Student Of Knowledge
Forum Staff
Moderator
Uploader
Exposer
HistoryLover
Salafi User
- Joined
- Nov 25, 2022
- Threads
- 343
- Comments
- 477
- Reactions
- 6,314
- Thread Author
- #1
কেয়ামত কখন হবে এবং কেয়ামতের প্রাক্কালে ঘটিতব্য বিষয়গুলো কখন প্রকাশিত হবে, তা পুরোপুরি অদৃশ্যের জ্ঞানের অন্তর্গত। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না, কখন এগুলো সংঘটিত হবে। কিন্তু বিভ্রান্ত বক্তা আবু ত্বহা আদনান অদৃশ্যের জ্ঞানের অন্তর্গত এসব বিষয় সম্পর্কে অনুমান করে বলে দিচ্ছেন, কখন ঘটবে এগুলো!
তিনি তার একটি বক্তব্যে কেয়ামতের সময়কাল প্রসঙ্গে বলেছেন, “এবার ইসা আলাইহিস সালাম দুজন ফেরেশতার কাঁধে ভর দিয়ে কোথায় নামবেন? সিরিয়ায় নামবেন। এই যে সিরিয়ায় যুদ্ধ হচ্ছে। সিরিয়ার দামেস্কে সাদা মসজিদের ওপরে তিনি নামবেন। এখন ওই মসজিদ সাদা হয়ে গেছে। যখন এ হাদিস বলা হয়েছিল, তখন মসজিদটাই ছিল না! এখন সেই মসজিদের গম্বুজ সাদা হয়ে গেছে। আর কতসময় বাকি আছে? এখনো ঘুমাচ্ছে সবাই!... এই পুরো সময়টাতে আমাদের হাতে কতটুকু সময় আছে, আল্লাহ ভালো জানেন। তবে আমাদের মনে হয়, আমাদের মত, আমাদের মনে হয়, সবমিলিয়ে হয়তোবা পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি বাকি আছে বলে আমার মনে হয় না। আল্লাহ ভালো জানেন, বারবার বলছি। আমার মত— ফিফটি থেকে সিক্সটি ইয়ার্স (এর মধ্যে) সবগুলো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব।” [দেখুন: youtu.be (১:০৩ মিনিট থেকে ২:০৮ মিনিট পর্যন্ত)]
এমনকি বক্তা আদনান মনে করেন, স্কলারদের এমন মত প্রকাশের অধিকার আছে। অর্থাৎ স্কলাররা গবেষণা করে বলতে পারবেন, কখন কেয়ামত হতে পারে! তিনি আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন, “তবে এ বিষয়ে কোনো ডাউট নাই যে, ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স যেদিকে যাচ্ছে, আমাদের হাতে টাইম খুব বেশি নাই। এমন হতে পারে, দুই বছরের মধ্যে, এমন হতে পারে চল্লিশ বছরের মধ্যে। আমরা জানি না। আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব। যেগুলোতে আমরা তাবিল করি, এগুলো ইন্টারপ্রিটেশন বা তাবিল। তাবিল করলে বলতে হবে, আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। তবে কোনো স্কলার হয়তো নিজের মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে যে, তাঁর মতে এটা হতে পারে এত বছরের মধ্যে। সেটা তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাঁর আছে! কোনো একটা মানুষ যখন এগুলি নিয়ে গবেষণা করতে থাকবে, তখন তার মনে হবে, এটা অনেক ক্লোজ।” [দেখুন: youtu.be (১:২০ মিনিট থেকে ১:৫৫ মিনিট পর্যন্ত)]
·
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বুঝতেই পারছেন, এখানে দুটো বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এক. কেয়ামতের সময়কাল ধারণা বা অনুমান করে নির্ধারণ করার বিধান কী, সে বিষয়ক আলোচনা। দুই. এরকম মত প্রকাশের অধিকার স্কলারদের আছে কিনা, সে বিষয়ক আলোচনা।
প্রথম বিষয়ের আলোচনা: ফিতনার এ সময়ে আমাদের সবসময় মনে রাখা জরুরি— শরিয়তের কোনো দলিলে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। সোজাকথায় কেয়ামত কোন সময়ে হবে সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই। কেবল আল্লাহর কাছেই আছে এ বিষয়ক জ্ঞান। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَتَبَارَكَ الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ “মহাবরকতময় তিনি, যিনি আকাশরাজি ও পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর অধিপতি। কেয়ামতের জ্ঞান শুধু তাঁরই আছে এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সুরা যুখরুফ: ৮৫]
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ “অদৃশ্যের চাবিকাঠি রয়েছে তাঁরই নিকটে; তিনি ছাড়া আর কেউ তা অবগত নয়।” [সুরা আনআম: ৫৯] রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, مَفَاتِحُ الْغَيْبِ خَمْسٌ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا اللهُ لَا يَعْلَمُ مَا فِيْ غَدٍ إِلَّا اللهُ وَلَا يَعْلَمُ مَا تَغِيْضُ الْأَرْحَامُ إِلَّا اللهُ وَلَا يَعْلَمُ مَتَى يَأْتِي الْمَطَرُ أَحَدٌ إِلَّا اللهُ وَلَا تَدْرِيْ نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ وَلَا يَعْلَمُ مَتَى تَقُوْمُ السَّاعَةُ إِلَّا اللهُ “অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেগুলো হলো আগামী দিন কী হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। মায়ের জরায়ুতে কী আছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বৃষ্টি কখন আসবে, তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। কোনো মানুষ জানে না, তার মৃত্যু কোথায় হবে। আর কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না।” [সহিহুল বুখারি, হা: ৪৬৯৭]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কেয়ামতের সময়কাল নির্ধারণ করেননি। আর করবেনই বা কীভাবে? মহান আল্লাহ বলেছেন, يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে? তুমি বলে দাও, এ বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে কেবল আমার রবের নিকটে। শুধু তিনিই কেয়ামতের নির্ধারিত সময়ে ওটাকে (কেয়ামতকে) প্রকাশ করবেন।” [সুরা আরাফ: ১৮৭]
আমাদের সুপরিচিত হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত হয়েছে, জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, مَتَى السَّاعَةُ “কেয়ামত কবে?” নবিজি জবাব দিয়েছিলেন, مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ “এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন।” [সহিহুল বুখারি, হা: ৫০; সহিহ মুসলিম, হা: ৮; শব্দাবলি বুখারির] নবিজিকে জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও তিনি যখন অনুমান করে কেয়ামতের সময় বলেননি, তখন এ বিষয়ে ভদ্র মুমিনের কাজ হবে, নবিজির আগবাড়িয়ে ধারণাপ্রসূত মন্তব্য না করা। কিন্তু আবু ত্বহা আদনানের মতো জনপ্রিয় বক্তারা নবিজির চেয়েও বেশি জ্ঞানী সেজেছেন। এজন্য অনুমান করে কেয়ামতের সময়কাল বলে বেড়ান তারা!
যারা অনুমান করে সময়কাল বলে দেয়, তাদের ব্যাপারে যুগে যুগে সু্ন্নাহপন্থি প্রাজ্ঞ উলামাগণ কী অবস্থান গ্রহণ করেছেন, আমরা এখন সেটা জেনে নিব। ইনশাআল্লাহ। ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৪৫৬ হি.) বলেছেন, وأما اختلاف الناس في التاريخ، فإن اليهود يقولون: للدنيا أربعة آلاف سنة ونيف. والنصارى يقولون: للدنيا خمسة آلاف سنة. وأما نحن فلا نقطع على عدد معروف عندنا. وأما من ادعى في ذلك سبعة آلاف سنة أو أكثر أو أقل فقد كذب، وقال ما لم يأت قط عن رسول الله صلى الله عليه وسلم فيه لفظة تصح، بل صح عنه عليه السلام خلافه، بل نقطع على أن للدنيا أمرا لا يعلمه إلا الله عز وجل “ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষ এ বিষয়ে মতভেদ করেছে। ইহুদিদের মতে পৃথিবীর বয়স চার হাজার বছরের কিছু বেশি। খ্রিষ্টানদের মতে পৃথিবীর বয়স পাঁচ হাজার বছর। পক্ষান্তরে আমরা (মুসলিমরা) কোনো সুবিদিত সময়কালের ব্যাপারে নিশ্চিত বলতে পারি না। সুতরাং যে দাবি করে, পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর, কিংবা এরচেয়ে কিছু বেশি, অথবা এরচেয়ে কিছু কম, সে মিথ্যা বলে। এবং সে ব্যক্তি এমন কথা বলে, যে ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি শব্দও বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। বরং এর বিপরীতটাই নবিজি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য আমরা নিশ্চিত করে বলি, পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।” [আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৪]
কেউ কেউ বলতে পারেন, ‘আবু ত্বহা আদনান তো নিশ্চিত করে বলেনি, কবে হবে কেয়ামত।’ কিন্তু দেখেন, ঠিকই নিজের মত ব্যক্ত করেছে, বলে দিয়েছে স্পষ্ট করে, ‘আমার মতে ৫০-৬০ বছরের মধ্যে কেয়ামতের প্রাক্কালে ঘটিতব্য বিষয়গুলো ঘটে যাবে!’ কেউ আবার বলেন, ‘আবু ত্বহা বলেছে তো, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন, সুতরাং তাঁর দোষ ধরেন কেন?!’ আমরা বলি, ‘আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন’ বলে কেউ যদি মত ব্যক্ত করে, প্রকৃত নবি মূলত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু, ভুল করে মুহাম্মাদের কাছে ওহি নিয়ে গেছে জিবরাইল! এরকম কুফরি কথা মানবেন? মানবেন না। একইভাবে আবু ত্বহা আদনানের বাতিল মতও মানা যাবে না।
কেয়ামতের সময়কাল বলে দেওয়া বিপথগামী লোকেরা একটি জাল হাদিস দিয়ে দলিল দেয়। জাল হাদিসে বলা হয়েছে, নবিজি নাকি বলেছেন, الدُّنْيا سَبْعَةُ آلافِ سَنَة، وأنا في آخِرِها ألفًا “পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর। আমি রয়েছি সর্বশেষ হাজারে।” [দেখুন: দয়িফুল জামিয়িস সগির, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৬০; হা: ৩০১৩]
হাদিস জাল হওয়ার কারণ নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৫১ হি.) বলেছেন, مخالفته صريحَ القرآن؛ كحديث مقدار الدنيا، وأنها سبعة آلاف سنة، ونحن الآن في الألف السابعة، وهذا من أبين الكذب؛ لأنه لو كان صحيحًا، لكان كل واحد عالمًا أنه بقي للقيامة من وقتنا هذا مائتان وإحدى وخمسون سنة “কোনো হাদিস কুরআনের সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধী হওয়া। যেমন পৃথিবীর বয়স সংক্রান্ত হাদিস যে, পৃথিবীর বয়স সাত বছর; আর আমরা আছি সপ্তম হাজারে। এটা পরিষ্কার মিথ্যা কথা। কেননা এ কথা যদি ঠিকই হতো, তাহলে প্রত্যেকেই জানত, আমাদের জামানা থেকে কেয়ামত হতে আর বাকি আছে দুইশো একান্ন বছর!” [ইবনুল কাইয়্যিম কৃত আল-মানারুল মুনিফ, পৃষ্ঠা: ৮০; তাহকিক: আবু গুদ্দাহ; মাকতাবুল মাতবুয়াতিল ইসলামিয়্যা (আলেপ্পো) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৩৯০ হি./১৯৭০ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
আমরাও বলব, আবু ত্বহা আদনানের কথা যদি সঠিক হতো, তাহলে প্রত্যেকেই জানত, আমাদের জামানা থেকে কেয়ামত হতে আর বাকি আছে পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর! সুতরাং আদনানের কথা বাতিল।
জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসির ইমাম ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৭৪ হি.) বলেছেন, كل حديث ورد فيه تحديد وقت القيامة على التعيين، لا يثبت إسناده “যে হাদিসেই কেয়ামতের সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, সে হাদিসেরই সনদ প্রমাণিত নয়।” [ইবনু কাসির কৃত আন-নিহায়া ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৪; তাহকিক: ইসামুদ্দিন আস-সাবাবিতি; দারুল হাদিস কর্তৃক প্রকাশিত]
হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৯৫ হি.) কেয়ামতের সময়কাল বলে দেওয়া লোকদের বেশকিছু দলিল পেশ করে বলেছেন, وأخذُ بقاء ما بقي من الدنيا على التَّحديد من هذه النصوص لا يصح، فإن الله استأثر بعلم الساعة، ولم يُطْلِع عليه أحدًا من خلقه، وهو من مفاتح الغيب الخمسة التي لا يعلمها إلا الله “এসব দলিল থেকে পৃথিবীর বয়স আর কতটুকু বাকি আছে তা নির্ধারণ করা সঠিক নয়। কেননা কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন। তাঁর কোনো সৃষ্টিকে কেয়ামতের সময়কাল জানাননি। এটা অদৃশ্যের পাঁচটি চাবিকাঠির একটি, যেই পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।” [ইবনু রজব কৃত ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৩৮; মাকতাবাতুল গুরাবায়িল আসারিয়্যা (মদিনা) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
হাদিসের বিখ্যাত ভাষ্যকার ইমাম আমির সানআনি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ১১৮২ হি.) বলেছেন, اعلم أن مقدار الدنيا لا يعلمه إلّا الله، i ولم يرد نص من كتاب ولا سنة في بيان ذلك “জেনে রেখ, পৃথিবীর বয়স আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কিতাব ও সুন্নাহয় এ বিষয়ের কোনো বিবরণ আসেনি।” [রিসালাতুন শারিফা, পৃষ্ঠা: ৩০; গৃহীত: শাইখ মুহাম্মাদ ইসমায়িল আল-মুকাদ্দাম বিরচিত ফিকহু আশরাতিস সাআহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২২৭]
তৎকালীন বিপথগামীদের মধ্যে যারা কেয়ামতের সময়কাল বলে বেড়াত, তাদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭২৮ হি.) যা বলেছিলেন, তা হালের আবু ত্বহা আদনান ও তার সমমনা ভ্রান্তদের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলে যায়। তিনি বলেছিলেন, فإنهم -وان كان لهم صورة عظيمة عند أتباعهم- فغالبهم كاذبون مفترون، وقد تبين لديهم من وجوه كثيرة أنهم يتكلمون بغير علم؛ “এসব লোকের অনুসারীদের কাছে যদিও তাদের বিরাট মর্যাদা রয়েছে, তথাপি এদের অধিকাংশই অপবাদ-দানকারী মিথ্যুক। বিভিন্ন সূত্রে প্রতীয়মান হয়েছে, এরা বিনা ইলমে কথা বলে থাকে।” [মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৪২; তাহকিক: শাইখ আব্দুর রহমান বিন কাসিম; কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স ফর পাবলিশিং কুরআন (মদিনা) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪১৬ হি./১৯৯৫ খ্রি.]
অনেকে বলতে পারেন, ‘আবু ত্বহা আদনান তো কেয়ামতের আলামত কবে ঘটবে, সেটা বলেছে, কেয়ামত হবে কবে, সেটা বলেননি।’ এর জবাব দুভাবে দিব আমরা। প্রথমত, সে কেয়ামতের ব্যাপারেই জানিয়েছে, পঞ্চাশ থেকে ষাট বছরের মধ্যে সবকিছু ঘটে যাবে। আলামতগুলো ঘটে গেলেই তো কেয়ামত! সুতরাং প্রকারান্তরে সে কেয়ামতের আলামতের ব্যাপারেও বলেছে।
দ্বিতীয়ত, কেয়ামতের যেসব আলামত প্রকাশিত হয়নি, সেগুলোও অদৃশ্যের জ্ঞানের অন্তর্গত। এগুলোর সময়কাল বলে দেওয়াও নিষিদ্ধ। ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৬৭১ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘আত-তাযকিরা’ গ্রন্থে বলেছেন, إن ما أخبر به النبي -ﷺ- من الفتن، والكوائن أن ذلك يكون، وتعيين الزمان في ذلك من سنة كذا، يحتاج إلى طريق صحيح يقطع العذر، وإنما ذلك كوقت قيام الساعة؛ فلا يعلم أحدٌ أيَّ سنة هي؟ ولا أيَّ شهر؟ أما أنها تكون في يوم الجمعة في آخر ساعة منه، وهي الساعة التي خلق الله فيها آدم عليه السلام، ولكن أي جمعة؟ لا يعلم تعيين ذلك اليوم إلا الله وحده لا شريك له، وكذلك ما يكون من الأشراط تعيين الزمان لها لا يُعْلم “নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব ফিতনা ও ঘটনার ব্যাপারে জানিয়েছেন, সেগুলো আগামীতে সংঘটিত হবে, সেসব বিষয় এবং অমুক বছরে ঘটবে বলে সময় নির্ধারণ করার বিষয়টি পুরোপুরি আপত্তি-দূরকারী বিশুদ্ধ দলিলের ওপর নির্ভরশীল। এসব ঘটিতব্য ঘটনাও কেয়ামতের সময়ের মতো। কেউ জানে না, কোন বছরে বা কোন মাসে তা সংঘটিত হবে। পক্ষান্তরে শুক্রবারে কেয়ামত হবে মর্মে বর্ণিত হয়েছে। এটা সেই সময় যে সময়ে আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কোন শুক্রবারে? অদ্বিতীয় এক আল্লাহ ছাড়া নির্দিষ্ট করে কেউ জানে না, সে দিন আসলে কোন দিন। তদ্রুপ কেয়ামতের যেসব আলামত আছে, সেসবের সময় নির্ধারণের ব্যাপারটিও অজ্ঞাত, অজানা।” [দেখুন: আত-তাযকিরা বি আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরা, পৃষ্ঠা: ১২২২-১১২৩; তাহকিক: ড. সাদিক ইবরাহিম; মাকতাবাতু দারিল মিনহাজ (রিয়াদ) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২৫ হিজরি (১ম প্রকাশ)]
প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ইমাম সাখাউয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৯০২ হি.) বলেছেন, ومن فوائده: الردُّ على الحراليِّ المغربي الزاعِم أنَّه استخرج من الحرفِ وقتَ خروج الدجَّال، ووقتَ طلوعِ الشَّمس من مغربِها، مع أنَّ هذه تحديداتٌ وعلومٌ استأثر اللهُ بها عن سائرِ أنبيائِه ورُسلِه، فضلًا عن مَن دونه “উক্ত হাদিস থেকে জানা যায় হারালি আল-মাগরিবির খণ্ডন। যে মনে করে, সে বর্ণমালা থেকে উদ্ঘাটন করেছে দাজ্জাল বের হওয়ার সময় এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের সময়। অথচ এগুলো এমন জ্ঞান, আর সময় নির্ধারণ, যা সাধারণরা তো দূরের কথা আল্লাহ তাঁর সকল নবি ও রসুল থেকেই তা গোপন করে রেখেছেন।” [সাখাউয়ি কৃত আল-কানাআহ ফি মা ইউহসুনুল ইহাতাতু বিহি মিন আশরাতিস সাআহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৮; তাহকিক: শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আল-আকিল; মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ (রিয়াদ) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
ভারতবর্ষের বিখ্যাত আহলেহাদিস বিদ্বান, ইমাম সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ১৩০৭ হি.) বলেছেন, وقد وقعتْ منها ملاحمُ وفتنٌ كثيرةٌ، ويقعُ ما بقي منها، ولكنِ العِلمُ بمواقيتها ممَّا استأثر اللهُ سبحانه وتعالى بعِلمِه، ولا يتيسَّر لبشرٍ العلمُ بوقتها، إلَّا بعدَ وقوعها، وحُصولِ التطبيقِ بالأحاديثِ الواردة فيها “ইতোমধ্যে অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ফিতনা সংঘটিত হয়েছে। বাকিগুলোও সংঘটিত হবে। কিন্তু এসব ঘটনার সময়কাল সংক্রান্ত জ্ঞান মহান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন। সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এবং এ বিষয়ক হাদিসগুলোর সমন্বয় ব্যতিরেকে কোনো মানুষের পক্ষে এসব ঘটনার সময়কাল জানা সম্ভব না।” [সিদ্দিক হাসান খান বিরচিত আবজাদুল উলুম, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫১৮; দেমাস্ক থেকে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত]
প্রকৃতপ্রস্তাবে কেয়ামত এবং কেয়ামতের পূর্বে ঘটিতব্য আলামতগুলো এত বছরের মধ্যে ঘটবে, অমুক তারিখে ঘটবে, এমন কথা যারা বলে, তাদের এ কথায় বিশ্বাস করা না-জায়েজ। কারণ এগুলো গায়েবের জ্ঞান, এসবের সময়কাল সম্পর্কে এক আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আবু ত্বহা আদনান আজ নতুন নয়। ইতঃপূর্বে অনেকেই কেয়ামতের আলামত অমুক দিন প্রকাশিত হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, আলামত আর সংঘটিত হয়নি! আরব বিশ্বে এমন বিপথগামীদের অনেক ঘটনা রয়েছে। [দেখুন: শাইখ আব্দুল্লাহ আল-উজাইরি বিরচিত মাআলিম ওয়া মানারাত ফি তানযিলি নুসিসিল ফিতানি ওয়াল মালাহিমি ওয়া আশরাতিস সাআতি আলাল ওয়াকায়িয়ি ওয়াল হাওয়াদিস, পৃষ্ঠা: ২১৭-২১৯]
·
দ্বিতীয় বিষয়ের আলোচনা: আদনান সাহেবের দাবি অনুযায়ী এরকম বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে স্কলারদের। মানে উলামারা চাইলে গবেষণা করে বলতে পারবেন, কবে হবে কেয়ামত, কিংবা কবে প্রকাশিত হবে কেয়ামতের আলামত! অথচ কেয়ামত এবং কেয়ামতের আলামত এমন মৌলিক বিষয়, যেসব বিষয়ে ইজতিহাদ বা গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন ধরুন, কেউ বলল, আল্লাহ কোথায় আছেন, এটা ইজতিহাদি তথা গবেষণানির্ভর বিষয়, গবেষণা করে উলামারা বিভিন্ন মত ব্যক্ত করতে পারবেন, কোনো মুসলিম মানবে এই কথা?! কিংবা কেউ বলল, কবরের আজাব হবে কিনা সেটা ইজতিহাদি তথা গবেষণানির্ভর বিষয়, গবেষণা করে উলামারা বিভিন্ন মত ব্যক্ত করতে পারবেন, কোনো মুসলিম মানবে এই কথা?! একইভাবে কেয়ামতের আলামত কবে হবে সেটাও ‘গবেষণানির্ভর’ বলা হলে তা মানা যাবে না।
অথচ আদনান সাহেবের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে, নামাজের মধ্যে হাত বুকের ওপর বাঁধবেন, না পেটের ওপর, না নাভীর নিচে — সেরকম মতভেদপূর্ণ বিষয় কেয়ামতের আলামতের কিংবা সরাসরি কেয়ামতের সময়কাল সংক্রান্ত জ্ঞান, যে যার ইচ্ছে মতো গবেষণা করে বলতে পারবেন, কবে হবে কেয়ামত!
যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৮৫২ হি.) বলেছেন, والحق أن ضابط ما يخبره الصحابي إن كان مما لا مجال فيه للاجتهاد ولا منقول عن لسان العرب فحكمه الرفع وإلا فلا، كالإخبار عن الأمور الماضية من بدء الخلق وقصص الأنبياء وعن الأمور الآتية كالملاحم والفتن والبعث وصفة الجنة والنار والأخبار فهذه أشياء لا مجال للاجتهاد فيها “বাস্তবিক অর্থে একজন সাহাবির বক্তব্য যদি এমন বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত হয়, যেসব বিষয়ে ইজতিহাদ তথা গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার সুযোগ নেই এবং যেসব বিষয় আরবি ভাষা থেকেও বর্ণিত নয়, তাহলে সেই বক্তব্য মারফু (নবিজির প্রত্যক্ষ বক্তব্য এমন) হাদিসের মর্যাদা পাবে। অন্যথায় উক্ত মর্যাদা পাবে না। যেমন সৃষ্টির সূচনা ও নবিদের কাহিনীর মতো অতীতের ঘটনাবলি সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়। আবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহ, নানাবিধ ফিতনা, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম, এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রভৃতির মতো আসন্ন বিষয়াবলি সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়। এগুলো এমনসব বিষয়, যাতে গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।” [ইবনু হাজার বিরচিত আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮৬; তাহকিক: শাইখ রাবি আল-মাদখালি; প্রকাশকাল: ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
আমাদের এক সম্মাননীয় ভাই আবু ত্বহা আদনানের ব্যাপারে দোয়া করেছিলেন, আল্লাহ আমাদেরকে এমন বক্তাদের থেকে হেফাজত করুন, যারা শরিয়ত বিষয়ে নবিজির চেয়েও বেশি জেনে ফেলেছে! কারণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও যিনি কেয়ামতের সময় বলতে পারেননি, চোদ্দোশো বছর পরে কোনো এক বিভ্রান্ত বক্তা কিনা সেই সময় বলে দেয়! এজন্য আবু ত্বহা আদনানের মতো ‘বেশি জানা’ বক্তা থেকে দূরে থাকা, পরিবারের মানুষদের দূরে রাখা এবং মুসলিম ভাইদেরকে সতর্ক করা এখন সময়ের দাবি।
এসব মিথ্যুক বক্তাদের থেকে সতর্ক করে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মসজিদে নববির মুদার্রিস এবং মসজিদে কুবার সম্মাননীয় ইমাম ও খতিব, আশ-শাইখ, আল-আল্লামা, আল-ফাকিহ, ড. সুলাইমান বিন সালিমুল্লাহ আর-রুহাইলি হাফিযাহুল্লাহ বলেছেন— “সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও মানবতার নেতা, বরং সৃষ্টির সর্বসেরা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জানতেন না কেয়ামত কখন হবে। তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কীভাবে কেয়ামতের সময় জানতে পারে? এজন্য হে আল্লাহর বান্দা, ওই সকল মিথ্যুক দাজ্জালদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ কোরো না, যারা প্রত্যেক বছর আবির্ভূত হয়, (নিজেদের ব্যাপারে) যারা ধারণা করে, তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানী বা অনুরূপ কিছু। আর ধারণা করে, দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে অমুক সময়ে, কিংবা এই বছরে। এই কথা বিশ্বাস করা কোনো মুমিনের জন্য জায়েজ নয়। কেননা এটা সুনিশ্চিত যে, কেয়ামতের নির্ধারিত সময় মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।” [দেখুন: পোস্ট-সংলগ্ন ভিডিয়োর ১ মিনিট ৭ সেকেন্ড থেকে শেষ পর্যন্ত]
তিনি তার একটি বক্তব্যে কেয়ামতের সময়কাল প্রসঙ্গে বলেছেন, “এবার ইসা আলাইহিস সালাম দুজন ফেরেশতার কাঁধে ভর দিয়ে কোথায় নামবেন? সিরিয়ায় নামবেন। এই যে সিরিয়ায় যুদ্ধ হচ্ছে। সিরিয়ার দামেস্কে সাদা মসজিদের ওপরে তিনি নামবেন। এখন ওই মসজিদ সাদা হয়ে গেছে। যখন এ হাদিস বলা হয়েছিল, তখন মসজিদটাই ছিল না! এখন সেই মসজিদের গম্বুজ সাদা হয়ে গেছে। আর কতসময় বাকি আছে? এখনো ঘুমাচ্ছে সবাই!... এই পুরো সময়টাতে আমাদের হাতে কতটুকু সময় আছে, আল্লাহ ভালো জানেন। তবে আমাদের মনে হয়, আমাদের মত, আমাদের মনে হয়, সবমিলিয়ে হয়তোবা পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি বাকি আছে বলে আমার মনে হয় না। আল্লাহ ভালো জানেন, বারবার বলছি। আমার মত— ফিফটি থেকে সিক্সটি ইয়ার্স (এর মধ্যে) সবগুলো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব।” [দেখুন: youtu.be (১:০৩ মিনিট থেকে ২:০৮ মিনিট পর্যন্ত)]
এমনকি বক্তা আদনান মনে করেন, স্কলারদের এমন মত প্রকাশের অধিকার আছে। অর্থাৎ স্কলাররা গবেষণা করে বলতে পারবেন, কখন কেয়ামত হতে পারে! তিনি আরেকটি বক্তব্যে বলেছেন, “তবে এ বিষয়ে কোনো ডাউট নাই যে, ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স যেদিকে যাচ্ছে, আমাদের হাতে টাইম খুব বেশি নাই। এমন হতে পারে, দুই বছরের মধ্যে, এমন হতে পারে চল্লিশ বছরের মধ্যে। আমরা জানি না। আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব। যেগুলোতে আমরা তাবিল করি, এগুলো ইন্টারপ্রিটেশন বা তাবিল। তাবিল করলে বলতে হবে, আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। তবে কোনো স্কলার হয়তো নিজের মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে যে, তাঁর মতে এটা হতে পারে এত বছরের মধ্যে। সেটা তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাঁর আছে! কোনো একটা মানুষ যখন এগুলি নিয়ে গবেষণা করতে থাকবে, তখন তার মনে হবে, এটা অনেক ক্লোজ।” [দেখুন: youtu.be (১:২০ মিনিট থেকে ১:৫৫ মিনিট পর্যন্ত)]
·
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বুঝতেই পারছেন, এখানে দুটো বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। এক. কেয়ামতের সময়কাল ধারণা বা অনুমান করে নির্ধারণ করার বিধান কী, সে বিষয়ক আলোচনা। দুই. এরকম মত প্রকাশের অধিকার স্কলারদের আছে কিনা, সে বিষয়ক আলোচনা।
প্রথম বিষয়ের আলোচনা: ফিতনার এ সময়ে আমাদের সবসময় মনে রাখা জরুরি— শরিয়তের কোনো দলিলে পৃথিবীর বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। সোজাকথায় কেয়ামত কোন সময়ে হবে সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই। কেবল আল্লাহর কাছেই আছে এ বিষয়ক জ্ঞান। মহান আল্লাহ বলেছেন, وَتَبَارَكَ الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَعِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ “মহাবরকতময় তিনি, যিনি আকাশরাজি ও পৃথিবী এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর অধিপতি। কেয়ামতের জ্ঞান শুধু তাঁরই আছে এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সুরা যুখরুফ: ৮৫]
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ “অদৃশ্যের চাবিকাঠি রয়েছে তাঁরই নিকটে; তিনি ছাড়া আর কেউ তা অবগত নয়।” [সুরা আনআম: ৫৯] রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, مَفَاتِحُ الْغَيْبِ خَمْسٌ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا اللهُ لَا يَعْلَمُ مَا فِيْ غَدٍ إِلَّا اللهُ وَلَا يَعْلَمُ مَا تَغِيْضُ الْأَرْحَامُ إِلَّا اللهُ وَلَا يَعْلَمُ مَتَى يَأْتِي الْمَطَرُ أَحَدٌ إِلَّا اللهُ وَلَا تَدْرِيْ نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوْتُ وَلَا يَعْلَمُ مَتَى تَقُوْمُ السَّاعَةُ إِلَّا اللهُ “অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেগুলো হলো আগামী দিন কী হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। মায়ের জরায়ুতে কী আছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বৃষ্টি কখন আসবে, তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। কোনো মানুষ জানে না, তার মৃত্যু কোথায় হবে। আর কেয়ামত কবে সংঘটিত হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না।” [সহিহুল বুখারি, হা: ৪৬৯৭]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কেয়ামতের সময়কাল নির্ধারণ করেননি। আর করবেনই বা কীভাবে? মহান আল্লাহ বলেছেন, يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছে, কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে? তুমি বলে দাও, এ বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে কেবল আমার রবের নিকটে। শুধু তিনিই কেয়ামতের নির্ধারিত সময়ে ওটাকে (কেয়ামতকে) প্রকাশ করবেন।” [সুরা আরাফ: ১৮৭]
আমাদের সুপরিচিত হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত হয়েছে, জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, مَتَى السَّاعَةُ “কেয়ামত কবে?” নবিজি জবাব দিয়েছিলেন, مَا الْمَسْئُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ “এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন।” [সহিহুল বুখারি, হা: ৫০; সহিহ মুসলিম, হা: ৮; শব্দাবলি বুখারির] নবিজিকে জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও তিনি যখন অনুমান করে কেয়ামতের সময় বলেননি, তখন এ বিষয়ে ভদ্র মুমিনের কাজ হবে, নবিজির আগবাড়িয়ে ধারণাপ্রসূত মন্তব্য না করা। কিন্তু আবু ত্বহা আদনানের মতো জনপ্রিয় বক্তারা নবিজির চেয়েও বেশি জ্ঞানী সেজেছেন। এজন্য অনুমান করে কেয়ামতের সময়কাল বলে বেড়ান তারা!
যারা অনুমান করে সময়কাল বলে দেয়, তাদের ব্যাপারে যুগে যুগে সু্ন্নাহপন্থি প্রাজ্ঞ উলামাগণ কী অবস্থান গ্রহণ করেছেন, আমরা এখন সেটা জেনে নিব। ইনশাআল্লাহ। ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৪৫৬ হি.) বলেছেন, وأما اختلاف الناس في التاريخ، فإن اليهود يقولون: للدنيا أربعة آلاف سنة ونيف. والنصارى يقولون: للدنيا خمسة آلاف سنة. وأما نحن فلا نقطع على عدد معروف عندنا. وأما من ادعى في ذلك سبعة آلاف سنة أو أكثر أو أقل فقد كذب، وقال ما لم يأت قط عن رسول الله صلى الله عليه وسلم فيه لفظة تصح، بل صح عنه عليه السلام خلافه، بل نقطع على أن للدنيا أمرا لا يعلمه إلا الله عز وجل “ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষ এ বিষয়ে মতভেদ করেছে। ইহুদিদের মতে পৃথিবীর বয়স চার হাজার বছরের কিছু বেশি। খ্রিষ্টানদের মতে পৃথিবীর বয়স পাঁচ হাজার বছর। পক্ষান্তরে আমরা (মুসলিমরা) কোনো সুবিদিত সময়কালের ব্যাপারে নিশ্চিত বলতে পারি না। সুতরাং যে দাবি করে, পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর, কিংবা এরচেয়ে কিছু বেশি, অথবা এরচেয়ে কিছু কম, সে মিথ্যা বলে। এবং সে ব্যক্তি এমন কথা বলে, যে ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি শব্দও বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়নি। বরং এর বিপরীতটাই নবিজি থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য আমরা নিশ্চিত করে বলি, পৃথিবীর বয়স সম্পর্কে মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।” [আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নিহাল, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৪]
কেউ কেউ বলতে পারেন, ‘আবু ত্বহা আদনান তো নিশ্চিত করে বলেনি, কবে হবে কেয়ামত।’ কিন্তু দেখেন, ঠিকই নিজের মত ব্যক্ত করেছে, বলে দিয়েছে স্পষ্ট করে, ‘আমার মতে ৫০-৬০ বছরের মধ্যে কেয়ামতের প্রাক্কালে ঘটিতব্য বিষয়গুলো ঘটে যাবে!’ কেউ আবার বলেন, ‘আবু ত্বহা বলেছে তো, আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন, সুতরাং তাঁর দোষ ধরেন কেন?!’ আমরা বলি, ‘আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন’ বলে কেউ যদি মত ব্যক্ত করে, প্রকৃত নবি মূলত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু, ভুল করে মুহাম্মাদের কাছে ওহি নিয়ে গেছে জিবরাইল! এরকম কুফরি কথা মানবেন? মানবেন না। একইভাবে আবু ত্বহা আদনানের বাতিল মতও মানা যাবে না।
কেয়ামতের সময়কাল বলে দেওয়া বিপথগামী লোকেরা একটি জাল হাদিস দিয়ে দলিল দেয়। জাল হাদিসে বলা হয়েছে, নবিজি নাকি বলেছেন, الدُّنْيا سَبْعَةُ آلافِ سَنَة، وأنا في آخِرِها ألفًا “পৃথিবীর বয়স সাত হাজার বছর। আমি রয়েছি সর্বশেষ হাজারে।” [দেখুন: দয়িফুল জামিয়িস সগির, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৬০; হা: ৩০১৩]
হাদিস জাল হওয়ার কারণ নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৫১ হি.) বলেছেন, مخالفته صريحَ القرآن؛ كحديث مقدار الدنيا، وأنها سبعة آلاف سنة، ونحن الآن في الألف السابعة، وهذا من أبين الكذب؛ لأنه لو كان صحيحًا، لكان كل واحد عالمًا أنه بقي للقيامة من وقتنا هذا مائتان وإحدى وخمسون سنة “কোনো হাদিস কুরআনের সুস্পষ্ট দলিলের বিরোধী হওয়া। যেমন পৃথিবীর বয়স সংক্রান্ত হাদিস যে, পৃথিবীর বয়স সাত বছর; আর আমরা আছি সপ্তম হাজারে। এটা পরিষ্কার মিথ্যা কথা। কেননা এ কথা যদি ঠিকই হতো, তাহলে প্রত্যেকেই জানত, আমাদের জামানা থেকে কেয়ামত হতে আর বাকি আছে দুইশো একান্ন বছর!” [ইবনুল কাইয়্যিম কৃত আল-মানারুল মুনিফ, পৃষ্ঠা: ৮০; তাহকিক: আবু গুদ্দাহ; মাকতাবুল মাতবুয়াতিল ইসলামিয়্যা (আলেপ্পো) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৩৯০ হি./১৯৭০ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
আমরাও বলব, আবু ত্বহা আদনানের কথা যদি সঠিক হতো, তাহলে প্রত্যেকেই জানত, আমাদের জামানা থেকে কেয়ামত হতে আর বাকি আছে পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর! সুতরাং আদনানের কথা বাতিল।
জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুফাসসির ইমাম ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৭৪ হি.) বলেছেন, كل حديث ورد فيه تحديد وقت القيامة على التعيين، لا يثبت إسناده “যে হাদিসেই কেয়ামতের সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, সে হাদিসেরই সনদ প্রমাণিত নয়।” [ইবনু কাসির কৃত আন-নিহায়া ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৪; তাহকিক: ইসামুদ্দিন আস-সাবাবিতি; দারুল হাদিস কর্তৃক প্রকাশিত]
হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭৯৫ হি.) কেয়ামতের সময়কাল বলে দেওয়া লোকদের বেশকিছু দলিল পেশ করে বলেছেন, وأخذُ بقاء ما بقي من الدنيا على التَّحديد من هذه النصوص لا يصح، فإن الله استأثر بعلم الساعة، ولم يُطْلِع عليه أحدًا من خلقه، وهو من مفاتح الغيب الخمسة التي لا يعلمها إلا الله “এসব দলিল থেকে পৃথিবীর বয়স আর কতটুকু বাকি আছে তা নির্ধারণ করা সঠিক নয়। কেননা কেয়ামতের জ্ঞান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন। তাঁর কোনো সৃষ্টিকে কেয়ামতের সময়কাল জানাননি। এটা অদৃশ্যের পাঁচটি চাবিকাঠির একটি, যেই পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।” [ইবনু রজব কৃত ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৩৮; মাকতাবাতুল গুরাবায়িল আসারিয়্যা (মদিনা) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
হাদিসের বিখ্যাত ভাষ্যকার ইমাম আমির সানআনি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ১১৮২ হি.) বলেছেন, اعلم أن مقدار الدنيا لا يعلمه إلّا الله، i ولم يرد نص من كتاب ولا سنة في بيان ذلك “জেনে রেখ, পৃথিবীর বয়স আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কিতাব ও সুন্নাহয় এ বিষয়ের কোনো বিবরণ আসেনি।” [রিসালাতুন শারিফা, পৃষ্ঠা: ৩০; গৃহীত: শাইখ মুহাম্মাদ ইসমায়িল আল-মুকাদ্দাম বিরচিত ফিকহু আশরাতিস সাআহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২২৭]
তৎকালীন বিপথগামীদের মধ্যে যারা কেয়ামতের সময়কাল বলে বেড়াত, তাদের ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭২৮ হি.) যা বলেছিলেন, তা হালের আবু ত্বহা আদনান ও তার সমমনা ভ্রান্তদের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলে যায়। তিনি বলেছিলেন, فإنهم -وان كان لهم صورة عظيمة عند أتباعهم- فغالبهم كاذبون مفترون، وقد تبين لديهم من وجوه كثيرة أنهم يتكلمون بغير علم؛ “এসব লোকের অনুসারীদের কাছে যদিও তাদের বিরাট মর্যাদা রয়েছে, তথাপি এদের অধিকাংশই অপবাদ-দানকারী মিথ্যুক। বিভিন্ন সূত্রে প্রতীয়মান হয়েছে, এরা বিনা ইলমে কথা বলে থাকে।” [মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৪২; তাহকিক: শাইখ আব্দুর রহমান বিন কাসিম; কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স ফর পাবলিশিং কুরআন (মদিনা) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪১৬ হি./১৯৯৫ খ্রি.]
অনেকে বলতে পারেন, ‘আবু ত্বহা আদনান তো কেয়ামতের আলামত কবে ঘটবে, সেটা বলেছে, কেয়ামত হবে কবে, সেটা বলেননি।’ এর জবাব দুভাবে দিব আমরা। প্রথমত, সে কেয়ামতের ব্যাপারেই জানিয়েছে, পঞ্চাশ থেকে ষাট বছরের মধ্যে সবকিছু ঘটে যাবে। আলামতগুলো ঘটে গেলেই তো কেয়ামত! সুতরাং প্রকারান্তরে সে কেয়ামতের আলামতের ব্যাপারেও বলেছে।
দ্বিতীয়ত, কেয়ামতের যেসব আলামত প্রকাশিত হয়নি, সেগুলোও অদৃশ্যের জ্ঞানের অন্তর্গত। এগুলোর সময়কাল বলে দেওয়াও নিষিদ্ধ। ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৬৭১ হি.) তাঁর বিখ্যাত ‘আত-তাযকিরা’ গ্রন্থে বলেছেন, إن ما أخبر به النبي -ﷺ- من الفتن، والكوائن أن ذلك يكون، وتعيين الزمان في ذلك من سنة كذا، يحتاج إلى طريق صحيح يقطع العذر، وإنما ذلك كوقت قيام الساعة؛ فلا يعلم أحدٌ أيَّ سنة هي؟ ولا أيَّ شهر؟ أما أنها تكون في يوم الجمعة في آخر ساعة منه، وهي الساعة التي خلق الله فيها آدم عليه السلام، ولكن أي جمعة؟ لا يعلم تعيين ذلك اليوم إلا الله وحده لا شريك له، وكذلك ما يكون من الأشراط تعيين الزمان لها لا يُعْلم “নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব ফিতনা ও ঘটনার ব্যাপারে জানিয়েছেন, সেগুলো আগামীতে সংঘটিত হবে, সেসব বিষয় এবং অমুক বছরে ঘটবে বলে সময় নির্ধারণ করার বিষয়টি পুরোপুরি আপত্তি-দূরকারী বিশুদ্ধ দলিলের ওপর নির্ভরশীল। এসব ঘটিতব্য ঘটনাও কেয়ামতের সময়ের মতো। কেউ জানে না, কোন বছরে বা কোন মাসে তা সংঘটিত হবে। পক্ষান্তরে শুক্রবারে কেয়ামত হবে মর্মে বর্ণিত হয়েছে। এটা সেই সময় যে সময়ে আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু কোন শুক্রবারে? অদ্বিতীয় এক আল্লাহ ছাড়া নির্দিষ্ট করে কেউ জানে না, সে দিন আসলে কোন দিন। তদ্রুপ কেয়ামতের যেসব আলামত আছে, সেসবের সময় নির্ধারণের ব্যাপারটিও অজ্ঞাত, অজানা।” [দেখুন: আত-তাযকিরা বি আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিরা, পৃষ্ঠা: ১২২২-১১২৩; তাহকিক: ড. সাদিক ইবরাহিম; মাকতাবাতু দারিল মিনহাজ (রিয়াদ) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২৫ হিজরি (১ম প্রকাশ)]
প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ইমাম সাখাউয়ি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৯০২ হি.) বলেছেন, ومن فوائده: الردُّ على الحراليِّ المغربي الزاعِم أنَّه استخرج من الحرفِ وقتَ خروج الدجَّال، ووقتَ طلوعِ الشَّمس من مغربِها، مع أنَّ هذه تحديداتٌ وعلومٌ استأثر اللهُ بها عن سائرِ أنبيائِه ورُسلِه، فضلًا عن مَن دونه “উক্ত হাদিস থেকে জানা যায় হারালি আল-মাগরিবির খণ্ডন। যে মনে করে, সে বর্ণমালা থেকে উদ্ঘাটন করেছে দাজ্জাল বের হওয়ার সময় এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের সময়। অথচ এগুলো এমন জ্ঞান, আর সময় নির্ধারণ, যা সাধারণরা তো দূরের কথা আল্লাহ তাঁর সকল নবি ও রসুল থেকেই তা গোপন করে রেখেছেন।” [সাখাউয়ি কৃত আল-কানাআহ ফি মা ইউহসুনুল ইহাতাতু বিহি মিন আশরাতিস সাআহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৮; তাহকিক: শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আল-আকিল; মাকতাবাতু আদওয়ায়িস সালাফ (রিয়াদ) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
ভারতবর্ষের বিখ্যাত আহলেহাদিস বিদ্বান, ইমাম সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ১৩০৭ হি.) বলেছেন, وقد وقعتْ منها ملاحمُ وفتنٌ كثيرةٌ، ويقعُ ما بقي منها، ولكنِ العِلمُ بمواقيتها ممَّا استأثر اللهُ سبحانه وتعالى بعِلمِه، ولا يتيسَّر لبشرٍ العلمُ بوقتها، إلَّا بعدَ وقوعها، وحُصولِ التطبيقِ بالأحاديثِ الواردة فيها “ইতোমধ্যে অনেকগুলো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ফিতনা সংঘটিত হয়েছে। বাকিগুলোও সংঘটিত হবে। কিন্তু এসব ঘটনার সময়কাল সংক্রান্ত জ্ঞান মহান আল্লাহ একান্তই নিজের করে রেখেছেন। সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এবং এ বিষয়ক হাদিসগুলোর সমন্বয় ব্যতিরেকে কোনো মানুষের পক্ষে এসব ঘটনার সময়কাল জানা সম্ভব না।” [সিদ্দিক হাসান খান বিরচিত আবজাদুল উলুম, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫১৮; দেমাস্ক থেকে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত]
প্রকৃতপ্রস্তাবে কেয়ামত এবং কেয়ামতের পূর্বে ঘটিতব্য আলামতগুলো এত বছরের মধ্যে ঘটবে, অমুক তারিখে ঘটবে, এমন কথা যারা বলে, তাদের এ কথায় বিশ্বাস করা না-জায়েজ। কারণ এগুলো গায়েবের জ্ঞান, এসবের সময়কাল সম্পর্কে এক আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আবু ত্বহা আদনান আজ নতুন নয়। ইতঃপূর্বে অনেকেই কেয়ামতের আলামত অমুক দিন প্রকাশিত হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, আলামত আর সংঘটিত হয়নি! আরব বিশ্বে এমন বিপথগামীদের অনেক ঘটনা রয়েছে। [দেখুন: শাইখ আব্দুল্লাহ আল-উজাইরি বিরচিত মাআলিম ওয়া মানারাত ফি তানযিলি নুসিসিল ফিতানি ওয়াল মালাহিমি ওয়া আশরাতিস সাআতি আলাল ওয়াকায়িয়ি ওয়াল হাওয়াদিস, পৃষ্ঠা: ২১৭-২১৯]
·
দ্বিতীয় বিষয়ের আলোচনা: আদনান সাহেবের দাবি অনুযায়ী এরকম বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে স্কলারদের। মানে উলামারা চাইলে গবেষণা করে বলতে পারবেন, কবে হবে কেয়ামত, কিংবা কবে প্রকাশিত হবে কেয়ামতের আলামত! অথচ কেয়ামত এবং কেয়ামতের আলামত এমন মৌলিক বিষয়, যেসব বিষয়ে ইজতিহাদ বা গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন ধরুন, কেউ বলল, আল্লাহ কোথায় আছেন, এটা ইজতিহাদি তথা গবেষণানির্ভর বিষয়, গবেষণা করে উলামারা বিভিন্ন মত ব্যক্ত করতে পারবেন, কোনো মুসলিম মানবে এই কথা?! কিংবা কেউ বলল, কবরের আজাব হবে কিনা সেটা ইজতিহাদি তথা গবেষণানির্ভর বিষয়, গবেষণা করে উলামারা বিভিন্ন মত ব্যক্ত করতে পারবেন, কোনো মুসলিম মানবে এই কথা?! একইভাবে কেয়ামতের আলামত কবে হবে সেটাও ‘গবেষণানির্ভর’ বলা হলে তা মানা যাবে না।
অথচ আদনান সাহেবের ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে, নামাজের মধ্যে হাত বুকের ওপর বাঁধবেন, না পেটের ওপর, না নাভীর নিচে — সেরকম মতভেদপূর্ণ বিষয় কেয়ামতের আলামতের কিংবা সরাসরি কেয়ামতের সময়কাল সংক্রান্ত জ্ঞান, যে যার ইচ্ছে মতো গবেষণা করে বলতে পারবেন, কবে হবে কেয়ামত!
যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৮৫২ হি.) বলেছেন, والحق أن ضابط ما يخبره الصحابي إن كان مما لا مجال فيه للاجتهاد ولا منقول عن لسان العرب فحكمه الرفع وإلا فلا، كالإخبار عن الأمور الماضية من بدء الخلق وقصص الأنبياء وعن الأمور الآتية كالملاحم والفتن والبعث وصفة الجنة والنار والأخبار فهذه أشياء لا مجال للاجتهاد فيها “বাস্তবিক অর্থে একজন সাহাবির বক্তব্য যদি এমন বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত হয়, যেসব বিষয়ে ইজতিহাদ তথা গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার সুযোগ নেই এবং যেসব বিষয় আরবি ভাষা থেকেও বর্ণিত নয়, তাহলে সেই বক্তব্য মারফু (নবিজির প্রত্যক্ষ বক্তব্য এমন) হাদিসের মর্যাদা পাবে। অন্যথায় উক্ত মর্যাদা পাবে না। যেমন সৃষ্টির সূচনা ও নবিদের কাহিনীর মতো অতীতের ঘটনাবলি সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়। আবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহ, নানাবিধ ফিতনা, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম, এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রভৃতির মতো আসন্ন বিষয়াবলি সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া হয়। এগুলো এমনসব বিষয়, যাতে গবেষণা করে মত ব্যক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।” [ইবনু হাজার বিরচিত আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮৬; তাহকিক: শাইখ রাবি আল-মাদখালি; প্রকাশকাল: ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খ্রি. (১ম প্রকাশ)]
আমাদের এক সম্মাননীয় ভাই আবু ত্বহা আদনানের ব্যাপারে দোয়া করেছিলেন, আল্লাহ আমাদেরকে এমন বক্তাদের থেকে হেফাজত করুন, যারা শরিয়ত বিষয়ে নবিজির চেয়েও বেশি জেনে ফেলেছে! কারণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও যিনি কেয়ামতের সময় বলতে পারেননি, চোদ্দোশো বছর পরে কোনো এক বিভ্রান্ত বক্তা কিনা সেই সময় বলে দেয়! এজন্য আবু ত্বহা আদনানের মতো ‘বেশি জানা’ বক্তা থেকে দূরে থাকা, পরিবারের মানুষদের দূরে রাখা এবং মুসলিম ভাইদেরকে সতর্ক করা এখন সময়ের দাবি।
এসব মিথ্যুক বক্তাদের থেকে সতর্ক করে মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মসজিদে নববির মুদার্রিস এবং মসজিদে কুবার সম্মাননীয় ইমাম ও খতিব, আশ-শাইখ, আল-আল্লামা, আল-ফাকিহ, ড. সুলাইমান বিন সালিমুল্লাহ আর-রুহাইলি হাফিযাহুল্লাহ বলেছেন— “সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ও মানবতার নেতা, বরং সৃষ্টির সর্বসেরা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জানতেন না কেয়ামত কখন হবে। তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কীভাবে কেয়ামতের সময় জানতে পারে? এজন্য হে আল্লাহর বান্দা, ওই সকল মিথ্যুক দাজ্জালদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ কোরো না, যারা প্রত্যেক বছর আবির্ভূত হয়, (নিজেদের ব্যাপারে) যারা ধারণা করে, তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানী বা অনুরূপ কিছু। আর ধারণা করে, দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে অমুক সময়ে, কিংবা এই বছরে। এই কথা বিশ্বাস করা কোনো মুমিনের জন্য জায়েজ নয়। কেননা এটা সুনিশ্চিত যে, কেয়ামতের নির্ধারিত সময় মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।” [দেখুন: পোস্ট-সংলগ্ন ভিডিয়োর ১ মিনিট ৭ সেকেন্ড থেকে শেষ পর্যন্ত]
লিখেছেন: মুহাম্মাদ আব্দুল্ললাহ মৃধা।