ صَلَّى مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْقِبْلَتَيْنِ، أَنَّهُ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَمْسَحُ عَلَى الْخُفَّيْنِ؟ قَالَ:্نَعَمْ ، قَالَ: يَوْمًا؟ قَالَ:্يَوْمًا ، قَالَ: وَيَوْمَيْنِ؟ قَالَ:্وَيَوْمَيْنِ ، قَالَ: وَثَلَاثَةً؟ قَالَ:্نَعَمْ وَمَا شِئْتَ

(১) অর্থাৎ, উবাই ইব্ন ইমারা (রা.) হতে বর্ণিত। ইয়াহ্ইয়া ইবন আইঊব বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে উভয় কিবলার দিকে মুখ করে সালাত পড়েছিলেন। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলালস্নাহ। আমি কি মোজার উপর মাসাহ করব? তিনি বলেন: হ্যাঁ। রাবী তাঁকে এক, দুই ও তিন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে- তিনি বলেন: তুমি যত দিনের জন্য ইচ্ছা কর। অপর এক বর্ণনায় আছে: তিনি প্রশ্ন করতে করতে সাত দিন পর্যন্ত পৌঁছান। জবাবে রাসূল (ﷺ) বলেন, হ্যাঁ যত দিন তুমি প্রয়োজন বোধ কর।[14]

(২) খুযাইমা ইবন সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি (ﷺ) বলেন: মোজার উপর মাসাহ করার নির্ধারিত সময়সীমা হল তিন দিন। আমরা যদি তাঁর নিকট অধিক সময়সীমা প্রার্থনা করতাম, তবে তিনি আমাদের জন্য অধিক সময় অনুমোদন করতেন।[15] অর্থাৎ, এর দ্বারা মুসাফিরের জন্য দু‘মোজার উপর মাসাহ করা বুঝানো হয়েছে। এ হাদীসটি যদিও সহীহ হয় তবুও এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না। কেননা এটা সাহাবীর একটি ধারণা মাত্র। এর দ্বারা ইবাদাত করা যেতে পারে না।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ :্র إِذَا تَوَضَّأَ أَحَدُكُمْ وَلَبِسَ خُفَّيْهِ فَلْيُصَلِّ فِيهِمَا وَلْيَمْسَحْ عَلَيْهِمَا ، ثُمَّ لاَ يَخْلَعْهُمَا إِنْ شَاءَ إِلاَّ مِنْ جَنَابَةٍ

(৩) আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত; রাসূল (ﷺ) বলেন, তোমাদের কেউ যদি ওযূ করে মোজা পরিধান করে অতঃপর তা পরিধান করে সালাত আদায় করে, তাহলে পরে যদি সে চায় তবে মোজা না খুলে মোজার উপর মাসাহ করলেই চলবে। তবে জানাবাতের নাপাকীর কারণে মাসাহ বৈধ হবে না।[16]

উল্লেখিত সব হাদীসগুলোই যঈফ। এগুলো দলীল যোগ্য নয়।

(৪) عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ الْجُهَنِىِّ قَالَ : خَرَجْتُ مِنَ الشَّامِ إِلَى الْمَدِينَةِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ، فَدَخَلْتُ عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فَقَالَ لِى : مَتَى أَوْلَجْتَ خُفَّيْكَ فِى رِجْلَيْكَ؟ قُلْتُ : يَوْمَ الْجُمُعَةِ. قَالَ : فَهَلْ نَزَعْتَهُمَا؟ قُلْتُ : لاَ. قَالَ : أَصَبْتَ السُّنَّةَ.

(৪) আলকামা বিন আমের আল জুহানী এর আসারে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একদা আমি শাম থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমি শাম থেকে বের হয়ে ছিলাম জুম‘আর দিন এবং মদিনায় পৌঁছেছিলাম তার পরবর্তী জুম‘আর দিন। অতঃপর আমি উমার বিন খাত্তাবের কাছে গেলে তিনি আমাকে বলেন, তুমি কখন তোমার পায়ে মোজা পরিধান করেছ? তখন আমি উত্তরে বললাম, জুম‘আর দিন। তখন তিনি বললেন তুমি কি মোজাদ্বয়কে আর খুলেছিলে? আমি বলালম না, তখন তিনি বললেন তুমি ঠিক করেছ।[17] অনুরূপভাবে এ বর্ণনাটিও যঈফ।

বাইহাক্বী বলেন, আমাদের কাছে উমার (রাঃ) থেকে সময়-সীমার কথা বর্ণিত হয়েছে। হয়ত তিনি রাসূল (ﷺ) এর থেকে হাদীস পাওয়ার কারণে এ মতের( সময়-সীমার) দিকে প্রত্যাবর্তন করেছেন অথবা তার মতামতটি প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস অনুযায়ী হওয়াটাই উত্তম।

এজন্য ইবনে হাযম (রাহি.) ‘‘মুহালস্না’’ গন্থে (২/৯৩পৃ) বলেন, ‘‘শুধু ইবনে উমার ছাড়া সাহাবাদের পক্ষ থেকে আর কেউ সময় নির্ধারণের ব্যাপারে কোন মতানৈক্য করেননি’’।

মোজার উপর মাসাহ করার সময় সীমার সূচনা:

শরীয়াত কর্তৃক এটা নির্ধারিত যে, মুকীম হলে তার মাসাহ করার সময়সীমা একদিন একরাত এবং মুসাফির হলে তিনদিন তিনরাত। কিন্তু কখন থেকে এ সময়ের গণনা শুরু হবে? বিদ্বানদের মাঝে এ ব্যাপারে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়-

১ম: মোজা পরিধানের পর প্রথম হাদস (ওযূ ভঙ্গ) থেকে এ সময়ের সূচনা হবে:

এটা সুফয়ান সাওরী, শাফেঈ, আবূ হানীফা ও তার অনুসারী এবং হাম্বলী মাযহারের প্রকাশ্য অভিমত।[18] তারা বলেন, কেননা মাসাহ এর ক্ষেত্রে যেমন দূরুত্ব নির্ধরণ করা হয় তেমনি প্রথম হাদীসের পরের সময় থেকেই মোজার উপর মাসাহ করা বৈধ হয়।

২য়: মোজা পরিধান করার পর থেকেই এ সময়ের সূচনা হবে: এটা হাসান বুখারী (রাহি.) এর অভিমত।[19]

৩য়: মুকীম হলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সমপরিমাণ মাসাহ করবে। আর মুসাফির হলে ১৫ ওয়াক্ত সালাত সমপরিমাণ সময় মাসাহ করবে। এর বেশি সময় মাসাহ করবে নাঃ এটা ইমাম শাফেঈ, ইসহাক ও আবূ সাওরসহ অন্যান্যদের অভিমত।[20]

৪র্থ: হাদাসের (ওযূ ভঙ্গের) পরেই যখন তার জন্য মাসাহ করা বৈধ হবে তখন থেকেই এ সময় সূচনা হবে। চায় সে মাসাহ করুক বা ওযূ ও মাসাহ না করুকঃ এমনকি যদি মাসাহ বৈধ হওয়ার পর কিছু সময় অতিক্রম করার পর মাসাহ করে, তাহলে শুধু বাকি সময় মাসাহ করতে পারবে। এটা ইবনে হাযম (রাহি.) এর অভিমত। তিনি অনেক মাযহাবের কথা তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে দেখে নিন![21]

৫ম: হাদাসের (ওযূ ভঙ্গের) পরে যখন প্রথম মাসাহ করা হবে তখন থেকে এ সময়ের সূচনা হবে:[22] এটা আহমাদ ইবনে হাম্বল ও আওযায়ী (রাহি.) এর অভিমত। ইমাম নববী, ইবনে মুনযির ও ইবনে ওসাইমীন (রাহি.) এ অভিমতকে পছন্দ করেছেন। এটাই প্রাধান্য প্রাপ্ত অভিমত। যেহেতু মহানাবী (ﷺ) প্রকাশ্য ভাবেই বলে দিয়েছেন- ‘‘মুসাফির মাসাহ করবে’’ ও ‘‘মুকীম মাসাহ করবে’’। আর মাসাহ করা কার্যটি সম্পূর্ণ না করা পর্যন্ত কাউকে মাসাহকারী বলা সম্ভব নয়। সুতরাং দলীল ছাড়া প্রকাশ্য অর্থ ব্যতীত অন্য কোন অর্থ গ্রহণ করা বৈধ হবে না। আল্লাহ্‌ ভাল জানেন।

এর উপর ভিত্তি করে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোন ব্যক্তি যদি যূহরের সালাতের সময় ওযূ করে এবং ১২ টার সময় মোজা পরিধান করে আসরের সময় তথা ৩টা পর্যন্ত পবিত্র অবস্থায় থাকে। এরপর ওযূ ভঙ্গ হয়ে যায়, এবং আসরের পর বিকাল ৪ টার সময় ওযূ করে মোজার উপর মাসাহ করে। তাহলে সে যদি মুকীম হয়, তবে পরবর্তী দিন আসরের সময় বিকাল ৪টা পর্যন্ত মাসাহ করতে পারবে। আর মুসাফির হলে ৪র্থ দিন ঐ সময় পর্যন্ত মাসাহ করতে পারবে।

[1] নাসলুল আওতার (১/২৪১)।

[2] আল-কামুসুল মুহীত্ব, মাকাবয়িসুল লুগাহ্।

[3] আদ-দুররুল মুখতার (১/১৭৪)।

[4] আল-ইজমা’ (২০) ইবনে মুনযির প্রণীত। আল-আওসাত্বব (১/৪৩৪)।

[5] আল-আওসাত্বব (১/৪৩৪), সুনানুল বাইহাক্বী (১/২৭২), আল-ফাতহ্ (১/৩০৫)।

[6] সহীহ; বুখারী (৩৮৭), মুসলিম (১৫৬৮) তবে শব্দগুলো মুসলিমের।

[7] ফাতহুল কাদীর (১/১২৬), শারহুস সগীর (১/২২৭), আল-মাজমূ’ (১/৫০২) মুনতাহাল ইরাদাত (১/২৩)।

[8] এটা শাইখুল ইসলামের মতামত, যা এসেছে আল-ইখতিয়ারাত গ্রন্থে (১৩ পৃ.)।

[9] আল-মাসবূত্ব (১/৯৮), আল-উম্ম (১/৩৪), আল-মুগনী (১/২০৯), আল-মুহালস্না (২/৮০)।

[10] সহীহ; মুসলিম (২৭৬), নাসাঈ (১/৮৪)।

[11] সহীহ; আহমাদ (৬/২৭), সহীহ সনদে, আবু বাকরাহর হাদীসটি এর শাহেদ, ইবনে মাজাহ (৫৫৬), প্রভৃতি।

[12] হাসান; কিছু পূর্বে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে।

[13] আল-মাদূনাহ (১/৪১), বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/২৪)।

[14] যঈফ; আবূ দাউদ (১৫৮) ইবনু আব্দিল বার বলেন, এ হাদীসটি প্রমাণিত নয় এবং এর নির্ভরযোগ্য সূত্রও নেই।

[15] যঈফ; আবূ দাউদ (১৫৭), তিরমিযী, ইবনে মাজাহ (৫৫৩)।

[16] যঈফ, বাইহাক্বী (১/২৮০)।

[17] যইফ, বাইহাক্বী (১/২৮০), ত্বাহাবী (১/৪৮), আদ-দারাকুতনী (৭২)।

[18] আল-মাসবূত্ব (১/৯৯), আল-মাজমু (১/৪৭০), আল-মুগনী (১/২৯১) আল-আওসাত্বব (১/৪৪৩)।

[19] ‘আল-ইকলিল শারহু মানারিস সাবিল’, শাইখ ওয়াহিদ আবদুস সালাম প্রণীত (১/১৩৬) আলস্নাহ তাঁকে এর দ্বারা উপকৃত করুন।

[20] আল-মুগনী (১/২৯১), আল-মাজমু (১/৪৪৬), আল-আওসাত্বব (১/৪৪৪)।

[21] আল-মুহালস্না (২/৯৫-পরবর্তী অংশ), ইবনু হাযম প্রণীত।

[22] মাসাইলু আহমাদ (১০) আবূ দাউদ প্রণীত। আল-মুহালস্না (২/৯৫)।
 
Similar content Most view View more
Back
Top