জয়নব বিনতে মুহাম্মদ (রা.)
জন্ম: ২৩ হিজরি পূর্ব (সম্ভাব্য ৬০০ খ্রিস্টাব্দ), মক্কা মুকাররমা।
মৃত্যু: ৮ হিজরি (৬২৯ খ্রিস্টাব্দ)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর।
মৃত্যুস্থান: মদিনা মুনাওয়ারা।
দাফন: আল বাকি, মদিনা মুনাওয়ারা।
উপাধি: সাহাবাতুল কিলাদাহ (মালা পরিহিতা/মালার মালিক)।
ধর্ম: ইসলাম।
পিতা: হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
মাতা: হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)।
স্বামী: আবুল আস বিন আল-রাবি (রা.)।
সন্তানাদি: আলী বিন আবুল আস (শৈশবেই ইন্তেকাল করেন)। উমামাহ বিনতে আবুল আস।
ভাই-বোন: কাসিম, আব্দুল্লাহ, ইব্রাহিম, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম এবং ফাতিমা (রা.)।
ইতিহাস: ইসলামের ইতিহাসে তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে।
মর্যাদা: তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অগ্রবর্তী সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত।
বিস্তারিত জীবনিঃ
জয়নব বিনতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব আল-কুরাশী আল-হাশেমী; তিনি ছিলেন সৃষ্টির সেরা মানব হযরত মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সন্তানদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম কন্যা। তবে তাঁর এবং তাঁর ভাই কাসিমের মধ্যে কে বড় ছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।
জন্ম: নবুয়ত প্রাপ্তির ১০ বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ: তিনি ইসলামের আগমন প্রত্যক্ষ করেন এবং ঈমান এনে মদিনায় হিজরত করেন। পরিবার: তাঁর স্বামী ছিলেন তাঁর খালাতো ভাই আবুল আস বিন আল-রাবি বিন আব্দুল উযযা। ইন্তেকাল: তিনি হিজরি ৮ম সনে মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩০ বছর। (শাহাবুদ্দিন আল-কস্তালানী, মাউয়াহিবুল লাদুন্নিয়া- খন্ড:১/৪৭৯পৃ., মাকতাবাতুশ শামেলা)।
তাঁর জীবনকাল, জন্ম ও বিবাহ:
জয়নব (রা.) নবুয়ত প্রাপ্তির ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২৩ হিজরি পূর্ব (৬০০ খ্রিস্টাব্দে) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর বয়স ছিল ত্রিশ বছর। তাঁর বিবাহ হয় তাঁর খালা হালা বিনতে খুয়াইলিদের ছেলে আবুল আস বিন আল-রাবি-এর সাথে। মূলত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.) নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর কাছে জয়নবকে তাঁর সাথে বিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন; কারণ তিনি আবুল আসকে নিজের সন্তানের মতোই মনে করতেন। এই বিবাহ নবীজির নবুয়ত প্রাপ্তির আগেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং তখন জয়নবের বয়স ছিল দশ বছরেরও কম।
উল্লেখ, আবুল আস ছিলেন ধনে, ব্যাবসা-বানিজ্যে ও বিশ্বস্ততায় মক্কার গন্যমান্য ব্যাক্তি, বর্ণিত হয়েছে যে- রাসূল ﷺ তার এ জামাতার প্রসংশা করতেন। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)।
ইসলাম গ্রহণ ও কঠিন সময়:
যখন নবী মুহাম্মদ ﷺ নবুয়ত লাভ করেন, তখন জয়নব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁর পৈতৃক ধর্মেই থেকে যান। কুরাইশরা আবুল আসকে চাপ দিতে থাকে যেন তিনি জয়নবকে তালাক দিয়ে দেন, এবং এর বিনিময়ে কুরাইশের যেকো নারীর সাথে বিবাহের অফার দেয়া হয়। কিন্তু তিনি তাদের উত্তরে বলতেন, না, আল্লাহর কসম! আমি আমার সঙ্গিনীকে ছেড়ে দেব না। আর আমার স্ত্রীর বদলে কুরাইশদের কোনো নারীকেই আমি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পছন্দ করি না। ফলে জয়নব (রা.) তাঁর স্বামীর সাথেই থেকে যান, যদিও তখন তাঁদের ধর্ম ভিন্ন ছিল। কারণ রাসূল ﷺ সে সময় চতুর্মুখী শত্রুতায় এমন একটা পরিস্থিতিতে ছিলেন যে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম ছিলেননা। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)।
সন্তানাদি:
জয়নব (রা.) এবং আবুল আসের সংসারে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পুত্র: তাঁর নাম ছিল আলী, যিনি শৈশবেই মারা যান।
কন্যা: তাঁর নাম ছিল উমামাহ। ফাতেমা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর আলী বিন আবি তালিব (রা.) উমামাহকে বিয়ে করেন। (আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ আস সুহাইলি, রওদ্বতুল আনফ ফি শরহিস সিরাতুন নবাবিয়্যাহ- খন্ড:৫/১২৭-১২৮পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।) (শামসুদ্দিন আয-যাহবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা- খন্ড:২/২৪৬পৃ., তাহক্কীক: শোয়াইব আরনাউত্ব, প্রকাশনি: মুয়াসাসাতুর রিসালাহ, লেবানন।) (মাজমাউয যাওয়ায়েদ- খন্ড:৯/২১২পৃ., আসদুল গাবাহ- খন্ড:৭/১৩০পৃ., মাকতাবাতুশ শামেলা)। পরবর্তীতে আলী (রা.)-এর মৃত্যুর পর মুগিরা বিন নওফেল তাঁকে বিয়ে করেন। এই উমামাহ-ই সেই শিশু, যাকে নিয়ে নবী মুহাম্মদ ﷺ ফজর নামাজে কাঁধে চড়িয়েছিলেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। (সহিহ, বূখারী-৫১৬, কিতাবুস সলাত, মুসলিম-৫৪৩, কিতাবু ফিল মাসজিদ, মাকতাবাতুশ শামেলা, হাদিসটা বর্ণনা করেন আবু কাতাদাহ রা.)
আবূ কাতাদাহ্ আনসারী (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي وَهُوَ حَامِلٌ أُمَامَةَ بِنْتَ زَيْنَبَ بِنْتِ رَسُولِ اللهِ وَلِأَبِي الْعَاصِ بْنِ رَبِيعَةَ بْنِ عَبْدِ شَمْسٍ فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا وَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে যয়নবের গর্ভজাত ও আবুল আস ইবনু রাবী‘আহ ইবনু ‘আবদ শামস (রা)-এর ঔরসজাত কন্যা উমামাহ (রাযি.)-কে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায় করতেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন তখন তাকে রেখে দিতেন আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে তুলে নিতেন। (৫৯৯৬; মুসলিম ৫/৯, হাঃ ৫৪৩, আহমাদ ২২৬৪২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৯২)।
স্বামীর বন্দিদশা ও মুক্তি:
নবী মুহাম্মদ ﷺ মদিনায় হিজরত করার পর, ২ হিজরিতে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে আবুল আস কুরাইশদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী জয়নব (রা.) মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধ শেষে মুসলমানরা বিজয় লাভ করলে আবুল আস বন্দি হিসেবে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়েন। খিরাশ বিন আস-সিম্মাহ নামক এক সাহাবী তাঁকে বন্দি করেছিলেন।
এরপর মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দিদের মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ পাঠাতে শুরু করল, তখন জয়নব (রা.) তাঁর স্বামী আবুল আসের মুক্তির জন্য একটি হার বা মালা পাঠিয়েছিলেন। এই মালাটি ছিল তাঁর মা খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-এর, যা তিনি জয়নবের বিয়ের সময় তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। আর নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতিবিজড়িত সেই মালাটি দেখে নবী মুহাম্মদ ﷺ অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন: তোমরা যদি উপযুক্ত মনে করো, তবে জয়নবের বন্দিকে (আবুল আস) মুক্তি দিয়ে দাও এবং তাঁর পাঠানো সম্পদ (মালাটি) তাঁকে ফিরিয়ে দাও।
সাহাবায়ে কেরাম সানন্দে আবুল আসকে মুক্তি দেন এবং মালাটি ফিরিয়ে দেন। তবে নবী মুহাম্মদ ﷺ আবুল আসের মুক্তির বিনিময়ে একটি শর্ত দিয়েছিলেন যে, মক্কায় ফিরে গিয়ে তিনি জয়নবকে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেবেন এবং তাঁর পথ সুগম করে দেবেন। আবুল আস তাঁর সেই কথা রক্ষা করেছিলেন। (ইবনে কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া- খন্ড:৩/৩৮০পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।) (আবু নুয়াইম আল-আসবাহানি, মাআরিফাতুস সাহাবা- খন্ড:৬/৩১৯৪পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।)
ইবনে সাদ এটি তার 'ত্বাবাকাত' গ্রন্থে (৮/৩১) ওয়াকিদির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকেম এটি (৪/৪৪-৪৫) ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে আব্বাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর তার পিতা থেকে এবং তিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন- "যখন মক্কাবাসী তাদের বন্দীদের মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ পাঠাল, তখন আল্লাহর রাসূলের কন্যা জয়নব (রা.) তার স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণ হিসেবে একটি হার পাঠালেন। হারটি ছিল (তার মা) খাদিজা (রা.)-এর; জয়নবের বিয়ের সময় তিনি এটি তাকে দিয়েছিলেন। যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হারটি দেখলেন, তখন তার মনে অত্যন্ত মায়া ও কোমলতা সৃষ্টি হলো। তিনি (সাহাবীদের উদ্দেশ্যে) বললেন: "তোমরা যদি মনে করো তবে তার বন্দীকে (আবুল আস) মুক্তি দিতে পারো এবং তার সম্পদ (হারটি) তাকে ফিরিয়ে দিতে পারো।"
ইমাম হাকেম এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন। বিষয়টি তেমনই (অর্থাৎ হাদীসটি সহীহ), কারণ ইবনে ইসহাক এখানে স্পষ্টভাবে হাদীস শ্রবণের কথা (আনআনাহ না করে সরাসরি বর্ণনা) উল্লেখ করেছেন।
মদিনায় হিজরত, যাত্রার প্রস্তুতি ও বাধা:
স্বামী আবুল আস মুক্তি পেয়ে মক্কায় ফেরার পর, নবীজির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি জয়নব (রা.)-কে মদিনায় তাঁর পিতার কাছে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। জয়নব (রা.) হিজরতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এ সময় হিন্দ বিনতে উতবা তাঁকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও জয়নব (রা.) ভয়ের কারণে তা অস্বীকার করেন এবং নিজের প্রস্তুতির কথা গোপন রাখেন। প্রস্তুতি শেষ হলে, তাঁর দেবর কিনানা বিন আল-রাবি একটি উটের পিঠে পালকি বসিয়ে তাঁকে নিয়ে রওনা হন। কিনানা নিজের ধনুক হাতে দিনের আলোতেই জয়নবকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিনানা উঠের রশি টেনে আগে আগে চলছিলো। আর এদিকে কুরাইশরা খবর পেয়ে তাঁদের পিছু নেয়। এবং যু-তুয়া নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলে। এরপর সবার আগে তাঁদের কাছে পৌঁছায় হুব্বার বিন আল-আসওয়াদ এবং নাফি বিন আব্দুল কায়েস নামের দুই ব্যক্তি। হাব্বার তাঁর বল্লম দিয়ে জয়নবকে ভয় দেখান। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, জয়নব (রা.) তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং প্রচণ্ড ভয়ে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়।
তখন তাঁর দেবর কিনানা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এবং তুণীর হতে তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করল। এরপর বলল: আল্লাহর কসম! আমার কাছে যে-ই আসবে, আমি তাকে আমার তীরের নিশানা বানাব। এ অবস্থা দেখে সবাই তার থেকে পিছিয়ে গেল। আবূ সুফইয়ান একদল কুরায়শসহ তার সামনে এসে বলল: ওহে! তুমি আমাদের থেকে তোমার তীর সংযত কর। আমরা তোমার সাথে কথা বলি। কিনানা সংযত হল। তখন আবু সুফইয়ান আরও কাছে এসে তার সামনে দাঁড়াল এবং বলল: তুমি কিন্তু কাজটি ঠিক করনি। তুমি প্রকাশ্য দিবালোকে এ মহিলাকে নিয়ে সকলের সামনে দিয়ে বের হলে, অথচ তুমি জান, আমরা কি মুসীবত ও বিপাকে আছি; মুহাম্মদের কারণে আমাদের মাঝে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে! তুমি যেভাবে প্রকাশ্যে সকলের চোখের সামনে তার মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে এলে, তাতে লোকে ভাববে, বদরে আমাদের যে সর্বনাশ ঘটে গেল, তদ্দরুন আমরা নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়েছি। আমাদের চরম দুর্বলতা ও পর্যুদস্ত, হওয়ার কারণেই তুমি এমনটি করতে পেরেছ। আমার জীবনের কসম! তার বাপ থেকে তাকে আটকে রাখার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। এভাবে প্রতিশোধ গ্রহণেরও কোন ইচ্ছা আমাদের নেই।
এরপর আবু সুফিয়ান কিনানার সাথে আলোচনা করেন যে, জয়নবকে এখন মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং পরে রাতের আঁধারে গোপনে মদিনায় পাঠাতে হবে, যাতে মক্কাবাসীরা একে তাদের দুর্বলতা মনে করে সমালোচনা করতে না পারে। কিনানা সেই অনুযায়ী কাজ করেন এবং মক্কায় ফিরিয়ে আনেন, পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কোনো এক রাতে তাঁকে জায়েদ বিন হারিসা ও অন্য এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন, যাঁদেরকে নবী মুহাম্মদ ﷺ বদর যুদ্ধের এক মাস পর জয়নবকে নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
ব্যাক্তিদ্বয়ের নিক জয়নাবকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় দেবর কেনানা বলেছিলো: "আমি হুবার ও তার গোত্রের দুর্বৃত্তদের আচরণে বিস্মিত হয়ে যাই যে, তারা চায় আমি মুহাম্মদ (সা)-তনয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি!
যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন আমি তাদের সংখ্যাধিক্যের কোন পরওয়া করব না। আর যতক্ষণ আমার হাত হিন্দুস্তানের তৈরি সুতীক্ষ্ণ তরবারি দৃঢ়ভাবে ধরে থাকবে, ততক্ষণ আমি তাদের কোন তোয়াক্কা করব না।" (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ:
জয়নবের ওপর এই অমানবিক আচরণের খবর পেয়ে নবী মুহাম্মদ ﷺ পরবর্তীতে হাব্বার ও নাফিকে ধরার জন্য একটি বিশেষ বাহিনী পাঠান। প্রথমে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন: যদি তোমরা হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ এবং তাঁর সঙ্গীকে (বলা হয়েছে তার নাম নাফি) পাও, তবে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দিও।
কিন্তু পরদিন তিনি তাঁর নির্দেশ সংশোধন করে বলেন: আমি তোমাদের এই দুজনকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি অনুধাবন করলাম যে, আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তাই যদি তোমরা তাদের পাকড়াও করতে পারো, তবে তাদের হত্যা করো। এর সনদ শক্তিশালী; কারণ ইবনে লাহিয়াহ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন ইবনুল মুবারক। আর ইবনুল মুবারক তাঁর (ইবনে লাহিয়াহর) কিতাব পুড়ে যাওয়ার আগেই তাঁর থেকে হাদিস শুনেছিলেন। হাফেজ (ইবনে হাজার) 'আল-ইসাবাহ' (১০/২৩৩) গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন এবং একে মুহাম্মদ বিন উসমান বিন আবি শায়বার তারিখ গ্রন্থের দিকে নিসবত করেছেন।
ইবনে ইসহাক এটি 'আল-মাগাজি'তে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে হিশাম (১/৬৫৭) তাঁর থেকে এটি নকল করেছেন। তিনি বলেন: ইয়াজিদ বিন আবি হাবিব আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বুকাইর বিন আশাজ থেকে, তিনি সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবু ইসহাক আদ-দাউসি থেকে, আর তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তবে আবু ইসহাক আদ-দাউসি একজন মাজহুল বা অপরিচিত রাবী।
ইমাম বুখারি (৬/১০৪) জিহাদ অধ্যায়ে 'আল্লাহর আজাব দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না' পরিচ্ছেদে এটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তিরমিজি (১৫৭১) সিয়ার অধ্যায়ে কুতাইবা থেকে, তিনি লাইস থেকে, তিনি বুকাইর থেকে, তিনি সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন-
بَعَثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي بَعْثٍ فَقَالَ " إِنْ وَجَدْتُمْ فُلاَنًا وَفُلاَنًا لِرَجُلَيْنِ مِنْ قُرَيْشٍ فَأَحْرِقُوهُمَا بِالنَّارِ " . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حِينَ أَرَدْنَا الْخُرُوجَ " إِنِّي كُنْتُ أَمَرْتُكُمْ أَنْ تَحْرِقُوا فُلاَنًا وَفُلاَنًا بِالنَّارِ وَإِنَّ النَّارَ لاَ يُعَذِّبُ بِهَا إِلاَّ اللَّهُ فَإِنْ وَجَدْتُمُوهُمَا فَاقْتُلُوه
আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি যুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি বলে দেন, তোমরা কুরাইশ বংশের অমুক অমুক লোকের নাগাল পেলে তাদের দু’জনকেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। যখন আমরা যাত্রা শুরু করলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেনঃ আমি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, অমুক অমুক লোককে -তোমরা আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কেউ নয়। অতএব তোমরা অমুক ও অমুকের নাগাল পেলে তবে তাদের দু’জনকেই মেরে ফেলবে।
আরও দেখুন: সিরাতে ইবনে হিশাম (১/৬৫৪), আল-মুস্তাদরাক (৪/৪৩), মাজমাউয যাওয়াইদ (৯/২১২, ২১৩) এবং ইমাম বুখারির আত-তারিখ আস-সাগীর (১/৭, ৮)।
হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ সংক্রান্ত আলোচনা:
আর হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ সম্পর্কে তথ্য হলো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সুনানে সাঈদ বিন মানসুরে ইবনে উইয়াইনা থেকে, তিনি ইবনে নাজিহ থেকে বর্ণনা করেন যে... সেই বাহিনী তাঁকে পায়নি (পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য), বরং তিনি ইসলামের সন্ধান পান এবং হিজরত করেন। এরপর তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। হাফেজ (ইবনে হাজার) 'আল-ফাতহ' গ্রন্থে (৬/১০৫) বলেন: তাবারানি ও ইবনে মানদাহর কিতাবে তাঁর একটি হাদিস আছে। ইমাম বুখারি তাঁর তারিখ গ্রন্থে সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে তাঁর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যা হজ পালনের সময় ওমর (রা.)-এর সাথে তাঁর একটি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। হাব্বার মুয়াবিয়া (রা.)-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
আরও দেখুন: আল-ইসাবাহ (১০/২৩৫, ২৩৬)।
হাফেজ আরও বলেন: হাব্বার বিন আসওয়াদের সেই সঙ্গীর (যাকে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল) ব্যাপারে সাহাবীদের তালিকায় কোনো উল্লেখ আমি পাইনি; সম্ভবত তিনি ইসলাম গ্রহণের আগেই মারা গেছেন।
স্বামীর ইসলাম গ্রহণ, আশ্রয় প্রার্থনা ও নিরাপত্তা দান:
জয়নব (রা.) মদিনায় চলে যাওয়ার পর আবুল আস মক্কাতেই থেকে যান। মক্কা বিজয়ের কিছুদিন আগে ৮ হিজরিতে তিনি কুরাইশদের পণ্য নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফরে যান। ফেরার পথে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর একটি সেনাদল তাঁর পথরোধ করে এবং তাঁর সাথে থাকা সমস্ত মালামাল নিয়ে নেয়। এরপর আবুল আস রাতের আঁধারে গোপনে মদিনায় প্রবেশ করেন এবং জয়নব (রা.)-এর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরদিন ভোরে সাহাবীগণ যখন ফজরের নামাজ পড়ছিলেন, তখন জয়নব (রা.) উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন: হে লোকসকল! আমি আবুল আস বিন আল-রাবিকে নিরাপত্তা (আশ্রয়) দান করেছি। নামাজ শেষে নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেন: হে জনগণ! "আমি যে কথা শুনেছি, তা কি তোমরাও শুনেছ?” সবাই বললেন: হ্যাঁ, শুনেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: "আল্লাহর কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, এ ঘোষণা শুনবার আগে আমি কিছুই জানতাম না। চুক্তি অনুসারে যে কোন ব্যক্তি, যে কোন মুসলমানের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।" ইবনে হিশাম তার 'সীরাত' গ্রন্থে (১/৬৫১, ৬৫৭), ইবনে সাদ (৮/৩২) ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইয়াজিদ ইবনে রুমান আমার কাছে বর্ণনা করেছেন... এবং ইমাম হাকেমও এটি বর্ণনা করেছেন (৪/৪৫)।
ইবনে ওয়াহাব থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে লাহীআহ থেকে, তিনি মুসা ইবনে জুবায়ের আল-আনসারী থেকে, তিনি ইমরান ইবনে মালিক আল-গিফারী থেকে, তিনি আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান থেকে, আর তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সহধর্মিণী উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে: "রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা যয়নব (রা.)-এর কাছে আবুল আস ইবনুর রবী' এই মর্মে সংবাদ পাঠালেন যে, 'তুমি তোমার পিতার কাছে আমার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করো।' তখন যয়নব (রা.) বের হলেন এবং নিজের কামরার দরজার আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে দিলেন। ওই সময় নবী কারীম ﷺ ফজরের নামাজে লোকদের ইমামতি করছিলেন। যয়নব (রা.) উচ্চস্বরে বললেন: 'হে লোকসকল! আমি আল্লাহর রাসূলের কন্যা যয়নব। আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দান করলাম।'
এরপর যখন নবী ﷺ নামাজ শেষ করলেন, তখন তিনি বললেন: 'হে লোকসকল! তোমাদের মতো আমিও এ ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানতাম না, যতক্ষণ না তোমরা তা শুনলে। জেনে রেখো, মুসলমানদের ক্ষুদ্রতম কোনো ব্যক্তিও যদি কাউকে আশ্রয় দেয়, তবে (পুরো জাতির পক্ষ থেকে) তা কার্যকর হবে।'
হাদীসের মান: এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যয়নবের কাছে গিয়ে বললেন: হে আমার প্রিয় কন্যা! আবুল আ'সকে সযত্নে রাখ। কিন্তু সে যেন নির্জনে তোমার কাছে না আসে। কেননা তুমি এখন তার জন্য হালাল নও।"
এরপর নবী মুহাম্মদ ﷺ যারা আবুল আসের মালপত্র নিয়েছিলেন, তাদের কাছে সেগুলো ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান। তাঁরা সানন্দে সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেন। আবুল আস তাঁর সমস্ত মালপত্র নিয়ে মক্কায় ফিরে যান এবং কুরাইশদের প্রাপ্য আমানত বুঝিয়ে দেন। এরপর তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং মদিনায় হিজরত করেন। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা), (আস সুহাইলি, রওদ্বতুল আনাফ ফি শরহিস সিরাতুন নবাবিয়্যাহ- খন্ড:৫/১২৭-১৩৬পৃ., প্রকাশনি: দারু ইহয়াউত তুরাছিল আরাবী, লেবানন, প্রথম সংস্করণ)।
আবুল আস মদিনায় পৌঁছানোর পর নবী মুহাম্মদ ﷺ তাঁর মেয়ে জয়নব (রা.)-কে প্রথম বিবাহের উপরে রেখেই পুনরায় তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেন। (ইবনে হিশাম (১/৬৫৮, ৬৫৯), আহমাদ (১৮৭৬, ২৩৬৯, ৩২৯০), ইবনে সাদ (৮/৩৩), আবু দাউদ (২২৪০), তিরমিজি (১১৪৩), ইবনে মাজাহ (২০০৯), আব্দুর রাজ্জাক (১২৬৪৪), দারা কুতনী (পৃষ্ঠা ৩৯৬) এবং হাকেম (৩/৬৩৮, ৬৩৯ ও ৪/৪৬) এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা সবাই ইবনে ইসহাক-এর সূত্রে, তিনি দাউদ বিন আল-হুসাইন থেকে, তিনি ইকরামা থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
رَدَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْنَتَهُ زَيْنَبَ عَلَى أَبِي الْعَاصِ بِالنِّكَاحِ الْأَوَّلِ، لَمْ يُحْدِثْ شَيْئًا، قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرٍو، فِي حَدِيثِهِ: بَعْدَ سِتِّ سِنِينَ، وَقَالَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ: بَعْدَ سَنَتَيْنِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা যাইনাবকে প্রথম বিবাহের ভিত্তিতেই আবুল ’আসের কাছে ফেরত দেন এবং নতুনভাবে কোনো মোহর ধার্য করেননি। বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ ইবনু আমর তার হাদীসে বলেন, ছয় বছর পর এবং হুসাইন ইবনু ’আলী বলেন, দুই বছর পর।
এই বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য এবং ইবনে ইসহাক স্পষ্টভাবে সরাসরি শোনার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে, দাউদ বিন আল-হুসাইন যখন ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, তখন তাতে কিছুটা দুর্বলতা বা সংশয় থাকে। কিন্তু এই হাদিসটির সমর্থনে আমির আশ-শাবি, কাতাদাহ এবং ইকরামা বিন খালিদ থেকে একাধিক বিশুদ্ধ 'মুরসাল' বর্ণনা রয়েছে।
এসব বর্ণনা ইবনে সাদ তাঁর 'তাবাকাত' (৮/৩২) গ্রন্থে, আব্দুর রাজ্জাক তাঁর 'মুসান্নাফ' (১২৬৪৭) গ্রন্থে এবং তহাবি 'শারহু মাআনিল আসার' (২/১৪৯) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এই শাওয়াহিদ বর্ণনাগুলোর মাধ্যমে হাদিসটি শক্তিশালী ও সহিহ হিসেবে গণ্য হয়। মুসনাদে আহমদ এর তাহক্কীকে আহমদ শাকের হাদিসটি সহিহ্ বলেছেন।)
কিছু বর্ণনা মতে, এটি নতুন বিয়ের চুক্তি ও মোহরানার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, আবার কারো মতে তা পূর্বের বিয়ের ভিত্তিতেই ছিল। (ইমাম আহমাদ (৬৯৩৮), তিরমিজি (১১৪২), ইবনে সাদ (৮/৩২), ইবনে মাজাহ (২০১০), দারা কুতনী (পৃষ্ঠা ৩৯৬) এবং বায়হাকি (৭/১৮৮) এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা সবাই হাজ্জাজ বিন আরতাহ-এর সূত্রে, তিনি আমর বিন শুয়াইব থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে এটি বর্ণনা করেছেন-
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَدَّ ابْنَتَهُ زَيْنَبَ عَلَى أَبِي الْعَاصِي بْنِ الرَّبِيعِ بِمَهْرٍ جَدِيدٍ وَنِكَاحٍ جَدِيدٍ .
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কন্যা যাইনাবকে পুনরায় মোহর নির্ধারণ করে এবং নতুন বিয়ের মাধ্যমে আবূল আস ইবনুর রাবীর নিকটে ফেরিয়ে দেন।
এই সনদটি দুর্বল; কারণ হাজ্জাজ বিন আরতাহ একজন মুদাল্লিস এবং তিনি এখানে সরাসরি শোনার কথা উল্লেখ না করে 'আন' শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম আহমাদ বলেন: 'এই হাদিসটি দুর্বল বা ভিত্তিহীন; হাজ্জাজ এটি আমর বিন শুয়াইব থেকে সরাসরি শোনেননি, বরং তিনি এটি মুহাম্মদ বিন উবাইদ আল-আরজামি থেকে শুনেছেন। আর আল-আরজামির বর্ণনা মূল্যহীন।' প্রকৃতপক্ষে সহিহ (বিশুদ্ধ) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সা.) তাঁদের পূর্বের বিবাহকেই বহাল রেখেছিলেন।)
ইন্তেকাল, মৃত্যু ও জানাজা:
জয়নব (রা.) নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই ৭ম বা ৮ম হিজরিতে (৬২৯ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২৯ বছর। তাঁকে গোসল করিয়েছিলেন উম্মে আয়মান (রা.), উম্মুল মুমিনীন সওদা বিনতে জামআ (রা.) এবং উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.)। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। কবরে দাফন করার সময় নবীজি স্বয়ং কবরে নামেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন জয়নবের স্বামী আবুল আস বিন আল-রাবি। জয়নব (রা.)-এর জানাজার জন্য একটি বিশেষ কফিন বা খাটিয়া (আচ্ছাদনসহ) তৈরি করা হয়েছিল এবং তিনিই ছিলেন প্রথম নারী যাঁর জন্য এমনটি করা হয়। (অধ্যাপক ড. গানিম হাশেম খুদাইর আস-সুলতানি; সহযোগী অধ্যাপক ড. সালিহ হাসান আশ-শামারি। বালাযুরীর 'আনসাবুল আশরাফ' গ্রন্থে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন (আলাইহিমাস সালাম)। জার্নাল অফ দ্য কলেজ অফ বেসিক এডুকেশন। খণ্ড: ১৬, সংখ্যা: ৬২, পৃষ্ঠা: ৩২৫–৩৬০।)
মৃত্যুর কারণ:
বর্ণিত আছে যে, মদিনায় হিজরতের সময় মক্কার কাফিরদের আক্রমণে তাঁর যে গর্ভপাত হয়েছিল, সেই আঘাত ও অসুস্থতাই ছিল তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ। সেই থেকে তিনি ক্রমাগত অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই অসুস্থতাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (ইবনে আব্দিল বার, আল ইস্তিয়াব ফি মাআরিফাতিল আসহাব- খন্ড:৪/১৮৫৪পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।)
তাঁকে নিয়ে লেখা গ্রন্থ:
উর্ফ আল-যারনাব ফি বায়ানি শানি আস-সায়্যিদা জয়নব (عُرْف الزرنب في بيان شان السيدة زينب); লেখক: তাজউদ্দীন আল-ইসফরাইনি। (কিং ফয়সাল সেন্টার থেকে প্রকাশিত, খাজানাতুত তুরাস- খন্ড:৪৩/৪১পৃ.)
জন্ম: ২৩ হিজরি পূর্ব (সম্ভাব্য ৬০০ খ্রিস্টাব্দ), মক্কা মুকাররমা।
মৃত্যু: ৮ হিজরি (৬২৯ খ্রিস্টাব্দ)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর।
মৃত্যুস্থান: মদিনা মুনাওয়ারা।
দাফন: আল বাকি, মদিনা মুনাওয়ারা।
উপাধি: সাহাবাতুল কিলাদাহ (মালা পরিহিতা/মালার মালিক)।
ধর্ম: ইসলাম।
পিতা: হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
মাতা: হযরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)।
স্বামী: আবুল আস বিন আল-রাবি (রা.)।
সন্তানাদি: আলী বিন আবুল আস (শৈশবেই ইন্তেকাল করেন)। উমামাহ বিনতে আবুল আস।
ভাই-বোন: কাসিম, আব্দুল্লাহ, ইব্রাহিম, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম এবং ফাতিমা (রা.)।
ইতিহাস: ইসলামের ইতিহাসে তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে।
মর্যাদা: তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অগ্রবর্তী সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত।
বিস্তারিত জীবনিঃ
জয়নব বিনতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব আল-কুরাশী আল-হাশেমী; তিনি ছিলেন সৃষ্টির সেরা মানব হযরত মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সন্তানদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম কন্যা। তবে তাঁর এবং তাঁর ভাই কাসিমের মধ্যে কে বড় ছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।
জন্ম: নবুয়ত প্রাপ্তির ১০ বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ: তিনি ইসলামের আগমন প্রত্যক্ষ করেন এবং ঈমান এনে মদিনায় হিজরত করেন। পরিবার: তাঁর স্বামী ছিলেন তাঁর খালাতো ভাই আবুল আস বিন আল-রাবি বিন আব্দুল উযযা। ইন্তেকাল: তিনি হিজরি ৮ম সনে মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩০ বছর। (শাহাবুদ্দিন আল-কস্তালানী, মাউয়াহিবুল লাদুন্নিয়া- খন্ড:১/৪৭৯পৃ., মাকতাবাতুশ শামেলা)।
তাঁর জীবনকাল, জন্ম ও বিবাহ:
জয়নব (রা.) নবুয়ত প্রাপ্তির ১০ বছর আগে অর্থাৎ ২৩ হিজরি পূর্ব (৬০০ খ্রিস্টাব্দে) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর বয়স ছিল ত্রিশ বছর। তাঁর বিবাহ হয় তাঁর খালা হালা বিনতে খুয়াইলিদের ছেলে আবুল আস বিন আল-রাবি-এর সাথে। মূলত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.) নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর কাছে জয়নবকে তাঁর সাথে বিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন; কারণ তিনি আবুল আসকে নিজের সন্তানের মতোই মনে করতেন। এই বিবাহ নবীজির নবুয়ত প্রাপ্তির আগেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং তখন জয়নবের বয়স ছিল দশ বছরেরও কম।
উল্লেখ, আবুল আস ছিলেন ধনে, ব্যাবসা-বানিজ্যে ও বিশ্বস্ততায় মক্কার গন্যমান্য ব্যাক্তি, বর্ণিত হয়েছে যে- রাসূল ﷺ তার এ জামাতার প্রসংশা করতেন। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)।
ইসলাম গ্রহণ ও কঠিন সময়:
যখন নবী মুহাম্মদ ﷺ নবুয়ত লাভ করেন, তখন জয়নব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন কিন্তু তাঁর স্বামী তাঁর পৈতৃক ধর্মেই থেকে যান। কুরাইশরা আবুল আসকে চাপ দিতে থাকে যেন তিনি জয়নবকে তালাক দিয়ে দেন, এবং এর বিনিময়ে কুরাইশের যেকো নারীর সাথে বিবাহের অফার দেয়া হয়। কিন্তু তিনি তাদের উত্তরে বলতেন, না, আল্লাহর কসম! আমি আমার সঙ্গিনীকে ছেড়ে দেব না। আর আমার স্ত্রীর বদলে কুরাইশদের কোনো নারীকেই আমি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পছন্দ করি না। ফলে জয়নব (রা.) তাঁর স্বামীর সাথেই থেকে যান, যদিও তখন তাঁদের ধর্ম ভিন্ন ছিল। কারণ রাসূল ﷺ সে সময় চতুর্মুখী শত্রুতায় এমন একটা পরিস্থিতিতে ছিলেন যে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম ছিলেননা। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)।
সন্তানাদি:
জয়নব (রা.) এবং আবুল আসের সংসারে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পুত্র: তাঁর নাম ছিল আলী, যিনি শৈশবেই মারা যান।
কন্যা: তাঁর নাম ছিল উমামাহ। ফাতেমা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর আলী বিন আবি তালিব (রা.) উমামাহকে বিয়ে করেন। (আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ আস সুহাইলি, রওদ্বতুল আনফ ফি শরহিস সিরাতুন নবাবিয়্যাহ- খন্ড:৫/১২৭-১২৮পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।) (শামসুদ্দিন আয-যাহবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা- খন্ড:২/২৪৬পৃ., তাহক্কীক: শোয়াইব আরনাউত্ব, প্রকাশনি: মুয়াসাসাতুর রিসালাহ, লেবানন।) (মাজমাউয যাওয়ায়েদ- খন্ড:৯/২১২পৃ., আসদুল গাবাহ- খন্ড:৭/১৩০পৃ., মাকতাবাতুশ শামেলা)। পরবর্তীতে আলী (রা.)-এর মৃত্যুর পর মুগিরা বিন নওফেল তাঁকে বিয়ে করেন। এই উমামাহ-ই সেই শিশু, যাকে নিয়ে নবী মুহাম্মদ ﷺ ফজর নামাজে কাঁধে চড়িয়েছিলেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। (সহিহ, বূখারী-৫১৬, কিতাবুস সলাত, মুসলিম-৫৪৩, কিতাবু ফিল মাসজিদ, মাকতাবাতুশ শামেলা, হাদিসটা বর্ণনা করেন আবু কাতাদাহ রা.)
আবূ কাতাদাহ্ আনসারী (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي وَهُوَ حَامِلٌ أُمَامَةَ بِنْتَ زَيْنَبَ بِنْتِ رَسُولِ اللهِ وَلِأَبِي الْعَاصِ بْنِ رَبِيعَةَ بْنِ عَبْدِ شَمْسٍ فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَهَا وَإِذَا قَامَ حَمَلَهَا.
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে যয়নবের গর্ভজাত ও আবুল আস ইবনু রাবী‘আহ ইবনু ‘আবদ শামস (রা)-এর ঔরসজাত কন্যা উমামাহ (রাযি.)-কে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায় করতেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন তখন তাকে রেখে দিতেন আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে তুলে নিতেন। (৫৯৯৬; মুসলিম ৫/৯, হাঃ ৫৪৩, আহমাদ ২২৬৪২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৪৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৯২)।
স্বামীর বন্দিদশা ও মুক্তি:
নবী মুহাম্মদ ﷺ মদিনায় হিজরত করার পর, ২ হিজরিতে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে আবুল আস কুরাইশদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী জয়নব (রা.) মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধ শেষে মুসলমানরা বিজয় লাভ করলে আবুল আস বন্দি হিসেবে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়েন। খিরাশ বিন আস-সিম্মাহ নামক এক সাহাবী তাঁকে বন্দি করেছিলেন।
এরপর মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দিদের মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ পাঠাতে শুরু করল, তখন জয়নব (রা.) তাঁর স্বামী আবুল আসের মুক্তির জন্য একটি হার বা মালা পাঠিয়েছিলেন। এই মালাটি ছিল তাঁর মা খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)-এর, যা তিনি জয়নবের বিয়ের সময় তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন। আর নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর স্মৃতিবিজড়িত সেই মালাটি দেখে নবী মুহাম্মদ ﷺ অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন: তোমরা যদি উপযুক্ত মনে করো, তবে জয়নবের বন্দিকে (আবুল আস) মুক্তি দিয়ে দাও এবং তাঁর পাঠানো সম্পদ (মালাটি) তাঁকে ফিরিয়ে দাও।
সাহাবায়ে কেরাম সানন্দে আবুল আসকে মুক্তি দেন এবং মালাটি ফিরিয়ে দেন। তবে নবী মুহাম্মদ ﷺ আবুল আসের মুক্তির বিনিময়ে একটি শর্ত দিয়েছিলেন যে, মক্কায় ফিরে গিয়ে তিনি জয়নবকে মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেবেন এবং তাঁর পথ সুগম করে দেবেন। আবুল আস তাঁর সেই কথা রক্ষা করেছিলেন। (ইবনে কাছীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া- খন্ড:৩/৩৮০পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।) (আবু নুয়াইম আল-আসবাহানি, মাআরিফাতুস সাহাবা- খন্ড:৬/৩১৯৪পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।)
ইবনে সাদ এটি তার 'ত্বাবাকাত' গ্রন্থে (৮/৩১) ওয়াকিদির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম হাকেম এটি (৪/৪৪-৪৫) ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে আব্বাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর তার পিতা থেকে এবং তিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন- "যখন মক্কাবাসী তাদের বন্দীদের মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণ পাঠাল, তখন আল্লাহর রাসূলের কন্যা জয়নব (রা.) তার স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণ হিসেবে একটি হার পাঠালেন। হারটি ছিল (তার মা) খাদিজা (রা.)-এর; জয়নবের বিয়ের সময় তিনি এটি তাকে দিয়েছিলেন। যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হারটি দেখলেন, তখন তার মনে অত্যন্ত মায়া ও কোমলতা সৃষ্টি হলো। তিনি (সাহাবীদের উদ্দেশ্যে) বললেন: "তোমরা যদি মনে করো তবে তার বন্দীকে (আবুল আস) মুক্তি দিতে পারো এবং তার সম্পদ (হারটি) তাকে ফিরিয়ে দিতে পারো।"
ইমাম হাকেম এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন। বিষয়টি তেমনই (অর্থাৎ হাদীসটি সহীহ), কারণ ইবনে ইসহাক এখানে স্পষ্টভাবে হাদীস শ্রবণের কথা (আনআনাহ না করে সরাসরি বর্ণনা) উল্লেখ করেছেন।
মদিনায় হিজরত, যাত্রার প্রস্তুতি ও বাধা:
স্বামী আবুল আস মুক্তি পেয়ে মক্কায় ফেরার পর, নবীজির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি জয়নব (রা.)-কে মদিনায় তাঁর পিতার কাছে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। জয়নব (রা.) হিজরতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এ সময় হিন্দ বিনতে উতবা তাঁকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও জয়নব (রা.) ভয়ের কারণে তা অস্বীকার করেন এবং নিজের প্রস্তুতির কথা গোপন রাখেন। প্রস্তুতি শেষ হলে, তাঁর দেবর কিনানা বিন আল-রাবি একটি উটের পিঠে পালকি বসিয়ে তাঁকে নিয়ে রওনা হন। কিনানা নিজের ধনুক হাতে দিনের আলোতেই জয়নবকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিনানা উঠের রশি টেনে আগে আগে চলছিলো। আর এদিকে কুরাইশরা খবর পেয়ে তাঁদের পিছু নেয়। এবং যু-তুয়া নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলে। এরপর সবার আগে তাঁদের কাছে পৌঁছায় হুব্বার বিন আল-আসওয়াদ এবং নাফি বিন আব্দুল কায়েস নামের দুই ব্যক্তি। হাব্বার তাঁর বল্লম দিয়ে জয়নবকে ভয় দেখান। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, জয়নব (রা.) তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং প্রচণ্ড ভয়ে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়।
তখন তাঁর দেবর কিনানা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এবং তুণীর হতে তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করল। এরপর বলল: আল্লাহর কসম! আমার কাছে যে-ই আসবে, আমি তাকে আমার তীরের নিশানা বানাব। এ অবস্থা দেখে সবাই তার থেকে পিছিয়ে গেল। আবূ সুফইয়ান একদল কুরায়শসহ তার সামনে এসে বলল: ওহে! তুমি আমাদের থেকে তোমার তীর সংযত কর। আমরা তোমার সাথে কথা বলি। কিনানা সংযত হল। তখন আবু সুফইয়ান আরও কাছে এসে তার সামনে দাঁড়াল এবং বলল: তুমি কিন্তু কাজটি ঠিক করনি। তুমি প্রকাশ্য দিবালোকে এ মহিলাকে নিয়ে সকলের সামনে দিয়ে বের হলে, অথচ তুমি জান, আমরা কি মুসীবত ও বিপাকে আছি; মুহাম্মদের কারণে আমাদের মাঝে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে! তুমি যেভাবে প্রকাশ্যে সকলের চোখের সামনে তার মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে এলে, তাতে লোকে ভাববে, বদরে আমাদের যে সর্বনাশ ঘটে গেল, তদ্দরুন আমরা নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়েছি। আমাদের চরম দুর্বলতা ও পর্যুদস্ত, হওয়ার কারণেই তুমি এমনটি করতে পেরেছ। আমার জীবনের কসম! তার বাপ থেকে তাকে আটকে রাখার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। এভাবে প্রতিশোধ গ্রহণেরও কোন ইচ্ছা আমাদের নেই।
এরপর আবু সুফিয়ান কিনানার সাথে আলোচনা করেন যে, জয়নবকে এখন মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং পরে রাতের আঁধারে গোপনে মদিনায় পাঠাতে হবে, যাতে মক্কাবাসীরা একে তাদের দুর্বলতা মনে করে সমালোচনা করতে না পারে। কিনানা সেই অনুযায়ী কাজ করেন এবং মক্কায় ফিরিয়ে আনেন, পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কোনো এক রাতে তাঁকে জায়েদ বিন হারিসা ও অন্য এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন, যাঁদেরকে নবী মুহাম্মদ ﷺ বদর যুদ্ধের এক মাস পর জয়নবকে নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
ব্যাক্তিদ্বয়ের নিক জয়নাবকে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় দেবর কেনানা বলেছিলো: "আমি হুবার ও তার গোত্রের দুর্বৃত্তদের আচরণে বিস্মিত হয়ে যাই যে, তারা চায় আমি মুহাম্মদ (সা)-তনয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি!
যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন আমি তাদের সংখ্যাধিক্যের কোন পরওয়া করব না। আর যতক্ষণ আমার হাত হিন্দুস্তানের তৈরি সুতীক্ষ্ণ তরবারি দৃঢ়ভাবে ধরে থাকবে, ততক্ষণ আমি তাদের কোন তোয়াক্কা করব না।" (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ:
জয়নবের ওপর এই অমানবিক আচরণের খবর পেয়ে নবী মুহাম্মদ ﷺ পরবর্তীতে হাব্বার ও নাফিকে ধরার জন্য একটি বিশেষ বাহিনী পাঠান। প্রথমে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন: যদি তোমরা হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ এবং তাঁর সঙ্গীকে (বলা হয়েছে তার নাম নাফি) পাও, তবে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দিও।
কিন্তু পরদিন তিনি তাঁর নির্দেশ সংশোধন করে বলেন: আমি তোমাদের এই দুজনকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি অনুধাবন করলাম যে, আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তাই যদি তোমরা তাদের পাকড়াও করতে পারো, তবে তাদের হত্যা করো। এর সনদ শক্তিশালী; কারণ ইবনে লাহিয়াহ থেকে এটি বর্ণনা করেছেন ইবনুল মুবারক। আর ইবনুল মুবারক তাঁর (ইবনে লাহিয়াহর) কিতাব পুড়ে যাওয়ার আগেই তাঁর থেকে হাদিস শুনেছিলেন। হাফেজ (ইবনে হাজার) 'আল-ইসাবাহ' (১০/২৩৩) গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন এবং একে মুহাম্মদ বিন উসমান বিন আবি শায়বার তারিখ গ্রন্থের দিকে নিসবত করেছেন।
ইবনে ইসহাক এটি 'আল-মাগাজি'তে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনে হিশাম (১/৬৫৭) তাঁর থেকে এটি নকল করেছেন। তিনি বলেন: ইয়াজিদ বিন আবি হাবিব আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বুকাইর বিন আশাজ থেকে, তিনি সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবু ইসহাক আদ-দাউসি থেকে, আর তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। তবে আবু ইসহাক আদ-দাউসি একজন মাজহুল বা অপরিচিত রাবী।
ইমাম বুখারি (৬/১০৪) জিহাদ অধ্যায়ে 'আল্লাহর আজাব দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না' পরিচ্ছেদে এটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তিরমিজি (১৫৭১) সিয়ার অধ্যায়ে কুতাইবা থেকে, তিনি লাইস থেকে, তিনি বুকাইর থেকে, তিনি সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে, তিনি আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন-
بَعَثَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي بَعْثٍ فَقَالَ " إِنْ وَجَدْتُمْ فُلاَنًا وَفُلاَنًا لِرَجُلَيْنِ مِنْ قُرَيْشٍ فَأَحْرِقُوهُمَا بِالنَّارِ " . ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حِينَ أَرَدْنَا الْخُرُوجَ " إِنِّي كُنْتُ أَمَرْتُكُمْ أَنْ تَحْرِقُوا فُلاَنًا وَفُلاَنًا بِالنَّارِ وَإِنَّ النَّارَ لاَ يُعَذِّبُ بِهَا إِلاَّ اللَّهُ فَإِنْ وَجَدْتُمُوهُمَا فَاقْتُلُوه
আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি যুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি বলে দেন, তোমরা কুরাইশ বংশের অমুক অমুক লোকের নাগাল পেলে তাদের দু’জনকেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। যখন আমরা যাত্রা শুরু করলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেনঃ আমি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম, অমুক অমুক লোককে -তোমরা আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকারী আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কেউ নয়। অতএব তোমরা অমুক ও অমুকের নাগাল পেলে তবে তাদের দু’জনকেই মেরে ফেলবে।
আরও দেখুন: সিরাতে ইবনে হিশাম (১/৬৫৪), আল-মুস্তাদরাক (৪/৪৩), মাজমাউয যাওয়াইদ (৯/২১২, ২১৩) এবং ইমাম বুখারির আত-তারিখ আস-সাগীর (১/৭, ৮)।
হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ সংক্রান্ত আলোচনা:
আর হাব্বার বিন আল-আসওয়াদ সম্পর্কে তথ্য হলো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সুনানে সাঈদ বিন মানসুরে ইবনে উইয়াইনা থেকে, তিনি ইবনে নাজিহ থেকে বর্ণনা করেন যে... সেই বাহিনী তাঁকে পায়নি (পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য), বরং তিনি ইসলামের সন্ধান পান এবং হিজরত করেন। এরপর তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। হাফেজ (ইবনে হাজার) 'আল-ফাতহ' গ্রন্থে (৬/১০৫) বলেন: তাবারানি ও ইবনে মানদাহর কিতাবে তাঁর একটি হাদিস আছে। ইমাম বুখারি তাঁর তারিখ গ্রন্থে সুলায়মান বিন ইয়াসার থেকে তাঁর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যা হজ পালনের সময় ওমর (রা.)-এর সাথে তাঁর একটি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। হাব্বার মুয়াবিয়া (রা.)-এর খেলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
আরও দেখুন: আল-ইসাবাহ (১০/২৩৫, ২৩৬)।
হাফেজ আরও বলেন: হাব্বার বিন আসওয়াদের সেই সঙ্গীর (যাকে পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল) ব্যাপারে সাহাবীদের তালিকায় কোনো উল্লেখ আমি পাইনি; সম্ভবত তিনি ইসলাম গ্রহণের আগেই মারা গেছেন।
স্বামীর ইসলাম গ্রহণ, আশ্রয় প্রার্থনা ও নিরাপত্তা দান:
জয়নব (রা.) মদিনায় চলে যাওয়ার পর আবুল আস মক্কাতেই থেকে যান। মক্কা বিজয়ের কিছুদিন আগে ৮ হিজরিতে তিনি কুরাইশদের পণ্য নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফরে যান। ফেরার পথে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর একটি সেনাদল তাঁর পথরোধ করে এবং তাঁর সাথে থাকা সমস্ত মালামাল নিয়ে নেয়। এরপর আবুল আস রাতের আঁধারে গোপনে মদিনায় প্রবেশ করেন এবং জয়নব (রা.)-এর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। পরদিন ভোরে সাহাবীগণ যখন ফজরের নামাজ পড়ছিলেন, তখন জয়নব (রা.) উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন: হে লোকসকল! আমি আবুল আস বিন আল-রাবিকে নিরাপত্তা (আশ্রয়) দান করেছি। নামাজ শেষে নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেন: হে জনগণ! "আমি যে কথা শুনেছি, তা কি তোমরাও শুনেছ?” সবাই বললেন: হ্যাঁ, শুনেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: "আল্লাহর কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, এ ঘোষণা শুনবার আগে আমি কিছুই জানতাম না। চুক্তি অনুসারে যে কোন ব্যক্তি, যে কোন মুসলমানের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।" ইবনে হিশাম তার 'সীরাত' গ্রন্থে (১/৬৫১, ৬৫৭), ইবনে সাদ (৮/৩২) ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ইয়াজিদ ইবনে রুমান আমার কাছে বর্ণনা করেছেন... এবং ইমাম হাকেমও এটি বর্ণনা করেছেন (৪/৪৫)।
ইবনে ওয়াহাব থেকে বর্ণিত, তিনি ইবনে লাহীআহ থেকে, তিনি মুসা ইবনে জুবায়ের আল-আনসারী থেকে, তিনি ইমরান ইবনে মালিক আল-গিফারী থেকে, তিনি আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান থেকে, আর তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সহধর্মিণী উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে: "রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা যয়নব (রা.)-এর কাছে আবুল আস ইবনুর রবী' এই মর্মে সংবাদ পাঠালেন যে, 'তুমি তোমার পিতার কাছে আমার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করো।' তখন যয়নব (রা.) বের হলেন এবং নিজের কামরার দরজার আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে দিলেন। ওই সময় নবী কারীম ﷺ ফজরের নামাজে লোকদের ইমামতি করছিলেন। যয়নব (রা.) উচ্চস্বরে বললেন: 'হে লোকসকল! আমি আল্লাহর রাসূলের কন্যা যয়নব। আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দান করলাম।'
এরপর যখন নবী ﷺ নামাজ শেষ করলেন, তখন তিনি বললেন: 'হে লোকসকল! তোমাদের মতো আমিও এ ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানতাম না, যতক্ষণ না তোমরা তা শুনলে। জেনে রেখো, মুসলমানদের ক্ষুদ্রতম কোনো ব্যক্তিও যদি কাউকে আশ্রয় দেয়, তবে (পুরো জাতির পক্ষ থেকে) তা কার্যকর হবে।'
হাদীসের মান: এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যয়নবের কাছে গিয়ে বললেন: হে আমার প্রিয় কন্যা! আবুল আ'সকে সযত্নে রাখ। কিন্তু সে যেন নির্জনে তোমার কাছে না আসে। কেননা তুমি এখন তার জন্য হালাল নও।"
এরপর নবী মুহাম্মদ ﷺ যারা আবুল আসের মালপত্র নিয়েছিলেন, তাদের কাছে সেগুলো ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানান। তাঁরা সানন্দে সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেন। আবুল আস তাঁর সমস্ত মালপত্র নিয়ে মক্কায় ফিরে যান এবং কুরাইশদের প্রাপ্য আমানত বুঝিয়ে দেন। এরপর তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং মদিনায় হিজরত করেন। (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ- খন্ড:১/৬৫১-৬৫৭ পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা), (আস সুহাইলি, রওদ্বতুল আনাফ ফি শরহিস সিরাতুন নবাবিয়্যাহ- খন্ড:৫/১২৭-১৩৬পৃ., প্রকাশনি: দারু ইহয়াউত তুরাছিল আরাবী, লেবানন, প্রথম সংস্করণ)।
আবুল আস মদিনায় পৌঁছানোর পর নবী মুহাম্মদ ﷺ তাঁর মেয়ে জয়নব (রা.)-কে প্রথম বিবাহের উপরে রেখেই পুনরায় তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেন। (ইবনে হিশাম (১/৬৫৮, ৬৫৯), আহমাদ (১৮৭৬, ২৩৬৯, ৩২৯০), ইবনে সাদ (৮/৩৩), আবু দাউদ (২২৪০), তিরমিজি (১১৪৩), ইবনে মাজাহ (২০০৯), আব্দুর রাজ্জাক (১২৬৪৪), দারা কুতনী (পৃষ্ঠা ৩৯৬) এবং হাকেম (৩/৬৩৮, ৬৩৯ ও ৪/৪৬) এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা সবাই ইবনে ইসহাক-এর সূত্রে, তিনি দাউদ বিন আল-হুসাইন থেকে, তিনি ইকরামা থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-
رَدَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ابْنَتَهُ زَيْنَبَ عَلَى أَبِي الْعَاصِ بِالنِّكَاحِ الْأَوَّلِ، لَمْ يُحْدِثْ شَيْئًا، قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ عَمْرٍو، فِي حَدِيثِهِ: بَعْدَ سِتِّ سِنِينَ، وَقَالَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ: بَعْدَ سَنَتَيْنِ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যা যাইনাবকে প্রথম বিবাহের ভিত্তিতেই আবুল ’আসের কাছে ফেরত দেন এবং নতুনভাবে কোনো মোহর ধার্য করেননি। বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ ইবনু আমর তার হাদীসে বলেন, ছয় বছর পর এবং হুসাইন ইবনু ’আলী বলেন, দুই বছর পর।
এই বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য এবং ইবনে ইসহাক স্পষ্টভাবে সরাসরি শোনার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে, দাউদ বিন আল-হুসাইন যখন ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, তখন তাতে কিছুটা দুর্বলতা বা সংশয় থাকে। কিন্তু এই হাদিসটির সমর্থনে আমির আশ-শাবি, কাতাদাহ এবং ইকরামা বিন খালিদ থেকে একাধিক বিশুদ্ধ 'মুরসাল' বর্ণনা রয়েছে।
এসব বর্ণনা ইবনে সাদ তাঁর 'তাবাকাত' (৮/৩২) গ্রন্থে, আব্দুর রাজ্জাক তাঁর 'মুসান্নাফ' (১২৬৪৭) গ্রন্থে এবং তহাবি 'শারহু মাআনিল আসার' (২/১৪৯) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং এই শাওয়াহিদ বর্ণনাগুলোর মাধ্যমে হাদিসটি শক্তিশালী ও সহিহ হিসেবে গণ্য হয়। মুসনাদে আহমদ এর তাহক্কীকে আহমদ শাকের হাদিসটি সহিহ্ বলেছেন।)
কিছু বর্ণনা মতে, এটি নতুন বিয়ের চুক্তি ও মোহরানার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, আবার কারো মতে তা পূর্বের বিয়ের ভিত্তিতেই ছিল। (ইমাম আহমাদ (৬৯৩৮), তিরমিজি (১১৪২), ইবনে সাদ (৮/৩২), ইবনে মাজাহ (২০১০), দারা কুতনী (পৃষ্ঠা ৩৯৬) এবং বায়হাকি (৭/১৮৮) এটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা সবাই হাজ্জাজ বিন আরতাহ-এর সূত্রে, তিনি আমর বিন শুয়াইব থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি তাঁর দাদা থেকে এটি বর্ণনা করেছেন-
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَدَّ ابْنَتَهُ زَيْنَبَ عَلَى أَبِي الْعَاصِي بْنِ الرَّبِيعِ بِمَهْرٍ جَدِيدٍ وَنِكَاحٍ جَدِيدٍ .
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কন্যা যাইনাবকে পুনরায় মোহর নির্ধারণ করে এবং নতুন বিয়ের মাধ্যমে আবূল আস ইবনুর রাবীর নিকটে ফেরিয়ে দেন।
এই সনদটি দুর্বল; কারণ হাজ্জাজ বিন আরতাহ একজন মুদাল্লিস এবং তিনি এখানে সরাসরি শোনার কথা উল্লেখ না করে 'আন' শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইমাম আহমাদ বলেন: 'এই হাদিসটি দুর্বল বা ভিত্তিহীন; হাজ্জাজ এটি আমর বিন শুয়াইব থেকে সরাসরি শোনেননি, বরং তিনি এটি মুহাম্মদ বিন উবাইদ আল-আরজামি থেকে শুনেছেন। আর আল-আরজামির বর্ণনা মূল্যহীন।' প্রকৃতপক্ষে সহিহ (বিশুদ্ধ) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সা.) তাঁদের পূর্বের বিবাহকেই বহাল রেখেছিলেন।)
ইন্তেকাল, মৃত্যু ও জানাজা:
জয়নব (রা.) নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই ৭ম বা ৮ম হিজরিতে (৬২৯ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২৯ বছর। তাঁকে গোসল করিয়েছিলেন উম্মে আয়মান (রা.), উম্মুল মুমিনীন সওদা বিনতে জামআ (রা.) এবং উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.)। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। কবরে দাফন করার সময় নবীজি স্বয়ং কবরে নামেন এবং তাঁর সাথে ছিলেন জয়নবের স্বামী আবুল আস বিন আল-রাবি। জয়নব (রা.)-এর জানাজার জন্য একটি বিশেষ কফিন বা খাটিয়া (আচ্ছাদনসহ) তৈরি করা হয়েছিল এবং তিনিই ছিলেন প্রথম নারী যাঁর জন্য এমনটি করা হয়। (অধ্যাপক ড. গানিম হাশেম খুদাইর আস-সুলতানি; সহযোগী অধ্যাপক ড. সালিহ হাসান আশ-শামারি। বালাযুরীর 'আনসাবুল আশরাফ' গ্রন্থে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন (আলাইহিমাস সালাম)। জার্নাল অফ দ্য কলেজ অফ বেসিক এডুকেশন। খণ্ড: ১৬, সংখ্যা: ৬২, পৃষ্ঠা: ৩২৫–৩৬০।)
মৃত্যুর কারণ:
বর্ণিত আছে যে, মদিনায় হিজরতের সময় মক্কার কাফিরদের আক্রমণে তাঁর যে গর্ভপাত হয়েছিল, সেই আঘাত ও অসুস্থতাই ছিল তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ। সেই থেকে তিনি ক্রমাগত অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই অসুস্থতাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (ইবনে আব্দিল বার, আল ইস্তিয়াব ফি মাআরিফাতিল আসহাব- খন্ড:৪/১৮৫৪পৃ., প্রকাশনি: মাকতাবাতুশ শামেলা।)
তাঁকে নিয়ে লেখা গ্রন্থ:
উর্ফ আল-যারনাব ফি বায়ানি শানি আস-সায়্যিদা জয়নব (عُرْف الزرنب في بيان شان السيدة زينب); লেখক: তাজউদ্দীন আল-ইসফরাইনি। (কিং ফয়সাল সেন্টার থেকে প্রকাশিত, খাজানাতুত তুরাস- খন্ড:৪৩/৪১পৃ.)